দরিদ্র্যের কশাঘাতে যিনি ছিলেন পরিত্যাজ্য, তিনি এখন ৩০০ নারী বুনন কারিগরের কর্মসংস্থানের কারিগর। পোশাক, কাঁথা থেকে শুরু করে সব ধরনের হস্তশিল্পের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনের গল্পটা অতটা মসৃণ নয়। গল্পটা জামালপুরের আমলাপাড়ার হাসি বেগমের। তার শোরুমে এখন নিজের উদ্যোগের সবকিছুই পাওয়া যায়। 

হাসি বেগমের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা শুরু ১৯৯৫ সালে। ওই সময়ই তিনি ইসলামী ব্যাংকের আরডিএসের খোঁজ পেয়েছিলেন। প্রকল্পের সদস্য হয়ে তখন ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। শুরুতে প্রতিবেশীদের টেইলারিংয়ের কাজ করতেন। ওড়না, ফ্রক, রাতের পোশাক ও থ্রিপিসের মধ্যে এমব্রয়ডারির কারিগরি বুননে নজর কেড়েছিলেন সবার। পাশাপাশি চোখ জুড়ানো বালিশের কভার, চাদর, টুপি ও হিজাবের মতো নিয়মিত জিনিসপত্রও বানাতেন। এসব পণ্য নিয়ে হাসি বেগম জামালপুরের দোকানিদের কাছে যেতেন। কাজের মুনশিয়ানা দেখিয়ে সহজে রাজিও করাতে পারতেন। পণ্য বিক্রি করতেন পাইকারিতে। দিনে দিনে তার আয়ও বাড়ছিল। 

কাজের সুযোগ করে দেন আশপাশের নারীদেরও। পণ্য বিক্রির পর কারিগরদের সঙ্গে তার লেনদেনটা ছিল পরিষ্কার। আর এ কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয়। সুনাম ছড়াল পরিচিতজনসহ সবার মাঝেই। সুনামের বিনিয়োগে বাড়ল তার ব্যবসার পরিধিও। একটা সময় ব্যাংক তাকে আরো ঋণ দিল নিজের ভিত শক্ত করার জন্য। হাসি বেগম সে টাকায় এখন দোকানের মালিক। জামালপুর জেলার সবচেয়ে নামিদামি শোরুমের একটি এখন তার। নিজের শোরুমের নকশাও করেছেন দৃষ্টিনন্দন। নানান পণ্যের পসরা। লেডিস পার্টস, বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ, হ্যান্ডব্যাগ, টিফিন ব্যাগ, স্মারক পণ্যসহ নারীদের যত সুন্দর সুন্দর সাজগোজের কাপড়—সবই মেলে তার দোকানে। 

কারিগররা হাসিকে আড়ম্বরপূর্ণ সব পণ্য সরবরাহ করেন। ‘হাসিজ শপ’-এ এখন ভিড় করেন ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইলের পাইকারি ক্রেতারা। ফলে ব্যতিক্রমী এ দোকানকে ঘিরে জামালপুরের অনেক নারীর আয়-রোজগারের সংস্থান হয়েছে। হাসির শোরুমের নকশিকাঁথা, পোশাকসহ সব শিল্পের বিক্রি করা অর্থের লভ্যাংশ দিয়ে সংসার চলে ৩০০ বুনন কারিগরের। শোরুমের আয় দিয়ে চলে নিজের সংসারও। অথচ একসময় রোজগার না থাকা স্বামীর সংসারে তেল আনতে পানতা ফুরোনোর অবস্থা ছিল। এখন শোরুমে তার স্বামী সার্বক্ষণিক সময় দেন। সঙ্গে থাকেন ছেলে নাজমুল হাসানও। হাসি বেগম নিজেদের বাড়িও গড়েছেন।

বর্তমানে নিদারুণ সমস্যায় আছেন হাসি বেগম। তাকে যারা পণ্যগুলো সরবরাহ করছেন তাদের নগদ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে পাইকাররা কয়েক মাসের করে বাকি রেখে দিয়েছেন। বাজারের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আরডিএসের কাছে তার ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ানোর আবেদন করেছেন।

এত সংকটের মধ্যেও হাসি বেগমের হাসিটা কমেনি। দারিদ্র্য উতরে এ পর্যায়ে আসার গল্পটার সাক্ষী তো তিনি নিজেই। ফলে তার কাছে এসব কষ্ট কিছুই না। 

হাসি বেগম বলেন, ‘দারিদ্র্য আমার মুখে হাসি কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অনেক লড়েছি। আমি আমার হাসি ফিরে পাওয়ার জন্য আরডিএসকে ধন্যবাদ জানাই।’