বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় চিপ ডিজাইনার আর্ম সম্প্রতি ৪০ বছরে পদার্পণ করেছে। আর্মের প্রযুক্তি এখন ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডিভাইসে ব্যবহার হচ্ছে। চার দশক আগে একটি কাঠের গুদামে যাত্রা করা কোম্পানিটি এখন স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ডাটা সেন্টার পর্যন্ত নানা ধরনের ডিভাইসের জন্য চিপ ডিজাইন করছে। আর্মের চিপগুলো সময়ের সঙ্গে সারা বিশ্বে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মোবাইল ডিভাইস।
১৯৮৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে অবস্থিত অ্যাকর্ন কম্পিউটারসের একটি ছোট দল নতুন ধরনের প্রসেসর তৈরির চিন্তা করে। এমন ধারণা থেকেই ইঞ্জিনিয়ার সোফি উইলসন ও স্টিভ ফার্বার আর্ম১ চিপটি ডিজাইন করেন। এটি একটি মাইক্রো কম্পিউটার চালানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আর্ম১ ছিল একটি ৩২-বিট প্রসেসর, যা সহজ ও দ্রুত কম্পিউটেশন করতে কমান্ডের সংখ্যা কমিয়ে দক্ষভাবে কাজ করার জন্য ডিজাইন করা হয়। এটি একবারে বড় তথ্য প্রক্রিয়া করতে পারত।
আর্ম১ প্রসেসরটি খুব কম বিদ্যুৎ খরচের জন্য ডিজাইন করা হয়। এরপর আর্ম২ প্রসেসর তৈরি করা হয় অ্যাকর্ন আর্কিমিডিসে ব্যবহারের জন্য। অ্যাকর্ন আর্কিমিডিস ছিল প্রথম রিস্ক (RISC) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হোম কম্পিউটার। তারপর এল আরো উন্নত কর্মক্ষমতার আর্ম৩।
১৯৯০ সালে অ্যাকর্ন থেকে আলাদা হওয়ার পর আর্ম লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল অ্যাকর্ন, অ্যাপল ও ভিএলএসআই কোম্পানির একটি যৌথ উদ্যোগ। তাদের প্রথম বাণিজ্যিক সাফল্য ছিল অ্যাপল নিউটন নামে একটি পোর্টেবল ডিভাইস। এরপর আর্ম প্রযুক্তি মোবাইল ফোনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতে শুরু হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নকিয়া ৬১১০।
১৯৯১ সালে আর্ম৬ পুরো ৩২-বিট প্রসেসিং ও এমএমইউ (মেমরি ম্যানেজমেন্ট ইউনিট) নিয়ে আসে, যা জিএসএম মোবাইল ফোন চালানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০০৫ সালে নতুন একটি প্রসেসর নিয়ে আসে আর্মভি৭। প্রযুক্তিটি প্রাথমিক পর্যায়ের স্মার্টফোনগুলো চালানোর জন্য ব্যবহার হয়। তারপর ২০১১ সালে আর্মভি৮ ক্লাউড, ডাটা সেন্টার, মোবাইল ও অটোমোটিভ কম্পিউটিংয়ের জন্য ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। নতুন ফিচারগুলো কর্মক্ষমতা ও এআই সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে তোলে।
২০২১ সালে আর্মভি৯ আর্কিটেকচারের উন্মোচনটি এআই-ভিত্তিক কাজের জন্য এক নতুন দিক উন্মোচন করে। নতুন সংস্করণের ফিচারগুলো স্মার্টফোনের উন্নত ইমেজ প্রসেসিং থেকে শুরু করে এআই সার্ভারে পর্যন্ত ব্যবহৃত হচ্ছে।
আর্মের প্রথম চিপ আর্ম১ ছিল মাত্র ২৫ হাজার ট্রানজিস্টরের তৈরি, কিন্তু আজকের আর্মভি৯ চিপে রয়েছে ১০০ মিলিয়ন গেট। অর্থাৎ প্রায় ৪০ বছরে চিপের সক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে। আগের চিপগুলো ছিল খুবই সাধারণ এবং কম শক্তিশালী, কিন্তু বর্তমানে এগুলো অনেক বেশি দ্রুত ও শক্তিশালী। ফলে আর্মের ডিজাইনকৃত চিপ স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্য অনেক ডিভাইসে ব্যবহার হচ্ছে।
প্রযুক্তির এ অগ্রগতি সারা বিশ্বের কম্পিউটিং ক্ষমতাকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে গত চার দশকে। আর্মভিত্তিক চিপ এখন ছোট সেন্সর থেকে শুরু করে পূর্ণমাত্রায় ডাটা সেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটারসহ অনেক ডিভাইসে ব্যবহৃত চিপের আর্কিটেকচার ডিজাইনের জন্য পরিচিত আর্ম হোল্ডিংসের সঙ্গে ২০২৩ সালে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে অ্যাপল। আর্ম হোল্ডিংস প্রতিষ্ঠার সময় অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম টেক জায়ান্ট। বর্তমানে ৯৯ শতাংশ স্মার্টফোনই আর্ম আর্কিটেকচারের ওপর চলছে। সেই সঙ্গে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ক্লাউড ও এআইয়ের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ছে। শক্তি সাশ্রয়ী ডিজাইন ও নমনীয় লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার কারণে আর্ম আরো বিস্তৃত হচ্ছে।
টেকরাডার অবলম্বনে










