‘বর্তমান শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ও ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রদেশে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়াছে, কলহাস্যে মুখরিত জনপদ যখন শ্মশানের রূপ ধারণ করিয়াছে, অগণিত মানুষের আহাজারিতে যখন আকাশ-বাতাস মুখরিত তখন এই দেশেরই জাতীয় বেতার ও টেলিভিশনে ওই মহাপ্রলয়কাণ্ডের খবর অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব সহকারে প্রচার এবং ফুর্তির প্রোগ্রাম শুনিয়া কুষ্টিয়ার সর্বশ্রেণীর মানুষ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক প্রভৃতি বেদনা বিস্ময়ে অবাক হইয়া পড়িয়াছেন। স্থানীয় জনমনে একটি প্রশ্নই উঁকিঝুঁকি মারিতেছে—দেশের বেতার ও টিভি কাহাদের জন্য!’
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২৪ নভেম্বর, ১৯৭০ সালে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত পত্রিকা দৈনিক আজাদে। প্রতিবেদনটি থেকে সহজেই অনুমিত হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান সরকারের দায়িত্বহীনতা এবং প্রতিক্রিয়ায় বাংলার জনমানস। নির্বাচনের ঠিক আগে পূর্ব পাকিস্তানের জনমনে সৃষ্ট এ অসন্তোষের ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এর মধ্য দিয়েই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্য আলাদা হওয়ার রাস্তা তৈরি হয়।
ক্ষমতা গ্রহণের পরই ইয়াহিয়া খান দ্রুত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেয়া হয়। জানিয়ে দেয়া হয়, ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ ও ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিলে পরিস্থিতি প্রতিকূলে যেতে থাকে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় উনিশটি জেলা। ডানপন্থী ও বামপন্থী বেশকিছু দল তখন নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলেছিল। বিষয়টি বিবেচনা করে ১৫ আগস্ট দেয়া ঘোষণায় ইয়াহিয়া খান ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ ও ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচনের নতুন তারিখের ঘোষণা দেন। পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টি নির্বাচন পেছানোর বিরুদ্ধে ছিল। কারণ দেশী ও বিদেশী অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দল তখন পাকিস্তানের নির্বাচন নিয়ে সন্দিহান ছিল। তার পরও প্রচারণা চলছিল জোরেশোরে। এর মধ্যেই ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার দেখা দেয় শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা মর্মান্তিক ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। রাতের দিকে ঘণ্টায় ১৫০ মাইল বেগে উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ঝড়। সঙ্গে ২০-৩০ ফুট জলোচ্ছ্বাস প্লাবিত করে ব্যাপক উপকূলীয় অঞ্চল। উপকূলের পাঁচটি জেলা বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, খুলনা অঞ্চলে দেখা যায় ভয়াবহ ধ্বংসলীলা।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা সম্ভব হয়নি। ১৫ নভেম্বর দৈনিক আজাদ দাবি করে ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাবে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ হাজার ১৩৬। দৈনিক ইত্তেফাক ৮০০ মৃতদেহ উদ্ধারের কথা প্রকাশ করে। ১৬ নভেম্বর সরকারিভাবে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয় ১৬ হাজার। একই দিনে দৈনিক আজাদের দাবি, নিহতের সংখ্যা ২ লাখ। সে সময়কার প্রাদেশিক রিলিফ কমিশনার এএম আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে নিহতের সংখ্যা ৩৩ হাজার। তিনি জানান, ২ হাজার ৩৩৮ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ১২ লাখ ৩৩ হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৩ লাখ ৩৫ হাজার মানুষের ঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত এবং ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষের ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির আকার ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এপিপির খবরে ৫ জেলায় নিহতের সংখ্যা দাবি করা হয় ৫৩ হাজার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন দাবি করেছিলেন, নিহতের সংখ্যা দেড় লাখ। অথচ এত বড় ঘটনার পরও পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমগুলোয় তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। তবে ক্রমে ঘটনার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাকে নিয়মিত কাভার করতে শুরু করে। অনেক সংবাদকর্মী বাংলায় ছুটে আসেন।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশন এবং আবহাওয়া কেন্দ্র থেকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের খবর তেমন গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা হয়নি। বরং আবহাওয়া দপ্তর বিপৎসংকেতের নম্বর উল্লেখ করাই বন্ধ করে দেয়। ফলে উপকূলের বসতিদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। আবহাওয়া দপ্তরের এমন সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যায় সাধারণ মানুষ। ১১ তারিখে যে খবর জানার কথা ছিল, তা বিশ্ববাসী জানতে পারে ১৪ তারিখ। কেন পূর্বাভাস দিতে দেরি হয়েছে, তার জন্য তদন্ত কমিটি হয়, যদিও তা প্রকাশিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় মাধ্যমের দায়িত্বহীনতা আরো দৃশ্যমান হয় খোদ প্রেসিডেন্টের আচরণে। ১২ নভেম্বর অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়ের সময় ইয়াহিয়া খান চীন সফরে ছিলেন। ১৪ নভেম্বর তিনি ঢাকায় আসেন এবং ১৬ তারিখ রাওয়ালপিন্ডি ফিরে যান। বিশ্বজুড়ে তখন পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে ফলাও করে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে উদ্যোগ নেয়া হয় মানুষ উদ্ধার ও মৃতদের দাফনে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসে ত্রাণ; কিন্তু পাকিস্তান সরকারের কোনো খবর পাওয়া যায় না। দুর্গত এলাকায় লাশ দাফন, উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ, সাহায্য ও চিকিৎসাকার্য ত্বরান্বিত করতে বাধ্য হয়ে এগিয়ে আসেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও রাজনৈতিক দলের নেতারা। বাংলায় তখন জরুরি অবস্থা ঘোষণার দরকার ছিল। কিন্তু করা হয়নি। যেন বাংলার প্রতি সরকারের বিতৃষ্ণ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অন্তত জনগণ সেভাবেই বিবেচনা করে পরিস্থিতিকে।
যখন বিদেশী ত্রাণসামগ্রী দেশে পৌঁছেছে, তখন রিলিফ নিয়ে দেখা যায় চরম অব্যবস্থাপনা। দুর্যোগের নয় দিন পরও অনেক স্থানে ত্রাণ পৌঁছেনি। ইয়াহিয়া খান ২৪ নভেম্বর ঢাকায় আসেন এবং ২৭ তারিখ ফিরে যান। সরকারি প্রেসনোটে জানানো হয় বিশেষ রিলিফ কমিটি ঘোষণার কথা। ততদিনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজের মতো করে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। ১৮ তারিখ হয় শোক মিছিল। দুর্যোগের খবর চাপা দেয়ার অভিযোগে ক্রুদ্ধ বিক্ষোভাকারীরা রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র ঘেরাও করে ও তথ্য দপ্তরের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। প্রথমদিকে নির্বাচনে প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত থাকা রাজনৈতিক দলগুলোও বুঝতে পারেনি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। পরবর্তী সময়ে যখন তারা বুঝতে পারে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তারা তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত রেখে সাধ্যমতো ত্রাণ তৎপরতা শুরু করে। সেই সঙ্গে থাকে পাকিস্তান সরকারের সমালোচনা। আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, পাকিস্তান জাতীয় লীগ, পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলা জাতীয় লীগ, কাউন্সিল মুসলিম লীগ নিজেদের মতো করে চালাতে থাকে তৎপরতা। ছাত্রসংগঠনের তৎপরতা, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সমাজ, গণতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ইসলামী ছাত্রসংঘও সরকারের সমালোচনা করে বিবৃতি প্রকাশ করে। নিজেদের সাধ্যমতো এগিয়ে আসে। সামগ্রিকভাবে এভাবে পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের সমালোচনা বিম্বিত হয় তাদের কার্যক্রমেও। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আদর্শিক অবস্থান নির্বিশেষে সরকারের সমালোচনা করতে থাকে, যা জনতার মনস্তত্ত্ব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
দুর্যোগের অল্প কয়েক দিন পরই অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সরকারের উপেক্ষা ও অব্যবস্থাপনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। তার ওপর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো পাকিস্তান সরকারের এহেন বিমাতাসুলভ আচরণ সামনে তুলে ধরে। প্রসঙ্গ সামনে আনা হয় নির্বাচনী প্রচারণায়। বাংলার আপামর জনসাধারণ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করার একটা রাস্তা পায় যেন সামনে। নির্বাচনে সেই মনোবাসনাই তারা তুলে ধরে। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণকে বড় অংশে প্রভাবিত করেছে সে বছরের দুর্যোগ মোকাবেলায় পাকিস্তান সরকারের ব্যর্থতা। নির্ধারণ করেছে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা





