টেলিকম খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ফাইভজি মোবাইল প্রযুক্তির প্রসার ও ব্যবহার। ফোরজির তুলনায় সর্বশেষ প্রজন্মের এ নেটওয়ার্ক দ্রুতগতির ডাউনলোড স্পিড, বেশি ডাটার আদান-প্রদান ও কম ল্যাটেন্সির মতো নানা সুবিধা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস বলছে, ফাইভজির ফলে আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী মাসিক মোবাইল ডাটার ব্যবহার ৩০০ এক্সাবাইট (১০ লাখ টেরাবাইটে ১ এক্সাবাইট) ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। জার্মানিভিত্তিক ডাটা বিশ্লেষণ প্লাটফর্ম স্ট্যাটিস্টার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা বলছে, বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি ব্যবহারকারী মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট চালায়। গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশন ইন্টেলিজেন্সের (জিএসএমএ) সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর ৪৬০ কোটি মানুষ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৭ শতাংশ।
ইন্টেলের ফাইভজি ব্যবসা ও প্রযুক্তি বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার রবার্ট জে. টোপল বলেন, ‘ফাইভজি হবে স্মার্টফোন-পরবর্তী যুগের সূচনা। তবে প্রথমে এটি ফোনেই চালু হচ্ছে। কারণ সংযোগের দিক থেকে স্মার্টফোন মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাইভজি প্রযুক্তির দ্রুত গতি ও কম ল্যাটেন্সি (ডাটা পাঠানো থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়া পর্যন্ত সময়) ব্যবহারকারীদের আরো বেশি ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিং ও উচ্চমানের কনটেন্ট ব্যবহারে উৎসাহিত করবে। ফলে মোবাইল ডাটা খরচ বহুগুণে বেড়ে যাবে। এছাড়া আল্ট্রা-এইচডি ভিডিও, এআর/ভিআর অভিজ্ঞতা, ক্লাউড গেমিং ও লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মতো ডাটানির্ভর সেবা আরো জনপ্রিয় হবে। পাশাপাশি আইওটি প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে স্মার্ট হোম ডিভাইস, সেন্সর ও স্মার্ট গাড়ি ২৪ ঘণ্টা তথ্য আদান-প্রদান করবে। ফলে ডাটার চাহিদা আরো বেড়ে যাবে।
স্ট্যাটিস্টার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মোবাইল সংযোগে ফাইভজি প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশেরও বেশি পৌঁছতে পারে। তবে অঞ্চলভেদে পার্থক্য থাকবে। কারণ অনেক জায়গায় রয়েছে ফাইভজি অবকাঠামোর অভাব, নেটওয়ার্ক অপারেটরদের উচ্চ খরচ ও ফাইভজি ফোনের কম সহজলভ্যতা।
উত্তর আমেরিকায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ফাইভজি ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু সাব-সাহারান আফ্রিকায় এ হার ২০ শতাংশের নিচে থাকতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, টেলিকম খাতের পাশাপাশি ফাইভজি চালুর ফলে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক শিল্পগুলোয় বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।
এরিকসনের হালনাগাদ মবিলিটি রিপোর্ট বলছে, বর্তমানে বিশ্বে ৩০০-এর বেশি কমিউনিকেশন সার্ভিস প্রভাইডার (সিএসপি) ফাইভজি সংযোগ সরবরাহ করছে। এদের মধ্যে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ফাইভজি এসএ চালু করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত ফাইভজি নেটওয়ার্কের পরিধি ও ব্যবহারকারী বাড়ছে। সে হিসাবে ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ মোট মোবাইল ব্যবহারকারীর ৬০ শতাংশই ফাইভজি নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফাইভজি সেবার গুণগতমান মূল্যায়ন করা হয় ব্যবহারকারীদের গড় ডাউনলোড গতির ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে ২০২৫ সালে ৪৩৫ এমবিপিএস গড় গতির মাধ্যমে শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা বুলগেরিয়ার ১৯৯ এমবিপিএস থেকে অনেক বেশি।
স্ট্রেটস রিসার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডাটার ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি ফাইভজি প্রযুক্তি বিভিন্ন শিল্পখাতে নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআই ও আইওটি ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়বে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লাভজনক হবে।










