সে আমলে প্রবেশিকা পরীক্ষা হতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪২ সালে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতার বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে কলা বিভাগে ভর্তি হন।

বাংলার গভর্নর ভিক্টর বুলওয়ার-স্কিটন বিশেষত পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে এ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। দানবীর হাজী মুহম্মদ মুহসীন কিদওয়াহ কলেজ ক্যাম্পাসের জন্য জমি দান করেন। মফস্বলের ছেলেদের আবাসিক সুবিধার জন্য একাধিক হোস্টেলও নির্মাণ করা হয়। এমনি একটি ছাত্রাবাসের নাম বেকার হোস্টেল। শেখ মুজিবকে এ বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষটি বরাদ্দ দেয়া হয়।

শেখ মুজিব যখন কলেজে ভর্তি হন তখন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন ড. আই এ ই জুবেরী। বেকার হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন তরুণ প্রভাষক সাইদুর রহমান। দেশভাগের পর কলেজটির পুরনো নাম পরিহার করে নতুন নামকরণ করা হয় সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজ। ১৯৬০ সালে আরেক দফা কলেজটির নাম বদলে করা হয় ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের নামে কলেজ। বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ নামেই কলেজটি পরিচিত।

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ মুজিব ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। রাজনীতিতে প্রকৃত হাতেখড়ি তার আগেই হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল পরিদর্শন করতে গেলে বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন অনুযায়ী প্রদেশের চিফ মিনিস্টারকে সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী বলা হতো) এ কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পথ আগলে প্রতিবাদী কিশোর মুজিব স্কুলের দাবি-দাওয়া পেশ করে তখনই সোহরাওয়ার্দীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীকালে তাদের মধ্যকার যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ থাকে। বিশেষত ১৯৩৯ সালে কলকাতা বেড়াতে গিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার এবং তার উপদেশ ও পরামর্শ নিয়ে গোপালগঞ্জে ফিরে আসার পর তিনি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। সেটি ছিল হাত মকশ করার মতো। প্রকৃত রাজনৈতিক জীবনের শুরু ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পর।

কলকাতার মুসলিম ছাত্রলীগ তখন দুই উপদলে বিভক্ত। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিব ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন:

ছাত্রদের মধ্যে দুইটা দল ছিল। চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরীও তখন ছাত্র আন্দোলনের একজন নেতা ছিলেন। ওয়াসেক সাহেব ও ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাথে গোলমাল লেগেই ছিল। ওয়াসেক সাহেব ছাত্রদের রাজনৈতিক পিতা ছিলেন বললে অন্যায় হবে না। বহুদিন তিনি ‘অল বেঙ্গল মুসলিম ছাত্রলীগের’ সভাপতি ছিলেন। ছাত্রজীবন শেষ করেছেন বোধ হয় পনেরো বছর পূর্বে। তবুও তিনি পদ ছাড়বেন না। কেউ তার মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই তিনি বলতেন, ‘কে হে তুমি? তুমি তো ছাত্রলীগের সদস্য বা কাউন্সিলার নও; বের হয়ে যাও সভা থেকে।’ প্রথমে কেউই কিছু বলত না তাঁকে সম্মান করে। প্রথম গোলমাল হয় বোধ হয় ১৯৪১ বা ১৯৪২ চুঁচুড়া সম্মেলনে। ফজলুল কাদের চৌধুরী ও আমরা ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলাম। শেষ পর্যন্ত শহীদ সাহেবের হস্তক্ষেপে গোলমাল হল না।১

শেখ মুজিবের এ উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, মুসলিম লীগের অনুসারী মুসলিম ছাত্রলীগ ক্রমেই মুসলমান ছাত্রদের প্রধান সংগঠনে পরিণত হলেও সংগঠনের অভ্যন্তরে কার্যত কোনো গণতন্ত্রের চর্চা ছিল না। ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও পনেরো বছর (!) ছাত্রলীগের সভাপতি থাকা ও দলাদলির যে কু-দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, দেশভাগের পরও সেই ‘ঐতিহ্য’ বজায় ছিল। যে কারণে ১৯৪৮ সালেই মুসলিম ছাত্রলীগ আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সময়টা ছিল মুসলিম লীগের উত্থানের যুগ। লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর দ্রুতই তা বাংলার মুসলমান ছাত্র-তরুণদের মধ্যে এক ধরনের সঞ্জীবনী সুধার কাজ করে। ছাত্রসমাজ তখন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে। ইসলামিয়া কলেজ ছিল বাংলার মুসলমান ছাত্রদের আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ক্রমেই এ প্রাণকেন্দ্রের প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠেন ছাত্রনেতা শেখ মুজিব। তাঁর ভাষায়:

এই সময় ইসলামিয়া কলেজে আমি খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছি। অফিসিয়াল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে তাদের পরাজিত করলাম। ইসলামিয়া কলেজেই বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। পরের বছরও ১৯৪৩ সালে ইলেকশনে আনোয়ার সাহেবের অফিসিয়াল ছাত্রলীগ পরাজিত হল। তারপর তিন বৎসর কেউই আমার মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ইলেকশন করে নাই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের ইলেকশন হত। আমি ছাত্রনেতাদের নিয়ে আলোচনা করে যাদের করে দিতাম তারাই নমিনেশন দাখিল করত, আর কেউ করত না। কারণ, জানত আমার মতের বিরুদ্ধে কারও জিতবার সম্ভাবনা ছিল না।২

ইসলামিয়া কলেজে তার এ জনপ্রিয়তা পরবর্তীকালে আরো বৃদ্ধি পায়। তিনি হয়ে ওঠেন ছাত্র-সমাজের অবিসংবাদিত নেতা। এরই ধারাবাহিকতায় ‘১৯৪৬ সালে উক্ত ছাত্র নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।’৩

ভারত ও অবিভক্ত বাংলার ছাত্র আন্দোলনের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল দীর্ঘ ইতিহাস। উনিশ শতকে বাঙালি রেনেসাঁর অন্যতম প্রতীক হচ্ছে ইয়ং বেঙ্গল বলে পরিচিত দ্রোহ চেতনার তরুণ শিক্ষার্থীগণ। উনিশ শতকে যাত্রারম্ভ হলেও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ধারায় সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠন গড়ে ওঠে বিশ শতকের কুড়ি ও ত্রিশের দশকে। চল্লিশের দশকে এসব ছাত্র সংগঠন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং কর্মসূচি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৩৬ সালে গঠিত ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন’ ছিল দৃশ্যত জাতীয় কংগ্রেসের অনুসারী জাতীয়তাবাদী ধারার বড় সংগঠন। এ সংগঠন ছিল বামপন্থী, ফরোয়ার্ড ব্লক (সুভাষ বসুপন্থী) এবং গান্ধী-নেহরুপন্থী বিভিন্ন উপদল। ১৯৩৯ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির সম্মেলন থেকে ভাঙন প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে চলে আসে। ১৯৪০ সালে নাগপুরে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশন দুই ভাগে বিভক্ত হয়। দুই উপদলই ‘ছাত্র ফেডারেশন’ নামটি ব্যবহার করে। তবে ১৯৪৫ সালে একটি অংশ নতুন ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস কংগ্রেস’ নাম গ্রহণ করে। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশন কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে কর্মকাণ্ড চালায়।

ইসলামিয়া কলেজে কংগ্রেস অনুসারী ছাত্র সংগঠনের তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। তবে কলকাতার মুসলমান ছাত্রদের একটি অংশের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির গোপন ও প্রকাশ্য যোগাযোগ ছিল। সেই সুবাদে ইসলামিয়া কলেজের মুসলিম ছাত্রদেরও বিশিষ্ট কয়েকজন ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মোজাফ্ফর চৌধুরী ছিলেন তেমনই একজন। এছাড়া কে জি মোস্তফা, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ ছাত্রনেতা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

জিন্নাহর উদ্যোগে ১৯৩৭ সালে গঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন ১৯৩৮ সালে নাম পরিবর্তন করে হয় অল ইন্ডিয়া মুসলিম ছাত্রলীগ। বাংলায় এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের একজন ছিলেন আবদুল ওয়াসেক। এছাড়া যশোরের শামসুর রহমান, মাহমুদ নূরুল হুদা, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে খাজা গ্রুপের অনুসারী শাহ আজিজ এবং সোহরাওয়ার্দী-আবু হাশিমের অনুসারী শেখ মুজিবুর রহমান, নূর-উদ্দিন, জহিরুদ্দীন প্রমুখ মুসলিম ছাত্রলীগের দুই অংশের নেতৃত্বে ছিলেন। তবে দেশভাগের আগে দলাদলি থাকলেও মুসলিম ছাত্রলীগ অফিসিয়ালি এক সংগঠন ছিল। আগেই সংগঠনটির প্রাণকেন্দ্র ছিল ইসলামিয়া কলেজ।

শেখ মুজিব কলকাতায় পড়াশোনা করলেও একাধারে তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের সংগঠক এবং মুসলিম লীগেরও সংগঠক। স্মর্তব্য যে অভিজাততন্ত্রী ও রক্ষণশীলদের কুক্ষিগত মুসলিম লীগ চল্লিশের দশকের প্রথম দিকেও ছিল জমিদার ভূস্বামী উকিল-মোক্তারদের বৈঠকখানায় বন্দি। জনগণ ও গণ-আন্দোলনের সঙ্গে তেমন কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। গত শতাব্দীর শুরু থেকেই হিন্দু মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক উত্থান এবং ব্রিটিশবিরোধী গণসংগ্রাম নানা মাত্রায় প্রকাশ পেতে থাকে। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ, স্বদেশী, অসহযোগী, খিলাফত আইন অমান্য এবং ১৯৪২-এর কুইট ইন্ডিয়া বা ‘ভারত ছাড়’ প্রভৃতি আন্দোলনের ভেতর দিয়ে হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং জাতীয় কংগ্রেস গণসম্পৃক্ত লড়াকু দলে পরিণত হয়েছিল। ক্ষুদিরাম বসু থেকে সূর্য সেনের চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহসহ বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যেমন অগণিত তরুণ ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছে, কারা নির্যাতন ভোগ করেছে, তেমনি মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ বসু, জওহরলাল নেহরুসহ জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতারা প্রায় সবাই অসংখ্যবার কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবের পর্যবেক্ষণ বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন:

হিন্দু মহাজন ও জমিদারদের অত্যাচারেও বাংলার মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তাই মুসলমানরা ইংরেজদের সাথে অসহযোগ করেছিল। তাদের ভাষা শিখবে না, তাদের চাকরি নেবে না, এই সকল করেই মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল। আর হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে ইংরেজকে তোষামোদ করে অনেকটা উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়েছিল। যখন আবার হিন্দুরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল তখন অনেকেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মরতে দ্বিধা করে নাই। জীবনভর কারাজীবন ভোগ করেছে, ইংরেজকে তাড়াবার জন্য। এই সময় এই সকল নিঃস্বার্থ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ত্যাগী পুরুষরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাথে সাথে হিন্দু ও মুসলমানদের মিলনের চেষ্টা করতেন এবং মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার ও জুলুম হিন্দু জমিদার ও বেনিয়ারা করেছিল, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন, তাহলে তিক্ততা বাড়ত না। হিন্দু নেতাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এ ব্যাপারটা বুঝেছিলেন, তাই তাঁরা অনেক সময় হিন্দুদের হুঁশিয়ার করেছিলেন। কবিগুরুও তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে হিন্দুদের সাবধান করেছেন। এ কথাও সত্য, মুসলমান জমিদার ও তালুকদাররা হিন্দু প্রজাদের সঙ্গে একই রকম খারাপ ব্যবহার করত হিন্দু হিসাবে নয়, প্রজা হিসাবে।৪

পক্ষান্তরে বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টিই বলি আর মুসলিম লীগের কথাই বলি, মুসলমান নেতারা যেমন ব্রিটিশবিরোধী তেমন কোনো গণ-আন্দোলন করেননি, তেমনি দেশভাগের আগে সামান্য ব্যতিক্রম (যেমন স্কুলছাত্র কিশোর শেখ মুজিবের প্রথম সাতদিনের কারাভোগ) ছাড়া মুসলমান নেতাদের কেউই কারাগারের স্বাদ গ্রহণ করেননি। জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, এ কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেউই জেলে যাননি। মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার কথা বললেও শাসক ব্রিটিশরাজের সঙ্গে একধরনের সমঝোতা করে চলেছেন। সাধারণভাবে মুসলিম লীগ নিয়মতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে।

মুসলমানদের একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলা এবং আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে তা ঢাকার আহসান মঞ্জিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।৫

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম লীগও মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কহীন ছিল। নেতৃত্বে ছিলেন সেই নবাব, জমিদার এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যাদের সাংস্কৃতিক ভাষা ছিল ফারসি, কথ্যভাষা ছিল উর্দু। তারা কলকাতার অধিবাসীও ছিলেন না। তারা ছিলেন বহিরাগত। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলমানদের সঙ্গে তাদের একাত্মবোধ কোনো ক্ষেত্রেই ছিল না, এক ধর্ম এবং হিন্দু আধিপত্যের ভীতি ছাড়া।৬

নবাব জমিদার উচ্চবিত্তবানদের এই মুসলিম রাজনৈতিক তথা মুসলিম লীগ নেতৃত্ব, আসলে ‘জেন্টেলম্যানস পলিটিকস’ বা ‘ভদ্রলোকের রাজনীতি’। নিপীড়িত মুসলিম জনসাধারণের আর্থসামাজিক মুক্তির জন্য তাদের রাজনীতি ছিল না, তারা কোনো ‘এজিটেশনাল পলিটিকস’ আন্দোলনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাদের রাজনীতি ব্রিটিশ শাসক সমীপে আবেদন-নিবেদন এবং প্রতিনিধি প্রেরণেই সীমাবদ্ধ ছিল।... ‘নাইট’, ‘নবাব’ (খান বাহাদুর, খান সাহেব-লেখক) উপাধি দিয়েই তাদের শান্ত এবং সন্তুষ্ট করা গিয়েছিল।৭ ভারতের অন্যত্র না হোক চল্লিশের দশকের বাংলায় বৈঠকখানার বৃত্ত ভেঙে মুসলিম লীগকে গণপার্টিতে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেন সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম। সোহরাওয়ার্দী উচ্চশিক্ষিত মুসলমান এলিট শ্রেণীর লোক হলেও বিশের দশকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সংস্পর্শে আসেন। সিআর দাশ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন। তারা দুজন ছিলেন কলকাতার মেয়র ও ডেপুটি মেয়র। এছাড়া তরুণ আইনজীবী বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে কলকাতায় এসে আইন পেশার পাশাপাশি খিদিরপুর এলাকায় শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার কাজেও আত্মনিয়োগ করেছিলেন। উদার বুর্জোয়া গণতন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী বুঝতে পেরেছিলেন মুসলিম লীগকে গণপার্টিতে রূপান্তরিত করতে না পারলে ‘পাকিস্তান হাসিল’ সম্ভব হবে না। আবুল হাশিম ছিলেন একাধারে ইসলামী শাস্ত্রে সুপণ্ডিত এবং অন্যদিকে মার্ক্সবাদী সাহিত্যেরও নিষ্ঠাবান পাঠক। উভয় শাস্ত্রেই তার গভীর ব্যুৎপত্তি ছিল। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকলেও মুসলিম লীগকে গণপার্টিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে ঐকমত্য ছিল। দুজন পরস্পরের পরিপূরক ছিলেন।

১৯৪৩ সালের ৭ নভেম্বর বেঙ্গল মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে আবুল হাশিম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অন্যদিকে খাজা গ্রুপের মওলানা আকরম খাঁ হলেন সভাপতি। আবুল হাশিম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েই মুসলিম লীগকে গণপার্টিতে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উদ্ধৃতিটা একটু দীর্ঘ হলেও এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মূল্যায়ন উল্লেখ করছি:

এই সময় আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে একটা নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করেন এবং নতুনভাবে যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করতেন যে পাকিস্তান দাবি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দু-মুসলমানদের মিলানোর জন্য এবং দুই ভাই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সুখে বাস করতে পারে তারই জন্য। তিনি আমাদের কিছু সংখ্যক কর্মীকে বেছে নিয়েছিলেন, তাদের নিয়ে রাতে আলোচনা সভা করতেন মুসলিম লীগ অফিসে। হাশিম সাহেব পূর্বে বর্ধমান থাকতেন, সেখান থেকে মুসলিম লীগ অফিসে একটা রুমে এসে থাকতেন, কলকাতা আসলে। মুসলিম লীগ অফিসটা শহীদ সাহেব ভাড়া নিয়েছিলেন। তাঁকেই ভাড়া দিতে হয়েছে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। হাশিম সাহেব আমাদের বললেন, একটা লাইব্রেরি করতে হবে, তোমাদের লেখাপড়া করতে হবে। শুধু হিন্দুদের গালাগালি করলে পাকিস্তান আসবে না। আমি ছিলাম শহীদ সাহেবের ভক্ত। হাশিম সাহেব শহীদ সাহেবের ভক্ত বলে আমিও তাকে শ্রদ্ধা করতাম, তাঁর হুকুম মানতাম। হাশিম সাহেব শহীদ সাহেবের হুকুম ছাড়া কিছু করতেন না।... হাশিম সাহেব বলতেন, মুসলিম লীগকে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। গ্রাম থেকে প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। উপরের তলার প্রতিষ্ঠান করলে চলবে না। জমিদারদের পকেট থেকে প্রতিষ্ঠানকে বের করতে হবে। তিনি শহীদ সাহেবের সাথে পরামর্শ করে সমস্ত বাংলাদেশ ঘুরতে আরম্ভ করলেন। চমৎকার বক্তৃতা করতেন।৮ 

আবুল হাশিম কিছুটা কমিউনিস্ট পার্টির আদলে ছাত্র ও তরুণ কর্মীদের নিয়ে ‘পার্টি হাউজে’ নিয়মিত রাজনৈতিক ক্লাস নিতে শুরু করেন। এসব ক্লাসে বিভিন্ন বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হতো। দিনের বেলা যেমন, তেমনি রাতেও তিনি ক্লাস নিতেন। শেখ মুজিবও রাতের ক্লাসে অংশ নিতেন। এ প্রসঙ্গে আবুল হাশিম লিখেছেন:

At night I discussed with young leaders and workers of Muslim League fundamental of Islam method of party organization and political workers, Philosophy and Sociology. Generally I retired to bed at 2:30 a.m. Sheikh Mujibur Rahman attended my night classes but he had little or no interest in academic discussions. He often fell asleep and rising in the morning he would ask me what was to be done. I found in him an exceptionally good young man of action and not of thought. He did his duty with precision.৯

মুসলিম লীগের যুব নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের সঙ্গে রাত্রিতে আলোচনা করতাম ইসলামের মৌলিক তত্ত্বসমূহ, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও পার্টি সংগঠন, দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞান। রাতে ঘুমোতাম আড়াইটার দিকে। শেখ মুজিবুর রহমান আমার রাতের ক্লাসে থাকতেন, কিন্তু এই তাত্ত্বিক আলোচনায় তার উৎসাহ ছিল খুবই কম। তিনি প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়তেন এবং সকালে উঠে জিজ্ঞেস করতেন কী করতে হবে। তিনি কাজের লোক ছিলেন, কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করার লোক ছিলেন না। অবশ্য তার কর্তব্য-কর্ম তিনি ঠিকমতোই করতেন।১০ 

ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদের উদ্ধৃতি দুটি পাঠ করলে, এটা সুস্পষ্ট যে অনুবাদক ইচ্ছেকৃতভাবেই শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আবুল হাশিমের বক্তব্য অনুবাদ করতে গিয়ে চাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। বলাবাহুল্য, আবুল হাশিমের বইটি একটি আকর গ্রন্থ। ব্যক্তি শেখ মুজিবকে বুঝতে আবুল হাশিমের মন্তব্য নিঃসন্দেহে প্রামাণ্য হিসেবে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে তথ্য বিকৃতি পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। আর এ কারণেই অনুবাদ প্রসঙ্গে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা অপরিহার্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে আবুল হাশিমের মূল গ্রন্থ ‘In Retrospect’-এর অনুবাদ করেছেন তার পুত্র শাহাবুদ্দীন মহম্মদ আলী। অন্য পুত্র বদরুদ্দীন উমর তাকে ‘অনুপ্রাণিত’ করেছেন। অনুবাদ প্রসঙ্গে শাহাবুদ্দীন বলেছেন, বইয়ের মূল অংশকে অবিচ্ছিন্ন রেখে ভাবের সংমিশ্রণে যদি অনুবাদ হয়ে থাকে...ইত্যাদি। অনুবাদক ভাবানুবাদ বা ‘ভাবের সংমিশ্রণে’ অনুবাদের কথা স্বীকার করলেও সংমিশ্রণের নামে অনুবাদ যদি বিকৃত করা হয় অথবা অনুবাদে অর্থান্তর ঘটে, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেমন আবুল হাশিমের ইংরেজি বয়ানে শেখ মুজিব সম্পর্কে বলেছেন, “exceptionally good young man of action and not of thought.” অনুবাদক এই লেখকের উচ্চ প্রশংসাসূচক এ বাক্যটির অনুবাদ করেছেন, ‘তিনি কাজের লোক ছিলেন।’ অথচ যথার্থ অনুবাদ হচ্ছে ‘অসাধারণ দক্ষ কর্মযোগী তরুণ’ (অনুবাদ মফিদুল হকের)। শেখ মুজিব সম্পর্কে ‘exceptionally good’ কথাটি সম্ভবত ভ্রাতৃদ্বয়কে পীড়িত করেছে। এ জন্যই এ ‘সাদামাটা’ বা ‘জলো’ ভাবে ভাষান্তর করা হয়েছে, যা অনুবাদকের সততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ প্রসঙ্গে মফিদুল হক লিখেছেন, ‘আবুল হাশিম আরো লিখেছেন যে, ‘শেখ মুজিব ডিড হিজ ডিউটি উইথ প্রেসিশন।’ অনুবাদক লিখেছেন, ‘কাজকর্ম ঠিকমতোই করতেন।’ এই অনুবাদে ‘প্রেসিশন’ বিশেষণ ব্যবহারের প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায় না।১১

এছাড়া তাত্ত্বিক বিষয়ে শেখ মুজিবের আগ্রহ প্রসঙ্গে মূল ইংরেজিতে রয়েছে, ‘He had little or no interes t’ আর অনুবাদে বলা হয়েছে ‘খুবই কম’। ‘খুবই কম’ আর ‘He had little or no interes t’ সমার্থক নয়। ‘কিঞ্চিৎ বা আগ্রহ ছিলই না’, বলা যেতে পারে। এখানেও অনুবাদক সৎ ছিলেন না। শেখ মুজিব লিখেছেন:

কলকাতায় যে সকল ছাত্র-কর্মী ছিল তারা প্রায়ই হাশিম সাহেবের কাছে যাওয়া-আসা করে। তাঁর কাছে যেয়ে ক্লাস করে, এইভাবে তাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। যে সমস্ত নিঃস্বার্থ কর্মী সে-সময় কাজ করত তাদের মধ্যে নুরুদ্দিন, বর্ধমানের খন্দকার নুরুল আলম ও শরফুদ্দিন, সিলেটের মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী, খুলনার একরামুল হক, চট্টগ্রামের মাহাবুব আলম, নুরুদ্দিনের চাচাতো ভাই এসএ সালেহ অন্যতম ছিল। শেষ পর্যন্ত এদের সাথেই আমার মিল হল, কারণ আমরা সকলেই শহীদ সাহেব ও আবুল হাশিম সাহেবের ভক্ত ছিলাম। আনোয়ার সাহেবের দল হাশিম সাহেবকে দেখতে পারতেন না। কিন্তু শহীদ সাহেবের ভক্ত ছিলেন।১২ 

কলকাতায় ছাত্রলীগে এবং তরুণ মুসলিম লীগারদের মধ্যে শেখ মুজিবের প্রকৃত প্রভাব অবস্থান বোঝার জন্য সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম অনুসারী প্রগতিকামীদের নামের তালিকাটি আরো একটু বড় করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে আবুল হাশিমের গ্রন্থ বেশ সহায়ক। তিনি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:

নুরুদ্দীন আহমেদ, সালেহ আহমেদ, বরিশালের আবদুর রহমান, খুলনার মহাম্মদ ইকরামুল হক ও শেখ আবদুল আজিজ, যশোহরের আবদুল হাই ও মোশারফ খান, রাজশাহীর আবুল হাসনাত মহম্মদ কামারুজ্জামান, আতাউর রহমান, মোজাম্মেল হক, মহম্মদ মহবুবুল ও আবদুর রশীদ খান, ফরিদপুরের শেখ মুজিবুর রহমান, বগুড়ার বিএম ইলিয়াস ও শাহ আবদুল বারি, রংপুরের আবুল হোসেন, পাবনার মহম্মদ আবদুর রফিক চৌধুরী, নদীয়ার ফকির মহাম্মদ ও মহাম্মদ সোলায়মান খান, দিনাজপুরের মহাম্মদ দবিরুল ইসলাম, চট্টগ্রামের মাহবুব আনোয়ার, ইসলামিয়া কলেজ ইউনিয়নের সহসভাপতি শাহাবুদ্দীন এবং কলকাতার জহিরউদ্দীন—এঁরা কলকাতা কেন্দ্রের যুব মুসলিম কর্মীদের নেতা ছিলেন। ১৩

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র-তরুণদের একটি প্রগতিশীল গ্রুপ গড়ে ওঠে। ঢাকা ছিল খাজাদের প্রভাবাধীন এবং তাদের দুর্গ। কিন্তু এখানেও অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির তরুণরা খাজাদের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এঁদের মধ্যে ছিলেন:

কামরুদ্দীন আহমেদ, টাঙ্গাইলের শামসুল হক, ঢাকার কাজী মহাম্মদ বশির, ইয়ার মহাম্মদ, শামসুদ্দীন আহমদ, মহম্মদ শওকত আলী, এ কে আর আহমদ, মসিনুদ্দিন আহমেদ (রাজা মিয়া), আলমাস আলী, আউয়াল এবং তাজউদ্দীন, কুমিল্লার খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও অলি আহাদ এবং নোয়াখালীর মহাম্মদ তোয়াহা ও নজমুল করিম, এঁরা ঢাকা কেন্দ্রের নেতা ছিলেন। ১৪

অন্যদিকে খাজা শিবিরে ছিলেন হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে (পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি) আনোয়ারুল হক, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ। খুলনার সবুর খান শাহ আজিজের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে শেখ মুজিব ও আবুল হাশিম উভয়েই উল্লেখ করেছেন। বিস্তারিতভাবে এ নামগুলো উল্লেখ করলাম এ কারণে যে উল্লিখিত তরুণরাই দেশভাগ-পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলার রাজনীতির প্রধান কুশীলব হয়ে উঠেছিলেন। চল্লিশের দশকের এক ঝাঁক তরুণ, যারা পাকিস্তান আন্দোলনের সম্মুখসারির কর্মী ছিলেন, দেশভাগের পর তাদের প্রধান অংশটি ঢাকায় এসে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দ্রোহের পতাকা উত্তোলন করেন। এরাই ১৫০ মোগলটুলীতে ‘মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ সাইনবোর্ড লাগিয়ে সরকারি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র কেন্দ্র গড়ে তোলেন। চল্লিশের দশকের কলকাতা ও ঢাকার এই ছাত্র-তরুণরাই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। অন্যদিকে শাহ অজিজের নেতৃত্বে সরকারি ছাত্রলীগ, সরকারের যাবতীয় গণবিরোধী কাজের পক্ষে থাকে, ক্রমেই গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শেখ মুজিব যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছেন কলকাতায়। এখানেই যেমন তাঁর বাস্তব রাজনীতির হাতেখড়ি হয়, তেমনি ১৯৪৩-৪৭ কালপর্বে তার রাজনৈতিক-ভাবাদর্শগত চিন্তার ভিত্তি তৈরি হয়। নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তিনি রাজনীতির কলাকৌশলের নামে সুবিধাবাদ, ক্ষমতালিপ্সা, ক্ষুদ্রতা, নীরবতা, ব্যক্তিস্বার্থে সমষ্টির স্বার্থ বিসর্জন দেয়া, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস রূপ এবং মানবচরিত্রের বৈপরীত্য ও সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। একই সঙ্গে জেলায় জেলায় ঘুরে ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের সংগঠন গড়ে তোলা, সমাজের বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে সমগ্র বাংলাদেশ চষে বেড়ানো, সিলেটের গণভোটে কাজ করা প্রভৃতির ভেতর দিয়ে আবুল হাশিমের ভাষায় ‘অসাধারণ কর্মযোগী’ তরুণ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কলকাতার এ অভিজ্ঞতা এবং কলকাতা ও ঢাকায় তার বিশ্বস্ত কর্মীদের নিয়েই তিনি দেশ-বিভাগোত্তর নতুন ধারার রাজনীতির সূচনা করেন।

তথ্যসূত্র

১. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১৬

২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬-১৭

৩. মযহারুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, আগামী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা. ৯০

৪. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২৪

৫. সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.), বাংলাদেশের ইতিহাস, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, পৃ. ৪২৪-২৫

৬. Harun-or-Rashid, The Foreshadowing of Bangladesh, Revised and enlarge edition, p.9

৭. মোনায়েম সরকার (সম্পা.), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবন ও রাজনীতি, প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি, পৃ. ১১৮

৮. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২৪

৯. Abul Hashim, In Retrospect, Bangladesh Co-operative Book Society ltd, P.92

১০. আবুল হাশিম, আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, পৃ. ৭১

১১. মফিদুল হক, বঙ্গবন্ধু বিষয়ক আর একটি বই, বিদ্যা প্রকাশ, পরিমার্জিত দ্বিতীয় প্রকাশ, পৃ. ২২

১২. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২৮

১৩. আবুল হাশিম, আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, পৃ. ৪৭

১৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭

[লেখকের রাজনীতিতে হাতেখড়ি ও কলকাতায় শেখ মুজিব (বাংলা একাডেমি)গ্রন্থ থেকে সংকলিত]

লেখক: উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ