কিংবদন্তিতুল্য স্যার ফজলে হাসান আবেদ এক বছর আগে আমাদের মধ্য থেকে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। পরিণত বয়সে গেছেন তিনি, আশির ঊয়েছিল। কিন্তু বহু মানুষের চেয়ে তিনি ছিলেন অন্য রকম। তাঁর জন্ম হয়েছিল সিলেটের একটি গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে, যেখানে শিক্ষার ঐতিহ্য ছিল, লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তত্কালীন পাকিস্তানে পড়াশোনা শেষে লন্ডন থেকে বিদেশী ডিগ্রিও অর্জন করেছিলেন। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একটি বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে, কিন্তু এর মধ্যে শুরু হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম। তিনি তখন লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। বলতে গেলে সবকিছু ত্যাগ করে নিজের যেটুকু সঞ্চয় ছিল, তা নিয়ে নিজের বন্ধুবান্ধবকে যুক্ত করে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অর্থ সংগ্রহে নেমেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরো কয়েকজন প্রবাসীও যুক্ত হয়েছিলেন। অনেকেই জানেন না, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি জাহাজ উড়িয়ে দেয়ার পেছনে মুক্তিসেনাদের যে অবদান ছিল, তার অর্থ সংগ্রহের পেছনে ছিলেন ফজলে হাসান আবেদ। শেষ হলো স্বাধীনতা সংগ্রাম, জন্ম নিল বাংলাদেশ। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও স্যার ফজলে হাসান আবেদ কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে আর যুক্ত হলেন না। দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামের ততোধিক বিধ্বস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় এগিয়ে গেলেন তিনি। সুনামগঞ্জের নিভৃত পল্লী শাল্লায় শুরু করলেন ‘বাংলাদেশ রুরাল অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি’; যা পরে ‘বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি’ নামে পরিচিত হয়। সেই নিভৃত পল্লীতে তিনি যখন থাকতেন, বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন। ফজলে হাসান আবেদ একজন করিতকর্মা মানুষ ছিলেন। যে কাজে হাত দিয়েছেন, সেই কাজই সাফল্যের মুখ দেখেছে।  দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে গিয়ে তিনি স্বাস্থ্যের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে নেমে পড়লেন। ব্র্যাকের কর্ম এলাকায় তখন সাক্ষরতার হার অনেক কম ছিল, শিক্ষার্থীরা স্কুলেই যেত না। মা-বাবা লেখাপড়া জানতেন না। তখন তিনি শুরু করলেন ‘গণশিক্ষা’ কার্যক্রম। সেই শিক্ষা কার্যক্রম আশির দশকের মাঝামাঝি এমনভাবে শুরু হলো, তখন আমি একজন নবীন গবেষক হিসেবে নিজে দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, দেখেছিলাম শিক্ষার্থীরা গাছতলায় পড়ছে। আশপাশে তাদের গরু-ছাগল বাঁধা। আমার সঙ্গে ব্র্যাকের যে সহকর্মী ছিলেন, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এই যে ছাগল-গরু এরা নিয়ে আসে, এদের জন্য কি কোনো স্কুলঘর করা যাবে?’ তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘আবেদ ভাই মনে করেন, এই শিক্ষার্থীদের আনতে হলে তাদের এ সুযোগটা দিতে হবে। তাদের মধ্যে আগে শিক্ষার চাহিদাটা তৈরি করতে হবে। তাহলে একসময় আর গরু-ছাগল নিয়ে তারা আসবে না।’ আরেকটা বিষয় লক্ষ করেছিলাম। একজন শিক্ষক ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থীকে খুব মজা করে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। শান্তিনিকেতনের পাঠশালার মতো। তাদের তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজকে তো পড়ালেখা শেষ। কালকে কখন আসতে চাও?’ সমস্বরে সবাই তখন বলেছিল, ‘কালকে সকালে ক্ষেতে কাজ করতে যেতে হবে।’ এই যে একটা ‘নমনীয় স্কুল ক্যালেন্ডারের’ কথা আমরা এখন বলে থাকি, ফজলে হাসান আবেদ তখন সেটা চিন্তা করেছিলেন। একসময় দেখা গেল শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের মধ্যে যেভাবে শিক্ষার চাহিদা তৈরি হয়ে গেছে, তাতে আর সমস্যা হচ্ছে না। গরু-ছাগলও আনতে হয় না, গাছতলায়ও পড়তে হয় না। একজন সম্পন্ন গৃহস্থ তার বাড়ির একটা ঘর সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলেন এই শিক্ষার্থীদের জন্য। পরবর্তী সময়ে ব্র্যাক নিজেই ঘর তৈরি করল। আজ এই ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা’ ঝরে পড়া বা পিছিয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের জন্য একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে জাতীয়ভাবে, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। সাধারণ মানুষের ভেতর শিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা তৈরির পেছনে আবেদ ভাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ওই সময়, অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ব্র্যাকের উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা মডেল আফ্রিকায়ও ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক দেশে এগুলো এখনো চালু আছে। এভাবে চলতে চলতে আবেদ ভাই একসময় চিন্তা করেছেন যে গবেষণা, মূল্যায়ন সবই হলো, কিন্তু মনিটরিংও প্রয়োজন। অনেক বেসরকারি সংগঠন তখনো এভাবে চিন্তা করেনি। প্রতিষ্ঠার ১০ বছরের মধ্যে তিনি ব্র্যাকের একটি মনিটরিং ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একসময় তিনি আমাকে গল্প করে বললেন, (নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে) গ্রামীণ নারীদের সঙ্গে উঠান বৈঠকের আলোচনা থেকে তিনি ভাবলেন প্রশিক্ষণ শুধু তাদের জন্য নয়, তাদের সঙ্গে যারা কাজ করেন সেই সহকর্মীদেরও প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন সাভারের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট (সিডিএম), যেটা এখন বিশ্বখ্যাত। আবেদ ভাই গল্প করেছেন, তিনি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচি পরিদর্শনে একবার গ্রামে গেছেন। সেখানে বেশ কয়েকজন কিশোরী এসে তাকে ঘিরে ধরল। বলল, ‘স্যার, এই যে আপনি বাচ্চাদের জন্য এসব করছেন, আমাদের জন্য কিছু করেন না কেন? আমরাও লেখাপড়া করতে চাই। আমরা তো সুযোগ পাচ্ছি না।’ আবেদ ভাই ফিরে এলেন, কিন্তু ওদের কথাটা মনে রেখে ব্র্যাকের কার্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হলো ‘কিশোর-কিশোরী কর্মসূচি’; যা আজ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও অনুসৃত হয়। আবেদ ভাই শুধু বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করিনি, কিন্তু কিশোরীরা আমাকে বুঝিয়ে দিল, শুধু শিশুদের জন্য কাজ করলেই হবে না; পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জন্যও কাজ করতে হবে। তাদের কাছে আমি ঋণী।’ এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে শিক্ষাকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন অব্যাহত রেখেছেন। যেটাকে এখন মেলা (এমইএলএ: মাইক্রোক্রেডিট এন্টারপ্রাইজ লেন্ডিং অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম) বলা হয়, একসময় তিনি তাও চালু করলেন। মানুষের পাশে থেকে কাজ করে দুস্থ, ঝঞ্ঝাকবলিত মানুষের মঙ্গলের জন্য সর্বশক্তি নিয়োজিত করতেন। কেউ যখন করেনি (২০০৪ সালে), তখন তথাকথিত ‘পতিতা পল্লীতে’ পতিতাদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচির ব্যবস্থা করেছেন। নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে নারী আইনগত বিষয়ে সহায়তা পান না, সেটিও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। তাই তিনি ব্র্যাকে একটি ‘আইন সহায়তা সেল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে নির্যাতিতা নারীকে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু-কিশোর সুরক্ষা—এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে স্যার আবেদ দৃষ্টি দেননি বা ব্র্যাক এগিয়ে আসেনি। যেটা এখন ‘ওয়াশ’ নামে পরিচিত, স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির কর্মসূচি, সেটা নিয়েও ব্র্যাক নিরন্তর কাজ করে চলেছে। এ মুহূর্তে ১০টি দেশে ব্র্যাক কাজ করছে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তানজানিয়ায় ব্র্যাকের কাজ সম্পর্কে জানার। আমি গিয়েছিলাম একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে, যেখানে একজন মন্ত্রীর সঙ্গে সভা করতে গিয়েছিলাম আমরা বিভিন্ন দেশের কয়েকটি এনজিওর প্রতিনিধি। তানজানিয়ার সে সময়কার মন্ত্রী আমাকে বলেছেন, ‘ব্র্যাক কী অসাধ্য সাধন করেছে, আপনি যদি এখানে ব্র্যাকের কর্মসূচি দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন।’ তিনি এ কথাও বলেছিলেন, ‘আমি গর্বিত এ কারণে যে এটি উন্নত দেশের কোনো এনজিও নয়। এটি আমাদের দেশের মতোই একটি উন্নয়নশীল দেশের বেসরকারি সংগঠন, আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে।’ আফ্রিকার একটি উন্নয়নশীল দেশের একজন নীতিনির্ধারকের কাছ থেকে কথাটি শুনে তখন একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমার বুকটা গর্বে ভরে গিয়েছিল। এই হলো ব্র্যাকের গল্প, যার সঙ্গে স্যার ফজলে হাসান আবেদের নামটি কখনই পৃথক করে দেখার মতো নয়। তিনি দেশী-বিদেশী এত পদক-পদবি পেয়েছেন, কিন্তু কখনো থেমে থাকেননি। মৃত্যুর আগে শিক্ষায় নোবেল বলে পরিচিত ‘ইদান পুরস্কার’ পেলেন, কিন্তু শয্যাশায়ী থাকার কারণে সেটি আনতে যেতে পারেননি, তার পক্ষ থেকে তার পরিবার সেটি গ্রহণ করেছিল। বলতে গেলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সারা পৃথিবী তাকে সম্মান দিয়েছে, স্বীকৃতি দিয়ে নিজেরাই সম্মানিত বোধ করেছে। আমি যে গণসাক্ষরতা অভিযানের সঙ্গে যুক্ত, তার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন ছিলেন স্যার আবেদ। ১৯৯০ সালে জমতিয়েনে ‘বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমাদের সামরিক শাসক সেখানে গিয়েছিলেন, তিনি সর্বসমক্ষে ঘোষণা দিলেন—‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা অর্ডিন্যান্স’ করে দিয়েছেন। সেখানে আবেদ ভাইসহ বেশ কয়েকজন এনজিও নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। তারা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন যে এটা কখন হলো, কীভাবে হলো, আমরা তো জানিই না। স্যার আবেদ তত্কালীন মিলিটারি শাসক জেনারেল এরশাদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি তো আমাদের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করে আরো ভালো অর্ডিন্যান্সটা করতে পারতেন।’ উপস্থিত এনজিও নেতাদের কাছেই শোনা, তখন মিলিটারি শাসক আবেদ ভাইকে বলেছিলেন, ‘আপনাদের তো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জোট নেই। আমি কাকে ডাকব? আপনাদের ব্র্যাক, নাকি প্রশিকা, নাকি আহছানিয়া মিশন? কাকে ডাকব শিক্ষা সেক্টরকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য?’ সেখান থেকে ফিরে এসে আবেদ ভাই ঠিক করলেন সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মোর্চা তৈরি করবেন। সেই প্রত্যয় থেকে প্রতিষ্ঠিত হলো গণসাক্ষরতা অভিযান, যেখানে তিনি আজীবন চেয়ারম্যান থাকেননি, নির্বাহী কোনো পদেও ছিলেন না, কিন্তু সর্বদা দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। ঐক্যবদ্ধ শিক্ষা আন্দোলনের আমরা সবাই তার কাছে ঋণী। এই গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী হওয়ার সুবাদে আমি প্রায়ই আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। যেকোনো সময় যেকোনো পরামর্শের জন্য তার দুয়ার সবসময় খোলা ছিল। একদিন যখন দেখা করতে গিয়েছি ব্র্যাকের সেই ১৯ তলা ভবনে তার কক্ষে, অনেকেরই হয়তো স্মরণ আছে, সেদিন ব্র্যাক ভবনের পেছনে বস্তিতে আগুন লেগেছিল। তিনি আমাকে জানালার পাশে ডেকে বললেন, ‘দেখো, এই বস্তি এমনভাবে করা যে এখানে ফায়ার ব্রিগেডও যেতে পারবে না। পানি নিয়ে ঢোকাও সমস্যা।’ তারপর বললেন, ‘জানো, সরকার যদি আমাকে দায়িত্ব দিয়ে দিত তাহলে এখানে এই মানুষদের জন্য লো-কস্ট হাউজিং করতাম। একটি আরবান বা টাউন প্ল্যানিংয়ের মতো পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিকল্পনা করতাম। কোনো দিন করতে পারব কিনা জানি না।’ এটাও স্বপ্ন ছিল তার। আমি বলেছিলাম, ‘আবেদ ভাই, চেষ্টা করে তো দেখতে পারেন।’ তিনি বললেন, ‘নীতিনির্ধারকরা মানলে হয়!’ এ রকম অসংখ্য মহতী স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্নের বেশকিছু তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। বাংলাদেশের এক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেয়া ব্র্যাক, সেই ছোট্ট চারাটি আজ মহীরুহ। বটবৃক্ষের মতো চতুর্দিকে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে দেশে-বিদেশে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তিনি যখন এক পর্যায়ে ব্র্যাক ব্যাংকও প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন আমি একটু দ্বিধাভরেই বলেছিলাম, ‘এত চ্যালেঞ্জের মধ্যে এই ব্যাংকিং সেক্টরে পারা যাবে?’ বললেন, ‘ওটা তো অন্য রকম নীতি নিয়ে চলবে। আমাদের অভীষ্ট জনগোষ্ঠী হবে তারা, যাদের বড় বড় ব্যাংকে গিয়ে সারাক্ষণ ধরনা দিতে হয়। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আমাদের ব্র্যাক ব্যাংকের দুয়ার সবসময় খোলা থাকবে।’ এ স্বপ্ন নিয়েই তৈরি হয়েছিল তার ব্র্যাক ব্যাংক। একদিকে তিনি নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন মানুষের জন্য কাজ করেছেন, অন্যদিকে ব্র্যাক যাতে ক্রমাগত এমন একটা জায়গায় যেতে পারে, যেখান থেকে তাকে আর দাতা সংস্থার মুখাপেক্ষী হতে হবে না, সেই স্বপ্নও তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। ব্র্যাকের এখন যে বাজেট, তার প্রায় ৮০ শতাংশ তার নিজস্ব অনেক উদ্যোগ থেকে সংগ্রহ করে। বাকি ২০ শতাংশ আসে বিভিন্ন প্রকল্প, দাতা সংস্থা, সরকারের কর্মসূচি থেকে। পৃথিবীতে অনেক বেসরকারি সংগঠন আছে, কিন্তু ব্র্যাকের মতো এত সার্থক কেউ হতে পারেনি। বিভিন্ন সময় ব্র্যাক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে গেছে। আমরা সবাই জানি একসময় একটা উগ্রবাদী গোষ্ঠী ব্র্যাকের পেছনে পড়েছিল যে ব্র্যাক মেয়েদের ক্ষমতায়নের নামে তাদের রাস্তায় নামাচ্ছে, বেপর্দা করছে। তারা জকিগঞ্জ এলাকায় ব্র্যাকের আয়বর্ধক কর্মসূচির তুঁত গাছ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ১৯৯৪-৯৫ সালের কথা বলছি। কিন্তু আবেদ ভাই একটুও থেমে যাননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা যদি সত্যি সত্যি ওই গ্রামের মেয়েদের বা মানুষদের ক্ষমতায়ন করে থাকি, তাহলে কোনো প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাদের ক্ষতি করতে পারবে না।’ যেখানে তুঁত গাছ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল, ওই গ্রামের মেয়েরাই লাঠি নিয়ে সারা রাত তাদের গাছপালা পাহারা দিয়েছে। ব্র্যাককে কিছু করতে হয়নি। ব্র্যাক দেখেছে এবং সহায়তার সময় সহায়তা দিয়েছে। এই যে নিজেদের সংগঠন নিজেরা সুরক্ষিত রাখা এবং থাকা, এটাই তো ক্ষমতায়ন। এখানেই স্যার আবেদের সাফল্য। শুধু অর্থের জোগান দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে বা সামাজিক সংগঠন করে তিনি ক্ষান্ত হননি। যতভাবে সাধারণ মানুষকে ক্ষমতায়িত করা সম্ভব, তিনি তা করতে চেষ্টা করেছেন। স্বপ্নদ্রষ্টা এই মানুষ সারা জীবন অনেক স্বপ্ন দেখেছেন। আমরা অনেকেই ভালো কাজ করার স্বপ্ন দেখি, অনেক বড় বড় মাপের মানুষই দেখেন, কিন্তু সবাই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন না। এক্ষেত্রে স্যার ফজলে হাসান আবেদ এক অসাধারণ ব্যতিক্রম। শুধু দেখেননি, তাকে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন যে শ্রম ও নিষ্ঠা থাকলে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে যেকোনো কাজ করলে একসময় না একসময় সাফল্য আসবেই। স্যার ফজলে হাসান আবেদ না-ফেরার দেশে চলে গেছেন আজ প্রায় এক বছর হলো। আমরা মনে করি, তার ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে তার সংগঠনের মধ্য দিয়ে। তিনি যে অগণিত মানুষের জন্য অসংখ্য কাজ করে গেছেন—বিত্তহীন থেকে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং তার যে বিশাল কর্মী বাহিনী—তাদের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন।

রাশেদা কে চৌধুরী: সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান