নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। সে সময় মাধ্যম বলতে ছিল কেবল বাংলাদেশ টেলিভিশন। সময়ের পরিবর্তনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি ঈদের বিশেষ নাটক নির্মাণে মন দেয় অন্য টেলিভিশনগুলো। বর্তমান সময়ের এ ধারা বজায় রয়েছে। ঈদ এলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নাটক পাড়া। একের পর এক নাটকের শুটিংয়ে মুখর থাকে শুটিং হাউজগুলো। এ ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়েছে ডিজিটাল মাধ্যমগুলোর জনপ্রিয়তায়। ইউটিউব ও ওটিটি প্লাটফর্মগুলোয়ও থাকে ঈদকে ঘিরে বিশেষ নাটক।

ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল আর ডিজিটাল দুনিয়ায় থাকে নানা অনুষ্ঠান। এবারো এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বরং কভিডের সব বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হয়ে নাটক, টেলিফিল্ম, ধারাবাহিক নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে। টেলিভিশন চ্যানেলের পাশাপাশি ওটিটি প্লাটফর্ম ও ইউটিউব চ্যানেলগুলোও নিজের মতো কাজ করছে। ঈদ নাটক নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন পরিচালক ও তারকারা।

ঈদের নাটক নির্মাণের বিষয়ে জানতে কথা হয় খ্যাতিমান নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা বৃন্দাবন দাসের সঙ্গে। প্রতি বছর ঈদে তার পরিচালনায় অনেক নাটক দেখতে পান দর্শক। এ বছরের আয়োজন নিয়ে জানতে চাইলে বৃন্দাবন দাস বলেন, ‘‘এবার ঈদে একটি সাত খণ্ডের নাটক আসছে। এছাড়া দুটি এক পর্বের নাটক থাকছে। এর মধ্য ‘হারাধনের একটি বাগান’ এক পর্বের নাটক। নাটকটি পরিচালনা করছেন সালাহউদ্দিন লাভলু। চ্যানেল আইতে প্রচার করা হবে নাটকটি। গাজী টিভির জন্য করা হয়েছে ‘সুশীল ফ্যামিলি’। সাত খণ্ডের ‘পিকচারম্যান’ নাটকটি প্রচার হবে মাছরাঙা টেলিভিশনের পর্দায়। এ নাটকগুলোয় অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, শাহনাজ খুশি, গোলাম ফরিদা ছন্দা, আশরাফ রবি, দিব্য জ্যোতি, সৌম্য জ্যোতি, শৈশব রোদ্দুর শুদ্ধ, জসিম প্রমুখ। পর্দায় আমাকেও দেখতে পাবেন দর্শক। আমার সব একক নাটকের কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছি।” ‘সুশীল ফ্যামিলি’ নাটকটিতে অভিনয় করেছেন বৃন্দাবন দাসের ছেলে দিব্য জ্যোতি ও সৌম্য জ্যোতি। এ নিয়ে নির্মাতা বলেন, ‘বাবা হিসেবে বিষয়টা আনন্দের ও ভালো লাগার। ছেলেদের অভিনয় দেখে মানুষ যখন প্রশংসা করে, তখন বেশি ভালো লাগে। ওরা যা-ই করুক ভালোবাসা নিয়ে কাজ করুক।’

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় পরিচালক মাবরুর রশিদ বান্নাহ। ঈদ নাটকের প্রস্তুতি নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন এ নির্মাতা। বান্নাহ জানান, এবার ঈদে সম মিলিয়ে কমবেশি ১৫টি নাটক নির্মাণ করেছি। এ মুহূর্তে সঠিক সংখ্যাটি বলতে পারছি না। আশা করছি সবগুলো কাজ দর্শকের ভালো লাগবে। এখনো কিছু নাটকের শুটিং বাকি। ঈদ নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে দর্শকের চাহিদা মাথায় রেখে কাজ করি। এবার কিছু কাজ আসবে, যেগুলো একদম নিজের জন্য নিজের মতো করে করা। এবার ঈদে রোমান্টিক নাটকের বাইরেও অনেক কাজ করা হয়েছে। এবার থ্রিলার, হরর, সায়েন্স ফিকশন। এবারের সব কাজ করা হয়েছে টেলিভিশনের জন্য।

পরিচালক রাফাত মজুমদার রিংকু বলেন, ঈদে বেশকিছু নাটকে কাজ করেছি। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য নাটক নির্মাণ করেছি। এছাড়া সিএমভির ইউটিউব চ্যানেলের জন্য দুটি নাটক নির্মাণ করেছি। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় তারকাদের দেখা যাবে নাটকগুলোয়।

প্রতি বছর ঈদের নাটক মানেই দর্শক মুখিয়ে থাকেন তাদের প্রিয় তারকার কাজ দেখার জন্য। তাই তারকাদের ব্যস্ততাও বেড়ে যায় ঈদ আসতেই। ঈদের দুদিন আগেও তাদের কাজ করতে হয় শুটিং সেটে।

জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী নাদিয়া আহমেদ। মডেলিংয়ের জগতেও রয়েছে তার বিচরণ। ঈদের নাটকের কাজের ফাঁকে কথা বলেন এ অভিনেত্রী। নাদিয়া আহমেদ জানান, ‘এবার নাটকের কাজ কম করেছি। খুব বেশি সময় বের করতে পারিনি, কারণ আমার যে সিরিয়ালগুলো ছিল সেসবের শুটিং করেছি। এর পরও কমবেশি পাঁচ-ছয়টা নাটকে অভিনয় করেছি। এর একটি আছে টেলিফিল্ম। কিছু নাচের প্রোগ্রামে দর্শক আমাকে দেখতে পাবেন। এবারই প্রথম বিটিভির আনন্দ মেলায় উপস্থাপনা করেছি।’

প্রতি ঈদেই একাধিক নাটকে দেখা যায় জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা তাহসান খানকে। যেকোনো উৎসব উপলক্ষেই এ তারকার নাটক আসে। কারণ দর্শক চাহিদা। এবারের ঈদকে কেন্দ্র করেও দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না এ অভিনেতা। তাহসান খান জানান, ‘বর্তমানে খুব ব্যস্ত সময় পার করছি। প্রতিদিন রাতেই প্রায় ১টা পর্যন্ত নাটকের শুটিং করতে হচ্ছে।’

একটা সময়ে ঈদে খ্যাতিমান নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ আর আমজাদ হোসেনের নাটকের জন্য রীতিমতো অপেক্ষা ছিল। বর্তমানেও জনপ্রিয় নির্মাতাদের কাজ দেখতে মুখিয়ে থাকেন দর্শক। দর্শকের কথা মাথায় রেখে তাই টেলিভিশন চ্যানেলগুলো পাঁচ-সাত দিনব্যাপী ঈদের বিশেষ আয়োজনে সাজায় টেলিভিশনের পর্দা। ডিজিটাল মাধ্যমগুলোয় চলে দর্শককে বিনোদন দেয়ার পালা।

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিএমভিতে আসতে চলেছে ঈদের অনেক নাটক। সিএমভির পক্ষ থেকে জানা যায়, এবার ঈদ উপলক্ষে তাদের ১৫টি এক পর্বের নাটক নির্মাণ হচ্ছে। দেশের জনপ্রিয় তারকারা অভিনয় করেছেন এ নাটকগুলোয়। এর মধ্যে ‘লাস্ট লাভ’ নাটকে দেখা যাবে মুশফিক আর ফারহান ও তাসনিয়া ফারিণকে। এছাড়া নির্মাতা জাকারিয়া সৌখিন তৈরি করছেন ঈদের নাটক ‘ওয়েডিং ক্রাশ’। এতে তানজিন তিশার সঙ্গে অভিনয় করছেন ফারহান।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দর্শকের জন্য নানা আয়োজনের পসরা সাজিয়ে বসে ঈদ এলেই। জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল আই সূত্রে জানা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে তারা ঈদের আগের দিন রাত থেকেই রেখেছেন ঈদ নাটকের আয়োজন—চলবে ঈদের অষ্টম দিন পর্যন্ত। চ্যানেল আইয়ের পর্দায় ঈদে থাকছে ১০টি টেলিফিল্ম ও ১৫টি নাটক। আফরান নিশো, জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, নাজনীন চুমকি, বৃন্দাবন দাস, শাহনাজ খুশি, মেহজাবিন চৌধুরী, শবনম ফারিয়া, ইরফান সাজ্জাদ, সাফা কবির, মৌসুমী হামিদ প্রমুখ গুণী তারকাদের নাটক থাকছে চ্যানেল আইয়ের ঈদ আয়োজনে।

দীপ্ত টিভির পাবলিক রিলেশন অফিসার জাকিয়া সুলতানা জানান, প্রতি বছরের মতো এবার ঈদের সাতদিন থাকবে বিশেষ আয়োজন। এর মধ্য থাকছে ১৪টি একক নাটক। প্রতিদিন দুটি করে নাটক প্রচার হবে। এছাড়া শর্ট ফিল্ম থাকছে ২১টি। মোশাররফ করিম, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, তাসনিয়া তানহা, সেমন্তী সৌমির মতো জনপ্রিয় তারকারা অভিনয় করেছেন এ নাটকগুলোয়।

এনটিভির সহকারী ব্যবস্থাপক, প্রোগ্রাম ও কমিউনিকেশন অফিসার সাইফুল ইসলাম জানান, ঈদের সাতদিন থাকবে এনটিভির বিশেষ আয়োজন। একাধিক একক ও ধারাবাহিক নাটকে রয়েছেন মোশাররফ করিম, সালাহউদ্দিন লাভলু, সারিকা সাবা, মাইমুনা মম, রোবেনা রেজা জুঁই, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, সাবিলা নুর, তানজিন তিশার মতো জনপ্রিয় অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা।

বৈশাখী টেলিভিশনের পর্দায় থাকছে ঈদে সাতটি একক ও পাঁচটি ধারাবাহিক নাটক। এ নাটকগুলোয় জাহিদ হাসান, অপর্ণা, সজল, রাশেদ সীমান্ত প্রমুখকে দেখা যাবে।

ঈদের সাতদিন দর্শকের জন্য থাকছে মাছরাঙা টেলিভিশনে নানা আয়োজন। এর মধ্য রয়েছে একাধিক ধারাবাহিক ও একক নাটক। এছাড়া রয়েছে বিশেষ টেলিফিল্ম।

১৯৬৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরীর একতলা দোতলা নাটকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ প্রথম বাংলায় টেলিভিশন নাটক উপভোগ করেছিল। নাটকটি সে সময়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সময়ের পরিবর্তন হলেও বাংলা নাটকের আবেদন কমে যায়নি। তাই বছরজুড়েই নাটক নির্মাণ হলেও ঈদের সময় এলে নতুন নাটকের হিড়িক লেগে যায়। এর মূল কারণ দর্শকের চাহিদা আর অবসর। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশের নির্মিত নাটকগুলো সহজেই দেখা যাচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। তাই ঈদের নাটক নিয়ে নির্মাতা, তারকা ও দর্শক উভয় পক্ষের মধ্যেই চলে উসবের আমেজ।