জানালার পাশের চেয়ারে বসে আছি। বুর্জ আল-খলিফা টাওয়ারটার ক্রমান্বয়ে ছোট হতে থাকা অবলোকন করতে লাগলাম। হাওয়াই শকট মৃদু কম্পনে উপরের দিকে উঠছিল। সামনে বসা দুজন বয়োবৃদ্ধ মহিলা সমবেত কণ্ঠে চিত্কার করে বলল, ইয়া আবুল ফাযল! আবুল ফাযল নামটি আমি কখনোই শুনিনি। তাদের বলার ভঙ্গি শুনে বুঝলাম, নেহায়েতই বিপদে পড়লে কিংবা ভয় পেলে এমন নাম উচ্চারণ করে তারা। দুদিন ধরে চোখে ঘুম ছিল না। রাজ্যের অবসাদ সর্বময় ভর করেছিল। দুবাইয়ে বারো ঘণ্টা ট্রানজিট শেষে যারপরনাই ক্লান্ত আমি। প্রথম বিদেশ সফরে অনুভূতিহীন ছিলাম।

আমার শিক্ষক ড. কাহদুয়ি আমার পাশে বসে কথা বলছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর। বললেন, বড় সুন্দর দেশে যাচ্ছ, যেই না গিয়ে ওই পবিত্র ভূমিতে পৌঁছাবে, মহান প্রভুর দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে সেজদা করে নিয়ো। আমার পুরো স্কলারশিপ ম্যানেজ করা, ইরানে পড়তে যাওয়ার উৎসাহদানে তার অবদান কখনো ভুলতে পারব না। সেই সঙ্গে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল এজন্য, স্যার আমার সফরসঙ্গী ছিলেন। আমি স্যারকে অভয় দিয়ে বললাম, হাতমান উস্তাদ, অবশ্যই স্যার। স্যার পাশে থাকাতে কালচারাল শক অনেক কম অনুভব করছিলাম। তবে এইক্ষণে একটা উত্কণ্ঠা বুকের মধ্যে চিনচিন করছিল। কোথায় যাচ্ছি, কই গিয়ে উঠব। সব প্রবাসযাত্রীর এই অনুভূতি থাকে বইকি। রবি ঠাকুরের কথা ‘আমার বিধাতা আমারে মাগিলে, কোথায় আমার ঘর’। কথাটা মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম। অনেক আশা জাগানিয়া কথা।

ঘণ্টাখানেক পরে বিমান পারস্য উপসাগর পার হয়ে ইরানে ঢুকেছে। খানিক বাদে স্যার আমাকে বললেন, নিচে তাকিয়ে দেখ, আমরা ইসফাহানের ওপরে আছি। আমি জানালার কাচের ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে ঝাপসা পাহাড় ছাড়া কিছুুুু দেখিনি। স্যার বলল, এই পাহাড় থেকে একটা নদীর উত্পত্তি হয়েছে, জয়ান্দে রুদ নাম তার। স্যারের বাড়ি ইয়াজদ প্রদেশে। ইসফাহানের প্রতিবেশী প্রদেশ। ইয়াজদের শতভাগ মরুভূমি। পরে জানলাম, এই জয়ান্দে রুদ নদী ইসফাহান, ইয়াজদ, কেরমান প্রদেশের পানির চাহিদা মিটায়। ঘণ্টাখানেক পরে, বিমান তেহরানের আকাশে। যখন তা নিচে অবতরণ করার বাসনা আঁটছিল আমি ফের নিচে চোখ রাখি। এবার বুকটা এক নিমিষে শূন্য হয়ে গেল। কেবল ধূসর পাহাড় আর মরুভূমি। যে চোখ গেল জীবন সবুজ ছাড়া কিছু দেখেনি, তার জন্য এই মরুময় পরিবেশ সুখ আনয়নকারী নয়।

দুবাই থেকে তেহরানের পথের যাত্রীরা বেশির ভাগই ইরানি। সবাই সমবেতভাবে নামতে শুরু করল। এতক্ষণে খেয়াল করলাম, কিসের যেন একটা হিড়িক পড়ে গেল। সেকি! সবাই মাথায় হিজাব পরতে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। বুঝতে বাকি রইল না, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ইমিগ্রেশন পার হতে নারীদের হিজাব পরতে হয়। এয়ারপোর্টকে ইরানিরা ফুরুদগাহ বলে। ফুরুদ মানে অবতরণ আর গাহ মানে স্থান। যেমন আমাদের ঈদগাহ, ঈদের স্থান। তখন নভেম্বর মাস। দেশে ঘেমে একাকার হয়ে বিমানবন্দরে ঢুকেছিলাম। তেহরান এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই একটা মৃদু ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা আমার গায়ে লাগে। যেন ফ্রিজ থেকে বের হওয়া বাতাস। আমাকে নিয়ে যেতে ইউনিভার্সিটি থেকে গাড়ি এসেছে। আবাদী সহাস্যে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। আমার স্যার আবাদীকে বললেন, একে দিয়ে গেলাম। বছর দুয়েক পর ফেরত নেব, সুস্থ ফেরত চাই, যদিও এর ফারসির অবস্থা হাত-পা ভাঙা অবস্থায়। স্যার দোয়া-দরুদ পড়ে আমায় ফুঁ দিয়ে নিজের শহরে যাওয়ার জন্য ঘরোয়া বিমানবন্দরের দিকে চলে গেলেন।

এতকাল আমার কাছে ইরান মানে শিরাজের আঙুর-আপেল-আনারের বাগান, কবিতা আর পারস্যের গাম্ভীর্যপূর্ণ ইতিহাস ব্যতীত কিছুই ছিল না। একটা পবিত্র ধারণা নিয়ে ইউনিভার্সিটির হোস্টেলের দিকে আবাদীর সঙ্গে যাচ্ছি। পথে রাস্তার ওপাশে কয়েকটা মেয়ে দেদারসে ধূমপান করছে দেখে আমার পবিত্র ধারণায় কিঞ্চিৎ ভাবনার অরুণোদয় হলো। আসলে যতটা রটে ততটা ঘটে না। যাই হোক, আমার শিক্ষক বলে দিয়েছেন, নতুন সংস্কৃতিতে গেলে সহসা বিচার করতে নেই, তুলনা করতে নেই। শুধু বলতে হয়, সৃষ্টির বৈচিত্র্য বড়ই সুন্দর।

তেহরান শহর উঁচুনিচু পথ। পুরো শহরকে ঘিরে আছে আল-বোরজ পাহাড়রাশি। প্রশস্ত হাইওয়ের মাঝখানে থেকে থেকে গাছগাছালি সেজেছিল। সবুজের দেখাও মিলছে দেখছি। তখন ইরানে শরত্কাল। বেশির ভাগ গাছ পাতাহারা ছিল। সার্ভ গাছটাকে আগে থেকেই জানি, চিরহরিৎ বৃক্ষ। হেন ইরানি কবি নেই সার্ভ গাছকে তাদের প্রেয়সীর রূপের সঙ্গে তুলনা করেনি। আরেকটা গাছ নুয়ে আছে, পাতাগুলো এলোমেলো। দেখতে কেমন পাগলাটে মনে হচ্ছে। আবাদীকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই গাছের নাম কী? বললেন, বিদে মাজনুন। বাংলা অর্থ করলে হয় মজনু গাছ। অবাক হলাম! নামের সঙ্গে চেহারার বড়ই মিল। মূলত চীন দেশের গাছ, সিল্করোড হয়ে ইরানে আগমন করেছিল। রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলো প্রায়ই ধূসর রঙের। বৈচিত্র্য মেলা ভার।

ড্রাইভার আমাকে ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যাচ্ছে। ওইখানে ল্যাংগুয়েজ সেন্টারে আমার ফারসি দক্ষতা যাচাই হবে। তারপর তিন মাস একনাগাড়ে আমার হাত-পা ভাঙা ফারসি দক্ষতার চিকিৎসা হবে। আবাদীর মতে, মাস্টার্সের ক্লাস শুরুর আগে আমাকে বইপুস্তকের ভাষা ছাড়াও রাস্তাঘাট, বাজার-মাঠ, গালাগালিসহ সব রকমের ভাষার দক্ষতা অর্জন করা জরুরি। অন্যথায়, চলা দায়! আবাদীর বাড়ি আহভাজ প্রদেশে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত প্রদেশ আহভাজের অধিবাসীদের বেশির ভাগই আরব। আবাদী বলছিলেন, বিদেশী শিক্ষার্থীদের এয়ারপোর্টে আনা-নেয়ার কাজটা তিনিই করেন। এ নিয়ে তার মধ্যে একটা গর্ব করার ব্যাপার লক্ষণীয় ছিল।

রাতে একজন আমার দরজায় কড়া নাড়ে। জিজ্ঞেস করতেই বলল, আমি বিদেশী শিক্ষার্থীদের দেখভাল করি। নাম কামরান। জাতে তাজিক। চেহারায় মঙ্গোলীয় ছাপ। এখানকার শিক্ষার্থী। বলল, তোমার হাঁড়িপাতিল, বাসনকোসন কী কী লাগবে একটা লিস্ট করো। ভাবলাম, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। এগুলোর বেশ প্রয়োজন ছিল। একটু আপ্যায়ন আমাকেও করতে হয়। দেশ থেকে আনা প্রাণ ঝাল চানাচুর তাকেও একটু দিলাম। খুশি হয়ে মুখে তুলে নিতেই আমার তাজিকি বন্ধুর চেহারা ঘোরতর রক্তিম বর্ণ ধারণ করল, চোখগুলো ভিজে যাওয়ার উপক্রম। সেদিনের মতো প্রস্থান নিয়ে দুই দিন সে আর ধারেকাছে আসেনি। খেয়াল করলাম, চেহারায় মঙ্গোলীয় ছাপ থাকাতে ইরানি বন্ধুরা কামরানকে চেংগিস বলে গালি দেয়। কামরান রাগ করে না। সবার খোঁজখবর নেয়। সে নিজেকে বিদেশী শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ভাবতে ভালোবাসত।

প্রতিদিন সকাল ৭টায় হোস্টেলের সামনে বাস এসে হাজির হতো। প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী। বেশির ভাগই চীনা, কোরিয়ান, আমরা চারজন উপমহাদেশীয়। গন্তব্য ইউনিভার্সিটির ল্যাংগুয়েজ সেন্টার। আমার ক্লাসে একজন রাশিয়ান ছাড়া প্রায় সবাই চীনা শিক্ষার্থী। চীনাদের নাম ইরানি শিক্ষকদের উচ্চারণ করতে ঝামেলা হয় বিধায় প্রত্যেক চীনা ও কোরিয়ান শিক্ষার্থীদের ইরানি নাম দেয়া হয়েছে। যেমন: নাদের, সোহরাব, আলালা, গজল, সিওয়াশ। এ রকম সাহিত্যিক, বীরত্বপূর্ণ নাম পেয়ে ওরা খুশি ছিল। চীনা বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে যখন কথা বলত, ওদের কথার ফুলঝুরির মধ্যে কেবল বিভিন্ন রিদম আবিষ্কার করতে পারতাম। এছাড়া কিছু বুঝতাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, ওদের ইরানে আগমনের হেতু কী? ফারসিই বা কেন শিখছে? যা বুঝলাম ওরা ফারসি ভাষাকে সাহিত্য কিংবা ইতিহাস বা ফিলোসফির দায় থেকে শিখছে না। চীনের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ওরা এসেছে, ক্রেডিট বদল করে ছয় মাসের কোর্স সমাপ্ত করতে। ওদের ওখানে স্রেফ ল্যাংগুয়েজ শেখানো হয়। ভাষার পুরো চারটি দক্ষতা শেখানো হয় না। হাওয়া, একমাত্র উইগুরু চীনা বন্ধু। ইরানি, আরবি সংস্কৃতির প্রতি অসীম টান মেয়েটির। ঠোঁট কাটার মতো জিজ্ঞেস করি, চীনে ওদের কোনো সমস্যায় পড়তে হয় কি না, জাতিগত নিধন আসলে সত্যি নাকি! প্রথমে ইতস্তত বোধ করলেও পরে নিজ থেকে সবকিছু বলতে শুরু করে।

চীনাদের আর রাশিয়ানদের মধ্যে একটা বিশেষ জিনিস লক্ষণীয়। ওরা নিজেদের গোত্র থেকে খুব একটা বের হয় না। সেদিক দিয়ে কোরিয়ানরা একটু ভিন্ন। কোরিয়ানদের বলা চলে দূরপ্রাচ্যের উপমহাদেশীয় সংস্করণ। সবসময় হইহুল্লোড়, মাস্তি। সবার সঙ্গে মেশার একটা প্রবণতা ওদের মধ্যে আছে। একদিন কী এক কারণে পুরো ইরানের ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। দুদিন ইন্টারনেট ছিল না। এমন অবস্থায় এক চীনা বন্ধু কীভাবে যেন ইন্টারনেট চালাত। তখন চীনাদের টেকনোলজি জ্ঞান সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না।

এভাবে একদিন আমার ল্যাংগুয়েজ কোর্স শেষ হয়ে যায়। স্বল্পমেয়াদি কোর্সে ইরানে আসা বিদেশী বন্ধুদের প্রায় সবাই যার যার দেশে ফিরে যায়। আমরা উপমহাদেশীয় সাতজন থেকে যাই। লক্ষ্য, ফারসি ভাষাতত্ত্বে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করা।

সেদিন রাতে হোস্টেলের অতিথি কক্ষে আমাদের অনেককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমার মাথায় হঠাৎ করেই ঢাকায় থাকাকালীন হলের গেস্ট রুমের কথা আসে। চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে যায়। না জানি কোনো বড় ভাই রেগেমেগে তেড়ে আসে কিনা। পা টিপে টিপে, দুরু দুরু বুক নিয়ে অতিথি কক্ষে প্রবেশ করি। একি! খোশ আমদেদ (তোমাকে স্বাগতম) বলতে বলতে একদল সিনিয়র ও জুনিয়র এগিয়ে আসে। সবাই সবার সঙ্গে পরিচিত হওয়াই ছিল এমন জমায়েতের উদ্দেশ্য এবং উত্তম উপায়ে সবাই সবাইকে কাছে টেনে নিচ্ছিল। এখানে আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ববোধ সব কিছুইঅটুট থাকে। বড় ভাই, ছোট ভাই নামক কালচারটার উপস্থিতিই নেই এখানে। কাউকে ভাই বললে খুশি না হয়ে বরং মাইন্ডও করতে পারে। তবে এমনিতে ছোটবড় সবাইকে দাদাশ (দাদা) বলে ডাকার প্রচলন আছে। সাধারণত সবাই নাম ধরেই ডাকে। সবাই সবার রাফিক (বন্ধু)।

ইরানিদের আদিখ্যেতা দেখানোর রীতি বাড়াবাড়ি রকমের। এরা ভদ্রভাবে ফারসিতে একে তায়ারুফ বলে। ইরানি সংস্কৃতিতে এটা খুবই ইতিবাচক। আপনি আদিখ্যেতা না দেখালে, অভদ্র, গোঁয়ার ভাবা হবে। তায়ারুফ অনেকটা বিয়েতে দুই বার কবুল বলার মতো। তৃতীয়বার যখন কোনো কিছু আপনাকে খেতে সাধবে কিংবা দাওয়াত করবে, তখন বুঝতে হবে, আসলে মন থেকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। বিদেশীরা দ্বিধায় পড়ে যায় এটা বুঝতে, কোনটা মন থেকে বলছে আর কোনটা এমনিতে বলছে। শুধু বাক্যের সোজাসাপটা অনুবাদ ধরে, আমল করতে গেলে হিতে বিপরীত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। দোকানে কেনাকাটা শেষে মূল্য পরিশোধ করতে গেলে দোকানদার হাত থেকে টাকা নিয়ে গুনতে গুনতে বলবে, ‘আহা! কী দরকার ছিল। এটুকু নগণ্য জিনিস আসলে টাকার যোগ্য না। আপনি আমার মেহমান, আমি আপনার নকরতুল্য।’ এমন মিঠা কথায় প্রথমে দ্বিধায় পড়ে যেতাম। পরে আমাদের মহল্লার দোকানি মিলাদ আমার ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে বলল, ‘ছাড়ো বাছা! তুমি বিদেশী মানুষ, এসব প্রবাদ প্রবচনে কান দিয়ো না।’ আদিখ্যেতার প্রবল মাত্রা দৃষ্টিগোচর হয় যখন দুজন ইরানি অনেক দিন পর পরস্পরের মুখোমুখি হয়। দুজন দুজনকে হূদয় উজাড় করে অভিবাদন জানাবে। যেমন ‘কেমন আছেন? আপনার জন্য কুরবান হই। বিবি-বাচ্চা কেমন? আপনি আমার মাথার মুকুট। আপনাকে ঘিরে তাওয়াফ করব। আপনার সরলতায় মরে যাব।’ একটু খেয়াল করে দেখলে দেখা যায়, দুজন পরস্পরকে একই রকম বেদম বাক্য ব্যয় করছে। কিন্তু কেউ কাউকে শুনছে না। তাজ্জব বনে যাই। যাই হোক, যেই দেশে যে চাইল, রান্ধে মুরগি হয় ডাইল।

আদিখ্যেতার কথা এলে সেদিক থেকে আমার আফগানি পাঠান বন্ধুদের অবস্থা একেবারে বিপরীতমুখী। ওদের শব্দই কর্ম। আফগানদের মধ্যে একটা জিগারতুল্য ব্যাপার আছে। অতিথিপরায়ণে অনবদ্য ছেলেগুলো। অল্পতে রাগ করার প্রবণতা ব্যাপক। শুনে অবাক হয়েছি, এক কাবুলি বন্ধুর পরিবারের সঙ্গে অন্য একটি গোষ্ঠীর পঞ্চাশ বছর ধরে ঝগড়া লেগে আছে। আমার ওই বন্ধু জানে না ঠিক কী কারণে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল। ও শুধু এটুকুই জানে, ওই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করলে সঙ্গে বন্ধুকে রাখতে হবে। প্রায় তিন মিলিয়ন আফগান মানুষ ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। ইরানের অবকাঠামো উন্নয়নে কায়িক শ্রমের জোগান দাতাদের বেশির ভাগ আফগান মুহাজির। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা গৃহযুদ্ধ, অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে এপারে এদের আগমন ঘটে। ভাষা এক হওয়ায় এখানে এদের টিকতে কষ্ট হয় না। ইরানে অবস্থানরত আফগানদের বেশির ভাগ হাজারা সম্প্রদায়ের লোক। হাজারারা শিয়া মতাবলম্বী হওয়াতে ইরানে এদের আত্মদানও অনেক। শোনা যায় ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রায় দুই হাজার হাজারা যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছে। আমাদের হোস্টেলে বিদেশী শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক আফগান। তবে ওরা কেউই ইরানের স্থায়ী অভিবাসী না। এখানে পড়তে এসেছে।

এবার আসি আফগান বন্ধুদের ক্রিকেট জ্ঞানে। ক্রিকেট মূলত দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের তথা হেলমান্দ, কান্দাহার এলাকার পাঠান অধ্যুষিত এলাকার খেলা। প্রতিবেশী পাকিস্তানের কল্যাণে এসব এলাকায় ক্রিকেট ছড়িয়ে পড়েছে। হোস্টেলের জনা ত্রিশেক আফগানির মধ্যে কেবল আহমেদজাই ক্রিকেট খেলায় পুরোদস্তুর পারঙ্গম। ওর জন্ম ও বেড়ে ওঠা পাকিস্তানের পেশোয়ারের শরণার্থী শিবিরে। ইদানীং আফগানিস্তান ক্রিকেটে ভালো করছে দেখে আফগানি অপরাপর শিক্ষার্থী যাদের বেশির ভাগ উজবেক, তুরকামান, হাজারা সম্প্রদায়ের তারা নিয়মিত টেলিভিশন কক্ষে হাজির হয়। দেশের প্রতি মায়া বলে কথা। কিন্তু খেলা আর কেউ বোঝে না। বন্ধু হাকিমি অনেকক্ষণ অপলক নেত্রে টিভি স্ক্রিনে চেয়ে থেকে বলল, ‘যতটুকু বুঝলাম, বল যখন প্রথম বৃত্তটা পার হয় এক ক্রেডিট যোগ হয়। যখন দ্বিতীয় বৃত্তটা পার হয় তখন দুই ক্রেডিট।’ আমি আর আগ বাড়িয়ে বোঝাতে যাইনি। ওদের কেবল একটাই কথা। ক্রিকেট টিম আর যাই করুক পাকিস্তানকে হারানো চাই। ওদের মতে, আফগানিস্তানের যত দুঃখ-দুর্দশা, তার জন্য পাকিস্তান দায়ী।

ইরানের খাবার নিয়ে আগ্রহ ছিল দেশে থাকার সময়। এখানে এসে সেই আগ্রহ কবে উবে গেছে। ভাত দিয়ে ডাল মাখিয়ে দক্ষিণ হস্তে গলাধঃকরণ করা মানুষ আমরা। খাবারের টেবিলে যখন শুকনো খাবারের পসরা দেখি আত্মারাম সর্বদা পালাই পালাই করে। বোধ করি, খাবার একটা সংস্কৃতির মজ্জাগত ব্যক্তিগত বিষয়। এক্ষেত্রে আমার সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা কখনো আসেনি। চেলু কাবাব, জুজে কাবাব, কুরমে সাবজী, জেরেশক পোলাও মোরগ এখানকার নামি খাবারের নাম। সম্পূর্ণরূপে মসলাবর্জিত খাবার। এসব খাবার মরিচের সঙ্গে যেকোনো কারণে আড়ি করেছে আমার জানা হয়নি। ইরানি খাবারের আইটেমের মধ্যে মির্জা কাসেমি নামক একটা খাবার আমাদের কাছাকাছি গোত্রের খাবার। বেগুন ভাজির খালাতো বোন। মানুষের নামে খাবারের নাম কেন রাখা হয়েছে বুঝে আসেনি। তো, মিরজা কাসেমিকে আমার স্বদেশী ভাই রেস্টুরেন্টে অর্ডার করার সময় মির্জা কাসেম সুলেমানি বলে দিয়েছিলেন। উপস্থিত ভোজনরসিকগণ ভেবেছেন, আমরা বোধ হয় উনাদের প্রধান সিপাহসালারের নামে রসিকতা করছি। পরে ব্যাপক তোপের মুখে কোনো রকম বোঝানো গিয়েছে, আমরা বিদেশী। ইরানি এক ভদ্রলোক একদিন আমাকে বলছিল, শুনেছি তোমরা নাকি আস্ত ডেগচিপূর্ণ মসলার মধ্যে খাবার ডুবিয়ে রান্না করো? বললাম, তা তো বটেই! তিনি বললেন, মিয়া নিজের প্রতি একটু রহম তো করো! মুহূর্তেই জবাব দিলাম, শুষ্ক দেশ, শুষ্ক খাবার, শুষ্ক প্রাণ—কী করে বুঝবে বর্ষাস্নাত প্রেয়সীর গান।

আমার পাকিস্তানি সহপাঠী মুসাব্বির। পাজিটা মানতেই চায় না, মাছ ঝোল দিয়ে রান্না করা যেতে পারে। তার কাছে ব্যাপারটি একই সঙ্গে অমানবিক ও অযৌক্তিক। জিজ্ঞেস করলাম, কেন এমনটা মনে করছেন? তিনি বললেন, মাছ পানিতে থাকে, বেচারাকে পুনরায় পানিতে রেখে রান্না করার কোনো মানে হয় না। তার মতে, খাদ্যাভ্যাস মানুষের শরীরে ও চরিত্রে প্রভাব রাখে। উদাহরণ দিতে গিয়ে বললেন, যেমন বাঙালিরা বেশি মাছ খায় তাই তারা যথেষ্ট পশমি হয় না। মনে মনে বললাম, পাকিস্তানিরা প্রচুর পাঁঠা খায়, তাই তারা যথেষ্ট লোমশ।

ইংরেজি নববর্ষ কিংবা ঈদে বিদেশী শিক্ষার্থীদের দাওয়াত করে আপ্যায়ন করার দায়িত্বটা রীতিমতো আমার আর ভারতীয় বন্ধু মিনহাজের ওপর থাকে। মিনহাজ পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির ছেলে। রান্নায় পরিমিত পরিমাণের চেয়ে একটু বেশি রাজস্থানি ও হায়দরাবাদি মসলা ব্যবহার করে। ফিলিস্তিনি বন্ধু হাম্মাদ ও সিরিয়ান আলী এমন খাবারের খুব ভক্ত। সেদিন খুব আয়েশ করে খাবার খেয়ে আমাদের ককেশীয় উত্তম গৌর গাত্রবর্ণীয় বন্ধুদের মুখমণ্ডলে দুর্লভ কিছু ফুসকুড়ির উত্থান দেখা দেয়। পরে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে ডাক্তার ওদের সর্বপ্রকারের ইন্দো-বেঙ্গলি খাবার এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেন।

কেরমান সিটি-কর্পোরেশন কর্তৃক আয়োজিত একটা ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করার সুযোগ এসে যায়। সাতপাঁচ না ভেবে রাজি হয়ে যাই। আমরা প্রায় ১৩ জন ১৩টি দেশ থেকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। কেরমানে যখন পৌঁছাই তখন আমাদের মধ্যে এড্যাম সাকো নামের আইভরিকোস্টের এক বন্ধুকে নিয়ে উদযাপন শুরু হয়ে যায়। পরে বুঝতে পারি শুধু এড্যামকে দৈর্ঘ্য প্রস্থে বিদেশী মনে হচ্ছে। ছেলে বুড়ো সবাই ওকে ঘিরে সেলফির জোয়ার বইয়ে দিচ্ছিল।

কেরমান নিয়ে অনেক কথা। রাফসানজানের সেই সরাইখানাগুলো যেখানে সিল্করোড হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্য করতে আসা ভারতবর্ষ ও চীনের মুসাফিররা খানিক জিরিয়ে নিত। সারি সারি খেজুরের গাছ। একই সঙ্গে চার ঋতু অনুধাবন হয় এমন কিম্ভূত আবহাওয়া। পথের দুধারে প্রাচীন স্থাপত্যের অনুপম অলংকরণ। জিজ্ঞাসা করলাম, এই যে বড় বড় গম্বুজ, কী দিয়ে বানাইছে? একজন খুব আগ্রহ ভরে উত্তর দিল, পাথরের সঙ্গে গমের খড়, সেই সঙ্গে উটের দুধের মিশ্রণে হয়েছে এই শিল্পকর্ম। পাশে বাতাসে দুলতে থাকা চারাগাছটার সঙ্গে মাথা দুলিয়ে বুঝতে পেরেছি সূচক। জবাব দিয়ে মনে মনে কইলাম, ব্যাপারটা ক্লিয়ার না! ধবল রঙবিশিষ্ট পারসিকদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত আমি। কেরমানের বাম নামক গ্রামের অন্ত্যজ শ্যামল গাত্র রঙবিশিষ্ট লোকজন দেখে আহ্লাদে আটখানা হই। দক্ষিণ ইরানের লোক ছাড়াও কেরমানের এই এলাকার লোকদের দেখতে আমাদের মতো লাগে। কেমন ভাইয়ালি একটা ব্যাপার, একজনের সঙ্গে কোলাকুলি কইরা বললাম, ‘আমাগোর দেশে আইসো।’

শহরের মাঝখানে একটা বড় ময়দানে একদল জিপসি নারী-পুরুষ সমবেতভাবে ভিক্ষা করছিল। খোঁজ নিয়ে জানলাম, পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জিপসিদের ট্রানজিট কেন্দ্র নাকি ইরানই ছিল। মহাকাব্য শাহনামার রেওয়ায়েত অনুযায়ী, সাসানী শাসক বাহরাম গোর (৪২১-৪৩৯) ভারতের রাজার কাছে একদল বাদ্যবাদক চেয়েছিল যেন আপামর সাধারণ ইরানিদের বিনোদিত করতে পারে। কেননা সাধারণ মানুষ সবসময় শাহি বিনোদন থেকে বঞ্চিত ছিল। ভারতের রাজা পাঞ্জাব থেকে ১০ হাজার বাদ্যবাদক পাঠিয়েছিল। ইরানের বাদশা সবাইকে একটি করে গরু, একটি করে গাধা দিয়েছিল যেন তারা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আর বিনিময়ে ইরানের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিনামূল্যে গান শোনায়। কিন্তু ভারত থেকে আগন্তুক বাদক দল এক বছরের মাথায় সবকিছু খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। তখন বাদশা আর চুক্তি না বাড়িয়ে সবাইকে গাধার পিঠে বসিয়ে খোদা হাফেজ বলে দেয়। আর তখন থেকে জিপসিরা পুবদিকে পুনরায় মুখ না ফিরিয়ে পশ্চিমের পথে পা বাড়ায়। যদিও জিপসিদের এমন উত্থানের সপক্ষে ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণাদি ছাড়া নৃতাত্ত্বিক শক্ত কোনো প্রমাণাদি পাওয়া যায়নি।

তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ফেস্টিভ্যালে শেষ দিনটি রাখা হয়েছিল বিদেশী প্রতিযোগীদের জন্য। প্রথমে প্রতিটি দেশের জাতীয় সংগীত বাজে। বেশির ভাগ জাতীয় সংগীতের সুর যুদ্ধের দামামার মতো শোনাচ্ছিল। বিভিন্ন জাতির শৌর্য, বীরত্ব প্রকাশ তাদের জাতীয় সংগীতের মধ্যে স্পষ্ট ছিল। এর মধ্যে কোমল কণ্ঠে ভেসে আসে আমার সোনার বাংলা। উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা প্রথমে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করে। পরক্ষণে ওরা বুঝতে পারে এটা এমন এক ভূখণ্ডের সংগীত যার অধিবাসীরা সে দেশকে মা বলে সম্বোধন করে। আর মায়ের গান তো কোমলই হবে। আমি ওদের চোখেমুখে আমাদের জাতীয় সংগীতের প্রতি ভালোবাসা দেখেছি।

হঠাৎ করেই বাংলাদেশের অর্থনীতি শিরোনামটি আমার বক্তব্যের বিষয় নির্বাচন করে দিল। তখন কিনা আমি পারস্য-বাংলা সম্পর্ক, বিদ্রোহী কবির সিরাজপ্রেম আর লালা-নারগিস ফুলের উপমার কথা নিয়ে ভাবছিলাম। শেষমেশ আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, সোনালি আঁশের ওপর প্রস্তুতি নিয়ে বক্তৃতা করতে পেরেছিলাম।

ইরানিদের ভারতীয়দের প্রতি একটা অসীম প্রেম রয়েছে। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক যোগাযোগের কারণে এমনটা হবে হয়তো। তো সেই সুযোগ কোনো মতে হাতছাড়া করে না আমার দিল্লির বন্ধু শাহনাওয়াজ আর আচ্ছে মিয়া। এই দুজন ইরানিদের ভারতপ্রীতির বাহানায় যে কত ইরানিদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছে খোদা মালুম। মোটামুটি মুফতে পুরো ইরান ঘুরে ফেলেছে। ইরানিদের কাছে ভারত মানেই শাহরুখ খান আর অমিতাভ বচ্চন। আর ভারতীয় কাউকে দেখলেই বলবে সালাম বেরাসান অর্থাৎ অমিতাভ বচ্চনকে সালাম পৌঁছে দিয়ো। মনে মনে ভাবি, এই হচ্ছে সিনেমার শক্তি।

সেদিন ট্যাক্সিতে করে কোথাও যাচ্ছি। বয়োজ্যেষ্ঠ এক চালক গাড়ি চালাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘জানো নাকি, ইরানের ইসলামি বিপ্লবে অমিতাভ বচ্চনের সিনেমা শোলের ভূমিকা আছে।’ শুনে আমার চক্ষু চড়কগাছ!

ব্যাপারটি কীভাবে হাজি? একটু বেশি হয়ে গেল না? আমার জিজ্ঞাসা।

মুরব্বি বলতে লাগল, বিপ্লবের ক্ষণকাল পূর্বে যখন ইরানের রাজা রেজা শাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘনীভূত হয়,  সে বছর ইরানে অমিতাভ বচ্চনের শোলে মুভি মুক্তি পায়। আর এই যে গাব্বার সিং আছে না, সে সমস্ত জুলুমের প্রতীক। ইরানি বহু সাধারণ মানুষ এই সিনেমা দেখে বিপ্লবের প্রতি উৎসাহী হয়েছিল।

আমি মাথা নেড়ে বলি, ‘শয়াদ (হয়তো)।’

ছুটির দিনগুলোয় রাতভর আড্ডা হয়। আমাদের কক্ষটি অল্প দিনের মধ্যে ভারত, ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনি, পাকিস্তানি বন্ধুদের মিলনমেলায় রূপ লাভ করেছে। আরবদের হুক্কা আর কফি, আফগানদের জাফরানি শরবত, ইরানিদের পেস্তা আর আমাদের দেশী চায়ের সম্মিলনে আড্ডা বেশ জমে।

আলী গল্প বলতে শুরু করে। আলেপ্পো আর দামেস্কের গল্প। ২০১২ সালের আগে ওর দেশটা নাজ-নেয়ামতে পূর্ণ ছিল। ওদের গাড়ি ছিল। উন্নত সুযোগ-সুবিধা ছিল। দায়েশ এসে ওর স্বপ্নের আলেপ্পোকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে দিয়েছে। চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখেছে অনেক বন্ধু-স্বজনকে। এসব বলতে বলতে আলীর চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে।

মুদাসসির সম্প্রতি আফগানিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় মারা যাওয়া লোকদের নিয়ে চিন্তিত ছিল। ও জন্ম থেকে দেখে এসেছে ওর আত্মীয়-স্বজনদের দেশ ছেড়ে যেতে। জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়তে হয়। আমি বললাম এটা তো স্বাভাবিক। দেশ তো আমাদেরও ছেড়ে যেতে হয়। পরিবারের মুখে তিন বেলা আহার তুলে দিতে আমাদের মিলিয়ন মিলিয়ন প্রবাসী বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে।

সাজ্জাদ বলে ওঠে, ‘তোমাদের স্রেফ জীবিকার জন্য বিদেশ যেতে হয় কিন্তু আমাদের জীবন বাঁচাতে যেতে হয়। আমাদের আমেরিকা মারে, তালেবানরা মারে। জাতিগত কোন্দল তো আছেই। আহারে কোথাও নিস্তার নাই! মসজিদে গেলে সেখানেও অঘটন ঘটে।’

এসব কথা শুনে আমরা উপমহাদেশীয় বন্ধুরা চুপ হয়ে যাই। বন্ধু শাহনাওয়াজ বলে ওঠে, আসলে আফগানিস্তানের ক্ষতটা অনেক গভীর। হাসিতে ফেটে পড়ে হাম্মাদ। হাম্মাদ ও ওবাদা ফিলিস্তিনের বন্ধু। হাম্মাদের হাসির একটা আজব বৈশিষ্ট্য আছে। সাধারণত অট্টহাসি উচ্চ স্কেল থেকে নিম্নগামী হয়। কিন্তু হাম্মাদ নিচু স্বর থেকে শুরু করে, তার সঙ্গে একটা নাজুক কম্পন হাসির রেশকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলে। কয়েক মিনিট স্থায়িত্ব লাভ করে এ হাসি। তার হাসির প্রভাবে প্রথমে একজন দুজন করে হাসতে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে সে ধারাবাহিকতায় এক সময় পুরো মজলিস হাসতে থাকে। পরে সবাই বুঝতে পারে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কারণে এই হাসির পর্ব সংঘটিত হয়নি।

যাই হোক, হাম্মাদ বলছিল, দুনিয়ায় আমরাই মনে হয় সবচেয়ে সুখী। কয়েকজন জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে ওর দিকে তাকালে ও বলতে থাকে, ‘কারণ, আমাদের তো কোনো দেশই নেই।’ এবার বুঝেশুনে সবাই হাসতে শুরু করে। হাম্মাদের বাবার জন্মভিটা ফিলিস্তিনের রামাল্লায়। যৌবনের প্রথম প্রহরে ওর বাবা হাইফাতে ইসরায়েলের জেলখানায় দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ ছিল। ছাড়া পেয়ে আগপাছ না ভেবে সিরিয়ায় চলে যায়। হাম্মাদের জন্ম ও বড় হওয়া সিরিয়ায়। হাম্মাদ আর ওবাদার কোনো পাসপোর্ট নেই। চাইলেও সিরিয়া ছেড়ে কোথাও যেতে পারে না। ইরান সরকার ওদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সেজন্য ওরা ইরানের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ।

ড. কুরোশ সবার মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। সবসময় রসহীন আলোচনাকে সরস করে তুলতে তার জুড়ি নেই। কৌতুক শোনাতেও ওস্তাদ। বললেন, এক ইসফাহানি মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে, ছেলে বড়টা কই? স্ত্রী বলল, এই যে আপনার ডান পাশে। মেঝোটা? এই যে আপনার মাথার পাশে। ছোটটা কই? বলল, আপনার পায়ের কাছে। এবার ইসফাহানি রেগেমেগে বলল, হারামজাদারা! এইখানে বইসা আছস, তোদের রুমের লাইট জ্বলতেছে কেন?

কৃপণ হিসেবে ইরানের সর্বত্র ইসফাহানিদের খ্যাতি রয়েছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইসফাহানিদের এমন দেখিনি। সব দেশেই বোধ করি ব্যাপারটি আছে। ইসফাহানিদের কথাবার্তায় আঞ্চলিকতার সুর অনেক শ্রুতিমধুর। এদিক দিয়ে ইসফাহানকে আমার কাছে ইরানের বরিশাল মনে হয়েছে।

ইরানে ইয়াযদ আর শিরাজের লোকজন একটু বেশি প্রভাবশালী। সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রগুলোয় এদের পদচারণা বেশি। যেহেতু ইয়াযদ মরুময় অঞ্চল, এখানে প্রতিকূলতাও বেশি। প্রতিকূল পরিবেশ সবসময় উন্নয়নের সোপান হয়। তুর্কি, কুরদি, ফারস, বেলুচি, বখতিয়ারি, লুরি নানা জাতির সম্মিলনে গড়ে ওঠা পারসিকদের স্যালুট জানাতে হয়। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা নানা রকম আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, অবরোধের মধ্যে নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অপার সম্ভাবনাময় এ দেশ একদিন বিজয়ের হাসি হাসবে। যদিও এখানকার যুবকদের মধ্যে হতাশা অনেক। মেঘ চিরস্থায়ী হয় না।

এখন বাংলাদেশের পোশাক ইরানের বাজারে হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে। সেদিন এক ইরানি দোকানি বলছিল, ‘পৃথিবীতে বেহতারিন (সর্বোত্কৃষ্ট) পোশাক বাংলাদেশে তৈরি হয়।’ উপস্থিত কয়েকটি দেশের বন্ধুদের মাঝে আমার মাথাটা কৃতজ্ঞতাবোধে ওপরে উঠে যায়।

 

মাজহারুল ইসলাম:  ইরানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী