তামারা হাসান আবেদ স্যার ফজলে হাসান আবেদের কন্যা। ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন। ২০১০ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া তামারা হাসান আবেদ এশিয়া সোসাইটি থেকে পেয়েছেন ‘এশিয়া ২১ ইয়াং লিডার’-এর সম্মাননা। ২০১৪ সালে ওয়ার্ল্ড উইমেন লিডারশিপ কংগ্রেসের ‘আউটস্ট্যান্ডিং উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ পান। স্যার ফজলে হাসান আবেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিনি বণিক বার্তার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা
স্যার
ফজলে হাসান
আবেদ একটি
প্রতিষ্ঠান, এক
মহীরুহ। অনেক
কাছ থেকে
তাঁকে দেখার
আপনার সুযোগ
হয়েছে। কেমন
ছিলেন তিনি?
স্যার ফজলে হাসান আবেদের গল্প একটি পরিপূর্ণ মানুষের গল্প। তাঁর ব্যক্তিত্বের বেশকিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি একজন স্বচ্ছ চিন্তার, মুক্ত মনের, সাহসী ও অসম্ভব আশাবাদী একজন মানুষ ছিলেন। পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অসাধারণ সহানুভূতি। তিনি যেন তাদের জীবনের সংগ্রাম এবং কষ্ট ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করতে পারতেন। পাশাপাশি যেকোনো সমস্যার সমাধানের নিরন্তর কারিগর ছিলেন তিনি। তিনি যেকোনো কিছু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন, যেকোনো বিষয় নিয়ে অনেক পড়তে পছন্দ করতেন এবং তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল অনেক বিষয়ে। তাঁর এসব বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কাজে এবং ব্যক্তিগত জীবনে।
পারিবারিক জীবনে তিনি আমাদের অগ্রাধিকার দিয়েছেন সব সময়। অফিস থেকে বাড়ি এলে তাকে আমরা পেতাম পুরোপুরিভাবে। তিনি আমাদের সব সময় মানসম্পন্ন সময় দিয়েছেন। আমাদের সম্পৃক্ত করেছেন। আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন। মৌলিক চিন্তা করতে শিখিয়ছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর সঙ্গে আমরা ব্র্যাকের ফিল্ড অফিসে যেতাম। সেখান থেকেও অনেক কিছু শিখেছি মানুষ সম্পর্কে। সব মিলিয়ে তিনি আমাদের দুই ভাইবোনকেই খুব প্র্যাকটিক্যাল, মুক্তমনা, স্বচ্ছ, শক্ত চরিত্রের মানুষ হিসেবে তৈরি করেছেন।
প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও তাকে সফল করার ক্ষেত্রে স্যার আবেদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল? তিনি নতুন বহু প্রকল্প ও কাজে হাত দিয়েছেন, যা অন্যরা হাত দিতে সাহস করেননি। কোন শক্তি স্যারকে এতে সহায়তা জুগিয়েছে?
যেকোনো নতুন প্রতিষ্ঠান শুরুর আগেই তাঁর ভিশন খুব পরিষ্কার থাকত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাঁর যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হতে হবে একটি সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে, যেখানে একটি শূন্যতা বিরাজ করছে। তিনি সমস্যাটিকে খুব গভীরভাবে বুঝতেন এবং তার সমাধান সেজন্য সে রকম বাস্তবমুখী হতো। পাশাপাশি তিনি অনেক বড় আকারে চিন্তা করতেন ও স্বপ্ন দেখতেন। তারপর প্রতিষ্ঠান তৈরির কাজে নেমে পড়তেন। সেক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই, প্রসেস তৈরি, মানবসম্পদের পেছনে বিনিয়োগ—এসবকেই তিনি গুরুত্ব দিতেন সবচেয়ে বেশি। অনেক দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতেন এবং প্রচণ্ড সাহসী ছিলেন। এ সাহস আর মানুষের আস্থা নিয়ে বড় বড় প্রকল্প, প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়ে অনেক ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নেমে পড়তেন। তাঁর কাজে ছিল শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রতি গভীর মনোযোগ। আর তাঁর চিন্তাভাবনার মূলে ছিল মানুষ—বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া মানুষ ও তাদের সমস্যা, যা নিয়ে তাঁর মতো আগে কেউ ভাবেনি।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন যে তিনি সম্পদ আহরণ করতে চান না। তিনি ব্র্যাকের শুরু করেছিলেন তাঁর লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রির অর্থ দিয়ে। তিনি সচ্ছল ও রুচিসম্মত জীবনযাপন করেছেন, কিন্তু কখনো বাহুল্য করেননি। তাঁর কাছে জীবনের তাত্পর্য সংজ্ঞায়িত হতো মানুষের জন্য সেবা দিয়ে। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, শিল্পবোধ, তার পরিবার—এগুলোর মূল্য তাঁর কাছে ছিল অনেক বেশি। আমেরিকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কার্নেগির একটি কথা তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন—আ ম্যান হু ডাইজ রিচ, ডাইজ ডিজগ্রেসড। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিটি ধনী মানুষের সমাজের প্রতি তাদের ঋণ চুকিয়ে বিশ্ব ছেড়ে যাওয়া উচিত।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত করেছিলেন ব্র্যাককে তাঁর অনুপস্থিতিতে চলার জন্য। তাঁর ৬৫ বছর বয়সেই তিনি নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে ব্র্যাকের চেয়ারপারসন হন। গভর্ন্যান্সকে শক্ত করেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যোগ্য মানুষদের নিয়ে এসে। ব্যবস্থাপনা আলাদা করেন গভর্ন্যান্স থেকে।
২০১৮
সাল থেকে তাঁর নির্দেশে ব্র্যাকের গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি তৈরির কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের মে মাসে সেটি চূড়ান্ত হয় এবং তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের মাঝামাঝি তিনি ব্র্যাক এবং তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে সরে দাঁড়ান নতুন ও যোগ্য চেয়ারপারসন মনোনীত করার মাধ্যমে। পাশাপাশি একটি গ্লোবাল বোর্ড তৈরি করেছেন। যেটি এ গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়নের কাজ করছে। প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে তিনি যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন সব সময়। এটাই মনে হয় তাঁর সাফল্যের একটি বড় চাবিকাঠি।
নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশে এখন অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে। স্যার ফজলে হাসান আবেদ বিশ্বাস করতেন যে একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে রেখে তার উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি বলে গেছেন নারী-পুরুষের সমতা বিধান তাঁর একটি আনফিনিসড এজেন্ডা। সে লক্ষ্য অর্জনে আমাদের আরো অনেক দূর হাঁটতে হবে। নারীরা যত বেশি সামনে এগোতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বাড়ছে। বাল্যবিবাহ আমাদের দেশে এখনো অনেক মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়। একইভাবে দারিদ্র্য নিরসনে আমরা অনেক এগিয়েছি কিন্তু এখনো আমাদের দেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ হতদরিদ্র। অর্থনৈতিক বৈষম্য অনেক বেড়েছে। সবাই বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারেনি। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও সমতাভিত্তিক সমাজ তৈরিতে আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি।
আমার কাছে মনে হয় তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে কীভাবে একটি পরিপূর্ণ, সফল ও সুখী জীবন কাটানো সম্ভব। তিনি অর্থ বৈভব, খ্যাতি বা ক্ষমতার পেছনে ছোটেননি। তিনি মানুষের জন্য কাজ করে তৃপ্তি পেয়েছেন, পরিবারের পাশে সব সময় ছিলেন। পাশাপাশি জীবনের সাধারণ আনন্দগুলো থেকে তিনি সুখ খুঁজে নিয়েছেন। একটি ভালো বই, একটি ভালো চিত্রকর্ম, বন্ধুদের সাহচর্য, নতুন দেশ ভ্রমণ, একটি কবিতা আবৃত্তি, এক বেলা ভালো খাওয়া, শিল্প ও সাহিত্য, ইতিহাস চর্চা, স্থাপত্য, চলচ্চিত্র—এই সবকিছুকেই তিনি প্রাণপণে উপভোগ করেছেন এবং সুখী হয়েছেন। ক্ষমতা, খ্যাতি, সুনাম সবই এসেছে কিন্তু তিনি এগুলোর পেছনে ছোটেননি। এগুলো তাঁর কাছে খুব একটি আহামরি কিছু মনে হতো না। সর্বোপরি জীবন ও মানুষের প্রতি আগ্রহ তাঁর প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করেছে। এটাই তাঁর জীবন থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।





