চলতি বছরের শুরু থেকেই সাইবার অপরাধ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় এবং জটিল রূপ নিয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থান। প্রযুক্তির সহায়তায় সাইবার অপরাধীরা এখন নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ৮২ হাজার কোটি বা ১৩ দশমিক ৮২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। জার্মানিভিত্তিক অনলাইন প্লাটফর্ম স্ট্যাটিস্টার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইন্টারনেট, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করেই সাইবার হামলা চালানো হয়। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আছে, ব্যক্তিগত বা সংস্থার গোপন তথ্য চুরি, ডাটাবেস বা অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা, ভুয়া ই-মেইল, লিঙ্ক বা ওয়েবসাইট তৈরি করে পাসওয়ার্ড বা ব্যাংক তথ্য হাতিয়ে নেয়া, কম্পিউটার বা ডাটা আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি (র‍্যানসমওয়্যার)। এছাড়া সাইবার হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা করা। কিংবা ক্ষতিকারক সফটওয়্যার ছড়িয়ে ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেয়া।

সম্প্রতি সাইবার সিকিউরিটি কোম্পানি হর্নেটসিকিউরিটির গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর বিশ্বব্যাপী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ২ হাজার ৫০ কোটি ই-মেইল পেয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল অবাঞ্ছিত। এর মধ্যে ২ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থাৎ ৪২ কোটি ৭৮ লাখ ই-মেইলে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছিল।

বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির এখন অন্যতম কারণ সাইবার হামলা। র‌্যানসমওয়্যার আক্রমণে হ্যাকাররা মুক্তিপণ দাবি করে, অর্থ না দিলে ডাটা হারানো বা ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফিশিং ই-মেইল বা ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নিয়ে সরাসরি টাকা তুলে নেয়া হচ্ছে। এছাড়া কোনো গ্রাহকের তথ্য ফাঁস হলে অনেক দেশে কোম্পানিকে আইনগত জরিমানা গুনতে হয়।

আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোস প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে র‍্যানসমওয়্যার হামলার অর্ধেকেরও বেশি ঘটনায় সফলভাবে মুক্তিপণ আদায় করতে সক্ষম হয় সাইবার অপরাধীরা। গত জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে এমন আক্রমণের শিকার প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান হ্যাকারদের অর্থ পরিশোধ করে তথ্য পুনরুদ্ধার করেছে। তবে যদিও এসব কোম্পানি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাইবার অপরাধীদের দাবি করা অর্থের চেয়ে কমে সমঝোতায় পৌঁছতে পেরেছে। এছাড়া ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী র‍্যানসমওয়্যার হামলার শিকার ভুক্তভোগীরা প্রায় ১১০ কোটি ডলার মুক্তিপণ দিয়েছেন।

গবেষণায় র‍্যানসমওয়্যার আক্রমণের সবচেয়ে বড় প্রবেশপথ হিসেবে সফটওয়্যারের অজানা দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় বেশির ভাগ আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানই জানত না যে হ্যাকাররা কোন জায়গা থেকে আক্রমণ চালিয়েছে।

জুনের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিচালিত সাইবার হামলা, যেমন ডিপফেক ফিশিং সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে। এসব অত্যাধুনিক হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা কঠিন হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ এ বছর প্রায় ১০ দশমিক ২৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনের দিনগুলোয় র‍্যানসমওয়্যারের হামলা বাড়তে পারে। হ্যাকার গ্রুপগুলো বড় পরিসরে তথ্য চুরির দিকে মনোনিবেশ করছে। ফলে আগামীতে ভুক্তভোগী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আরো বেশি মুক্তিপণ আদায় হতে পারে।