'নেভিগেটিং ডেভেলপমেন্ট পাথওয়েজ ইন ইভলভিং গ্লোবাল অর্ডার' বা পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে উন্নয়নের পথ অনুসন্ধান-এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ৫ ও ৬ মে, ২০২৪ রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম উন্নয়ন অধ্যয়ন সম্মেলন 'ডিএসআইসি ২০২৪'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ও বণিক বার্তা যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সম্মেলনের নয়টি সেশনে মোট ৩৪টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া চারটি পলিসি ডায়ালগ এবং চারটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। সম্মেলনে বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস, চীন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, নেপাল, ইথিওপিয়া, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

উদ্বোধনী অধিবেশন

উদ্বোধনী অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ছিল 'নেভিগেটিং দ্য কমপ্লেক্সিটিজ অব দি ইভলভিং গ্লোবাল অর্ডার ফর ডেভেলপমেন্ট পাথওয়েজ'। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, নেদারল্যান্ডসের হেগভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল স্টাডিজের রেক্টর ড. আর আর গ্যানজিভোর্ট, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের অ্যাসোসিয়েট প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (রিসার্চ) ড. জো ডিভাইন এবং সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন। স্বাগত বক্তব্য রাখার পাশাপাশি অধিবেশন সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার বলেন, 'বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক রাজনীতিসহ নানা সমস্যার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।'

দ্বিতীয় প্লেনারি

সম্মেলনের প্রথম দিনের দ্বিতীয় প্লেনারির প্রতিপাদ্য ছিল 'ফিসক্যাল অ্যান্ড মনিটারি পলিসি ইন দি ইভলভিং ইকোনমিক অর্ডার'। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। সম্মানিত আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও ফজলে কবির, সাবেক অর্থ সচিব ড. মোহাম্মদ তারেক ও মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।

দ্বিতীয় প্লেনারির আলোচনায় বলা হয়, আমাদের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। আদায়কৃত রাজস্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ কর এক-তৃতীয়াংশ। বাকি দুই-তৃতীয়াংশই পরোক্ষ কর। এর অর্থ হলো ধনীদের তুলনায় গরিবদের বেশি কর দিতে হচ্ছে।

বক্তব্যে আরো উঠে আসে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারকে কোনো ধরনের ঋণ দেয়া হচ্ছে না। বর্তমান সুদহার নির্ধারণের পদ্ধতিটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে সুদহার নির্ধারণে ব্যাংকের স্বাধীনতা থাকবে। চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো এটি নির্ধারণ করতে পারবে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানান আলোচকরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শও উঠে আসে আলোচকদের বক্তব্যে।

তৃতীয় প্লেনারি

তৃতীয় প্লেনারির শিরোনাম ছিল 'পার্টনারশিপ ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট।' এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শহিদুজ্জামান সরকার। সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান এমএ মান্নান। সম্মানিত আলোচক ছিলেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল্লায়ে সেক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও মধ্যপ্রাচ্য) মিরানা মাহরুখ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি ও চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। অধিবেশনটি সঞ্চালনায় ছিলেন অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম।

অধিবেশনের আলোচনায় বক্তারা বলেন, সরকার বর্তমানে বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। এ খাত শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের । বেসরকারি খাত থেকে প্রত্যাশিত সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে। গত তিন-চার বছর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মধ্যম পর্যায়ে রয়েছে।

সমাপনী অধিবেশন

দ্বিতীয় দিনে সমাপনী অধিবেশনের বিষয়বস্তু ছিল 'ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ইন একাডেমিয়া'। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল।

সম্মানিত আলোচকদের মধ্যে ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম কামরুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ।

অধিবেশনের আলোচনায় বক্তারা বলেন, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার চর্চা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে উন্নয়নের সঙ্গে নৈতিকতার সংযোগ থাকতে হবে। আর উন্নয়ন অধ্যয়নের কারিকুলাম হতে হবে সামগ্রিক। এক্ষেত্রে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের উচিত হবে সমন্বিত একটা পাঠ্যসূচি তৈরি করা। অন্যদিকে সরকারকে উন্নয়ন ও গবেষণায় আরো বেশি অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।