মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে ঋণ করেছিলেন সাভারের নারগিস বেগম। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। স্বামী অসুস্থ থাকায় পরিবারের উপার্জনও ছিল সীমিত। ঋণ শোধ ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০২২ সালের মে মাসে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি।

আশা ছিল, কয়েক বছর কাজ করে ঋণ পরিশোধ করবেন, সংসারের অভাব ঘোচাবেন। কিন্তু সেখানে মাসের পর মাস তাকে খেতে হয়েছে হাতে মেপে দেয়া দুই মুঠো মোটা চালের ভাত ও সেদ্ধ আলু। অসুস্থ অবস্থায়ও কাজ করতে হয়েছে, পাননি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও।

সৌদি আরবে যাওয়ার আগে পরিচিত এক ‘ধর্মবোন’ তাকে ভালো বেতন ও বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে থাকতেন। তার আশ্বাসে পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করেই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নারগিস। তার অভিযোগ, যাওয়ার আগে কোনো ভাষা বা কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কিনা, তাও তাকে জানানো হয়নি।

সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর যে নিয়োগকর্তার বাসায় কাজ করার কথা ছিল, তিনি তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে বোন জামাইয়ের পরিচিত এক এজেন্সির অফিস থেকে তাকে অন্য বাসায় পাঠানো হয়। সেখানে প্রথম দিকে রান্না করে খাওয়ার অনুমতি থাকলেও কয়েক দিন পর খাবারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

নারগিস বলেন, ‘এক শুক্রবার দুই পিস মুরগি আর একটা আলু রান্না করেছিলাম। এরপরই বলা হলো, মুরগি এক পিসের বেশি খাওয়া যাবে না। কিন্তু ভাত খাব কী দিয়ে? শুধু সেদ্ধ আলু, মরিচও দেয় না।’

এক বেলার জন্য হাতে মেপে দুই মুঠোর বেশি চাল রান্না করতে দেয়া হতো তাকে। চালও ছিল মোটা ও নিম্নমানের। নারগিস বলেন, ‘আমার হাতের দুই মুঠো চালের বেশি রান্না করতে দিত না। আর সঙ্গে শুধু আলু। এগুলা দিয়েই খেতে হতো।’ বাংলাদেশ থেকে নেয়া শুকনা মরিচ শেষ হয়ে গেলে নিজের টাকায় কাঁচা মরিচ কিনে খাবার খেতেন তিনি। সকালের নাশতায় জুটত এক কাপ রঙ চা ও একটি পাউরুটি। এগুলো খেয়েই সারা দিন বাসার কাজ করতে হতো।

পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে নারগিসের। মাথা ঘোরা ও ব্যথার কথা জানিয়ে ওষুধ চাইলেও দেয়া হতো না। একদিন কাজ করতে করতে মাথা ঘুরে সিঁড়ি থেকে পড়ে যান। শরীরে ব্যথা নিয়ে শুয়ে থাকলেও কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ হয়নি। তার অভিযোগ, এ সময় তাকে ‘বাংলাদেশী মিসকিন’ বলে অপমান করা হয়। কাজ দ্রুত করার জন্য একপর্যায়ে চোখের কাছেও আঙুল দিয়ে খোঁচা দেয়া হয়েছিল।

একদিন বাথরুমেও পড়ে যান নারগিস। শরীরে শক্তি না থাকায় উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। অনেকক্ষণ পড়ে থেকে ডাকাডাকি করেন। নাগরিস বলেন, ‘আমি তো একটা মানুষ। আমার শরীরে শক্তি থাকতে হবে। না খেয়ে আমি কাজ করব কীভাবে?’ দেশে ফেরার কথা বললে কাজ না করলে জেলে যেতে হতে পারে বলেও ভয় দেখানো হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে অসুস্থতায় গলার টিউমার বড় হয়ে যায়, কণ্ঠস্বরও পরিবর্তিত হতে থাকে। অসুস্থতার কারণে রমজানে একপর্যায়ে বিছানা থেকে উঠতেও পারছিলেন না। বাসার অন্য সদস্যরা ইফতার করলেও তার জন্য খাবারের ব্যবস্থা হতো না বলে জানান নারগিস। নিজের কেনা বিস্কুট, মুড়ি ও চানাচুর খেয়ে পানি পান করে রোজা রাখতেন।

নারগিস বলেন, ‘ওরা ইফতার খেত, আর আমি বিস্কুট, মুড়ি, চানাচুর খেয়ে পানি পান করতাম। কেউ জিজ্ঞেসও করত না, আমি খেয়েছি কিনা।’

যার কথায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, সেই পরিচিত ‘ধর্মবোনের’ সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া পাননি নারগিস। পরে একটি এজেন্সির আশ্বাসে বাসা থেকে বের হন। কিন্তু কেউ তাকে নিতে না আসায় একটি পেট্রল পাম্পে আশ্রয় নেন। সেখানে কয়েকজন বাংলাদেশীর সহায়তায় এজেন্সির অফিসে যান নারগিস। এরপর প্রায় এক মাস একটি বাসায় রাখা হয় তাকে।

সেখানে জানতে পারেন, যে বাসায় কাজ করতেন, সেই বাসার কফিল (নিয়োগকর্তা) তার বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেছেন। নারগিসের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অভিযোগে তাকে এক দিন এক রাত থানায় থাকতে হয়। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ২০২৩ সালের অক্টোবরে দেশে ফেরেন তিনি।

দেশে ফিরে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহায়তায় চিকিৎসা নেন নারগিস বেগম। নতুন করে বাঁচার অবলম্বন হিসেবে কর্মসংস্থানের জন্য সংস্থাটি তাকে দেয় ৮০ হাজার টাকা। সেই অর্থেই সাভারে গড়ে তোলেন মুদি দোকান। যে মেয়ের বিয়ের ঋণ শোধ করতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেই বিদেশযাত্রাই তাকে ঠেলে দিয়েছিল অনিশ্চয়তা, অনাহার আর অসুস্থতার এক দুঃসহ অভিজ্ঞতায়। সেই ক্ষত নিয়েই এখন সময় কাটে তার।