মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের নাম স্মরণ করলে যে ব্যক্তির মুখ সবার আগে ভেসে ওঠে, তিনি হলেন নাসার মহাকাশচারী জিম লভেল। ১৯৭০ সালে চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ মিশনে হঠাৎ ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার কিলোমিটার দূরে বিস্ফোরিত হয় অক্সিজেন ট্যাংক। বিদ্যুৎ ও জীবনরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী চাঁদে নামার স্বপ্ন বাতিল করে লভেল ও তার দুই সহযাত্রী প্রাণপণে কাজ করেন শুধু নিরাপদে ফিরে আসার জন্য।
মিশন কন্ট্রোলে লভেলের সেই বিখ্যাত বার্তা ‘হিউস্টন, আমরা সমস্যায় পড়েছি’, আজও ইতিহাসের অংশ। অসাধারণ নেতৃত্ব ও ঠাণ্ডা মাথার সিদ্ধান্তে তিন সদস্যের দল তিনদিন পর প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করে। ওই নাটকীয় উদ্ধার অভিযানের জন্য অ্যাপোলো ১৩-কে বলা হয় ‘সফল ব্যর্থতা’।
লভেলের মহাকাশযাত্রা শুরু হয় আরো আগে। তিনি জেমিনি ৭, জেমিনি ১২ ও অ্যাপোলো ৮ মিশনে অংশ নেন। অ্যাপোলো ৮ ছিল চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফেরা প্রথম মানব মিশন। মহাকাশযানের জানালার দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি বুড়ো আঙুল দিয়ে পুরো পৃথিবী ঢেকে ফেলতে পারছিলেন। তখন পৃথিবী এতই ছোট দেখাচ্ছিল যে, তার আঙুলের পেছনেও লুকিয়ে যায়।
তিনি ২০১৮ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমি বুঝতে পারলাম, আমার বুড়ো আঙুলের পেছনে প্রায় ৩৫০ কোটি মানুষ এবং আমার জানাশোনা যা কিছু তার সবই রয়েছে। তখনই জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল।'
১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো ৮-এর ক্রু সদস্যদের তোলা ‘আর্থরাইজ’ ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে, পরিবেশ আন্দোলনেও অনুপ্রেরণা জোগায়। সেই বছর টাইম ম্যাগাজিনের ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন লভেল ও তার সহযাত্রীরা।

জিম লভেল, ছবি: নাসা
অ্যাপোলো ১৩-এর পর লভেল পান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম। পরে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে রন হাওয়ার্ডের ‘অ্যাপোলো ১৩’ ছবিতে তার চরিত্রে অভিনয় করেন টম হ্যাঙ্কস, আর নিজে করেছিলেন উদ্ধারকারী নৌযানের ক্যাপ্টেনের ভূমিকায় একটি ক্যামিও।
ব্যক্তিগত জীবনে লভেল ছিলেন চার সন্তানের স্নেহময় বাবা, দাদা ও পরিবারের অনুপ্রেরণা। তার আশাবাদ, রসবোধ ও ‘অসম্ভবকেও সম্ভব’ করে দেখানোর বিশ্বাস পরিবার ও সহকর্মীদের প্রেরণা জুগিয়েছে। সহযাত্রী বাজ অলড্রিন তাকে স্মরণ করেছেন ‘অসাধারণ বন্ধু ও মহাকাশ অনুসন্ধানের পথপ্রদর্শক’ হিসেবে।
৯৭ বছর বয়সে জিম লভেল চলে গেলেন অগণিত ভক্তকে শোকাহত রেখে। নাসার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, লভেল ৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের লেক ফরেস্টে মারা গেছেন। মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার রেখে যাওয়া গল্প প্রমাণ করে, সঙ্কটের মুহূর্তে শান্ত মন, দৃঢ় নেতৃত্ব আর দলগত প্রচেষ্টাই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। মহাকাশে হোক বা পৃথিবীতে, জিম লভেলের উত্তরাধিকার মানব সাহস ও আশার প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।
সিএনএন অবলম্বনে









