পিকেএসএফ মূলত এ খাতেই কাজ করে এবং স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। বর্তমানে আমরা নীতিগত পর্যায়ে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ (সিএমই) এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতকে পৃথকভাবে বিবেচনার পক্ষে পলিসি অ্যাডভোকেসি করছি। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে সিএমএসএমই খাতকে একসঙ্গে বিবেচনা করলেও বাস্তবে এ দুটি ভিন্ন ধরনের বাজারে কাজ করে এবং তাদের চ্যালেঞ্জও ভিন্ন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে বলে আমরা জানি।
বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে সিএমই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাতের ভূমিকা বড় হলেও (প্রায় ৫৪%) কর্মসংস্থানের মান এবং উদ্যোগের সম্প্রসারণ নিয়ে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তারা প্রযুক্তি, দক্ষতা, বাজার সংযোগ এবং তথ্যপ্রাপ্তির অসমতার মতো নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। ফলে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতকে একটি বৃহত্তর ভ্যালু চেইনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে হবে। কারণ এ খাতের সঙ্গে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের সংযোগ (ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) রয়েছে। তাই শুধু অর্থায়ন নয়, ভ্যালু চেইনের বিভিন্ন স্তরে প্রয়োজনীয় ইন্টারভেনশন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এসব উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিতভাবে সম্প্রসারিত হবে না এবং বিশ্ববাজারে প্রবেশের যে দূরাভিসারী স্বপ্ন রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সিএমই খাতকে শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত হিসেবে নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন এবং বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্যতম সম্ভাবনাময় গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অর্থায়নের বাইরে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাজার সংযোগে পিকেএসএফ কী ভূমিকা রাখছে?
পিকেএসএফ শুধু অর্থায়নই করে না; উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজার সংযোগ সৃষ্টি এবং ব্যবসার টেকসই উন্নয়নের জন্যও কাজ করে। বিশেষায়িত প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে পিকেএসএফ পুরো ভ্যালু চেইনজুড়ে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করে। এক্ষেত্রে পিকেএসএফ ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং পদ্ধতিতে কাজ করছে। অর্থাৎ ঋণের সঙ্গে অনুদান, কারিগরি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভ্যালু চেইনে প্রয়োজনীয় ইন্টারভেনশনের সমন্বয় করা হয়। বিভিন্ন বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা শুধু অর্থায়নই পান না, বরং ব্যবসা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবাও পান।
দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
প্রকল্পসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়, বাজারজাত কৌশল, ব্র্যান্ডিং, মানসম্মত ও সার্টিফায়েড পণ্য উৎপাদন, সার্টিফিকেশন এবং বাজার সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
পিকেএসএফের অভিজ্ঞতা হলো অর্থায়নের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অ-আর্থিক সেবার সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, বাজার সংযোগ, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা তৈরি এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই পিকেএসএফ অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের এবং ভ্যালু চেইনের সামগ্রিক সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
পিকেএসএফের এ অভিজ্ঞতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা পিকেএসএফের ভ্যালু চেইন ইন্টারভেনশন কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন এবং এ অভিজ্ঞতা থেকে শেখার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সংকট কী বলে মনে করেন?
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো তারা একটি স্থবিরতার দুষ্টচক্রে আটকে আছেন। অর্থনীতির ভাষায় একে লো ইকুইলিব্রিয়াম ট্র্যাপ বলা হয়। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়, দীর্ঘদিন ধরেই এ পরিস্থিতি বিদ্যমান। শুধু ঋণ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; অর্থায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন বিভিন্ন ধরনের অ-আর্থিক সহায়তা এবং অনুকূল সামষ্টিক আবহ।
বর্তমানে এ খাতে অর্থায়নের অধিকাংশ ব্যবস্থাই ঋণনির্ভর। কিন্তু বিদ্যমান সুদের হার ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতকে বড় পরিসরে উন্নীত করার জন্য যথেষ্ট সহায়ক নয় কারণ নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তি বা বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদেরই প্রায় পুরো ঝুঁকি বহন করতে হয়। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখান। এ কারণে অনেক উদ্যোক্তা তুলনামূলক কম মুনাফার হলেও কম ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বেছে নেন। ফলে তাদের আয় কিছুটা বাড়লেও সেই অতিরিক্ত আয় প্রয়োজনীয় মূলধন গঠনে (ক্যাপিটাল ফরমেশন) বা ব্যবসা সম্প্রসারণে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারে না। অর্থাৎ আয় বাড়লেও তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনে রূপান্তরিত হয় না।
এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের আরো বেশি মূল্য সংযোজনভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করতে হবে। নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা উচ্চমূল্যের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি সামষ্টিক উন্নতি সাধিত হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মূল্য সংযোজন সৃষ্টি করা, যাতে সামগ্রিক অর্থনীতির আকার বড় হয় এবং নতুন সুযোগ তৈরি হয়। এজন্য দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ভ্যালু চেইনের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরিতে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু অর্থায়ন নয়, দেশজ ধাঁচে ইনকিউবেশন সাপোর্ট, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ, বাজার সংযোগ এবং সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি খাতের উন্নয়নে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করে। বাংলাদেশে এ সমন্বয়ের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। একটি উদ্যোগকে সফল করতে স্থানীয় সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সংস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ দ্রুত একটি সফল উদ্যোগ গড়ে তুলতে একসঙ্গে ছয়-সাতটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো এলাকায় স্ট্রিট ফুড, হস্তশিল্প বা টেরাকোটাকেন্দ্রিক একটি পর্যটন হাব গড়ে তুলতে চাইলে শুধু অর্থায়ন করলেই হবে না। স্থানীয় সরকার কর্তৃক জায়গা বরাদ্দ, সংশ্লিষ্ট এজেন্সি কর্তৃক বিদ্যুৎ সংযোগ, আইন-শৃঙ্খলা সহায়তা, প্রশিক্ষণ, ট্রেড লাইসেন্স, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হয়। একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ সফল করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে কাজ করে। ফলে সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থায়নের পাশাপাশি এ সমন্বয় ঘাটতি দূর করাও ক্ষেত্রবিশেষে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য পিকেএসএফের বিশেষ উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে?
বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা বিবেচনায় দেশের উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশই তুলনামূলকভাবে তরুণ। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পিকেএসএফ বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রেইজ প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণভাবে উদ্যোক্তাদের গড় বয়স ৩৪-৩৫ বছরের মধ্যে হলেও রেইজ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ২০-২১ বছর।
পিকেএসএফের অর্থায়ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত সদস্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি নারী। একইভাবে উদ্যোক্তাদের মধ্যেও নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৭০ শতাংশ। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবসা পরিচালনায় নারীদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ২২ শতাংশ নারী সরাসরি ব্যবসা তদারকি ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত, যা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আমাদের দেশের পারিবারিক ব্যবসাগুলোতে নারীদের ভূমিকা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সামনে থেকে ব্যবসা পরিচালনা না করলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কারণে পরিবারের পুরুষ সদস্য অনুপস্থিত থাকলে নারীরা দ্রুত ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন এবং সফলভাবে ব্যবসার হাল ধরেন।
পশ্চিমা বিশ্বে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নটি অনেক সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের দেশে পারিবারিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী ও পুরুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যৌথভাবে কাজ করে। ফলে নারীদের অবদান সবসময় দৃশ্যমান না হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্রমেই আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আমাদের বিশ্বাস, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান নারী উদ্যোক্তা সম্প্রদায়কে যথাযথ দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বাজার সংযোগের সুযোগ দেয়া গেলে তারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারবেন।
ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে এমএসএমই খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করার পরিকল্পনা কী?
আমরা চাই ডিজিটাল প্রযুক্তিকে এ খাতের উন্নয়নে আরো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক আচরণ, লেনদেনের ধরন এবং আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিভিন্ন প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ক্রেডিট স্কোরের ভিত্তিতে একজন উদ্যোক্তার ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা এবং ব্যবসার লাভজনকতা মূল্যায়ন করা যাবে। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উদ্যোক্তা নিজস্ব ডিভাইস থেকেই প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। একপর্যায়ে বিষয়টি এমন অবস্থায় পৌঁছতে পারে, যেখানে উদ্যোক্তা নিজেই ডিজিটাল প্লাটফর্মে ঋণ অনুমোদনের (‘আমার ঋণ আমি অনুমোদন করি’) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।
যদি ব্যবসা ডিজিটাল মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং সব লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়, তাহলে উদ্যোক্তার আর্থিক তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। তার ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি এবং লেনদেনের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে ক্রেডিট স্কোর নির্ধারণ করা যাবে। এর মাধ্যমে সক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণের সীমাও বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন পরোক্ষ বা বিকল্প সূচকের (প্রক্সি ইনডিকেটর) ভিত্তিতে উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি মূল্যায়নের চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু এসব সূচক সবসময় বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরে না। ডিজিটাল ফাইন্যান্সিংয়ের প্রসার ঘটলে তথ্যভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি হবে এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন অনেক সহজ হবে।
পুরো প্রক্রিয়াটি নীতিমালাভিত্তিক হবে। এখানে ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়নের (সাবজেক্টিভ জাজমেন্ট) সুযোগ কম থাকবে। উদ্যোক্তার পারফরম্যান্স, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং ব্যবসায়িক তথ্যের ভিত্তিতেই অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে। ফলে উদ্যোক্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন, অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণ কমবে, সুদ বাবদ ব্যয় হ্রাস পাবে এবং অর্থায়ন ব্যবস্থা আরো দক্ষ ও স্বচ্ছ হবে। এটাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ভিশন।
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ব্যবসা গড়ে তুলতে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন?
বিভিন্ন উদ্যোগকে আরো টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, এর একটি বড় অংশই সম্ভব আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে। এটি খুব ব্যয়সাপেক্ষ কোনো বিষয় নয়। এ কারণে বিহেভিয়ার সায়েন্সের আধুনিক বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। পিকেএসএফ এরই মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়া একটি প্রকল্পের আওতায় এ বিষয়ক কাজ করে ইতিবাচক ফল পেয়েছে।
এ অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে আমাদের সম্পদসাশ্রয়ী পরিচ্ছন্ন উৎপাদন চর্চা নিয়ে আরো বিস্তৃতভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করেছে। পাশাপাশি আমরা পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন সমাধান নিয়ে কাজ করছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাতক্ষীরার জিয়ালা গ্রামটি একসময় ‘গোবরগ্রাম’ নামে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে অভিহিত হতো। এখন এ গ্রামকে আমরা ভার্মিকম্পোস্ট পল্লীতে রূপান্তর করেছি। অর্থাৎ যে বর্জ্য একসময় পরিবেশ দূষণের কারণ ছিল, সেটিকেই সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে।
একইভাবে ভৈরবে ঝুট ও চামড়াজাত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারসহ পরিবেশবান্ধব নানা উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি ও পুরস্কার অর্জন করেছে।
এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে স্বল্প ব্যয়ে তরল বর্জ্য শোধনের প্রযুক্তিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ টাকার মধ্যেই একটি বাণিজ্যিক ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।










