১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচনের জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর সত্তরের নির্বাচনটিই ছিল প্রথম সরাসরি সাধারণ নির্বাচন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে একমাত্র নির্বাচন। ১৯৬৯ সালে আবদুস সাত্তার (১৯০৬-৮৫) প্রথম বাঙালি হিসেবে পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করেন, যেখানে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের জন্য ঐতিহাসিক সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ নির্বাচনের জেরে বাঙালি বেসামরিকদের বিরুদ্ধে গণহত্যার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূত্রপাত হওয়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আটকে রাখা হয়েছিল। তাকে সরকারি পদ থেকে অপসারণ এবং পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গৃহবন্দি করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে আটকে পড়া বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রত্যাবাসনের অংশ হিসেবে আবদুস সাত্তার স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট (৩০ মে ১৯৮১-২৪ মার্চ ১৯৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে ৩০০টি নির্বাচনী এলাকায় ভোট হয়, যার মধ্যে ১৬২টি পূর্ব পাকিস্তানে এবং ১৩৮টি পশ্চিম পাকিস্তানে। আরো ১৩টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল (যার মধ্যে সাতটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে এবং ছয়টি পশ্চিম পাকিস্তানে)।

নির্বাচনে দুটি প্রধান দল পশ্চিমভিত্তিক পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) এবং পূর্বভিত্তিক নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। পূর্ব শাখায় আওয়ামী লীগ ছিল একমাত্র প্রধান দল, যার কোনো প্রতিযোগী ছিল না। পক্ষান্তরে পশ্চিম শাখায় পিপিপি মুসলিম লীগ ও রক্ষণশীল দলগুলোর থেকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছিল। ফলাফলটি ছিল আওয়ামী লীগের জন্য একটি একতরফা বিজয়, যারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, ১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টি এবং পূর্ব পাকিস্তানের সাতটি মহিলা আসনও তারা পেয়েছিল। পিপিপি পশ্চিম পাকিস্তানে মাত্র ৮১টি সাধারণ আসন এবং পাঁচটি মহিলা আসন জেতে। ১০ দিন পর অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে আবার আধিপত্য বিস্তার করে, যখন পিপিপি শুধু পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে বিজয়ী দল ছিল। সেখানে মার্ক্সবাদী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে বিজয়ী হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পিপিপি চেয়ারম্যান জুলফিকার আলি ভুট্টো ফেডারেল সরকারে পূর্ব পাকিস্তানের একটি মাত্র দল চাননি বলে জাতীয় পরিষদেও অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। পরিবর্তে ইয়াহিয়া প্রবীণ বাঙালি রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগের বিপরীতে অন্যতম বিজয়ী নুরুল আমিনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাকে পিপিপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে বলা হয়। এ পদক্ষেপ ব্যর্থ হলে অধিবেশন উদ্বোধনে বিলম্ব ঘটে, ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পরিণতিতে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হয়। বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইয়াহিয়া পদত্যাগ করে জুলফিকার আলি ভুট্টোর হাতে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

২২ নভেম্বর ১৯৫৪ সালে গঠিত পশ্চিম পাকিস্তানের সমন্বিত প্রদেশটি বিলুপ্ত করে চারটি প্রদেশ করা হয়: পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। প্রতিনিধিত্বের নীতিগুলো জনসংখ্যার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল এবং যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের সম্মিলিত জনসংখ্যার চেয়ে বেশি লোক ছিল, প্রদেশটির অন্যতম দল জাতীয় পরিষদে অর্ধেকেরও বেশি আসন পেয়েছিল। নির্বাচনের এক মাস আগে পূর্ব পাকিস্তানে ভোলা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আনুমানিক পাঁচ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। দুর্যোগ মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ ১৯৭১-এর মে মাসে একটি গোপন প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, যাতে তারা দেখার চেষ্টা করেছিল যে পাকিস্তান ভেঙে গেলে দুই ভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে তার কী পরিণতি হবে। ২০১০ সালে ওই রিপোর্টের যে খণ্ডিত অংশ প্রকাশ করা হয়, তাতে সিআইএ তখন মনে করেছিল পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পশ্চিম পাকিস্তান বড় ধরনের বাণিজ্য সংকটে পড়বে, কারণ তাদের পণ্যের যে মান তাতে বিকল্প বাজার পেতে তাদের সমস্যা হবে। সিআইএর ওই গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক যত বেড়েছে দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য ও জীবনযাত্রার মানের তারতম্যও বেড়েছে। ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, ‘‌১৯৭০ সালের বিধ্বংসী সামুদ্রিক ঝড় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি কতটা অসহায় ও ভঙ্গুর। ওই সাইক্লোনের পর কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।’

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনকে পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও পরিচ্ছন্ন নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেখানে প্রায় ২৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে আধিপত্য বিস্তার করে। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানে পাকিস্তানে পিপলস পার্টির ক্রমাগত জনসভা ব্যাপক জনসমাগমকে আকর্ষণ করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পূর্বাঞ্চলে কোনো আসন জিততে পারেনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ পশ্চিমাঞ্চলে কোনো আসন পায়নি। পশ্চিমে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন বামপন্থীরা ব্যবহার করেছিল, যারা যুক্তি দিয়েছিল যে মুজিব”পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোনো ম্যান্ডেট বা সমর্থন পাননি"(সত্যটিকে উপেক্ষা করা হয় যে পিপিপিও কোনো আসনে জয়ী হয়নি পূর্ব পাকিস্তানে)। ভুট্টো একবার উচ্চারণ করেছিলেন”ইধার হাম, উদর তুম (আমরা এখানে শাসন করি, আপনি সেখানে শাসন করেন)—এভাবে মৌখিকভাবে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানকে বিভক্ত করা হয়েছিল।

জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের জন্য মোট ১ হাজার ৯৫৭ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই এবং প্রত্যাহারের পর অবশেষে ১ হাজার ৫৭৯ জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আওয়ামী লীগ ১৭০ জন প্রার্থী দিয়েছিল, যার মধ্যে ১৬২টি পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার জন্য ছিল। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ১৬২টি আসনে আওযামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ ছিল আইনজীবী। এছাড়া ব্যবসায়ী ছিল ১৯ শতাংশ এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিল ৬ শতাংশ। জামায়াত ইসলামীর ১৫১ জন প্রার্থীর সঙ্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক প্রার্থী ছিল। পাকিস্তান পিপলস পার্টি মাত্র ১২০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, যার মধ্যে ১০৩ জন পাঞ্জাব ও সিন্ধুর নির্বাচনী এলাকা থেকে ছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানের কোনোটিই ছিল না। পিএমএল (কনভেনশন) ১২৪ জন প্রার্থী, পিএমএল (কাউন্সিল) ১১৯ ও পিএমএল (কাইয়ুম) ১৩৩ জন প্রার্থী ছিলেন। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি আসন। নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোট পড়ে বলে সরকার দাবি করে। প্রসঙ্গত, ১৯৭০-এর নির্বাচনে তৎকালীন একজন মহকুমা প্রশাসক পরবর্তীকালে জানতে পারেন অনেক কেন্দ্রে অনেক ভোটারের ভোট কেউ দিয়ে গেছে। ভোটে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া জয় পাবে জানলেও ভোট রিগিংয়ে তারা না গেলেও পারতেন। সর্বমোট ৫ কোটি ৬৯ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ রেজিস্টার্ড ভোটারের মধ্যে ৩ কোটি ১২ লাখ ১১ হাজার ২২০ জন পূর্ব পাকিস্তানের এবং ২ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ২৮০ জন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ভোটার।

জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাধারণ নির্বাচনের একই সঙ্গে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের ৮১টিতে জয়লাভ করে।

কনজারভেটিভ দলগুলো নির্বাচনে খুব সুবিধা করতে পারেনি। সম্ভবত একই ধরনের পার্টিগুলো একে অন্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে এমনটি হয় পিএমএল (কাইয়ুম), পিএমএল (কাউন্সিল), পিএমএল (কনভেনশন), জমিয়তে উলেমা-ই-ইসলাম, জমিয়তে উলেমা-ই-পাকিস্তান ও জামায়াতে ইসলামী একত্রে ৩৭টি আসন পায়।

গবেষক শ্যামলী ঘোষের মতে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় একটি পোস্টার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে দাগ কেটেছিল। এ স্লোগান গান ছিল—সোনার বাংলা শ্মশান কেন?"পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কীভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সেটি তুলে ধরা হয় এ পোস্টারের মাধ্যমে। স্মৃতিচারণমূলক ‘‌শতাব্দী পেরিয়ে’ বইয়ে বামপন্থী রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রনো লিখেছেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিব, আওয়ামী লীগ ও ছয় দফার পথে যে জোয়ার উঠেছিল, তার সামনে দক্ষিণপন্থী দলগুলো দাঁড়াতেই পারছিল না।

প্রচারণার সময় শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, এ নির্বাচন হবে ছয় দফার পক্ষে রেফারেন্ডাম বা গণভোট। ২০২০ সালের মার্চে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ১৯৭০ সালের নির্বাচন সম্পর্কে রেহমান সোবহান বলেন, ‘‌সেটি ছিল এক ধরনের রেফারেন্ডাম।’

নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী জিডব্লিউ চৌধুরী প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিয়েছিলেন বিষয়টি নিয়ে তিনি যেন সরাসরি শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলেন। শেখ মুজিব ছয় দফা দাবিকে সংশোধন করতে পারেন কিনা, সে বিষয়ে জানার জন্য প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেন মি চৌধুরী। তার কথায়, ‘‌‍যদি মুজিব বিষয়টি মানতে না চাইলে একটি গণভোট আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছিলাম। গণভোটের বিষয় হতো বাঙালি মুসলমানরা অবিভক্ত পাকিস্তান চায় নাকি আলাদা হতে চায়?’

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ভাসানী প্রথমে রাজী হলেও নভেম্বরের শেষ দিকে এসে তিনি নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যান। অনেকে মনে করেন ১৯৭০ সালে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে মওলানা ভাসানী ভুল করেছেন। অনুসারীদের বক্তব্য হচ্ছে, ভাসানী যদি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকতেন তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে ভোট ভাগ হয়ে যেত এবং আওয়ামী লীগ হয়তো একচ্ছত্র আধিপত্য পেত না। তবে হায়দার আকবর খান রনো লিখেছেন,"আমার মনে হয় ভাসানী মনে মনে চেয়েছিলেন শেখ মুজিবকে ওয়াক ওভার দিতে, যাতে শেখ মুজিবুর এককভাবে বেরিয়ে আসেন। তাতে স্বাধীনতার প্রশ্নটি সহজ হতো বলে তিনি ভেবেছিলেন।

সত্তর সালের নির্বাচনে কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। ইয়াহিয়া খান সরকারের মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের এ নির্বাচনে অংশ নেয়ার অনুমতি ছিল না। জিডব্লিউ চৌধুরীর মতে, সে নির্বাচন সত্যিকার অর্থে ‘‌তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে হয়েছিল। বিচারপতি সাত্তার সে কারণে যেকোনো প্রভাব ছাড়াই নির্বাচন করতে পেরেছিলেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার স্মৃতিচারণমূলক ‘‌উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে লিখেছেন, ভোট গ্রহণের আগেই আওয়ামী লীগ কার্যত নির্বাচনে জিতে গিয়েছে। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সে নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন। এ নির্বাচনের ফলাফল নির্দেশ করে পাকিস্তানের দুটি অংশের জনগণের মধ্যে চিন্তাধারার পার্থক্য ফুটে ওঠে।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর আবার নতুন করে সংকট শুরু হয়। জুলফিকার আলি ভুট্টো নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা হিসেবে দাবি করেন। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান। নির্বাচনের সময় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানকে একটি প্রদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানকে চারটি প্রদেশে ভাগ করা হয়। মি. ভুট্টো প্রশ্ন তোলেন, একটি প্রদেশে জয়ী কীভাবে পুরো পাকিস্তানের শাসনভার শেখ মুজিবের হাতে তুলে দেয়া যায়? মি. ভুট্টোর এ অবস্থানের কারণে শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। শেখ মুজিবকে সরকার গঠনে আহ্বান করার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এতে ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ।

প্রসঙ্গত, পাকিস্তান তৈরির পেছনে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর যুক্তিতে সায় দিলেও পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা কখনই তাদের বাঙালি জাতিসত্তা এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেনি। কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষা পূরণে এত দ্রুত কেন পাকিস্তান সৃষ্টির দুই দশক না যেতেই বাঙালি জাতিসত্তা নিয়ে তাদের আবেগ, আকাঙ্ক্ষার বাঁধ ভেঙে পড়ার কারণ বৈষম্য, শোষণ।

পাকিস্তান আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা যেহেতু দেশের পশ্চিমাংশে ঘাঁটি গাড়েন, শাসনক্ষমতাও সেখানেই কুক্ষিগত হয়ে পড়ে, যদিও পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ। সেই সঙ্গে শুরু হয় রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, প্রশাসন, প্রতিরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে দেশের অন্য একটি অংশের নাগরিকদের প্রতি পদে পদে বৈষম্য।

যেখানে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের দুই অংশে মাথাপিছু আয় ছিল সমান, ১৯৭১ সালে পশ্চিমের মানুষের আয় পূর্বের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ওই ২৫ বছরে পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগের অভাবে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু পশ্চিমে বাড়ে তিন গুণ। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে, সেনাবাহিনীর উঁচু পদে বাঙালিদের নিয়োগ পাওয়া খুব কঠিন ছিল। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের অবহেলার কারণে পূর্ব পাকিস্তানে হয়ে উঠেছিল পশ্চিমের কলকারখানার কাঁচামালের জোগানদাতা এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রধান ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ ব্রুস রিডেল তার ‘ডেডলি এমব্রেস’ বইতে লিখেছেন, পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই ‘‌পাকিস্তানের কাছে বাংলার গুরুত্ব ছিল দ্বিতীয়’ এবং বাঙালিদের ‘‌দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ হিসেবে দেখা হতো।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান