সৌদি আরবে স্বাস্থ্যসেবা খাতটি মূলত সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর সৌদি সরকার স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করে। সৌদি আরবের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা মূলত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত।

 

১.    প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র (মোস্তাওসাফ)।

২.   সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার (জেনারেল হাসপাতাল)। (মোস্তাসফা আম)

৩.   টারসিয়ার কেয়ার হাসপাতাল। (সেন্ট্রাল হসপিটাল/স্পেশালিস্ট হসপিটাল)

 

১. প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র : প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার জনবসতির জন্য একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (মোস্তাওসাফ/পিএইচসি) রয়েছে।

প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে তিন থেকে পাঁচজন জিপি (জেনারেল ফিজিসিয়ান) এবং একজন ডেন্টাল সার্জন (কোথাও কোথাও দুজন) থাকেন। প্রায় প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, এক্স-রে ফ্যাসিলিটিজ রয়েছে।

তাছাড়া প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে তিন থেকে পাঁচজন পুরুষ নার্স এবং তিন থেকে পাঁচজন ফিমেল নার্স, এক-দুজন ল্যাব টেকনিশিয়ান, একজন এক্স-রে টেকনিশিয়ান, এক-দুজন ডেন্টাল টেকনিশিয়ান কর্মরত আছে।

যেসব রোগীর চিকিৎসা পিএইচসিতে সম্ভব নয় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।

২. সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার হাসপাতাল: এক একটি সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার হাসপাতালের আওতায় নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক পিএইচসি বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকে। এসব হাসপাতালে ইনডোর ও আউটডোর পেশেন্ট কেয়ার সার্ভিস চালু আছে। পিএইচসি থেকে রোগীরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসব হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেন। প্রতিটি সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার হাসপাতালে মেডিসিন, সার্জারি, অবস অ্যান্ড গাইনি, অর্থোপেডিকস সার্জারি, শিশুরোগ, চক্ষু, নাক-কান-গলা, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ কর্মরত আছেন। ওই হাসপাতালগুলোয় ইমার্জেন্সি রোগী ছাড়া আর কোনো রোগী সরাসরি দেখা হয় না। সবাইকে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসতে হয়। তাছাড়া রেডিওলজি স্পেশালিস্ট, প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট এবং মাইক্রোবায়োলজি স্পেশালিস্ট পোস্টেড আছেন। কোনো কোনো সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার হাসপাতালে রেনাল ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু আছে। তাছাড়া প্রতিটি সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার হাসপাতালে রয়েছে রুটিন প্যাথলজি টেস্ট, বায়োকেমিস্ট এবং রেডিওলজি ও ইমেজিংয়ের সুবিধা। এমনকি হরমোনাল টেস্ট, সিটি, এমআরআই, ম্যামোগ্রাম ইনভেস্টিগেশনের সুবিধা রয়েছে। সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার হাসপাতালগুলোই মূলত এখনকার চিকিৎসার প্রাণকেন্দ্র। যেসব রোগীর আরো উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অধিকতর চিকিৎসা সুবিধাসংবলিত টারশিয়ারি কেয়ার হাসপাতাল কিংবা স্পেশালিস্ট হাসপাতালে রেফার করা হয়।

৩. টারশিয়ারি কেয়ার হাসপাতাল: হাসপাতালগুলো মূলত তিন-চারটি স্বতন্ত্র ম্যানেজমেন্টের নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে প্রতিটি প্রভিন্সে এমওএইচের অধীনে একটি করে ‘সেন্ট্রাল হাসপাতাল’ রয়েছে। তাছাড়া এখানকার ‘ইউনিভার্সিটি স্পেশালিস্ট হাসপাতাল’গুলো এডুকেশন মিনিস্ট্রি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ‘মিলিটারি বা সামরিক বাহিনীর হাসপাতাল’গুলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতাল এবং কিং ফয়সাল স্পেশালিস্ট হাসপাতালগুলো সরাসরি রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন। আর এসব হাসপাতালগুলোয় নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া (বা নির্ধারিত নিয়ম) অনুযায়ী রেফারাল নিয়ে রোগীরা চিকিৎসা পেয়ে থাকেন।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে (মোস্তাওসাফ) যেসব সার্ভিস বা চিকিৎসা পাওয়া যায় তা হলো:

১.      সাধারণ রোগ বা কমন ডিজিজের চিকিৎসা।

২.     ক্রনিক ডিজিজের চিকিৎসা। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ও অ্যাজমার রোগীরা প্রতি এক মাস কিংবা দুই মাস পরপর পিএইচসিতে ফলোআপে আসেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেয়ে থাকেন।

৩.     বাচ্চাদের টিকাদান।

৪.      অ্যান্টিনাটাল চেকআপ এবং রিস্কি প্রেগন্যান্সি স্ক্রিনিং।

৫.     স্কুল হেলথ চেকআপ: প্রতি বছর প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে, প্রাথমিক স্কুলে, জুনিয়র হাই এবং হাইস্কুলে ভর্তির সময় হেলথ চেকআপ করার জন্য স্টুডেন্টরা পিএইচসিতে আসে। এ সময় বাচ্চাদের হাইট, ওয়েট, দৃষ্টি, হেয়ারিং টেস্ট করা হয় এবং সেই সঙ্গে চাইল্ড ইমুনাইজেশন গুরুত্ব সহকারে চেক করা হয়। ইপিআইয়ের ভ্যাকসিনেশন কার্ড চেক করে ভ্যাকসিনেশন প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। যদি কোনো ডিফল্টার পাওয়া যায় তাহলে তাকে অবশিষ্ট টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। টিকা ইনকমপ্লিট থাকলে ওই বাচ্চা স্কুলে ভর্তির জন্য এলিজেবল হবে না।

৬.     নোটিফিকেশন অব ইনফেকশাস ডিজিজ: টিউবারকিউলোসিস, ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিস-বি, এনিম্যাল বাইট, স্ন্যাক বাইট, স্করপিয়ন বাইট, কভিড, সার্স, বিলহারজিয়া ইত্যাদি রোগী শনাক্ত হলে ইনফেকশাস ডিজিজ কন্ট্রোল সেন্টারকে এ বিষয়ে নোটিফিকেশন পাঠাতে হয়।

৭.      তাছাড়া মাইনর ইনজুরির চিকিৎসা দেয়া হয়।

মোট কথা, এসেনশিয়াল হেলথ কেয়ার বলতে যা বোঝায় সেটাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে দেয়া হয়ে থাকে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম : এখন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে ট্রিটমেন্ট নিতেও রোগীদের ৯৩৭ নম্বরে কল করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসতে হয়। অবশ্য কেউ যদি অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে না পারেন তাহলে তাদের জন্য এবং ইমার্জেন্সি রোগীর জন্য অন দ্য স্পট রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা আছে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা পদ্ধতি : অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসা রোগীরা প্রথমে রিসিপশনে এসে তাদের নাম এন্ট্রি করবেন। এরপর রোগীর প্রয়োজন মোতাবেক রোগীরা বিভিন্ন বিভাগে ভাগ হয়ে যেমন সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য পুরুষ রোগীরা পুরুষ নার্স এবং মহিলা রোগীরা মহিলা নার্সের কাছে যেয়ে ভাইটাল সাইনগুলো চেক করে কম্পিউটারে লিপিবদ্ধ করবেন।

যেসব বাচ্চা ভ্যাকসিনেশনের জন্য আসবে তারা প্রথমে ওয়েল বেবি কেয়ার ক্লিনিকের নার্সের কাছে যেয়ে ভাইটাল সাইনগুলো চেক করে কম্পিউটারে লিপিবদ্ধ করবে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে দেখিয়ে ইপিআইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় টিকা নেবে। অ্যান্টিনাটাল চেকআপের জন্য আগত রোগীরা এএনসির দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং ভাইটাল সাইনগুলো চেক করে কম্পিউটারে লিপিবদ্ধ করবে এবং এরপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে যাবে।

রোগীরা চিকিৎসকের কক্ষে এলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ওই রোগীর ফাইল ওপেন করবেন। অতঃপর রোগীর হিস্ট্রি নেবেন, প্রয়োজনীয় ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন করবেন। এরপর যদি কোনো রোগীর কোনো ইনভেস্টিগেশন প্রয়োজন মনে করেন তাহলে কম্পিউটারে ইনভেস্টিগেশন অর্ডার দিয়ে দেবেন এবং রোগীকে ল্যাবে পাঠিয়ে দেবেন।

এরপর ইনভেস্টিগেশন শেষে রোগী ফেরত এলে কিংবা অন্যান্য সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রেসক্রিপশন-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ওই রোগীর কম্পিউটারের ফাইলে লিখে দেবেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন লেখার পর রোগীর মোবাইলে একটি মেসেজ চলে যাবে, অতঃপর রোগীর সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট করা ফার্মেসিতে গিয়ে ওই মেসেজ দেখালে ফার্মাসিস্ট রোগীকে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ সম্পূর্ণভাবে বিনামূল্যে প্রদান করবে।

তবে যদি কোনো রোগীর রেফারাল প্রয়োজন হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক তার কম্পিউটারে ওই রোগীর শর্ট হিস্ট্রি, এক্সামিনেশন ফাইন্ডিংস এবং ল্যাব রিপোর্ট নোটপূর্বক একটি রেফারাল পেপার প্রস্তুত করে জেনারেল হাসপাতালে (সেকেন্ডারি কেয়ার হাসপাতাল) অনলাইনের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অ্যাপ্লাই করবেন। এরপর সম্ভাব্য তারিখ ও সময় অনুযায়ী অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লটের অপশন এলে রোগীর সঙ্গে আলোচনা করে সুবিধাজনক সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুক করবেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুক হলে রোগীর মোবাইলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট-সংক্রান্ত মেসেজ চলে যাবে। এরপর রোগী তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চলে যাবেন।

স্বাস্থ্য খাতকে দেশী কর্মশক্তি দিয়ে আত্মনির্ভরশীল করার উদ্যোগ : আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে এখানকার স্বাস্থ্যসেবা খাত বিদেশী চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও প্যারামেডিক স্টাফদের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই সরকার সফলভাবে বিদেশী হেলথ ম্যানপাওয়ারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সমর্থ হয়েছে।

বিদেশীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য সরকার সৌদি আরবে মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং হেলথ টেকনোলজিস্ট ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছে, যা এক্ষেত্রে সফলতা বয়ে আনতে দুর্দান্তভাবে সফলভাবে কাজ করেছে। আর এসব কলেজ ও ইনস্টিটিউট থেকে পাস করে আসা সৌদি চিকিৎসক এবং নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের দ্বার ধীরে ধীরে বিদেশী চিকিৎসক এবং নার্স ও টেকনোলজিস্টদের প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে বিদেশী ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানদের সদ্য পাসকৃত সৌদি ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান দিয়ে রিপ্লেস করা হয়। একই সঙ্গে ক্রমান্বয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে বিদেশী নার্সিং স্টাফদের সৌদি নার্সিং স্টাফ দিয়ে রিপ্লেস করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বিদেশী ডেন্টাল সার্জনদেরও সৌদি ডেন্টাল সার্জন দিয়ে রিপ্লেস করা হয়। এখন যেসব জায়গায় হাইলি স্কিল নার্সিং স্টাফ প্রয়োজন কিংবা যেসব জায়গায় ওয়ার্কলোড বেশি (যেমন আইসিইউ, পিসিইউ, নিউরোসার্জারি, পেডিয়াট্রিকস সার্জারি প্রভৃতি) এ ধরনের কিছু ইম্পরট্যান্ট কর্মক্ষেত্রে বিদেশী নার্সরা চাকরি করছেন, নতুবা বেশির ভাগ স্থানেই সৌদি নার্সরা চাকরি করছেন।

চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিদেশী চিকিৎসকদের (জিপি) রিপ্লেস করার প্রক্রিয়া চলমান আছে। তবে এক্ষেত্রে জিপি লেবেলে বিদেশী চিকিৎসকদের সম্পূর্ণভাবে রিপ্লেস করতে আরো অন্তত পাঁচ-ছয় বছর সময় লাগবে। তবে স্পেশালিস্ট পর্যায়ে চিকিৎসক রিপ্লেস করতে আরো অন্তত ১০-১৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে আমার ধারণা।

সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য চাকরির সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতা : বিগত দিনে ২০০৮ সালের আগে প্রতি দুই-এক বছর পর পর সৌদি আরবের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি রিক্রুটমেন্ট টিম বাংলাদেশে আসত। তারা আগ্রহী প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র গ্রহণ করে প্রথমে একটি রিটেন (এমসিকিউ) পরীক্ষা নিতেন এবং ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ (কোয়ালিফাইং নম্বর প্রাপ্ত) ক্যান্ডিডেটদের ভাইবা নেয়া হতো। যারা ভাইবায় উত্তীর্ণ হতেন তাদের জব ভিসা/ওয়ার্কিং ভিসা/এমপ্লয়মেন্ট ভিসা দেয়া হতো।

এমপ্লয়মেন্ট ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে আসা চিকিৎসক বা নার্সরা এ দেশে এসে পোস্টিং নিয়ে চাকরি করতে থাকতেন এবং পরবর্তী সময়ে ‘সৌদি কমিশন ফর হেলথ স্পেশালিটি’ বা ‘সৌদি মেডিকেল কাউন্সিল হতে’ লাইসেন্স এক্সাম দিতেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘প্রফেশনাল রেজিস্ট্রেশন’ সংগ্রহ করতেন।

২০০৮ সালের আগে আমাদের দেশ থেকে অনেক চিকিৎসক সৌদি আরবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি নিয়ে এসেছেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে চাকরি করেছেন। কিন্তু ২০০৬ কিংবা ২০০৭ সালে সৌদি মেডিকেল কাউন্সিল আমাদের দেশের ‘পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা’ ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের পদাবনতি করে স্পেশালিস্ট পদ থেকে রেসিডেন্ট পদে পদায়িত করেন। এর কারণ হিসেবে ‘ডিপ্লোমা কোর্স’গুলো এক বছরের কোর্স হিসেবে অবহিত করা হয়, কিন্তু ওই কোর্সে ভর্তির জন্য প্রাক-যোগ্যতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্যান্ডিডেটদের এক বছর ট্রেনিং থাকা আবশ্যক ছিল। অর্থাৎ ওইসব ডিপ্লোমা কোর্স এক বছরের নয়, ওই কোর্সগুলো দুই বছর মেয়াদি। এ সাধারণ বিষয়টি সেই সময় সৌদি মেডিকেল কাউন্সিলকে বোঝাতে ব্যর্থতা এর জন্য দায়ী। তাছাড়া ২০০৮ সালের পর সৌদি সরকার সরকারিভাবে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ থেকে আর কোনো চিকিৎসক রিক্রুট করা বন্ধ রয়েছে। আর দুএকজন যারা বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে এসেছেন তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসেছেন এবং তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য।

বর্তমানে পাকিস্তানের এফসিপিএস ডিগ্রি সৌদি আরবে রিকগনাইজড হলেও বাংলাদেশের এফসিপিএস সৌদি মেডিকেল কাউন্সিল কর্তৃক রিকগনাইজড নয়। অবশ্য আমাদের দেশের ‘এমডি’ ডিগ্রিটি এখনো সৌদি আরবে রিকগনাইজড।

সৌদি আরবে স্পেশালিস্ট পর্যায়ে এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে সৌদি চিকিৎসক গড়ে ওঠেনি। তাই এদের আগামী অন্তত আরো ন্যূনতম ১০-১৫ বছর সময় লাগবে নিজস্ব চিকিৎসক তৈরি হতে। এই মধ্যবর্তী সময়টা সৌদি আরবকে বিদেশী স্পেশালিস্ট চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে হবে। এমতাবস্থায় সৌদি আরবে যদি আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য জব মার্কেট ওপেন করা যায় তাহলে সেটা বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য ফরেন কারেন্সি উপার্জনের ক্ষেত্রে নব দিগন্তের সূচনা করবে।

আর বর্তমানে সৌদি আরবে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশী স্পেশালিস্ট চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা (অচলতা) চলছে তা থেকে উত্তরণের জন্য বিএমডিসি, বিসিপিএস এবং বাংলাদেশ মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্সকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে আমি কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করছি।

১. সৌদি কাউন্সিল ফর মেডিকেল স্পেশালিটি এবং আরব বোর্ডের যারা এক্সামিনার বা মেম্বার আছেন তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের ডিগ্রিগুলো রিকগনিশনের জন্য আলোচনা করতে হবে।

২. সৌদি কাউন্সিল ফর মেডিকেল স্পেশালিটি এবং আরব বোর্ডের যারা এক্সামিনার বা মেম্বার আছেন তাদের আমাদের দেশের এমডি ও এফসিপিএস কোর্স-কারিকুলাম এবং পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।

৩. আরব বোর্ডের এক্সামিনারদের আমাদের দেশের এমডি ও এফসিপিএস পরীক্ষার সময় অবজারভার হিসেবে ইনভাইট করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে তাদের এক্সামিনার হিসেবে নেয়া যেতে পারে।

এভাবে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের দেশের ডিগ্রির রিকগনিশন পাওয়ার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা করা যায়। সৌদি আরবে আমাদের দেশের পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির রিকগনিশন এস্টাবলিশ করতে হবে এবং আমাদের দেশ থেকে সৌদি আরবে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সৌদি সরকারকে উদ্বুদ্ধ করতে কূটনৈতিক তত্পরতা জোরদার করতে হবে। তাহলেই আবারো নতুন করে সৌদি আরবে স্পেশালিস্ট চিকিৎসকদের জন্য জব মার্কেট উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আজও রয়েছে।

বাংলাদেশী চিকিৎসকদের অবস্থা: বর্তমানে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বাংলাদেশী চিকিৎসক সৌদি আরবে কর্মরত আছেন। এর মাঝে বেশির ভাগ চিকিৎসকই সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরত আছেন। এসব চিকিৎসক প্রাইমারি হেলথ কেয়ার হাসপাতাল, সেকেন্ডারি কেয়ার হাসপাতাল, টারশিয়ারি কেয়ার হাসপাতালে সুনামের সঙ্গে কর্মরত আছেন।

মেডিসিন, জেনারেল সার্জারি, আই, ইএনটি, নিউরোসার্জারি, ইউরোলজিস্ট, অ্যানেস্থেশিয়া, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে সমগ্র সৌদি আরবে বাংলাদেশী চিকিৎসকরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এবং সুনামের সঙ্গে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কর্মরত আছেন।

এমনকি কিং ফয়সাল স্পেশালিস্ট হাসপাতাল যেখানে রয়েল ফ্যামিলির সদস্যরা চিকিৎসা নিয়ে থাকেন সেই হাসপাতালেও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশী চিকিৎসক কর্মরত আছেন।

তবে ২০০৮ সালের পর সরকারিভাবে আর কোনো বাংলাদেশী চিকিৎসক এ দেশে না আসায় সৌদি আরবে বাংলাদেশী চিকিৎসকদের সংখ্যা দিন দিন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এর কারণ—

১.     অনেকেই এমআরসিপি পাস করে লন্ডন কিংবা আয়ারল্যান্ড চলে যাচ্ছেন।

২.    অনেকে বয়সজনিত কারণে রিটায়ার করে দেশে ফিরে যাচ্ছেন।

৩.    কেউ কেউ ইমিগ্রেশন নিয়ে কানাডা কিংবা আমেরিকা চলে যাচ্ছেন।

৪.     অনেকে বিশেষ করে মহিলা ডাক্তাররা সন্তান বড় হওয়ায় তাদের মানসম্মত শিক্ষার জন্য বাংলাদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে সৌদি আরবে আমাদের বাংলাদেশী চিকিৎসকদের কমিউনিটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আর এর থেকে মুক্তি পেতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিএমডিসি ও বিসিপিএসের সমন্বিত কর্মপ্রচেষ্টা আবশ্যক।

 

ডা. আজাদ হাসান: জিপি (জেনারেল প্র্যাক্টিশনার)

সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়