জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব
(বিংশ কিস্তি)
(তৃতীয় অধ্যায় - ১ম পর্ব)
‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় সাহিত্যসমূহের উদ্ভব’
সচরাচর যাকে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের মহত্তম কবি বলে গণ্য করা হয়, সেই জিওফ্রে চসারের জন্য অনুবাদ ছিল অত্যন্ত অপরিহার্য একটি কাজ। চসার যখন দেশীয় ভাষায় লিখে একজন অনুবাদক ও compilator (সংকলক) হিসেবে মর্যাদা ও কর্তৃত্ব লাভ করেছেন, তখনো লাতিন যথেষ্ট সাংস্কৃতিক সম্মানের আসনে আসীন। তিনি লাতিন, ফরাসি ও ইতালীয় থেকে ধ্রুপদী ও দেশীয় রচনা অনুবাদ করেছিলেন, বা অনুবাদ করেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন: Le Roman dela Rose এবং বোয়েথিয়াস, বোক্কাচিও, পেত্রার্ক ও দান্তের রচনার সাহায্যে পরিপুষ্ট হয়ে তিনি তার নিজের রচনায় তার যুগের প্রধান দার্শনিক ও শৈল্পিক চিন্তভাবনাগুলো তুলে ধরেছেন। চসার ও দেশীয় ভাষার প্রথম দিকের লেখকদের ক্ষেত্রে অনুবাদ, সংকলন, পুনর্লিখন ও মৌলিক গ্রন্থকারস্বত্ব পরস্পরের সঙ্গে বিজড়িত হয়ে গিয়েছিল। অনুবাদকে একটি পুনঃসৃজন হিসেবে গণ্য করার ধারণার মধ্যেই এ দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় নিহিত ছিল। ইতিহাসের বিশেষ কিছু পর্যায়ে মৌলিক গ্রন্থকারবিষয়ক ধারণাটির কারণে ঢাকা পড়ে গিয়ে অনুবাদ সম্পর্কিত এ দৃষ্টিভঙ্গিটি সমগ্র ইতিহাসজুড়েই একটি সাধারণ যোগসূত্র হিসেবে রয়ে গেছে। নতুন ফসল ফলানোর জন্য পুরনো জমি চষা— চসারের এ রূপক দেশ-কাল ছাড়িয়ে গেছে। যদিও সেটি ড্রাইডেনের ১৭ শতকীয় মতবাদের একেবারে বিপরীত, যেখানে ড্রাইডেন বলছেন, অনুবাদক হচ্ছেন একজন ক্রীতদাস, যে অন্যের আঙুরক্ষেতে কাজ করে।
For out of olde felds, as men seyth,
Cometh al this newe corn fro yer to yere,
And out of olde bokes, in good feyth,
Cometh al this newe science that men lere.
জিওফ্রে চসার, পার্লামেন্ট অব ফাউলস
ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক অনুবাদ— এ দুটো থেকেই সাহিত্যিক অনুবাদ ভিন্ন। ঐতিহাসিকভাবে, ধর্মপুস্তক অনুবাদ বিজ্ঞান অনুবাদের মতোই ছিল: প্রাচীন ইহুদি অনুবাদক ও দার্শনিক ফিলো জুডিয়াস (জন্ম আনুমানিক ২০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ, মৃত্যু আনুমানিক ৫০ খ্রিস্টাব্দ) বলছেন, দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে ‘বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শব্দ ব্যবহার বা শব্দ নির্বাচন।’ আক্ষরিক অনুবাদের অগ্রদূত ছিলেন চৈনিক অনুবাদকেরা, সন্ত জেরোমে তার ধর্মীয় কাজের জন্য সেটার পক্ষে কথা বলেছিলেন, পরে বোয়েথিয়াস এবং তার পরে মধ্যযুগীয় অনুবাদকেরা— যাদের কাছে মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য প্রেরণের ব্যাপারটিরই অগ্রাধিকার ছিল— তারাও এ আক্ষরিক অনুবাদের ব্যাপারে জোর সমর্থন জুগিয়েছিলেন। দেশীয় ভাষায় সাহিত্যের অনুবাদের উদ্ভব ঘটেছিল এক ভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে। যদিও এটি অনুবাদের অন্যান্য প্রকার বা রূপের মতো বিশ্বস্ততা সম্পর্কিত একই বিতর্কেরই বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে, কিন্তু সাহিত্যিক অনুবাদ বরং অনুবাদের মাধ্যমে নতুন রূপ বা নমুনা সৃষ্টির বিষয়েই বেশি মাথা ঘামিয়েছে। রোমক যুগে অনুবাদকে বলা হতো, ‘এটি হলো মূল টেক্সট থেকে ভিন্নতা অর্জনের একটি আলঙ্কারিক প্রকল্প।’ একইভাবে দেশীয় ভাষায় ধ্রুপদী auctores বা লেখকদের রচনার মধ্যযুগীয় অনুবাদের উদ্ভব ঘটেছিল (প্রধানত) বাইবেলের ব্যাখ্যা, ভাষ্য ও গ্রন্থাদির পাঠগত আত্মীকরণের মাধ্যমে। ইতিহাসজুড়েই মৌলিক কাজের প্রতি মুগ্ধতা বা শ্রদ্ধার সঙ্গে নতুন কিছু একটা সৃষ্টি করার বোধটি যুক্ত: আর তাই অনুবাদ ও সৃজন, অনুকরণ ও স্থানচ্যুতি, বিদেশ থেকে আহরণ বা আনয়ন ও তাকে জয় করা, এসব অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে— চসারের ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছিল।
জাতীয় সাহিত্যগুলোয় অনুবাদকেরা কীভাবে অবদান রাখেন, সে বিষয়টিই এ পরিচ্ছেদে আলোচিত হবে। অনুবাদ প্রায়ই সৃজনশীল রচনার পূর্ববর্তী হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং অনুবাদই সাহিত্যের ‘জন্ম দেয়’ বলে বলা হয়েছে। আর অনুবাদবিষয়ক রচনায় এটা একটা leitmotiv হয়ে এসেছে, যা অক্তাভিও পাস দেখিয়েছেন:
[...] এ দুইয়ের মধ্যে [অনুবাদ ও সৃষ্টি] নিরন্তর মিথস্ক্রিয়া রয়েছে, যা একটি অবিরাম, পারস্পরিক সমৃদ্ধীকরণ। পশ্চিমা কাব্যের মহত্তম সৃজনশীল কালপর্বগুলোর [...] আগে বা সময়ে বিভিন্ন কাব্যিক ঐতিহ্যের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ঘটেছে। কখনো কখনো এ পারস্পরিক সংযোগগুলো অনুকরণের রূপ নিয়েছে, অন্য সময় অনুবাদের।
পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোয় এ ঘটনার ক্রমিক উদাহরণ তুলে ধরা হবে। এসব ঘটনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই অন্তিম ফল একই: অনুবাদ একেকজন লেখককে নমুনা অথবা আদর্শ ও অনুপ্রেরণা দান করেছে, আর এক বৃহত্তর স্তরে, অভীষ্ট সংস্কৃতিতে সাহিত্যকে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এ প্রক্রিয়ার পরীক্ষণ বেশ মজার: প্রথমত. অনুবাদের প্রেষণা, অনুবাদকদের এ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত ধারণা বা তত্ত্বগঠন ও গ্রহীতা সংস্কৃতির ওপর সেটার প্রভাবের চরিত্র বা ধরন। একটি বিশেষ প্রেক্ষিত বা প্রতিবেশে অনুবাদ সংঘটিত হয় এবং তার বড় বড় ঘটনার ভিত্তি ইতিহাসে রচিত। একটি সাহিত্যের উদ্ভব সবসময়ই আরেকটি সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা হচ্ছে পৃথকীকরণের একটি ব্যাপার। আর তাই তা কেন্দ্র ও প্রান্ত, আধিপত্যকারী সংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র সংস্কৃতির মধ্যেকার সম্পর্কসংক্রান্তও বটে। একটি চর্চা ও ডিসকোর্স হিসেবে অনুবাদকে অন্যান্য ঘটনা ও (সামজিক, রাজনৈতিক, ভাবতাত্ত্বিক ইত্যাদি) ডিসকোর্সের পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এ বিবেচনা থেকে কেবল অনুবাদের ক্ষেত্রে এসব বাইরের উপাদানের গুরুত্বই যে উঠে আসে তা নয়, বরং সেই সঙ্গে নানা সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে খোদ অনুবাদের কেন্দ্রীয়তাও উঠে আসে।
‘উদ্ভব’ কথাটিকে সেটার ব্যাপকতম অর্থে দেখতে হবে। এ সমীক্ষায় দেখানো হবে, অনুবাদকেরা তাদের যার যার সাহিত্যের বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে হয় একটি সদ্যোজাত সাহিত্য সৃষ্টি করে অথবা ইতিহাসের কোনো সংটময় মুহূর্তে সেটাকে নতুন দিকে ধাবিত করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে কীভাবে অবদান রেখেছেন।
কঠোরভাবে নির্দেশিত ভৌগোলিক সীমারেখার মাধ্যমে জাতি বা দেশগুলোকে ‘সর্বজনীন ধরনের সমাজ-অর্থনীতিক সংস্থা’ বলে গণ্য করা হলেও দেশত্ব ও জাতীয়তাবাদ বলতে আজ আমরা যা বুঝি, তা আসলে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। রেনেসাঁর কালে ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্রগুলো আবির্ভূত হতে শুরু করে। মুদ্রণ শিল্পের উদ্ভাবন ও তার পরবর্তী সময়ের মুদ্রণ সংস্কৃতি, গ্রিক ও লাতিন বৈদগ্ধ্যের প্রতি সংরাগ, নতুন পৃথিবী বিজয় এবং দেশীয় ভাষাগুলোয় বাইবেল পাঠের ব্যবস্থা করার গুরুত্ব— এসবই হলো রেনেসাঁর সময় ক্রমবর্ধিত অনুবাদ কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় ভাষা ও জাতীয় সাহিত্যগুলোর সমান্তরাল উদ্ভব এবং খোদ একটি দেশের বোধ জাগ্রত হওয়ার পেছনে যেসব উপাদান ভূমিকা রেখেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি। তাই সঙ্গত কারণেই এ পরিচ্ছেদ রেনেসাঁকালের অনুবাদ কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে শুরু হচ্ছে ওলন্দাজ স্বর্ণযুগের এক লেখক/অনুবাদকের কেস স্টাডি দিয়ে।
১৭ শতকের শেষভাগ ও ১৮ শতকের গোড়ার দিকের মধ্যে ইউরোপের অনেক সাহিত্যই ‘জাতীয়’ সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছিল এবং তখন কোনো অবস্থায়ই সেগুলোকে সেই অর্থে উন্মেষকালীন হিসেবে দেখার অবকাশ ছিল না। অবশ্য রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক নানা ঘটনার একটি অভিসরণের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থানান্তরের ভেতর দিয়ে গিয়েছিল। এ রকমই একটি সাহিত্যিক ঘটনা— ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে শেক্সপিয়রের রচনার অনুবাদ— আমাদের পরবর্তী কেস স্টাডির বিষয়। এ পরিস্থিতি আরো যথার্থভাবে জাতীয় সাহিত্যগুলোর পুনরুদ্ভব বা নবদিকনির্দেশনা লাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জাতীয় ভাষাগুলো আগে থেকেই ছিল, যেমনটা ছিল সেই ভাষায় রচিত সাহিত্য। ইউরোপের বেশির ভাগ এলাকা নেপোলিয়নের করতলগত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ফরাসি হেজিমনির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নতুন নতুন জাতীয় পরিচয় ঘোষিত হয়েছিল। সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোও দৃঢ়ভাবে তাদের পরিচয় জানানোর জন্য নানা পথের সন্ধান করছিল, বিশেষ করে সাহিত্যের মাধ্যমে।
এ পরিচ্ছেদের আরো সাম্প্রতিক সাহিত্যগুলোর ওপরই মূলত আলোকসম্পাত করবে, যে সাহিত্যগুলো আত্মসংকল্প অর্জনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি প্রভাবশালী ইংরেজি সংস্কৃতি থেকে পৃথকীকরণের দুটো পৃথক উদাহরণের কথা এখানে আলোচিত হবে: প্রথম দৃষ্টান্তটি আয়ারল্যান্ডের, যে দেশ ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায় করে নিয়েছিল এবং দ্বিতীয়টি স্কটল্যান্ডের, যেখানে দৃশ্যত ইংল্যান্ডের কাছ থেকে সাংস্কৃতিক পৃথকীকরণ ঘটলেও স্বাধীনতা এখনো একটি বিবেচনাধীন বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। বাকি দুটো পর্ব খতিয়ে দেখবে কিছু উপনিবেশোত্তর সংস্কৃতি, যাদের কাছে জাতীয় সাহিত্যের প্রচার ও বিকাশে অনুবাদ একটি মৌলিক উপায়: আর্জেন্টিনার ঘটনা এবং আরো সমস্যাসংকুল আফ্রিকার ঘটনা, যে আফ্রিকা কিনা খোদ ‘জাতীয় সাহিত্যে’র ধারণাটির প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
ক্রমশ...






