এর প্রভাবে দ্রুত রূপান্তর ও সম্প্রসারণ হচ্ছে এয়ার কন্ডিশনারের বাজার। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোয় এখন চাহিদা বাড়ছে পণ্যটির, বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিকে। ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক এসি বাজারে এখন মূল চালকের আসনে উঠে এসেছে এশিয়া-প্যাসিফিক।

মার্কেট ইন্টেলিজেন্স ও বাজার তথ্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বাজার এখন সম্প্রসারণ হচ্ছে বেশ দ্রুতগতিতে। ২০২৫ সাল শেষে এর আকার দাঁড়িয়েছে ১৩৭ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন (১৩ হাজার ৭৩৭ কোটি) ডলারে। এর মধ্যে শুধু এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাজারের মোট আয়তন ছিল ৭২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন (৭ হাজার ২৭৫ কোটি) ডলার। সে অনুযায়ী, এয়ার কন্ডিশনার বাজারে ২০২৫ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের হিস্যা ছিল ৫২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সাল শেষে বিশ্বব্যাপী এসির মোট বাজারের আকার দাঁড়াতে পারে ১৪৫ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন (১৪ হাজার ৫৩৫ কোটি) ডলারে। আর ২০৩৪ সালের মধ্যে তা পৌঁছতে পারে ২৪৫ দশমিক ৬১ বিলিয়ন (২৪ হাজার ৫৬১ কোটি) ডলারে। এ সময় পণ্যটির বাজারে বার্ষিক গড় সম্প্রসারণের চক্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) থাকবে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

সামনের দিনগুলোতেও বৈশ্বিক এসির বাজার সম্প্রসারণে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। চলতি ২০২৬ পঞ্জিকাবর্ষ শেষে এ অঞ্চলে পণ্যটির বাজারের মোট আয়তন দাঁড়াতে পারে ৭৭ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন (৭ হাজার ৭৪৫ কোটি) ডলারে। ২০৩৪ সাল পর্যন্তও এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পূর্বাভাস দিয়েছে ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস। এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বাড়ির মধ্যে প্রবাহিত বায়ুর গুণমান নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক নির্মাণ খাতের উল্লম্ফন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, জীবনধারার পরিবর্তন, নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়কে। এছাড়া এ অঞ্চলের ওপর ঘটে যাওয়া জলবায়ুগত পরিবর্তনজনিত অভিঘাতও এসিকে বিলাসপণ্য থেকে এখন রূপ দিয়েছে প্রয়োজনীয় পণ্যে। ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সমন্বিত স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ, রিমোট সুবিধা, ইনভার্টার প্রযুক্তি ও উচ্চ এসইইআর (SEER) রেটিং ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছে। আবার সরকারি প্রণোদনা ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে জোরারোপও এ প্রবণতাকে শক্তিশালী করছে। বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিকে পণ্যটির বৃহত্তম বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন, যার আকার চলতি বছর শেষে হতে পারে ৫০ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন (৫ হাজার ৪৭ কোটি) ডলার। এছাড়া জাপান ও প্রতিবেশী ভারতে এ বাজারের মোট মূল্যমান দাঁড়াতে পারে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৫১ বিলিয়ন (৯৫১ কোটি) ও ৫ দশমিক ২১ বিলিয়ন (৫২১ কোটি) ডলারে।

বাজার পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে তাপ ও আর্দ্রতার মাত্রা এখন ক্রমেই বাড়ছে। প্রতি বছরই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর বাসিন্দাদের জন্য ভয়াবহ খরতাপ ও অস্বস্তিকর আর্দ্রতা নিয়ে আসছে গ্রীষ্ম মৌসুম। আবার এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যবিত্ত শ্রেণী এখন ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাদের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ছে। আবার প্রযুক্তির উৎকর্ষের সুযোগ ক্রেতাদের জন্য আগের চেয়ে আরো সাশ্রয়ী মূল্যে এসি সরবরাহ করতে পারছে উৎপাদন ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো। ফলে এ অঞ্চলের মধ্যবিত্তরা বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলে স্বস্তিকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসির ওপর আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পরিবেশগত উদ্বেগ ও বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্য সামনে রেখে জ্বালানিসাশ্রয়ী ও স্মার্ট এয়ার কন্ডিশনার কিনছেন তারা। একই সঙ্গে পণ্যের উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ক্রমাগত প্রতিস্থাপনকে ত্বরান্বিত করছে পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চাপ। অফিস থেকে শুরু করে হোটেলসহ বাণিজ্যিক খাতে স্বাস্থ্যসম্মততা, উৎপাদনশীলতা ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়ায় নতুন সিস্টেম স্থাপন ও পুরনো সিস্টেম সংস্কারের প্রবণতা বাড়ছে, যা আগামী বছরগুলোয় এ বাজারের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির নিয়ামক হতে যাচ্ছে।

তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এসি বাজারের কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণে এখনো বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এসি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে বাজার সম্প্রসারণের পথে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। প্রাথমিক ক্রয়মূল্য থেকে শুরু করে এটি স্থাপনে দেয়া ফি, নিয়মিত সার্ভিসিং ব্যয় ও যন্ত্রাংশ বা মেরামতের খরচ—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। মূল্যসংবেদনশীল ভোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসএমই) জন্য এসি স্থাপনের ব্যয় এখনো তুলনামূলক বেশি। আবার জ্বালানির মূল্যও মালিকানা ব্যয়কে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিতে পারে।

এসির বিশ্ববাজারে এখন এশিয়া-প্যাসিফিকের পরই উত্তর আমেরিকার অবস্থান। এ অঞ্চলে পণ্যটির বাজার প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসি বাজারের মোট মূল্যমান ৩৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬৬১ কোটি) ডলারে পৌঁছার পূর্বাভাস রয়েছে।

তৃতীয় স্থানে থাকা ইউরোপে এসির বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। দেশ দুটিতে এসির মোট বাজার চলতি বছর শেষে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন (৩৬৪ কোটি) ও ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন (২৪৫ কোটি) ডলারে পৌঁছতে পারে।

বৈশ্বিক এসি বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। এ বাজারে বৈশ্বিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানের দাইকিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মিৎসুবিশি ইলেকট্রিক করপোরেশন, প্যানাসনিক করপোরেশন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারিয়ার গ্লোবাল করপোরেশন, হোয়ার্লপুল করপোরেশন, চীনের হায়ার স্মার্ট হোম কোম্পানি লিমিটেড, মিডিয়া গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড, জার্মানির রবার্ট বশ জিএমবিএইচ, দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রোনিকস কোম্পানি লিমিটেড ও ভারতের ভল্টাস লিমিটেড।