Baba Adam was a very powerful Darwish, who came to this part of the country with an army during the reign of Ballal Sen. Having encamped this army near Abdullapur, a village about 3 miles to the north-east, he caused pieces of cow’s flesh to be thrown with in the walls of Hindu prince's fortress. Ballal Sen was very irate and sent messengers througthout the country to find out by whom the cow had been slaughtered. One of the messengers shortely returned and informed him that the leader was then praying with in a few miles of the place. Ballal Sen at once galloped to the spot, and found Baba Adam still praying and at one blow cut off his head.
ইংরেজি ভাষ্যে ওপরের দীর্ঘ উদ্ধৃতি প্রায় দেড় শতাব্দী আগে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রাচ্যবিদদের অন্যতম ডক্টর জেমস ওয়াইজের একটি নিবন্ধ থেকে গৃহীত (জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, ১৯৮৩, খণ্ড ৪২, পৃষ্ঠা ২৮৫)। তিনি তৎকালীন বিক্রমপুর মহকুমার রামপালের কাছাকাছি অবস্থিত একটি মসজিদের কেন্দ্রীয় প্রবেশদ্বারের ওপর পাওয়া দুই লাইনের একটি আরবি প্রস্তর লিপির পাঠ, ইংরেজি অনুবাদ এবং মসজিদসংলগ্ন একটি সমাধি, যেটি বাবা আদম শহীদের কবর হিসেবে পরিচিত, এর পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে স্থানীয় একটি জনশ্রুতিকে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। লিপিটির একটি রাবিং (ছাপ) জেমস ওয়াইজ ও আলেকজান্ডার কানিংহাম এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের মাধ্যমে সমকালীন প্রাচ্যবিদ-লিপিবিশারদ-গবেষক হেনরি ব্লখম্যানের কাছে পাঠিয়েছিলেন। জেমস ওয়াইজ ও আলেকজান্ডার কানিংহামের মসজিদটি এখনো বাবা আদমের মসজিদ হিসেবে পরিচিত। এটি বর্তমান মুন্সিগঞ্জ সদর থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে সিপাহিপাড়া মোড় থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত। স্থানটি মীরকাদিম থানার দরগাবাড়ি হিসেবে পরিচিত। ১৮৪০-এর দশকে ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেলর তার A Sketch of the Topography and Statistics of Dacca গ্রন্থে বাবা আদম শহীদ এবং হিন্দু রাজা বল্লাল সেনের লড়াই নিয়ে প্রচলিত আরেকটি কিংবদন্তি নথিভুক্ত করেন। টেলর প্রদত্ত কাহিনীটি জেমস ওয়াইজের বর্ণিত ঘটনা থেকে কিছুটা ভিন্নতর এবং এতে রয়েছে বেদনা-ত্যাগ-রোমাঞ্চ মিশ্রিত পরিসমাপ্তি। এখানে রাজা বল্লাল সেন জয়ী হয়েও পরাজিত। মুসলিমদের সাধক বায়াদুম্ব-এর (সম্ভবত বাবা আদমের সংস্কৃত রূপ) নেতৃত্বে থাকা বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে হারালেও প্রকৃতির নিয়মে হেরে গেছেন নিজের পাতানো জালে। জেমস টেলরের উপস্থাপিত কিসসাটি ছিল নিম্নরূপ:
কথিত আছে, বিক্রমপুরের শেষ হিন্দু রাজা এবং তদীয় পরিবাররা মুসলমানদের আগমন সংবাদে অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিংবদন্তি এই যে রাজা তার রাজ্য-আক্রমণকারীদের মোকাবেলা করার জন্য বের হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে একটি সংবাদবাহক কবুতর সঙ্গে করে নিয়ে যান। রাজপ্রাসাদে পরিবারের লোকজনদের নিকট কবুতরটির ফিরে আসার অর্থ ছিল রাজার পরাজয়ের দুঃসংবাদ, সুতরাং আত্মহত্যা করার সংকেত। রাজা জয় লাভ করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি যখন সারাদিনের যুদ্ধের ক্লান্তি শেষে নদী থেকে জলপানের জন্য ঝুঁকে পড়েন, তখন তার পোশাকের গোপন স্থান থেকে পাখিটি পলায়ন করে এবং এর তার নির্দিষ্টি স্থানে অর্থাৎ রাজপ্রাসাদে উড়ে যায়। রাজা দ্রুত গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, কিন্তু তখন এ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পরিণতি এড়ানোর পক্ষে খুব বিলম্ব ঘটে গেছে। পরিবারদের জ্বলন্ত চিতার অগ্নিধুম্র তখনো নির্গত হচ্ছিল; রাজা তাতে নিজেও ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলেন। এভাবে ভারতবর্ষের এ অংশে হিন্দু রাজাদের শেষ বংশের রাজত্বের অবসান হয়ে যায়। (মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অনূদিত, পৃষ্ঠা ৪৮)
জেমস টেলরের শেষ উদ্ধৃতি ইতিহাসের তথ্যাদির আলোকে মেনে নেয়া কষ্টকর। কেননা বিক্রমপুর প্রাচীন বাংলার অন্যতম জনপদ বঙ্গের অংশ। বখতিয়ার খলজির আক্রমণের পর সেন রাজারা বিশেষত লক্ষ্মণ সেনের দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন এবং কেশব সেন শ্রী বিক্রমপুর অবস্থিত রাজধানী (শ্রীবিক্রমপুরসমাবাসিতশ্রীমজ্জয়স্কন্ধবারাত) থেকে ভূমিদান করে তাম্রশাসন ইস্যু করেছিলেন।
উনিশ-বিশ শতকে সংগৃহীত স্থানীয় জনমুখে প্রচলিত কিংবদন্তিতে রাজা বল্লাল সেনের প্রতিপক্ষ মুসলিম সুফির নাম পাওয়া যায় বাবা আদম শহীদ (বল্লাল সেনের সঙ্গে যুদ্ধে যিনি শাহাদাৎবরণ করেছিলেন)। এ কিংবদন্তির আক্ষরিক গ্রহণযোগ্যতা ইতিহাসের শাস্ত্রীয় কায়দায় নেই। নিরেট লিপি প্রমাণে বল্লাল সেনের সময় অনুমানিক (১১৬০-১১৭৮ সাল) এবং তদীয় পুত্র লক্ষ্মণ সেন তারপর সিংহাসনে আরোহণ করেন। অন্যদিকে কিংবদন্তি শহীদ সুফির নাম পাওয়া যায় না বাবা আদমের মসজিদের শিলালিপিতে। এই প্রস্তর লেখটিকে প্রাসঙ্গিক সূত্র হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তুঘরা রীতিতে খোদাইকৃত সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহের সময়ের লিপিটির বাংলা অনুবাদ হলো:
প্রথম লাইন:
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘এবং প্রকৃতপক্ষে মসজিদের মালিক শুধু আল্লাহ; তাই আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করোনা’ (৭২:১৮)। নবী (সা.) বলেন, ‘ যে ব্যক্তি একটি মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ তার জন্য বেহেশতে অনুরূপ একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন।’
দ্বিতীয় লাইন:
সুলতান পুত্র সুলতান জালাল আল-দুনিয়া ওয়ালদীন
আবুল মুজাফফার ফাতহ শাহ ইবনে মাহমুদ শাহ সুলতানের শাসনামালে আটশ আটাশি (৮৮৮) হিজরি সনের রজব মাসের মাঝামাঝি (আগস্ট ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দ)।
(মুহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক, নিদ্রিত মুদ্রার মুখরিত লিপি-বাংলার আরবি- ফার্সী লেখমালা (১২০৫-১৪৮৮ সাল), পৃষ্ঠা: ৫২৯
কিংবদন্তির চরিত্র বল্লাল সেন আর বাবা আদমের মসজিদের মধ্যকার কালিক দূরত্ব প্রায় তিন শতাধিক বছর। মসজিদটির সম্মুখে থাকা করবটিতে কোনো লিপি না থাকলেও স্থানীয়দের কাছে এটি বাবা আদমের সমাধি হিসেবেই সমধিক পরিচিত। শিলালিপিটির ও প্রায় তিন দশক পর আনুমানিক ১৫১০ সালে আনন্দভট্ট রচিত বল্লাল চরিত গ্রন্থে ঔপনিবেশিক আমলের গবেষকদের উত্থাপিত কিংবদন্তির ঠিকুজির সন্ধান মেলে। সংস্কৃত ভাষায় রচিত পুস্তকটিতে বল্লাল সেনের সঙ্গে বায়াদুম্ব’র যুদ্ধের বর্ণনা দেয়া আছে। সংস্কৃত ভাষায় লেখা গ্রন্থটির অনুবাদক শ্রী দীননাথ ধর বল্লাল-চরিত-এর ষোড়বিংশ অধ্যায়ে বর্ণিত কাহিনীকে বাংলায় উপস্থাপন করেন নিম্নোক্ত ভাষায়:
সেই পূর্ব নির্বাসিত ধর্ম্মগিরি... শত্রুতার প্রতিশোধ লইবার বাসনায় বায়াদুম্ব নামক ম্লেচ্ছেশ্বর সাহিত মিলিত হইয়াছিলেন।
বল্লালের বিপুল ধনরত্ব ও রাজ্যাধিকারের কথা শ্রুত হইয়া সেই ম্লেচ্ছরাজ সসৈন্যে রাত্রিযোগে বিক্রমপুর আক্রমণ করিয়াছিলেন।
স্বীয় সৈন্য মধ্যে সেই ধুম্রবর্ণ ধর্নুদ্বারী বায়াদুম্ব ইন্দ্রধনুযুক্ত মেঘের ন্যায় গর্জ্জন ও লম্ফঝম্ফ করিয়াছিলেন। তাহার সৈন্য সকল সাগরের ন্যায় দৃষ্ট হইয়াছিল! তাহাদের লম্ফ দান সাগর তরঙ্গের তুমুল শব্দ সমবোধ হইয়াছিল। আর তাহাদিগের অট্টহাসি জলরাশির ক্রীড়ার ন্যায় শোভা পাইয়াছিল। পাঁচ হাজার ম্লেচ্ছ সৈন্যের পদাঘাতে-পৃথিবীর কম্পিত এবং তাহাদের অহংকারে দিঙমণ্ডলকে মুখরিত ও নৃত্যশীল করিয়াছিল।
অনন্তর অন্তঃপুরস্থিত ও ভোগসুখ নিরত এবং তজ্জন্য এই সমস্ত ব্যাপার অবিদিত রাজা বল্লাল সেন বহুক্ষণ পরে তৎসমস্ত বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তখন প্রাতঃকালে সেই বিশাল শব্দ শুনিতে পাইয়া কান্তা ভুজলতা পরিত্যাগ করিয়া তিনি অসিলতা গ্রহণ করিয়াছিলেন...
যুদ্ধার্থ গমনশীল রাজার সেনা বিবিধ অস্ত্রধারী, গজারোহী, অশ্বারোহী, রথী ও পদাতিক দ্বারা শোভা পাইতেছিল। অনন্তর ও ম্লেচ্ছ ক্ষয়কারী এক তুমুল যুদ্ধ হইয়াছিল এবং তাহাতে হত ও আহত যোদ্ধাগণের শোনিতে ধরণী প্লাবিত হইয়াছিল শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে যখন আবদ্ধ করিয়াছিলেন রাজা বল্লাল বিনষ্ট সৈন্য মহাবল জজ বায়াদুম্বকে সেই রূপ এই যুদ্ধে অবদ্ধ করিয়াছিলেন। বাসব যেমন নমুচির মস্তক ছেদন করিয়াছিলেন তদ্রূপ ক্ষিপ্রহস্ত বল্লাল অতি বেগ ও বিক্রম সহকারে বায়াদুম্বর মস্তক ছেদন করিয়াছিলেন...
(শ্রীমদানন্দ ভট্ট-বিরচিত সংস্কৃত বল্লাল-চরিত-এর বঙ্গানুবাদ, অনুবাদক শ্রী দীননাথ ধর, কলকাতা ১৯০৬, পৃষ্ঠা ১০৯-১১)
লেখক আনন্দভট্টের লিখিত পরের কাহিনীটুকু জেমস টেলরের লেখায় ইংরেজি ভাষ্যে উপস্থাপিত হয়েছিল।
বল্লাল চরিত-এর উপস্থাপিত তথ্যাদির কালানুক্রম দোষ এবং অধিকমাত্রায় কল্পনার আবেশে জড়িয়ে আছে। তবে উপর্যুক্ত বর্ণনা থেকে মুসলিম সাধক বায়াদুম্ব বা বাবা আদমের কিছু তথ্যকে একসঙ্গে দেখা যেতে পারে:
(ক) বায়াদুম্ব ছিলেন ম্লেচ্ছশ্বর বা ম্লেচ্ছদের নেতা;
(খ) ধর্ম্মগিরি রাজা বল্লাল সেনের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বায়াদুম্বের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন;
(গ) রাজা বল্লাল সেনের রাজ্য ও অর্থসম্পদ হাসিল করার জন্য বায়াদুম্ব রাতের বেলায় বিক্রমপুর আক্রমণ করেছিলেন;
(ঘ) এ সময় বায়াদুম্ব ও ধর্ম্মগিরিরর যৌথ সৈন্যবাহিনীর সৃষ্ট ধ্বনি চারদিকে মেঘের মতো তর্জন-গর্জন সৃষ্টি করেছিল;
(ঙ) বায়াদুম্বের বাহিনীতে পাঁচ হাজার মুসলিম সৈন্য ছিল;
(চ) বল্লাল সেন যুদ্ধের এক পর্যায়ে বায়াদুম্বকে হত্যা করেন।
এ কিংবদন্তির সব তথ্যাদিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলার ইসলাম বিস্তার প্রক্রিয়ায় যেসব সুফিকে অগ্রনায়ক ধরা হয় বাবা আদম শহীদ বা বায়াদুম্ব তাদের মধ্যে অন্যতম। সুফিরা কখনো কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। ফলে কিংবদন্তির মূল কাঠামো বাবা আদম শহীদ এবং বল্লাল সেনের যুদ্ধকে নাকচ করা কিছুটা অযৌক্তিক। তবে তীব্র সংকট হলো সময়ের মানদণ্ড নির্ধারণ। রাজা বল্লাল, সেন বংশের শেষ রাজা, যার রাজ্যকাল দ্বাদশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে আশির দশক। কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর তথা বঙ্গজনপদে সুফি বা সুলতানদের সামরিক অভিযান এবং রাজ্য বিজয়ের সংবাদ পাওয়া যায় না।
রাজনৈতিক ইতিহাসের কাঠামোকে এড়িয়ে বাংলায় তথা পূর্ব ভারতে চিশতিয়া তরিকার সুফিদের ধর্ম প্রচারের ইতিহাস আলোচনায় বিক্রমপুরের রাজা বল্লাল সেনের পরাজয়কে নানা বিতর্কের সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মুহাম্মদ এনামুল হক তার ‘বঙ্গে সুফী প্রভাব’ গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা ৮৫-১০৫) বাংলার কেন্দ্রভিত্তিক (বরেন্দ্র, বঙ্গ, রাঢ়, চট্টলা) কয়েকজন ঐতিহাসিক সুফির পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি বঙ্গকেন্দ্র উপশিরোনামে তৎকালীন ‘রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, শ্রীহট্ট, ঢাকা, ফরিদপুর ও বাখেরগঞ্জ’ জেলার সর্বমোট ২১ জন সুফির তালিকা দিয়েছিলেন। এ তালিকায় দশম স্থানে বাবা আদম (বগুড়ার আদমদীঘি) এবং সতেরতম স্থানে বাবা আদম শহীদ (ঢাকার বিক্রমপুর) ছিলেন। এ গবেষক বল্লাল-চরিত গ্রন্থের কাহিনীকে প্রামাণিক সূত্র ধরে বাবা আদম শহীদকে একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর সুফি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন।
এনামুল হকের ভাষায়:
কাহারও কাহারও মতে এই ‘বল্লাল চরিত’ প্রমাণিত গ্রন্থ নহে। তবে কি বাবা আদম রাজা বল্লাল সেনের রাজত্বকালে বাঙ্গালাদেশে আসেন নাই। তাহাও বা বলা যায় কিরূপে? বাবা আদমের দরগাহসংলগ্ন একটি প্রাচীন মসজিদ ১৪৮৩ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত হয়। ইহাকে লোকে বাবা আদমের মসজিদ বলে। ইহা হইতে বিশদভাবে প্রমাণিত হয়, বাবা আদম ১৪৮৩ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই ‘পূর্ব্বের’ দ্বারা যদি সত্যই রাজা বল্লাল সেনের সময় নির্দেশ করে, তবে তিনি খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে জীবিত ছিলেন; কেননা রাজা বল্লাল সেন, ১১১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। (পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭)
মান্যবর এনামুল হকের উপস্থাপিত যুক্তির দুর্বলতা আনকোরা গবেষকের নজর এড়ানো কষ্টকর। তিনি কিংবদন্তি বা লোকমুখে প্রচলিত গাঁথাকে সত্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন জনস্মৃতিতে থাকা ‘ইহাকে বাবা আদমের মসজিদ বলে’ এ ধারণার মাধ্যমে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মসজিদটির মূল দরজার ওপরে স্থাপিত লিপিটির কোথাও ‘বায়াদুম্ব’ বা বাবা আদমের নামটি উল্লেখ নেই। ইতিহাসবিদ মুহম্মদ আবদুর রহিম মান্যবর এনামুল হকের প্রস্তাবকে সমর্থন করে কেন মসজিদটির নাম লোকমুখে বাবা আদম শহীদের মসজিদ হলো তার যৌক্তিক উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তর্কবিতর্ক আর ইতিহাসবিদের কাটাছেঁড়ার প্রক্রিয়া নিরন্তর। বাংলাদেশের জনজীবনে সুফি-সাধক-দরবেশদের সংশ্লিষ্টতা অনস্বীকার্য। সময়ের মানদণ্ড নিরূপণে গবেষকদের মতান্তর নতুন জ্ঞান সৃষ্টির প্রথাগত প্রক্রিয়া। সেটি চলছে তার গতিতে। পাঠকের মানসজগতে ও গ্রামীণ সমাজের কল্পনার দুনিয়ায় সুফিদের নিয়ে বিরাজমান গাঁথা ইতিহাসেরই উপাদান। বিতর্কের প্রক্রিয়া না বাড়িয়ে বাবা আদম শহীদকে নিয়ে উত্থাপিত আলোচনার ইতি টানছি মান্যবর আবদুর রহিমের টানা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে:
রামপালে বাবা আদম শহীদের একটি সাদাসিধে ধরনের সমাধি রয়েছে। এটি একটি মসজিদের সম্মুখে অবস্থিত।... মসজিদের দালানটি এ সুফি-দরবেশের মাজারসংলগ্ন ছিল। মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র জনসংখ্যা নিয়ে রামপাল ছিল একটি সামান্য গ্রামমাত্র। এর বিশেষ কোনো গুরুত্ব না থাকলে একজন.. সেনাপতি কখনো মসজিদ নির্মাণের জন্য এমন একটি গ্রাম নির্বাচন করতেন না। বাবা আদম শহীদের মাজার স্থানটিকে একটি ধর্মীয় পবিত্রতা ও গুরুত্ব দান করেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে মুসলমানরা এ শহীদের পবিত্র মাজার যিয়ারত করতে সমবেত হতো। এ সমবেত মুসলমানদের নামাজ পড়ার সুবিধার জন্য ইলিয়াস শাহী সুলতানের অধীনস্থ আবিসিনীয় সেনাপতি মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন। সুতরাং যুক্তিসংগত যে মসজিদের চেয়ে মাজারটি অনেক বেশি পুরনো এবং বাবা আদম শহীদ ওই স্থানে এত বেশি সুপরিচিত ছিলেন যে মসজিদে উৎকীর্ণ লিপিতে তার নামে কোনো বিশেষ উল্লেখের প্রয়োজন হয়নি।
(মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অনূদিত বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ১২০৩-১৫৭৬ খ্রী:, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ৭৩)
শহিদুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক
ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





