ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক যুগ থেকেই মসজিদ নির্মাণে মনোযোগী ছিলেন মুসলমানরা। কারণ মসজিদ শুধু ধর্মীয় প্রার্থনার জন্য নয়, সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মক্কা-মদিনার পথ ধরে বাংলা-ভারতজুড়েও এসেছেন অসংখ্য ধর্ম প্রচারক। তাদের একটি বড় অংশ ছিলেন সুফিরা।
বাবা আদম শহীদও তেমনি একজন সুফি সাধক, যিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম প্রচারে নানা দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরের অদূরে তায়েফে ১০৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সুদূর আরব দেশে জন্মগ্রহণ করেও ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যেই বাবা আদম তৎকালীন ভারতবর্ষে এসেছিলেন। বাংলার সেন শাসনামলে ১১৭৮ সালে ধলেশ্বরী নদীর তীরে মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিমে এসেছিলেন তিনি। আবার অনেক ইতিহাসবিদের মতে, দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলায় এসেছিলেন বাবা আদম।
ইসলাম ধর্ম প্রচারে তিনি বাংলা ও অন্য আরো কিছু অঞ্চলে বেশকিছু খানকাহ নির্মাণ করেছেন। এ খানকাহগুলোয় বাবা আদমের ইসলামের দাওয়াতে শরিক হতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ যোগ দিতেন। বাবা আদম শহীদ ১১৪২ সালে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আসেন। সেখান থেকে ১১৫২ সালে মুন্সিগঞ্জ সদরের প্রাচীন রামপালনগরে আসেন। মুন্সিগঞ্জ এলাকার কপালদুয়ার, মানিকেশ্বর ও ধীপুরে তিনটি খানকাহ নির্মাণ করেছিলেন। যেগুলো ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যবহার হতো বলেই জানা যায়। ৮৮৮ হিজরির রজব মাস বা ১৪৮৩ সালের আগস্টে সুলতান জালাল-উদ-দীন ফতেহ শাহের শাসনামলে মালিক কাফুরের তত্ত্বাবধানে ‘বাবা আদম শহীদ জামে মসজিদ’ নির্মাণ করা হয়। এটি মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে এবং বল্লালবাড়ি (রাজা বল্লাল সেনের বাড়ি) থেকে প্রায় উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। যেহেতু বাবা আদম এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে এসে হিন্দু রাজার নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ফলে তার স্মরণে এ মসজিদ নির্মাণ করেন শাসক ফতেহ শাহ। মসজিদের কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপরে থাকা শিলালিপি থেকে এ তথ্যগুলো জানা যায়। মসজিদটিতে রয়েছে পরপর ছয়টি বৃহৎ গম্বুজ, যা আধুনিক মসজিদে গম্বুজ নকশার তুলনায় বেশ আলাদা। গম্বুজের ওপরের দিকে আছে তিন ধাপের গোলাকার চাকতির মতো কাঠামো, যা বাংলার আর কোনো মসজিদে দেখা যায় না।
উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এ মসজিদের আয়তন ১৩ দশমিক ৩ মিটার×১০ দশমিক ৯ মিটার। মসজিদের প্রাচীরগুলো প্রায় ১ দশমিক ৮ মিটার প্রশস্ত। মসজিদে তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এছাড়া এ মসজিদের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দরজার অনুপস্থিতি। তবে সেখানে দরজার পরিবর্তে রয়েছে গভীর কুলুঙ্গি। মসজিদের অভ্যন্তর ভাগে আছে গ্রানাইট পাথরে নির্মিত দুটি স্তম্ভ। স্তম্ভ দুটি মেঝো থেকে ১ দশমিক ২৬ মিটার পর্যন্ত অষ্টকোণাকৃতির। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি অলংকৃত মেহরাব। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অন্য দুটির তুলনায় আকারে বড়। মেহরাবগুলো চিত্রফলক দ্বারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে অলংকৃত ছিল। তবে মসজিদে বহুবার সংস্কারকাজ হওয়ায় অনেক অলংকরণ আর দৃশ্যমান নয়। তবে কেন্দ্রীয় মেহরাবে আদি অলংকরণের কিছু নির্দশন এখনো আছে। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি কয়েক স্তরের খিলানে সজ্জিত। মেহরাবের স্তুম্ভে শিকল ও ঘণ্টার টেরাকোটা মোটিফ এখনো দৃশ্যমান।
মসজিদটি ভেতরের দিকে দুটি কুলুঙ্গি ও তিনটি করিডোর দিয়ে ছয়টি বর্গাকার অংশে বিভক্ত। মসজিদটির মূল ভিত্তি দুটি পাথরের একশিলা স্তম্ভ, এ দুটির ওপর তৈরি খিলান ছাদকে ধরে রেখেছে। এ পাথর স্তম্ভ দুটো গৌড় কিংবা বাগেরহাটের মসজিদের তুলনায় ভিন্ন।
এছাড়া মসজিদের বাইরের দিক বিশেষ করে সামনের দেয়াল অতি সুন্দর করে পোড়ামাটির চিত্রফলক দ্বারা অলংকৃত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেগুলো আর টিকে নেই। তবে কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের দুই পাশে কিছু পোড়ামাটির চিত্রফলক এখনো দেখা যায়। মসজিদের কার্নিশগুলো দুই ধারে কিছুটা বাঁকা হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তর মসজিদটিকে সংস্কার করেছে।
মসজিদটির নিকটে ৭ দশমিক ৫৭ মিটার বাহুবিশিষ্ট বর্গাকার আয়তনের একটি ইষ্টক নির্মিত প্লাটফর্মের ওপর বাবা আদম শহীদের মাজার বলে কথিত একটি পাকা সমাধি আছে। এ মসজিদ ও মাজার দুটো নিয়েই জনমনে প্রচলিত নানা রকমের জনশ্রুতি।
রাজা বল্লাল সেনের হাতে কিংবা নির্দেশে সুফি বাবা আদমের প্রাণ গেছে। উল্লিখিত মসজিদটি বাবা আদম শহীদ নিহত হওয়ার প্রায় ৩০০ বছর পর নির্মাণ করা হয়। উল্লেখিত সময়ে বাংলায় যেসব মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমির মসজিদ। যেটি নেত্রকোনায় অবস্থিত।
রুমিও বাংলায় এসেছিলেন একই উদ্দেশ্যে। ১০৫৩ সালে তিনি নেত্রকোনায় এসেছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচারে। তার মৃত্যু হয় ১০৭৫ সালে এবং এরপর নেত্রকোনায় মদনপুর গ্রামে একটি মাজার নির্মাণ করা হয়। মাজারের পাশেই নির্মিত হয় একটি মসজিদ, যেটি ‘মদনপুরের শাহ সুলতান মসজিদ’ নামে পরিচিত। আগে নির্মিত মসজিদগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাবা আদমের নামে নির্মিত মসজিদটি ছিল কাঠামোগতভাবে বেশ মজবুত ও সুশৃঙ্খলভাবে তৈরি। বর্তমানে মসজিদটি ৫৪৪ বছর পুরনো একটি ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনার অংশ। এখনো মসজিদের ওপরের দিকের ফারসি ভাষায় খোদাই করা কালো পাথরের ফলক চোখে পড়বে। এছাড়া মসজিদের খিলান, দরজা, স্তম্ভের পাদদেশ, মেঝে ও ছাদের কার্নিশের নিচে ইট কেটে মুসলিম স্থাপত্যকলার অর্পূব নকশাও লক্ষ করা যায়।
ফারিহা আজমিন: লেখক





