প্রবাস জীবন বলতেই কষ্টকর। আমি সুখে আছি বলেই যে আর পাঁচজন আমার মতোই আছে তা ভাবতে পারছি না বা ভাবছিও না। কুয়েতে যেসব বাংলাদেশী, শ্রীলংকান বা ইন্ডিয়ান রয়েছেন, তাদের কেউ ড্রাইভার, কেউ দুম্বা রাখে, কেউ গাছ-গাছালিতে পানি দেয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আমাদের দেশে বলে না ফ্রি ভিসা। এ ফ্রি ভিসা বলতে আসলে কোনো ভিসা নেই। আমরা বাইরেই কাজ করি, ফ্রিই কাজ করি কিন্তু প্রতি বছর আকামা করার জন্য একটা টাকা তাদের আমরা দিয়ে থাকি। আমি একজন ড্রাইভার। আমার যে কুয়েতি বাসায় কাজ করার কথা, তাদের ছেলেমেয়েকে মাদ্রাসায় স্কুল-কলেজে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমি আবার দেখা যাচ্ছে যে ওখানকার টাকা দিয়ে আকামা লাগাই, বাইরে কাজ করি। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ আমি করি। এখানে সবাই একরকম সুযোগ-সুবিধা পায় না বা পাওয়া সম্ভবও না। তাছাড়া ফ্রি ভিসা বলতে গেলে এটুকুই যে সেই কফিলকে একটা টাকা দিয়ে বলি যে এ টাকা দেব তোমাদের। তারপর যা ইনকাম করব তা আমার। দ্বিতীয় কথা বলি, ফ্রি ভিসা বলতে কোনো ভিসা নেই, যদি আমার মালিক বলে যে তোমাকে আমি আকামা রাখব না। পাঁচটা মালিক আমি বদল করেছি। এটাকে আমি সুবিধাই বলব যে মালিক ভালো না হলে বদলানো যায়। টাকা দিয়েই সেটা বদল করি। বর্তমানে আমি ফাইবার গ্লাসের টাঙ্কি নিয়ে কাজ করছি। নিজের ব্যবসা আমার। এছাড়া অন্যান্য অনেকে এখানে আছে যাদের কেউ ব্যবসা করছে, কেউ লেবারের কাজ করছে। সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে কুয়েতই সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে আমার কাছে।

আমাদের এখানে একটা বাজার আছে, আমরাই যেটা তৈরি করেছি বিলের ভেতরে। এই এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে মুন্সীগঞ্জ-ময়মনসিংহের লোক বেশি। এখানে হয়তো সব মিলিয়ে ১৫০০ থেকে ২০০০ বাসিন্দা আছে। তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই বাংলাদেশী। সুদানেরও আছে অনেকে। ভারতীয়ও আছে কিছু। বিশেষ করে এ বাজার আমরাই তৈরি করেছি বিলের ভেতর। এখানের হিসেবে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বাংলাদেশী আছে। আহাসাবিয়া, মাহুবুল্লা, অপরায় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশীর বাস। তাছাড়া সব জায়গাতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বাংলাদেশীরা। কুয়েতের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বাংলাদেশী নেই।

এখানে আমরা যারা পুরনো লোক তারা মোটামুটি ভালো আছি, এটা হয়তো অনেককে আসার জন্য উৎসাহিত করে। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে মানুষ মনে করে, কুয়েতে টাকার মান বেশি। সেখানে কষ্ট করে ১০০-১৫০ টাকা রোজগার করলেও তা বাংলাদেশে ৫০ হাজার টাকা হয়ে যাবে। এমন ভাবনা থেকেও এখানে আসার কথা ভাবতে পারে। এখানে আসলে প্রথমত কেউ হয়তো এগ্রিকালচারের ভিসায় আসে, কেউ হয়তো খাদেমগিরি নিয়ে আসে। আমার মতো এভাবেও আসে। অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাইরে ছেড়ে দেয় যে তার ইনকাম সে করবে।

কুয়েতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের বাংলা ভাষা চর্চার কোনো সুযোগ নেই। এখানে এ ধরনের কোনো বাংলাদেশী স্কুল নেই। তবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে। সেখানে হয়তো বাংলাদেশী শিশুরা আছে। সেখানেই বেশির ভাগ বাংলাদেশী সন্তানদের ভর্তি করে। সেখানে পাকিস্তানি, ভারতীয়, বাংলাদেশী শিশুরা পড়াশোনা করে। এর পাশাপাশি বাবা-মার কাছ থেকে যতটুকু বাংলা শিখে ততটুকুই তাদের বাংলাচর্চা।

এখানে মূলত উট ও দুম্বার খাবার বেশি বিক্রি হয়। বাঙালিরা এই কাজ করে বেশি আমাদের বাজারে। কেউ কেউ খুঁটি বিক্রি করে। আবার আমি যেমন পানির ট্যাঙ্কির সঙ্গে জড়িত। আমি পুরনোগুলো কিনি। পরে সেটা রিপেয়ারিং করে রংটং করে বিক্রি করি। সেটা খামারে উট ও দুম্বাকে খাবার খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজন পড়ে। অনেকেই আছেন যারা কাজ করে ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন। নিজেরাই অনেকে এখন ৮-১০-১৫ জন লেবার খাটাচ্ছেন এমনও আছেন। আমি যেমন একটা কাজ করি। শুধু আমার কথা বলছি না, অন্য মানুষের কথাও বলছি। কেউ হয়তো একটা দোকান দিচ্ছে, সেখানে তাদের তিনটা লেবার আছে। সেটা ঘাস বিক্রি করার দোকান হতে পারে। সেসব তো একা করা যায় না। তখন তারা লেবার রাখে। কারো হয়তো ১০টা বা ১৫টা ট্রাক রয়েছে। এই ১৫টা ট্রাকের তারা ১৫টা ড্রাইভার রেখেছে। আমরা এত বড় ব্যবসায়ী না, তার পরও অনেকে আছেন। হয়তো অনেক আগে তারা এখানে এসেছেন।

এখানে এক জায়গায় কেউ থাকে না। যার যেখানে যখন কাজ পড়ছে সে সেখানে যাচ্ছে। যেমন আমি ফ্রি ভিসায় কাজ করছি। সেখানে আজ যদি সিটি করপোরেশন এসে বলে যে এখানে তোমরা ব্যবসা করছ কিন্তু সরকারকে ট্যাক্স দিচ্ছ না, এখান থেকে উঠে যাও, তাহলে আমাদের উঠে যেতে হবে। বিনোদনের কথা বলতে গেলে সবার মধ্যে ক্রিকেট খেলা হয়, ফুটবল খেলা হয়। তবে সেখানে গিয়ে খেলা দেখা বা অংশগ্রহণের সৌভাগ্য আমার হয়নি। এ ধরনের আয়োজন হয়ই বিশেষ করে সেসব জায়গায় যেখানে বাঙালি আছে। এখানে যারা বাংলাদেশী আছে তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে। আমরা বাংলাদেশী, আরেক বাংলাদেশীর সঙ্গে দেখা হলে সৌজন্যমূলক যতটুকু করা দরকার আমরা সেটা করি।

এ দেশেও আপনার সঙ্গে কেউ গিয়ে গিয়ে কথা বলে না। সবাই মনে করে, ওর থেকে আমি বড়, ওর থেকে আমি বড় এমন। মানে কেউ কারো ধার ধারে না। সম্পর্ক তো একদিনে তৈরি হয় না। কিছু মানুষের সঙ্গে অনেকদিন পরিচিতি রয়েছে, আসা-যাওয়া আছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। এ দেশ তো গণতন্ত্রের দেশ না, রাজতন্ত্রের দেশ। তবে ওরা এমনিতে ভালো মানুষ। তাদের ভালো না বলা ভুল হবে। যেমন আমরা বিদেশে আছি। ওরা আমাদের পয়সা কেড়ে নিতে পারে, আমাদের মারতে পারে, আমাদের গালাগালি করতে পারে। হয়তো শতকরা এক-আধজন মানুষ উনিশ-বিশ হতে পারে। প্রত্যেকটা মানুষ তো আর ভালো না, তবে গড়পড়তায় এরা ভালো।

বাঙালিরা যেখানে আছে দোষ-গুণ নিয়েই আছে। তবে এটা বলতে হবে, বিশেষ করে কুয়েতে বাংলাদেশীরা ভালোই আছে। কোথাও সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক ভালো হয় না। এখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জায়গা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। হয়তো একজন এক জায়গায় ব্যবসা করত, পরের দিন আরেকজন সেখানে ব্যবসা করা শুরু করল। তখন ঝামেলা তৈরি হয়। সরকারি জমি নিয়েই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয় বেশি, আবার একসময় গিয়ে তারা মিলেমিশে থাকে। একবার হয়তো কারো সঙ্গে ঝগড়া হলো, পরে আবার মনে করি এটা তো বিদেশ। সত্যি বলতে এখানে ঝগড়া করার সুযোগও নেই। আমি যদি এখন কোনো বাংলাদেশীর সঙ্গেও ঝগড়া করি তাহলে ১০ মিনিটের মধ্যেই পুলিশ চলে আসবে। মানে কোনো ঝুঁকি নেয়াই যাবে না। রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও কে খবর দেয় না দেয়, খবর পাওয়ার আগেই হেলিকপ্টার চলে আসে। এ দেশে ঝগড়া-ফ্যাসাদ করা যায় না। তাছাড়া এ দেশে গণ্ডগোল হবে কী নিয়ে? এখানকার সবকিছুই বাইরের রাষ্ট্র থেকে আসছে। আমরা কিনছি আর খাচ্ছি। কিছু জিনিসে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। যেমন রুটি, সবচেয়ে ছোট পয়সায় এ রুটি পাওয়া যায়। তবে এটুকু বলতে পারি, দেশটির অবস্থা অনেক বেশি প্রতিকূল হলে বিদেশীরা এখানে থাকতেই পারত না।

 

মো. তুরান উদ্দীন: কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশী