এক কলসী ব্যবহারযোগ্য পানি পেতে হাঁটতে হতো মাইলের পর মাইল। বছরের বেশির ভাগ সময়ই পতিত থাকত কৃষিজমি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খুলনা, বাগেরহাটসহ উপকূলঘেঁষা অঞ্চলের মানুষের কাছে চেনা বাস্তবতা অনেকটা এমনই। তবে সময় বদলেছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের করপোরেট দায়িত্বশীলতা (সিএসআর) প্রকল্প ‘অপরাজেয় দেশ’ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য করেছে সুপেয় পানির ব্যবস্থা। পাশাপাশি কৃষকদের দেয়া হচ্ছে জলবায়ুসহনশীল কৃষি ব্যবস্থার ওপর প্রশিক্ষণ, পরিবেশ উপযোগী শস্যবীজ ও আবহাওয়াভিত্তিক তথ্যভিত্তিক সেবা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় ২০২৫ সালে চালু হওয়া এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা ও রামপাল-এ চার উপজেলায়। উদ্যোগের সুবিধা পৌঁছেছে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৬ হাজার কৃষক পরিবারের কাছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো ও জীবিকা সুরক্ষিত করাই ‘ব্র্যাক ব্যাংক অপরাজেয় দেশ’-এর মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে নারীদের অংশগ্রহণ ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে উদ্যোগটি।

অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট মোকাবেলায় প্রকল্পের আওতায় ১৫টি কমিউনিটি স্থাপনা ও ১৮০টি পরিবার পেয়েছে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা। ১৯৫টি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম স্থাপনে একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের জন্য নিরাপদ পানির নতুন উৎস তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সাশ্রয় হচ্ছে সময় ও শ্রম। স্থানীয় জনগণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে এসব ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণও করছে। ফলে নিশ্চিত হচ্ছে উদ্যোগটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব।

পাশাপাশি কৃষিতেও এসেছে বিপ্লবের ছোঁয়া। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কৃষককে জলবায়ুসহনশীল বীজ, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক দেয়া হয়েছে। ৩০টি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে এসব কৃষককে অভিযোজনভিত্তিক চাষাবাদের কৌশলও শেখানো হচ্ছে, যেখানে একসময়ের পতিত জমিতে বছরজুড়ে চাষ হচ্ছে সূর্যমুখী, সরিষা, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি।

g

শুধু উৎপাদনই নয়, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এ প্রকল্পে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে স্থাপন করা হয়েছে তিনটি সৌরচালিত সেচ পাম্প। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি কমছে কার্বন নিঃসরণ। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘‌আমার বন’ উদ্যোগও চালু করা হয়েছে। এর আওতায় ৭৫টি কমিউনিটি ও হোমস্টেড প্লটে পাইলট ভিত্তিতে পরিবেশবান্ধব কৃষি ও কৃষি বনায়ন করা হচ্ছে।

‘ব্র্যাক ব্যাংক অপরাজেয় দেশ’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক কৃষকদের জ্ঞানভিত্তিক সহায়তা দেয়া। অ্যাডাপটেশন ক্লিনিকের মাধ্যমে চার হাজারের বেশি কৃষক ফসলের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ পাচ্ছেন। পাশাপাশি ভয়েস এসএমএসের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও জোয়ার-ভাটার আগাম তথ্য, যা চাষাবাদের পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করছে।

স্থানীয় পর্যায়ে এসব পরিবর্তন শুধু সেখানকার মানুষের উৎপাদনশীলতাই বাড়াচ্ছে না, বরং জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতাও তৈরি করছে। ‘ব্র্যাক ব্যাংক অপরাজেয় দেশ’ সে উদাহরণ তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে আরো বিস্তৃত হয়ে গড়ে তুলতে পারে উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।