আঁধারের রুপালি ঝাড়

 

হয়তো আমার চাই বল্গা হরিণ

নতুবা কেন যে পথ চলি ভলগা উপত্যকায়,

পায়ের নিচে তুহিন তুষার, ফারের টুপি

শ্বেতভালুকের চামড়ার বিশাল চাপকান,

হাতে চকচকে বর্শা—

হিমেল নিঃসঙ্গতায় পেছনে একাকী অনুসরণ করে

কৃষ্ণ লোমশ আফগান হাউন্ড!

 

অথবা যেন বসে আছি অনন্তকাল স্প্যানিশ প্রস্তরে

মুর রূপসীর মতো চপল উর্বশী ঝরনায়

গহিন রজনীতে তৃষ্ণার্থ হরিণের মতো দলবেঁধে নেমে আসে

নক্ষত্রের সুবর্ণনীল কমলালেবু রঙ ছায়াপথ

আমি বসে থাকি প্রস্তরবত্!

 

কোথায় যেন ফেরাউনের কফিন ঘিরে

কোলাহল করে কথা কয় কতিপয়

প্রত্নতাত্ত্বিক বাদুড়।

 

অই মমির মিসরি স্মৃতি, অই কুহক কল্পনা

আমার চোখের শিশিরে আঁকে—

জেব্রার মতো নকশাকাটা স্বপ্ন!

 

পৌরাণিক নিঃসঙ্গতায় আমার চাই বল্গা হরিণ

অথচ আফগান হাউন্ডের জ্বলজ্বলে সবুজ চোখ

চেতনার সৌরালোকে জ্বালিয়ে রাখে

আঁধারের রুপালি ঝাড়!

 

হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ

 

জানি তোমার এ ঘুম ভাঙিবে না—

                        ভাঙিবে না আর কোনো দিন।

 

শিলালিপির মতো স্থবির তোমার স্মৃতি

দ্যাখো কেমন সবুজ সজীব আজো

মানুষমুখর ঊর্মির মতো বিস্মৃতি ভালোবাসে বড় বেশি

অথচ তুমি ভোলোনি

মনে হয় ভুলিবে না কোনো দিন

           সেই বৃষ্টিভেজা কাঠের বাড়ি

           টালির ছাদে গিলেবাজ কবুতরের গল্প;

সে কার জড়োয়া কাঁকন রিমঝিম শব্দে চন্দ্রাহত বিধুর,

প্রত্যাশার আবলুস আন্ধারে আরশিতে আরতির দীপ জ্বালে!

 

তোমার পদযুগল পর্যটনে ব্যস্ত

ধমনিতে লাফাচ্ছে রক্তিম উচ্ছ্বাস,

গতি ও উষ্ণতা যদি জীবনের মর্মকথা হয়

তথাপি হতাহত মৃত তোমার হূদয়;

তুমি পান করেছ চন্দ্রাহত হীরকচূর্ণের নীল দ্রবণ

মর্মান্তিক গোধূলির অন্তিম আবেগে স্তব্ধ তোমার ভ্রমণ!

 

জোনাকি, শিশির, শঙ্খে চিত্রিত পৃথিবী অনেক... অনেক দূর

স্নায়ুতে শুক্লপক্ষের প্রগাঢ় তিমির

করতলে পতঙ্গের হরিত্ পাপড়ি, গোলাপের বিষণ্ন ডানা

তুমি কোথায় যাবে?

কারা আলেয়ার মতো ডাকছে তোমাকে গভীর নিশীথে!

তুমি পান করেছ চন্দ্রাহত হীরকচূর্ণের নীল দ্রবণ...

 

তোমার করোটিতে কষ্টের হিম স্পর্শ

ঝাউবনের মতো নেশায় গভীর নিসর্গ

মেঘালোকে ডোবা সবুজ পত্ররাজি

যেন কার দীর্ঘশ্বাসের মতো করুণ বাতাস!

 

মর্মর পাথরের চোখে নক্ষত্র অগ্নিতে জ্বলে অশ্রুর লাবণ্য

মনে হয় বুঝিবা পাষাণেরও প্রাণ আছে হর্ষ বিধুর...

তুমি শ্মশানচারীর মতো নিদ্রাবিমুখ... ঘোর অমানিশায়

জানি তোমার এ ঘুম ভাঙিবে না

                       ভাঙিবে না আর কোনো দিন!

 

সম্ভাবনার মৌসুম

আর কিছু নয়—

খানিক শুষ্ক খাবার পানীয় জল— গুছিয়ে ব্যাকপ্যাক,

মানচিত্রে চোখ রেখে ভোরের অরুণিম আভায়

হেঁটে চলি... সম্পূর্ণ অচেনা এ ট্র্যাক;

 

যেতে হবে আজ তুষারের সফেদ কর্দম মাড়িয়ে

চোখ চলে যায় সুনসান বহুদূর,

প্রান্তরের প্রাণরিক্ত ঘাসে মেঘের শুভ্র পালক

আকাশ থেকে নেমে আসে গুঁড়ি গুঁড়ি কর্পূর;

 

বনের হূদমাঝারে ছড়ানো হিমেল শেফালি

তুষারের জায়নামাজে সেজদায় প্রতিবিম্বিত আকাশ,

মেহরাবে তার পাখির তরতাজা পদচিহ্ন—

মনের মুগ্ধ দেহলিতে দেখি—

এ ছাপের প্রজাতি সম্পূর্ণ ভিন্ন;

 

দুপুর অব্দি হেঁটে যাই—

উড্ডয়নপ্রিয় পারিজাতের সন্ধানে...

পেরিয়ে যাই আসমানি ছায়ায় নিমগ্ন জলের ঝোরা

পায়ের আঁকিবুঁকি চলে গেছে দিগন্তের পানে,

কম্পাসে দিক বিচারি পথের শিথানে

পালকের শরীর পাই না কোনোখানে;

 

হাইক করেছি অনেক আজ— মেলেনি খোঁজ

ক্রমশ শেষ হয়ে আসে সম্ভাবনার মৌসুম,

দাঁড়িয়ে থাকে বিষণ্ন বিকালে

তুষার মাখা আমার ব্যথিত বোধিদ্রুম।

 

দেউলের ধসে পাড়া দর দালান—

শ্বেতপাথরের আঙিনায় পাপড়ি ঝরা রজনীগন্ধা,

সন্ধ্যামালতির ঝোপে... পতঙ্গের ধ্বনিতে

বয়ে যায়— জলের হূদয় ঝরায় অলকানন্দা;

 

অর্ঘ্য রেখে বেদিতে... পেছনের কপাট দিয়ে

বেরিয়ে এসেছ তুমি... খুব নীরবে,

তোমার মনমেঘে বৃষ্টি... সুরভিত ধূপ

ঘাসফুল ভিজে যায় শিশিরের অনুভবে;

 

দিবসে গল্পের প্রচ্ছদপট...

অজগরের ত্বকে দিনযাপনের ছাপরেখা,

মসলিনের নেকাব পরে রতিকর্পূর রাত্রি এসে

চুপিসারে দেয় দেখা;

 

তুমি হদিস করো রুপালি গন্তব্যের

যে কালোয়াত রাজ্য অস্তিত্বের অতীত,

নিঃশব্দে বেজে ওঠে তোমার চেতনার

সৌরভ-জল— স্মৃতিতটে সূর্যমুখী সংগীত।