মহামারী-পরবর্তী সরবরাহ সংকট ও মূল্যস্ফীতির কারণে বৈশ্বিক স্মার্টফোন এবং কম্পিউটার বাজারের প্রবৃদ্ধি অনেকটা নিম্নমুখী ছিল। প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্প্রসারণ এ বাজার পুনরুদ্ধারে সাহায্য করবে এমনটা প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে জেনারেটিভ এআইনির্ভর কম্পিউটিংয়ে ব্যবহৃত চিপের চাহিদাও জোরাল হয় কিন্তু সামগ্রিকভাবে চলতি বছর বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রবৃদ্ধি সীমিত হবে বলে জানিয়েছে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (টিএসএমসি) প্রধান নির্বাহী সিসি ওয়েই। খবর নিক্কেই এশিয়া। 

সম্প্রতি ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিএসএমসি। সেখানে দেখা যায়, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ডাবল ডিজিটের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রবৃদ্ধির সেই ধারা বছরের অন্য প্রান্তিকগুলোয়ও অব্যাহত থাকবে বলে এক বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির সিইও সিসি ওয়েই। তবে সামষ্টিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বৈশ্বিক ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়ে টিএসএমসি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি জানান।

সিসি ওয়েই বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ম্যাচিউর নোড বা কম উন্নত প্রযুক্তির চিপের চাহিদা এখনো কম রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধার যথেষ্ট দ্রুতগতিতে হচ্ছে না। যেমন স্মার্টফোন বাজার চাহিদা ধারাবাহিকভাবে কিছুটা বাড়ালেও তা এখনো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। এছাড়া কম্পিউটার বাজার ধীরগতিতে পুনরুদ্ধার হচ্ছে।’

বাজার চাহিদার পরিবর্তন নিয়েও এ সময় মন্তব্য করেন টিএসএমসির শীর্ষ এ কর্মকর্তা। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এআইসংশ্লিষ্ট ডাটা সেন্টারের চাহিদা বেড়েছে এবং প্রচলিত সার্ভারের চাহিদা কিছুটা কমে এসেছে। তবে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত ডিভাইস ও কনজিউমার ইলেকট্রনিকস পণ্যের চাহিদা এখনো দুর্বল। 

ওভারক্যাপাসিটি নিয়ে সিসি ওয়েই বলেন, ‘কিছু কোম্পানি পুরনো কম উন্নত চিপ তৈরির জন্য অনেক বেশি কারখানা তৈরি করছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেশি হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে টিএসএমসির কৌশল ভিন্ন। আমরা মূল গ্রাহকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তাদের চাহিদা পূরণে বিশেষ ধরনের চিপ প্রযুক্তি সরবরাহ করব আমরা। এ কৌশলের কারণে পুরনো চিপের বাজারে টিএসএমসির সরবরাহ বেশি হওয়ার আশঙ্কা নেই।’ 

মূলত চীনের নির্মাতারা কম উন্নত চিপের জন্য নতুন বিনিয়োগ করতে পারেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেশটির এ খাতে অগ্রগতি রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে চিপ তৈরির সরঞ্জামের রফতানি কমিয়েছে ওয়াশিংটন। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় চিপ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং। শিল্প সংস্থা সেমির মতে, বিশ্বব্যাপী ৪২টি প্রকল্পের মধ্যে ২০২৪ সালে ১৮টি চীনা চিপ প্লান্ট উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে।

এদিকে টিএসএমসি চলতি বছর বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য তার সামগ্রিক প্রক্ষেপণ ১০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে যা বছরের শুরুতে ১০ শতাংশেরও বেশি ছিল। এছাড়া বৈশ্বিক চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাণ শিল্পে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস করেছিল টিএসএমসি। তবে তা এখন কমিয়ে ১৪ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। টিএসএমসি নিজেদের ২১ শতাংশ থেকে ২৬ শতাংশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখেছে। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের মতে, গত বছর অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ৮ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।

টিএসএমসি মূলত অ্যাপল, অ্যামাজন, এনভিডিয়া, কোয়ালকম, এএমডি ও মিডিয়াটেকসহ প্রায় সব বড় চিপ উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে থাকে। জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির সম্প্রসারণের ফলে টানা তিন প্রান্তিকে নিট মুনাফা কমার পর চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাইওয়ানের এ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে। বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) নিট মুনাফা হয়েছে ৬৯০ কোটি ডলার যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।