নির্বাচনভীতি বোধহয় এ অঞ্চলের শাসকদের চিরসহজাত এক ভীতি। অবশ্য এ ভীতি অকারণ নয়, এর সঙ্গে ইতিহাসের যোগ রয়েছে। পুরো পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে দুবারই মাত্র নির্বাচন হয়েছিল। একটি প্রাদেশিক (১৯৫৪) ও আরেকটি জাতীয় নির্বাচন (১৯৭০)। মাঝখানে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র নামে নির্বাচন নামের এক সার্কাসের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু জনগণ তা গ্রহণ করেনি। অখণ্ড পাকিস্তানের প্রায় ২৫ বছরে শাসক দল কোনো না কোনো ছলে ও কৌশলে নির্বাচন বা ভোট ব্যবস্থা এড়িয়ে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে। এর মূল কারণ বিরোধী দলের আসনে বসার ভয়। কিন্তু বহু কৌশলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই যুগ পর প্রথম ও শেষ সাধারণ নির্বাচন দিতে তারা বাধ্য হয়েছিল ১৯৭০ সালে। সে এক নির্বাচনেই পাকিস্তানের ভাগ্য চিরতরে নির্ধারণ হয়ে যায়। এ নির্বাচনের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার সব দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর এমনভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে যে তা আরেক নতুন রাষ্ট্র জন্মের মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করে। সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি আইনি কাঠামোর অধীনে। ইংরেজিতে একে বলা হতো লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার সংক্ষেপে এলএফও। এই এলএফও ছিল একটি অদ্ভুত আইন! কেননা এ আইনের মধ্যে একই সঙ্গে শাসনতান্ত্রিক উপাদান ছিল আবার এর মাধ্যমেই পাকিস্তানের ভবিষ্যতের স্থায়ী শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পদ্ধতিগত নির্দেশনাও ছিল। তাই আমি মনে করি, চরিত্রগত দিক দিয়ে এটি ছিল অর্ধেক শাসনতন্ত্র বা সংবিধান এবং যার অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য বা পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছিল। এর পরবর্তী সংঘটিত অনিবার্য ঘটনা প্রবাহের কারণে এ উপমহাদেশে রাজনৈতিক মানচিত্র পর্যন্ত বদলে গিয়েছিল।
২.
১৯৬৮ সালে মহাসমারোহে আইয়ুব খান পাকিস্তানজুড়ে তার ক্ষমতা দখলের ১০ বছর পূর্তি উদযাপন করেন। সে উদযাপনের নাম দেয়া হয়েছিল উন্নয়নের দশক (১৯৫৮-৬৮)। কিন্তু মাত্র এক বছর পরেই আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের মার্চে সংগঠিত হয় গণ-অভ্যুত্থান। সে অভ্যুত্থানে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় আইয়ুব খানের তথাকথিত লৌহশাসন ও উন্নয়নের বানোয়াট গল্প। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান নামক প্রায় বিকল রাষ্ট্রটি পরিচালনার দায়িত্ব এসে পতিত হয় আরেক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ওপর। আইয়ুব খানের পথ অনুসরণ করে তিনিও নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। মূলত আইয়ুব খান ১১ বছর আগে ঠিক যেভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল প্রায় একই কায়দায় ক্ষমতায় আসীন হলেন ইয়াহিয়া খান। তবে মৌলিক একটি পার্থক্য ছিল। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় বসতে পেরেছিলেন একটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুব খানের উৎখাতের কারণে। ফলে এ রকম একটি মহা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দানা বেঁধে ওঠা কোটি কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের একটি চাপ ইয়াহিয়া খানের ওপর ছিল। ফলে আইয়ুব খান কর্তৃক ধ্বংস করে দেয়া নির্বাচন ব্যবস্থা, বিলুপ্ত ভোটাধিকার ও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসেবে সবার ভোটদানের অধিকার ইত্যাদি ফিরিয়ে দেয়ার চাপ ছিল ইয়াহিয়া খানের ওপর।
৩.
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের ২৮ জুলাই একটি নীতিনির্ধারণী ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণে তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার আলোচনার কথা উল্লেখ করেন এবং ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মতো ব্যাপারগুলোয় বিভিন্নজনের তীব্র মতভেদের কথা জানান। কেউ কেউ ছিলেন ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করার বিপক্ষে। আবার অনেকেই মনে করতেন ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র হওয়া উচিত একটি আইনগত দলিল, যার অধীনে পাকিস্তানে শিগগিরই একটি সাধারণ নির্বাচন হতে পারে।
গণতান্ত্রিক দলগুলো দাবি করেন প্রতিনিধিত্বের ভিত্তি হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক নীতি অর্থাৎ এক ব্যক্তি এক ভোট। এ পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদে পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধিদের নিশ্চিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রদান করত। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা এটি গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ফেডারেল আইন পরিষদ দুই কক্ষবিশিষ্ট না হয়। তাদের প্রস্তাব ছিল নিম্নকক্ষ গঠিত হবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে বা এক ব্যক্তি এক ভোট এ হিসেবে এবং উচ্চকক্ষ গঠিত ঐকমত্যের ভিত্তিতে। আরেকটি গুরুতর রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের মূলনীতির ব্যাপারে। পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট তথা ১৯৫৫ সালের মতো চারটি প্রদেশকে মিলিয়ে এক প্রদেশে পরিণত করার ব্যাপারে মারাত্মক অনৈক্য বিরাজমান ছিল। পূর্ববঙ্গের জনগণ এ এক ইউনিট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল, কেননা তা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের এলিট গোষ্ঠীগুলোর কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল। ছোট প্রদেশগুলোও এক ইউনিটভিত্তিক শাসন কাঠামোর বিরোধী ছিল।
এসব বিতর্কিত বিষয়গুলোর পর্যালোচনার পর ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন—
প্রধান ইস্যুগুলোয় নানা মত ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আমার সম্পর্কে আমি আগেই কয়েকবার ইঙ্গিত দিয়েছি, আমার মন এসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। কেবল যে শর্তের ব্যাপারে আমি জোর দিচ্ছি তা হলো যেকোনো শাসনতন্ত্র বা সরকার, যা পাকিস্তানের জনগণ তাদের নিজেদের জন্য গ্রহণ করবে, তাকে অবশ্যই পাকিস্তানের কাঙ্ক্ষিত আদর্শ ও অখণ্ডতার ধারক হতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এসব দাবি পাকিস্তানের অখণ্ডতার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেসব দাবি পূরণে পথ ও পদ্ধতি বের করতে হবে।
সেই কথিত পথ ও পদ্ধতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার পরিকল্পনার একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছিলেন। জেনারেল পীরজাদা ও গোলাম ওয়াহেদ (জিডব্লিউ) চৌধুরীর সমন্বয়ে খুবই ছোট্ট একটি পরামর্শক গ্রুপ তাকে এ কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন। এসব বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের রাজনীতিকদের মতামতকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ওপরও তারা নির্ভর করেছেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে পরিকল্পনাটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল পীরজাদা, দুজন প্রাদেশিক গভর্নর ও দুজন আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসকের সমন্বয়ে গঠিত একটি গ্রুপের দীর্ঘ বৈঠকের মাধ্যমে।
জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের ২৮ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করার একটি রূপরেখা প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘তার সামনে চারটি বিকল্প পথ রয়েছে’—
ক. একটি সংবিধান কনভেনশন নির্বাচিত করে তাদের হাতে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা ন্যস্ত করা।
খ. ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করে সে অনুযায়ী দেশ শাসন করা। নিয়মমাফিক এ সংবিধানের সংশোধনও করা যেতে পারে।
গ. তিনি নিজে একটি সংবিধান প্রণয়ন করে তার ওপরে গণভোট নিতে পারেন।
ঘ. একটি সামরিক আইনগত কাঠামো রচনা করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, যাতে নির্বাচিত পরিষদ একটি সংবিধান রচনা করতে পারে।
চারটি বিকল্প পথের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও ঘোষণা করেন। প্রথমটি হচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট ব্যবস্থা বাতিল এবং দ্বিতীয়টি ভবিষ্যৎ জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের জন্য ‘একজন লোক একটি ভোট’ এ নীতি গ্রহণ। ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্যারিটি বা সমতার যে নীতি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল দাবি করে আসছিল, তা তারা সবাই মেনে নিয়েছিলেন এবং যা ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রে গৃহীত হয়েছিল তা পরিত্যক্ত হলো।
বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে চার মাসব্যাপী আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র সম্পর্কে কতগুলো বিষয়কে স্থিরীকৃত বলে ঘোষণা করেন। এগুলো হচ্ছে—
১. ফেডারেল পার্লামেন্টারি ধরনের সরকার।
২. প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারভিত্তিক প্রত্যক্ষ নির্বাচন।
৩. নাগরিকদের মৌলিক অধিকার দান এবং আইন আদালতের মাধ্যমে এ অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা বিধানের ব্যবস্থা।
৪. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তাকে শাসনতন্ত্র রক্ষকের ভূমিকা দেয়া।
৫. যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য একটি ইসলামী ভাবাদর্শভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন।
৪.
প্রেসিডেন্ট আরো প্রকাশ করেন, ১৯৭০ সালের মার্চের মধ্যে একটি আইন কাঠামো এবং জুনের মধ্যে ভোটার তালিকা তৈরি করে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার কথামতো ৩০ মার্চ রাওয়ালপিণ্ডিতে নির্বাচনসংক্রান্ত ‘আইনগত কাঠামো আদেশ’ বা এলএফও ঘোষণা করেন। এলএফও ছিল নিজেই একটি আধা শাসনতন্ত্র। কেননা এ আদেশ দ্বারা এমন কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট বা অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করা হয়, যেগুলো ভবিষ্যতের শাসনতন্ত্রেও গ্রহণ করতেই হবে। ফলে যে দলিল এতই শক্তিশালী, তা ভবিষ্যতে প্রণয়ন করা হবে এমন শাসনতন্ত্রের মৌলিক চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে, সে দলিলকে শাসনতন্ত্রের চেয়ে কম ক্ষমতাসম্পন্ন বলার কোনো উপায় নেই। তবে এলএফওর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পথরেখা হিসেবে কাজ করা।
আইনগত কাঠামো আদেশ বা এলএফওতে একটি মুখবন্ধ, ২৭টি অনুচ্ছেদ এবং তিনটি পরিশিষ্ট ছিল। এ আদেশের মূল বিষয়গুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র অনুসারে পাকিস্তান একটি ফেডারেল প্রজাতন্ত্র হবে এবং তা পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র নামে অভিহিত হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে ইসলামী আদর্শবাদের লালন ও প্রতিষ্ঠা।
২. শাসনতন্ত্রের প্রস্তাবে থাকবে পাকিস্তানের মুসলমানরা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ে তুলবে। সংখ্যালঘুরা অবাধে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে।
৩. জনসংখ্যা ও প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পরপর ফেডারেল ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচনের ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলোর অনুসরণ নিশ্চিত করা হবে। জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্য দূর করা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেয়া হবে।
৪. আইন তৈরির ক্ষমতা, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতাসহ সব ক্ষমতা ফেডারেল সরকার এবং প্রদেশগুলোর মধ্যে এমনভাবে ভাগ করা হবে, যাতে প্রদেশগুলো সর্বাধিক পরিমাণে স্বায়ত্তশাসন পায়।
৫. পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ব্যবস্থা বাতিল করে পূর্বের প্রদেশগুলোকে পুনর্বহাল করা হবে।
৬. নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ এ নীতির ভিত্তিতে।
৭. জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে।
৮. জাতীয় পরিষদের নির্বাচন ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ২২ অক্টোবরের আগেই ঘোষিত কোনো তারিখে অনুষ্ঠিত হবে।
৯. পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ৩১৩ সদস্যবিশিষ্ট হবে। এর মধ্যে ৩০০ হবে সাধারণ আসন এবং ১৩টি হবে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন। প্রাদেশিক পরিষদের আসন হবে ৬২১।
১০. জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের কোনো আসন শূন্য হলে আসন শূন্য হওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
১১. নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রেসিডেন্ট একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। এতে একজন প্রধান কমিশনার ও দুজন সদস্য থাকবেন।
১২. কোনো ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক হলে, তার বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হলে তিনি জাতীয় বা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
১৩. কোনো ব্যক্তি একসঙ্গে একাধিক পরিষদের সদস্য হতে কিংবা একই পরিষদের একাধিক নির্বাচনী এলাকার সদস্য হতে পারবেন না। কোনো সদস্য স্পিকারের কাছে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত নোটিস পাঠিয়ে তার আসন থেকে পদত্যাগ করতে পারবেন।
১৪. জাতীয় পরিষদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র তৈরির কাজ সম্পন্ন করার জন্য তার বিবেচনা মতো উপযুক্ত তারিখ, সময় ও স্থানে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন।
১৫. প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদে ভাষণ দিতে পারবেন। এমনকি প্রয়োজনে পরিষদে এক বা একাধিক বার্তা পাঠাতে পারবেন।
১৬. জাতীয় পরিষদের সদস্যরা দুজন সদস্যকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করবেন।
১৭. জাতীয় পরিষদের অধিবেশন চলাকালে কোনো সদস্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কোরাম সংকটের কারণে স্পিকার অধিবেশন বন্ধ বা মুলতুবি রাখতে পারবেন।
১৮. জাতীয় পরিষদের কোনো কাজের বৈধতা কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
১৯. স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও অন্য সদস্যরা প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নির্ধারিত বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।
২০. জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোই হবে জাতীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রথম আইন পরিষদ।
২১. জাতীয় পরিষদ তার প্রথম অধিবেশনের ১২০ দিনের মধ্যে শাসনতন্ত্র বিল নামে একটি বিলের আকারে শাসনতন্ত্র তৈরি করবেন এবং তা করতে ব্যর্থ হলে পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে।
২২. জাতীয় পরিষদের পাস করা শাসনতন্ত্র বিল প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। শাসনতন্ত্র যদি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক অনুমোদন না হয় তাহলে জাতীয় পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে।
- আইনগত কাঠামো আদেশে ভবিষ্যতের শাসনতন্ত্র সম্পর্কে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। যেমন আদেশের ২০ নং ধারায় ভবিষ্যতের শাসনতন্ত্রে থাকতেই হবে, এমন ছয়টি মূলনীতি বেঁধে দেয়। যেমন
ক. ফেডারেল পদ্ধতির সরকার দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হবে,
খ. রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে ইসলামী আদর্শ,
গ. প্রাপ্তবয়স্কের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে,
ঘ. মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে,
ঙ. নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন এলাকার মধ্যকার অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্য দূর করা হবে ও
চ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চিয়তা থাকবে।
৫.
এই এলএফও অনুসারেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল সত্তরের নির্বাচন। এবং সত্তরের নির্বাচন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল। দলিল হিসেবে এলএফও ছিল পাকিস্তানের জনগণকে একটি শাসনতন্ত্র প্রদানের অঙ্গীকার। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সে অঙ্গীকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বেঈমানির পরিণতি ভালো নয়, সে শিক্ষাও দেয় সত্তরের নির্বাচন। আইয়ুব খানের মতো জোর করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার স্বপ্ন ইয়াহিয়া খানও দেখতে পারতেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের ফলে অর্জিত জনগণের দুর্নিবার রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে তা সম্ভব ছিল না। তাই এলএফও জারি ও সত্তরের জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা ছিল ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ চাপের ফসল। ইয়াহিয়া খান সে চাপের আবশ্যিক পরিণতি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ইতিহাসের উল্টো পথে হেঁটেছিলেন। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত জনরায়ের আলোকে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগকে তিনি সরকার গঠন করতে দেননি। ফলে তিনি নিজেই নিজের ঘোষিত এলএফওতে বর্ণিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভঙ্গ করলেন। যার পরিণতি এ উপমহাদেশের মানচিত্র বদলে দিয়েছে।
এলএফও ছিল পাকিস্তানের কফিনের শেষ পেরেক। আইয়ুব খান জানত সামরিক শাসন, নির্যাতন-নিপীড়ন ও নজিরবিহীন অপশাসনের কারণে পাকিস্তান নামক কোনো একক ঐক্যের ভিত্তি আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু আইয়ুব খানের তুলনায় কম বুদ্ধিসম্পন্ন ইয়াহিয়া খান এ বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেননি। তার জারি করা এলএফও ছিল পাকিস্তানবাদের অগ্নিপরীক্ষা। সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া দূরের কথা, পাকিস্তান নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাব ছিল পাকিস্তান কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কিন্তু এসব মূল্যবোধের প্রতি পূর্ববঙ্গের জনগণের ছিল স্থির আনুগত্য ও আস্থা। আমরা পাকিস্তান ভেঙেছি, নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি, এর অর্থ হলো আমরা ওইসব জাতীয় রাজনৈতিক মূল্যবোধগুলোর প্রতি অনঢ় আস্থার প্রমাণ দিয়েছি। স্বাধীন বাংলাদেশে সেসব মূল্যবোধগুলোর প্রতি স্পৃহা, সমর্থন ও আস্থা পরিত্যক্ত হয়েছে তা ভাবলে হবে সবচেয়ে বড় ভুল। এলএফওর ব্যর্থতা ও সত্তরের নির্বাচন থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ শিক্ষাই আমরা গ্রহণ করতে পারি।
আরিফ খান: সংবিধান বিষয়ে গবেষক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী





