বাবা আদম শহীদের মাজার ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে অবস্থিত। এখানে এ সুবিখ্যাত দরবেশের একটি দরগাহও রয়েছে। কথিত আছে, রাজা বল্লাল সেন বিক্রমপুরে রাজত্ব করার সময় তিনি কতিপয় সৈন্যসামন্তসহ বল্লাল সেনের রাজ্য আক্রমণ করেন। প্রায় পক্ষকাল যুদ্ধ করেও বল্লাল সেন যুদ্ধ জয় করতে না পেরে ভগ্নহৃদয়ে আত্মবিসর্জন দেন। যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হলে মুসলমান রাজার হস্তে তার পরিবার-পরিজন লাঞ্ছনা ভোগ করবে আশঙ্কায় রাজা রাজ-অন্তঃপুরে চিতা প্রজ্বালিত করে রাখার আদেশ দেন, যাতে তারা রাজার পরাজয়ের ও মৃত্যুর কথা শ্রবণ করা মাত্র জ্বলন্ত অনলে আত্মবিসর্জন করেন। তার পরিবাররা যুদ্ধের ফলাফলের সংবাদ অত্যল্পকালের মধ্যে যাতে পেতে পারেন, এ উদ্দেশ্যে রাজা বল্লাল সেন এক জোড়া সংবাদবাহী পারাবত বস্ত্রাভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখেন। যুদ্ধে রাজা বল্লাল সেনের জয় হয় এবং সব মুসলমান পরাজিত ও নিহত হয়; শুধু বাবা আদম জীবিত ছিলেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই অন্তিম নামাজ সমাধা করতে থাকেন। এর আগে বল্লাল সেন তাকেও নিহত করেন এবং গোসলের জন্য বস্ত্রাদি খুলে নিকটবর্তী কোনো পুকুর ঘাটে গমন করেন। ইত্যবসরে পারাবত যুগল রাজার অজ্ঞাতসারে রাজধানীতে পালিয়ে যায় এবং পুরনারীরা একে একে আত্মহত্যা করেন। বল্লাল সেন পরে যখন রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন রাজধানীতে পুরমহিলারা সবাই প্রাণ বিসর্জন করেছেন। রাজা আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে মর্মবেদনায় কাতর হয়ে স্বয়ং আত্মহত্যা করেন।

গোপালভট্ট কৃত ‘বল্লালচরিতম’ নামক প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে এ বিবরণ রয়েছে১, তবে এ বিবরণ সত্য কিনা তৎসম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ আছে। বাবা আদমের দরগাহসংলগ্ন একটি প্রাচীন মসজিদ ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। এ মসজিদকে লোকে ‘বাবা আদমের মসজিদ’ বলে। বাবা আদম যে ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দের আগে মৃত্যুবরণ করেন, মসজিদ গাত্রে উৎকীর্ণ লিপি থেকে তা জানা যায়।

বল্লাল সেনের বাড়ি থেকে প্রায় অর্ধ মাইল দূরে বাবা আদমের মসজিদটি অবস্থিত। এ স্থান রামপালের সীমানাভুক্ত। মসজিদের গাত্রস্থিত প্রস্তরফলক থেকে জানতে পারা যায় এটি ৮৮৮ হিজরি অর্থাৎ ১৪৮৩ সালে নির্মিত হয়। এর নির্মাতা মালিক কাফুর। সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহর সময় এটি তৈরি করা হয়। ব্লখম্যান, হরিনাথ দে প্রমুখ মসজিদে উৎকীর্ণ পাঠ উদ্ধার করেছিলেন:

The mosque belongs to God. Do not associate any one with God. The prophet, may God bless him, say he who builds a mosque will have a castle built for him by God in paradise. This Jami masjid was built by the great Malik, Malik Kafur, in the time of the king, the son of the king Jalal-ud-din Wauddin Fateh Shah, the King son of Muhammad Shah, The King, in the middle of the month of Rajab 888 Hijri, 1438 A.D.২

কথিত আছে, যে স্থানে বাবা আদম নামাজ পড়তেন, সে স্থান মসজিদের জন্য নির্বাচন করা হয়। মসজিদের সন্নিকটে বাবা আদমের সমাধি বিদ্যমান। সমাধিটি প্রাচীন। পরবর্তীকালে এর সংস্কার করা হয়। বাবা আদমের মসজিদ ও সমাধি পূর্বাঞ্চলে মুসলমানদের প্রাধান্যের প্রমাণ। সে হিসেবে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে পূর্ববঙ্গে মুসলিম প্রাধান্য ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হতে শুরু করে। বাবা আদমের মসজিদ থেকে বরাবর দক্ষিণ দিকে যে পথ গেছে, সে পথ দিয়ে কিছুদূর অগ্রসর হলে দক্ষিণ দিকে একটি দিঘি দেখতে পাওয়া যায়। এ দিঘির নাম ‘কোদাল ধোয়ার দীঘি’।

বাবা আদমের মসজিদটি রামপালের অদূরে কাজী কসবা নামক স্থানে অবস্থিত। কসবা ফারসি শব্দ, অর্থ নগর। রামপালের একটি ভাগের নাম ‘নগর কসবা’। ‘নগর’ বলতে শহর বোঝায় এবং কসবা শব্দের অর্থ নগর। অতএব এরূপ অনুমান করা যায় উত্তরকালে মুসলিম-প্রভাব বিস্তৃত হলে পরে প্রাচীন বিক্রমপুর নগরের বিভিন্ন পল্লীর নামও পরিবর্তন হতে থাকে—যেমন নগর-কসবা, কাজি-কসবা, আবদুল্লাপুর প্রভৃতি।৩

বাবা আদম সম্বন্ধে Archeological survey of India. 1927-1928 রিপোর্টে বিবরণ আছে:

Whatever the historical truth underlying the tradition, it seems clear that Baba Adam must have been one of the earliest pioneers of Islam in Vikrampur, the most important stronghold of Hindu and Buddhist influences in Eastern Bengal in the times immediately preceding the Muhammedan invasion.

(উদ্ধৃতি: যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিক্রমপুরের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, ২য় সংস্করণ ১৩৪৬, পৃ. ২৭)

তথ্যসূত্র

১। যোগেন্দ্র নাথ গুপ্ত, বিক্রমপুরের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, ২য় সংস্করণ ১৩৪৬, পৃ. ৩৫১-৩৫২

২। পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৫৩-৩৫৪

৩। পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৫৪-৩৫৫

লেখক রচিত বাংলাদেশের সূফী সাধক (ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত) গ্রন্থ থেকে সংকলিত