ষাটের দশকে পশ্চিমা বিশ্বে একযোগে কয়েকটি কিংবদন্তি ব্যান্ডের উন্মেষ ঘটে। সূচনালগ্নের পর পরই শ্রোতাদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্যান্ডগুলোর গান। এর মধ্যে দ্য বিটলস, দ্য ডোরস, দ্য রোলিং স্টোনস, জ্যাকসন ফাইভ বিশেষ করে তরুণদের মনে স্থান করে নেয়। পশ্চিমা বিশ্বের এ জোয়ার আছড়ে পড়ে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানেও। মূলত এ অঞ্চলে ব্যান্ড তৈরির পেছনে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল মার্কিন ও ব্রিটিশ ব্যান্ডগুলো। 

বলা যায় বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের পরিচয় হয় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের হাত ধরে। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের বসতি গড়ে ওঠে। দেশ বিভাগের পর ঝাঁকে ঝাঁকে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান উপমহাদেশ ত্যাগ করলেও মাটির মায়া ছাড়তে পারেননি অনেকেই। এ বিষয়ে ফিডব্যাকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও কি-বোর্ডিস্ট ফুয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের গান শুনে ক্লাস নাইন-টেন পড়ুয়া বাঙালি ছেলেদের মনেও ব্যান্ড গঠনের ইচ্ছা দানা বাঁধে। তবে সে সময় বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করাটাই ছিল পাহাড়সম প্রতিকূলতা। স্প্যানিশ গিটারের নামই শুনেছিল হাতে গোনা কয়েকজন। বিদেশ থেকে গিটার, কি-বোর্ড কিনে আনতে হতো।’ এক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয়, মূলত ধনিক শ্রেণীর মিশনারি স্কুলের শিক্ষার্থীরাই আধুনিক বাদ্যযন্ত্র কেনার ক্ষমতা রাখত। তাই ব্যান্ড তৈরির ঝোঁক আসে সামাজিক কাঠামোয় উচ্চবিত্ত শ্রেণীর পরিবারগুলো থেকে। আবার বন্দর এলাকা হওয়ার কারণে বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের তীর্থস্থান হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম। দূর দেশ থেকে গিটার, কি-বোর্ড, অ্যাম্পলিফায়ার বয়ে নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড় জমাত জাহাজগুলো। কম দামে সেগুলো কেনার আশায় জাহাজিদের দিকে উন্মুখ হয়ে থাকত ভাবী কিশোর রকস্টাররা। তখন বাদ্যযন্ত্র জোগাড় করা ছিল যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি অনুশীলনের জায়গাও ছিল অপ্রতুল। এখনকার মতো ব্যবসায়িকভাবে প্র্যাকটিস প্যাডগুলোর চল তখনো শুরু হয়নি। ঘরের উঠান, ছাদের ঘর কিংবা গ্যারেজই হয়ে ওঠে অনুশীলনের জায়গা। আবার শুধু বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করলেই তো হলো না, সেগুলো বাজানোর শিক্ষাও চাই। সংগীত গুরুমুখী বিদ্যা। বাংলার প্রথম গুরুজনেরা তখনো কিশোর। বিদেশী ব্যান্ডগুলোর ক্যাসেট জোগাড় করে বারবার গানগুলো শুনে শুনে তা তোলার চেষ্টা করা ছিল কঠিন অধ্যবসায়। কর্ডের গঠন শিখতে ভরসা ছিল ব্রিটিশ কাউন্সিল ও লাইব্রেরির বিভিন্ন বই। তরুণ গিটারিস্টরা বাইবেল জ্ঞান করত ড্যান মরগ্যানের বইকে।

বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের পাট শেষ হলো, কিন্তু বাংলায় ব্যান্ড সংগীত লিখবে কে? ব্যান্ড সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি ঘরানা। ব্যান্ড সংগীতেরও আবার ভিন্ন ভিন্ন ধারার শ্রেণীবিভাগ থাকে। প্রাথমিকভাবে শুরুটা হয় ইংরেজি গান কভার করার মধ্য দিয়েই। ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘আইওলাইটস’। ১৯৬৪ সালে গিটারে ফজলে রব, ড্রামসে শাব্বির ও বেজ গিটার এবং কণ্ঠশিল্পী আলমগীর হক—এ তিন সদস্য মিলে গঠিত হয় আইওলাইটস। এ আলমগীরই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের জনপ্রিয় গায়ক হয়ে ওঠেন। প্রায় একই সময় চট্টগ্রামে পদার্পণ ঘটে জিংগা শিল্পগোষ্ঠীর। জিংগা ছিল মূলত পারিবারিক ঘরানার ব্যান্ড। তিন ভাই-বোন ও বড় ভাইয়ের স্ত্রী মিলে ব্যান্ডটি তৈরি করেন। সেই প্রথম স্বাধীনতার আগেই বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতাঙ্গনে দাপটের সঙ্গে নারীর পদচারণা দেখা যায়। জিংগা ব্যান্ড মূলত টেলিভিশনে শো করত। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেচে নেচে গান পরিবেশন করত জিংগা শিল্পগোষ্ঠী।

আইওলাইটসের সমসাময়িক ব্যান্ড লাইটনিংস, নিউ মেন্ডেজ, বকলম, র্যাম্বলিং স্টোনস স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস তৈরিতে অবদান রাখে। ক্ষুদ্র সামাজিক অনুষ্ঠানের গণ্ডি ভেঙে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ক্লাবেও সংগীত পরিবেশন করতে শুরু করে ব্যান্ডগুলো। যা ছিল একসময় উচ্চবিত্তদের বিলাসিতা, ধীরে ধীরে তা পেশাদারিত্বে পরিণত হয়। বর্তমানে যা কনসার্ট নামে পরিচিত, আগে সে অনুষ্ঠানগুলোকে বলা হতো পপ শো। ড্যাফোডিল হোটেল, লেডিজ ক্লাবে এ পপ শোগুলোর আয়োজন করা হতো। আসাদগেটের ডিম্পল রেস্তোরাঁয় বসত গানের জলসা। ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টালে বল ডান্সের সঙ্গে চলত ব্যান্ড সংগীত। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে পপ শোগুলো থেকে আয় করে আইওলাইটসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দাঁড়ায় ২৭ হাজার টাকা। পাশাপাশি ব্যান্ড সংগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো পাকিস্তান টেলিভিশনে (বর্তমান বিটিভি)। পাকিস্তান টেলিভিশনের আবির্ভাব ব্যান্ড সংগীত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তখনো গান রেকর্ড করে অ্যালবাম তৈরির প্রচলন শুরু হয়নি। আবার পপ শো দেখতে টাকা চাই। পাকিস্তান টেলিভিশনের আবির্ভাবে ব্যান্ড সংগীত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জর্জ হ্যারিসন, রবি শংকরসহ মহারথী শিল্পীরা ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামে অনুদান কনসার্টের আয়োজন করেন। পরবর্তী সমেয় এ কনসার্ট হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশী শিল্পীদের ব্যান্ড গঠনের নতুন অনুপ্রেরণা। এদিকে যুদ্ধ শেষে অস্ত্র ফেলে আবারো বাদ্যযন্ত্র হাতে তুলে নেন শিল্পীরা। ১৯৭২ সালে তৈরি হয় ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। আজম খানের কণ্ঠে দুর্দান্ত সংগীত আয়োজনে উচ্চারণ ব্যান্ডটিকে পপ সংগীতের পুরোধা বলা হয়। এ ব্যান্ডের গিটারিস্ট ছিলেন নয়ন মুন্সী। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত গিটারিস্ট। নয়ন মুন্সীকে দেখেই পরবর্তী সময়ে গিটার হাতে তুলে নেন আইয়ুব বাচ্চু। ইংরেজি গান কভারের বদলে তখন বাংলায় ব্যান্ড সংগীত লেখার নতুন এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়। ব্যান্ড সংগীত তরুণ প্রজন্মের এক উন্মাদনায় পরিণত হয় সত্তরের দশকে। এ সময় নাইনটি নাইন, স্পন্দন, আগলি ফেসেস, সুরেলা বিভিন্ন ব্যান্ড তৈরি হয়। এ সুরেলা ব্যান্ডই পরবর্তী সময়ে সোলস নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

শিল্পে রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটের দৃশ্যায়ন অপরিহার্য না হলেও তা নিজের সমসাময়িক বাস্তবতা তুলে ধরার একটি মাধ্যম বটে। মুক্তিযুদ্ধকালে গান যেমন ছিল যুদ্ধের অনুপ্রেরণা, তেমনি স্বাধীনতার পর ব্যান্ড সংগীতে সমাজের নানা সংকটও উঠে আসে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সর্বোপরি তারুণ্যের নিরাশাই হয়ে ওঠে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের উপজীব্য। নিছক রোমান্টিসিজম বাদ দিয়ে বাস্তবতার কশাঘাত করা হয় গানে। তরুণ শ্রোতাদের বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগের কারণে বাংলা ব্যান্ড বিস্তার লাভ করে। গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল সারগাম প্রডাকশন হাউজের। সারগামের কর্ণধার বাদল শিল্পীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অ্যালবাম আকারে গান বের করার তাগিদ দিতেন।

তবে অন্য দিকও ছিল। ব্যান্ড সংগীতের জনপ্রিয়তা যেমন ছিল আকাশচুম্বী, তেমনি সমালোচনার শূলেও চড়তে হয় শিল্পীদের। ব্যান্ড সংগীতকে অপসংস্কৃতি বলে প্রচার করতে শুরু করে রক্ষণশীল এক গোষ্ঠী। তবে বরাবরই তরুণদের কাছে ব্যান্ড সংগীতের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ছিল। ব্যান্ড গঠনে আরো আগ্রহী হয়ে ওঠে তরুণরা। ১৯৭৬ সালে আল্ট্রা-সনিকস ভেঙে তৈরি হয় জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিডব্যাক। ১৯৭৭-৮৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়মিত শো করে ব্যান্ডটি। ফিডব্যাকের গানগুলোয় ব্যাপকভাবে পশ্চিমা প্রভাব ছিল। অথচ গানগুলো ছিল একেবারেই বাংলাদেশের বাস্তবতার। অ্যালবাম বের হওয়ার আগেই মানুষের মুখে মুখে শোনা যায় মৌসুমি, জানালা, চিঠি, মেলা। ফুয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘একবার এক কনসার্টে মেলা গান শুরু করতেই শত শত শ্রোতা গানটি গাইতে শুরু করে। অথচ তখনো গানটি প্রকাশিতই হয়নি। শুধু টিভিতে শুনে শুনে শ্রোতারা সে গান কণ্ঠস্থ করে ফেলেছিল।’

সত্তরের দশকে আরো একটি ব্যান্ড তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে বাংলার সর্বকালের সেরা দুই রকস্টারের আঁতুর ঘর। ফিলিংস নামের এ ব্যান্ড বাংলা ব্যান্ড জগতে গণজোয়ার তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে এ ব্যান্ডের নামকরণ হয় নগরবাউল। চট্টগ্রামে নিয়মিত কনসার্ট করত ফিলিংস। সে সময় ফারুক মাহফুজ আনাম নামে এক কিশোরের গিটারের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ফিলিংসে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানান মনসুর। ঘরছাড়া ছেলেটি নাম বদলে জেমস পরিচয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। নব্বইয়ের দশকে ফিলিংসে বেজ গিটারিস্ট হিসেবে যোগ দেন আর এক ভবিষ্যতের রকস্টার, সুমন। বেজ গিটারের অভাবে অ্যাকুইস্টিক গিটারের দুই তার খুলে চার তারে বেজ বাজাতেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘বেজবাবা’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।

বাংলা ব্যান্ড জগতে সংগীত নিয়ে নিরীক্ষামূলক কাজের কৃতিত্ব দিতে হয় মাইলসকে। লাইটনিংস ব্যান্ডের ফরিদ রশিদসহ মুসা, ল্যারী, কামাল, রবিন, ম্যান্ডিজ ও হ্যাপি আখান্দ মিলে ব্যান্ডটি তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে মাইলসে যোগ দেন সুরকার কমল দাশগুপ্ত ও নজরুলগীতিশিল্পী ফিরোজা বেগমের দুই সন্তান শাফিন আহমেদ ও হামিন আহমেদ। রক ও পপ ধারার বাংলা গানে লাতিন সংগীতের ফিউশনে অনবদ্য গান তৈরি করেছে মাইলস।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যন্ত্র ফেলে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন শিল্পীরা। যুদ্ধের পর বিভিন্ন দুর্যোগকালে সামাজিক দায়িত্ববোধ আবারো জেগে ওঠে শিল্পীদের ভেতর। ১৯৮৭ সালের মহাপ্লাবনে ভেসে যায় দেশের ৪০ শতাংশ ভূমি। মানুষের দুর্দশা দূর করতে ঐক্যবদ্ধ হয় ব্যান্ডগুলো। সমসাময়িক সেরা ব্যান্ডগুলো মিলে শেরাটন হোটেলে তিন দিনব্যাপী একটি অনুদান কনসার্ট আয়োজন করে। এখান থেকেই জন্ম হয় বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা)। হাজারো বাংলা ব্যান্ডভক্ত তিন দিনব্যাপী এ কনসার্ট প্রত্যক্ষ করেন। কনসার্ট থেকে আড়াই লাখ টাকা তহবিল সংগ্রহ করা হয়। পরের বছর আবারো একটি দুই দিনব্যাপী অনুদান কনসার্টের আয়োজন করে বামবা। বর্তমান স্বনামধন্য প্রায় সব ব্যান্ডই বামবার সদস্য। বামবা নিয়ে পরিকল্পনা ছিল অনেক। অনুদান কনসার্টসহ বাংলাদেশে মিউজিক স্কুল প্রতিষ্ঠাও ছিল পরিকল্পনার অংশ। তবে এখনো সচরাচর কিছু কনসার্টের আয়োজন করলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী খুব একটা অগ্রসর হতে পারেনি বামবা।

নব্বইয়ের দশকে বাংলা ব্যান্ড সংগীত নতুন দিশা খুঁজে পায়। পশ্চিমা বিশ্বের ব্যান্ডগুলো তখন নিজস্ব এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সেগুলো বাংলা গানে ব্যবহার করলে কতটা শ্রোতাপ্রিয় হবে তা নিয়ে আশঙ্কা ছিল। ধীরে ধীরে পশ্চিমা সফট রক, ব্লুজ থেকে শুরু করে হার্ডরকও প্রবেশ করে বাংলা ব্যান্ড গানে। নব্বইয়ের দশকে আত্মপ্রকাশ করে লাভ রানস ব্লাইন্ড (এলআরবি), ডিফারেন্ট টাচ, আর্ক, ওয়ারফেজ, মেটালমেজ, রকস্ট্রাটা, শিরোনামহীন। তরুণদের মুখে মুখে শোনা যেত ব্যান্ডগুলোর গানের ছত্র। এলআরবির আইয়ুব বাচ্চুর কনসার্ট দেখে গিটার তরুণদের ফ্যাশনে পরিণত হয়। বলা হয়, বাঘা বাঘা শিল্পীর পৃষ্ঠপোষক ওয়ারফেজ। ওয়ারফেজ থেকে বেরিয়ে এসে অনেক কিংবদন্তি নতুন ব্যান্ড তৈরি করে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ব্যান্ড অর্থহীন। ফিলিংসের সেই কিশোর সুমন অর্থহীনের মূল হোতা।

মূলধারায় যখন একের পর ব্যান্ডগুলো জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছে, তখন অন্যদিকে দানা বাঁধছে এক নীরব আন্দোলন। ব্যান্ড জগতে আবির্ভূত হয় আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের। আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডগোষ্ঠী আদতে একটি পৃথক কালচার, যা পশ্চিমের হাওয়ায় এ দেশেও তৈরি হয়। আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের উপস্থিতি আরো আগে থেকেই ছিল, তবে ধীরে ধীরে তাদের অবস্থান আরো পোক্ত হতে থাকে। মূলত কয়েকটি ব্যান্ড মিলে নির্দিষ্ট পরিসরে কনসার্ট আয়োজন করত। রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে প্রায়ই এ কনসার্টগুলো আয়োজন করা হতো। এ ব্যান্ডগুলো নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করতে শুরু করে। আশির দশকে বিশ্বে তখন তোলপাড় তৈরি করছে ব্রিটিশ রক ব্যান্ড কুইন। আন্তর্জাতিক ট্যুর করে বেড়াচ্ছে আইরন মেইডেন। বিশ্বাঙ্গনে মেটাল ধারার তরঙ্গ শ্রোতাদের নাড়া দেয়। মার্কিন ব্যান্ড মেটালিকার ‘মাস্টার অব পাপেটস’-এর তালে মাথা দোলাচ্ছে শ্রোতারা। সে স্রোত এসে আছড়ে পড়ে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড জগতেও। আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড থেকেই পরবর্তী সময়ে মূলধারায় তুমুল জনপ্রিয়তা পায় প্রোগ্রেসিভ রক ব্যান্ড আর্টসেল। অ্যালবাম প্রকাশের আগেই তরুণ দলের উন্মাদনা তৈরি হয় আর্টসেলকে ঘিরে। আর্টসেলের গানে প্রোগ্রেসিভ রক ধারার বাংলা স্বকীয় রিফ বেজে ওঠে। এছাড়া আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে আর্বোভাইরাস, নেমেসিস ব্যান্ড পরবর্তী সময়ে মূলধারায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।

একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগে ব্যান্ড জগতেও। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র মধ্যবিত্তের নাগালে আসে। কনসার্টগুলো হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক। বদলায় রেকর্ডের ধরন। শ্রোতারা অনলাইনমুখী হয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে অ্যালবাম আকারে ক্যাসেট বা সিডি প্রকাশ করার চেয়ে একক গান বের করার প্রতি মনোযোগ বাড়ায় ব্যান্ডগুলো। বাংলা ব্যান্ড সংগীত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তৃতি লাভ করে। বিশ্ব ট্যুর করে বেড়ায় বাংলাদেশী ব্যান্ড। শ্রোতা চাহিদা বাড়ায় শিল্প এখন অনেক বেশি বাণিজ্যিক হয়ে পড়েছে। একসময় গত্বাঁধা নিয়ম ভেঙে বাংলা গান গঠনে নতুন ধারা প্রবর্তনের মাধ্যমে যাত্রা করেছিল ব্যান্ড। পরিবর্তনই শিল্পের ধর্ম। বর্তমানে পুরনো প্যাটার্নেরই চর্বিত চর্বণের প্রতিধ্বনি শোনা যায় গানগুলোয়। তবে এখনো কিছু মুষ্টিমেয় ব্যান্ড নিজস্ব নিরীক্ষামূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে চিরকুট, জলের গান, শিরোনামহীন, সহজিয়ার নাম। কখনো সাইকেডেলিক রক বা কখনো ফোক আন্দাজে পরিবেশন করা হচ্ছে একের পর এক গান। প্রতিটি ব্যান্ডের নিজস্ব সুরের ধরন, গানের গঠন ও নিজস্ব সাউন্ড। ভবিষ্যতে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের বিকাশে এ ব্যান্ডগুলোই দক্ষ কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করবে।