এটি একটি উন্নয়ন সংকটও বটে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এ বদ্বীপ ভূমি, যার বড় অংশই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব সামান্য উঁচুতে অবস্থিত। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, মৌসুমি বৃষ্টিপাত হয়ে উঠছে অনিয়মিত আর লবণাক্ত পানি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চাষ হওয়া কৃষিজমি।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি পানির নিচে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে এ দেশ অন্যতম। এ বাস্তবতায় জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যবসায়িক লক্ষ্য নয়, বরং জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। সে প্রেক্ষাপটে গত ১৫ বছরে একটি কারখানার পরিবেশগত রূপান্তরের গল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের কালুরঘাট ফ্যাক্টরি ১৯৬৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সাল থেকে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ৩৯ দশমিক ২৫ শতাংশ মালিকানার অংশীদার বাংলাদেশ সরকার, সে সময় কারখানাটি নতুন রাষ্ট্রের উৎপাদন সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো।
বর্তমানে ইউনিলিভার বাংলাদেশের পণ্য ১০টি পরিবারের মধ্যে নয়টি পরিবারে পৌঁছে যায়। এ ব্যাপক উপস্থিতির সঙ্গে আসে বড় দায়িত্বও। সে দায়িত্ববোধ থেকেই ২০১০ সাল থেকে কালুরঘাট ফ্যাক্টরি এনার্জি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ, পানি ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিমাপযোগ্য ও যাচাইকৃত অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

কারখানাভিত্তিক উদ্যোগের পাশাপাশি এটি ইউনিলিভারের দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক দর্শনেরও অংশ, যেখানে টেকসই উন্নয়নকে ব্যবসার মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের পরিচালনা ও জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যেও এ দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০১০ সালের অভ্যন্তরীণ বেজলাইনের তুলনায় গত ১৫ বছরে কালুরঘাট ফ্যাক্টরি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ সময় শক্তি ব্যবহার কমেছে ৩১ শতাংশ, যার মাধ্যমে সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬১ মিলিয়ন গিগাজুল শক্তি। কার্বন নিঃসরণ কমেছে ৩২ শতাংশ, ফলে এড়ানো গেছে প্রায় ৯০ হাজার ৫৬০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ। পানি ব্যবহার কমেছে ৩৩ শতাংশ, যা প্রায় ২ হাজার ৭৬৩ মিলিয়ন লিটার পানি সাশ্রয়ের সমান। একই সঙ্গে বর্জ্য উৎপাদনও বেজলাইনের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

২০১৪ সাল থেকে এ কারখানা থেকে কোনো বর্জ্য ল্যান্ডফিলে পাঠানো হচ্ছে না। এছাড়া ২০২১ সাল থেকে এটি একটি যাচাইকৃত ও নিরীক্ষাযোগ্য ব্যবস্থার আওতায় শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্বীকৃতি ধরে রেখেছে। এগুলো এককালীন সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক উন্নয়নের ফল, যা বজায় রাখা ও আরো এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে কোম্পানির।
এ অগ্রগতি রাতারাতি আসেনি। ধারাবাহিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে খুঁজে দেখা হয়েছে, কোথায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে শক্তি ব্যবহার হচ্ছে, কোথায় দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব এবং কোথায় শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনই কমিয়ে আনা যায়। ধাপে ধাপে ভ্যাকুয়াম সিস্টেম, কুলিং প্রযুক্তি ও হিট রিকভারি ব্যবস্থায় উন্নয়ন এনে কারখানাটির শক্তি ব্যবহার কমানো হয়েছে।
বর্তমানে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের অবশিষ্ট অংশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সনদ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে আরো এক মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার কাজ চলছে, যা কার্বননির্ভর বিদ্যুতের ব্যবহার আরো কমাবে।

পানি ব্যবস্থাপনায়ও একই ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পূর্ণাঙ্গ ফ্লো মিটারিং ব্যবস্থার ফলে বর্তমানে কারখানায় প্রতিদিন কী পরিমাণ পানি কোথায় থেকে ব্যবহার হচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে জানা যাচ্ছে। কনডেনসেট রিকভারি ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ সক্ষমতার সম্প্রসারণ এবং একটি কুলিং লুপ পুনঃসঞ্চালনের মাধ্যমে বার্ষিক বিপুল পরিমাণ পানি নিঃসরণ বন্ধ করা হয়েছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান পানি সংকটের বাস্তবতায় ধারাবাহিক দক্ষতা বাড়ার অংশ।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিছু অবশিষ্ট বর্জ্য বর্তমানে সিমেন্ট কারখানায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক জ্বালানির ব্যবহার কমাতে সহায়তা করছে। প্যাকেজিং ও রাসায়নিক কনটেইনার সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে কারখানার আরো বেশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে।
সংখ্যার বাইরে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা এ অগ্রগতিকে টিকিয়ে রেখেছে। কারখানার পরিবেশগত তথ্য নিয়মিত স্বাধীন মাসিক ডেটা ইন্টেগ্রিটি অডিটের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। পরিচালনা, প্রকৌশল ও অর্থ বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত আন্তঃবিভাগীয় কমিটি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ওয়াটার ম্যাপিং প্রজেক্টের মাধ্যমে কারখানায় প্রবেশ করা প্রতিটি পানির উৎস পর্যবেক্ষণ করা হয়।
টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো আর্থিক ও পরিচালনাগত ফলাফলের পাশাপাশি মূল্যায়ন করা হয়, যা প্রমাণ করে এগুলো কেবল কোনো নির্দিষ্ট বিভাগের লক্ষ্য নয়, বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি হলো পরিবেশগত কার্যকারিতা কেবল ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্টের বিষয় নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অংশ। কারণ পরিবেশগত উন্নয়ন স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে হলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও ধারাবাহিক মনোযোগ প্রয়োজন।
কালুরঘাট ফ্যাক্টরির অভিজ্ঞতা দেখায়, পরিবেশগত দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং একে অন্যকে শক্তিশালী করে। জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা পরিচালন ব্যয় কমায় ও জ্বালানি অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমায়। পানি ব্যবহারে দক্ষতা বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান পানি সংকট মোকাবেলায় সহায়তা করে। বর্জ্য কমানো কাঁচামালের দক্ষ ব্যবহার বাড়ায় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমায়।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা শুধু ব্যবসায়িক সক্ষমতার ওপর নয়, বরং তার পরিচালন পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপরও নির্ভরশীল।
একটি বড় শিল্প-কারখানায় ৩৩ শতাংশ পানি ব্যবহার কমানো সহজ কাজ নয়, বিশেষ করে যখন দেশটি এরই মধ্যেই পানি সংকটে রয়েছে। একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারিতে থাকা একটি দেশে দীর্ঘ সময় ধরে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে রাখা শিল্প খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
তবে এটুকুই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রয়োজন নীতিসহায়তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি। কালুরঘাটের অভিজ্ঞতা দেখায়, ঐতিহ্যগত শিল্প পরিচালনা থেকেও এমন একটি ব্যবস্থায় রূপান্তর সম্ভব, যেখানে পরিবেশগত কার্যকারিতা পরিকল্পিত, পরিমাপযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়। এ অর্জন কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং চলমান একটি প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ যাত্রার গুরুত্ব বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো দ্রুত নগরায়ণশীল এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য একটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, শহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বর্জ্য এখনো সংগ্রহের বাইরে থেকে যায়, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। এ প্রেক্ষাপটে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও ইপসা (ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন) সহযোগিতায় ২০২২ সাল থেকে চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডজুড়ে একটি সমন্বিত প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছে।
উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য হলো প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, উৎসভিত্তিক বর্জ্য পৃথক্করণে উৎসাহ দেয়া, বর্জ্যকর্মীদের জীবিকাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরি করা। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক পুনরুদ্ধার বৃদ্ধি, শক্তিশালী রিসাইক্লিং ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
উদ্যোগের আওতায় ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ হাজার টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সময় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সংগ্রহে আর্থিক প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্জ্যকর্মী ও স্ক্র্যাপ ক্রেতাদের দক্ষতা উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় তিন হাজার বর্জ্যকর্মীকে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২২০ জন স্ক্র্যাপ ক্রেতাকে ব্যবসায়িক সক্ষমতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং দুই হাজারের অধিক সংগ্রহকারীর মধ্যে নিরাপত্তা সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ আয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস ও সঞ্চয়ের অভ্যাস বৃদ্ধিসহ ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন।
সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে ২০২৫ সাল থেকে ১ হাজার ৮২৭ জন অংশগ্রহণকারীকে গ্রুপ স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা হয়েছে, যেখানে দুর্ঘটনা, অক্ষমতা ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। স্ক্র্যাপ ক্রেতাদের আনুষ্ঠানিকীকরণে অগ্রগতি হিসেবে প্রায় ৫০ শতাংশের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে এবং সবারই সক্রিয় ব্যাংক হিসাব রয়েছে।
কমিউনিটি পর্যায়ে ২৫ হাজারের বেশি পরিবারে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, ফলে প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবার বর্জ্য পৃথক্করণ চর্চা করছে। একই সঙ্গে ১১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন রঙের বিন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তরুণদের সম্পৃক্ত করতে ৪১০ সদস্যের স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক গঠন করা হয়েছে এবং ৮০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বোতল ও প্যাকেজিং বর্জ্য ক্রমেই বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে ইউনিলিভার বাংলাদেশ ‘ইউ-রিফিল’ উদ্যোগ চালু করেছে, যার লক্ষ্য পুরনো বোতল বা পাত্র পুনরায় ব্যবহার করে পণ্য রিফিলের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ভোক্তারা নিজেদের ব্যবহৃত খালি বোতল বা পাত্র নিয়ে এসে ডিজিটাল রিফিল মেশিন থেকে সরাসরি শ্যাম্পু, হ্যান্ডওয়াশ ও ডিশওয়াশ লিকুইডের মতো পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন, ফলে নতুন প্লাস্টিক বোতলের প্রয়োজন কমে যায় এবং পুনর্ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
উদ্যোগটির যাত্রা শুরু হয় ২২ জুন ২০২২ সালে, যখন ইউনিলিভার বাংলাদেশ প্রথম পাইলট সংস্করণ চালু করে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘ইউ-রিফিল ২.০’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। আন্তর্জাতিক অংশীদার ট্রান্সফর্ম এবং স্থানীয় অংশীদার ওমনি স্ট্র্যাটেজির সহযোগিতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও নরসিংদীতে ১৫০টি রিফিল মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগ প্লাস্টিক হ্রাস ও পুনর্ব্যবহারভিত্তিক ভোগ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করছে। ব্যবহৃত বোতল ও পাত্র পুনরায় ব্যবহারকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে এটি পরিচালিত হচ্ছে। এটি ইউনিলিভারের বৈশ্বিক ‘রিডিউস, রিইউজ অ্যান্ড রিসাইকেল’ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যৎ ইপিআর (Extended Producer Responsibility) লক্ষ্য ও ভার্জিন প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর প্রচেষ্টাকে সহায়তা করছে।
ভোক্তা সাশ্রয় ও সহজলভ্যতার দিক থেকেও উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নতুন বোতলের খরচ না থাকায় ভোক্তারা সরাসরি মূল্যছাড় পাচ্ছেন। বর্তমানে সানসিল্ক ও লাইফবয় হ্যান্ডওয়াশে প্রায় ১০ শতাংশ, ডাভ শ্যাম্পুতে প্রায় ৯ ও ভিম লিকুইডে প্রায় ৮ শতাংশ সাশ্রয় পাওয়া যাচ্ছে। উদ্যোগটির স্লোগান হলো ‘যতবার ক্রয়, ততবার সাশ্রয়’।
প্রযুক্তি ও খুচরা বিক্রয় মডেলের ক্ষেত্রে ওমনি স্ট্র্যাটেজি তিন ধরনের রিফিল মেশিন তৈরি করেছে, যা এক লিটার, তিন লিটার ও পাঁচ লিটার ধারণক্ষমতার। এগুলো ছোট মুদি দোকান, মাঝারি আকারের বাজার এবং কারখানা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দোকানের উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৫০টি দোকানে পাইলট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যার আওতাভুক্ত এলাকা হিসেবে রয়েছে মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা ও দক্ষিণখান। বিক্রয় ও ব্যবহারসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কাঁচাবাজারের ভেতর বা আশপাশের দোকানগুলোয় ভোক্তার অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি। এসব দোকানে দৈনিক গড় বিক্রি ২৫০ টাকার বেশি, আবাসিক এলাকার দোকানগুলোয় ১০০-২৫০ টাকার মধ্যে এবং ছোট বা গলির দোকানগুলোয় ১০০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ মেশিন স্থাপনের জন্য এ তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সচেতনতা ও পরিবেশগত প্রভাবের ক্ষেত্রে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার মানুষের কাছে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছানো হয়েছে এবং ৭২ কেজির বেশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া থেকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এক হাজার কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য প্রকৃতিতে মিশে যাওয়া প্রতিরোধের লক্ষ্য রয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যে প্রথম ধাপে এক-দেড় হাজার দোকানে এবং দীর্ঘমেয়াদে ৫-১০ হাজার খুচরা দোকানে রিফিল স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে, যার মাধ্যমে একটি বাণিজ্যিকভাবে টেকসই ও সম্প্রসারণযোগ্য রিফিল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।





