শীতের রাত। এক ভ্রান্তির মতো, বিষণ্নতার মতো জেগে উঠেছিল সে। আসলে সে ঘুমায়নি। এ নিস্তব্ধ মধ্যযামে সে ছিল একা। হ্রদের মতো, ক্লান্তির মতো নিস্তব্ধতা চারদিক জুড়ে। ঘড়ি বেজেই চলেছে টিক টিক টিক। অন্ধকারের মতো এক পুরনো র্যাপার। বিরক্তির মতো তেল চিটচিটে বালিশ। আর দূর থেকে, গলির মোড় থেকে ভেসে আসা জঘন্য একটানা কুকুরের ডাক। সে ঘৃণা করত শীতকালকে। যেমনটা মীর জাফরকে আমরা করে থাকি। আর তখনই তার মাথায় আসত সেই আইডিয়াটা। রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়া অনেক সহজ। কঠিন এ শৈত্যপ্রবাহকে সহ্য করা। রাষ্ট্রপতি হওয়ার ভাবনা তার এ আপাত ঘুমপাড়ানি জীবনে ছুড়ে দিত উত্তেজনা। অ্যাড্রিনালিনকে সাথী করে সে উঠে দাঁড়াত। আসলে বিশ্বাস করুন, এ প্রবল শৈত্যপ্রবাহে বেঁচে থাকতে কিছু উত্তেজক উষ্ণতাও যে প্রয়োজন।

শীতের সকালগুলো ছিল বড় ক্লান্তিকর। সকাল হলেই বাড়ির সামনে পড়ে থাকত অজস্র শুকনা পাতা। দোকানগুলো খুলত অনেক দেরি করে। কাজের মেয়েটি আসত না জ্বর বা সর্দি কোনো কারণ দেখিয়ে। একটা ত্যারছা রোদ তার পায়ের কাছে পড়ে মুখ ভ্যাংচাত। এর থেকে অনেক সহজ ছিল রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়া। শুধু এই আইডিয়াটা মাথায় কিক করার পর সে ফিরে পেত উষ্ণতা। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বা জন এফ কেনেডির বই বের করে পড়ত। আর তার মনে হতো প্রয়োজন কিছু প্রথম পছন্দের ভোট, কিছু দ্বিতীয় পছন্দের আর অনেক টাকা। সে বিয়ে করেছিল কিনা, সন্তান আছে না নেই, এ বিষয়ে কিছুই জানা যেত না। কেবল জানতাম সে পুলিশ বা দালালের মতোই ঘৃণা করত শীতকালকে।

শীতের দুপুরগুলো ছিল বড় ক্লান্তিকর। হাঁসগুলো পুকুরে সাঁতার কাটতে নামত না। আলু সিদ্ধ বা ভাতে ভাত করতে সময় লাগত অনেক বেশি। জ্বালানির সংকট দেখা দিত প্রবল। মেঝেতে পা দিতেই ছ্যাঁক করে উঠত। আর ছিল কৃমি-কীটের মতো একটা পুরু হলুদ রোদ্দুর। আর এ সময়েই মাথায় প্রবেশ করত সেই আইডিয়াটা। রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়া এর থেকে অনেক সহজ। সংবিধানের বইগুলো সে বের করে পড়তে শুরু করত। পররাষ্ট্র বা স্বরাষ্ট্র নিয়ে নিজস্ব অভিমত তৈরিতে সে ছবি আঁকত। কোনোটা সরলরেখা, কোনোটা বা বক্র। ডাইনিং টেবিলের ওপর এক এক করে সাজাত হাঁড়ি, কড়াই, ডেকচি, সসপ্যান, হাতা, খুন্তি এমনকি চা ছাঁকার ছাঁকনিও। কারণ সে জানত রাষ্ট্রপতি হতে গেলে তার প্রয়োজন অনেকগুলো প্রথম পছন্দের ভোট, কিছু দ্বিতীয় পছন্দের ভোট আর অনেক টাকা। তাই তার দু’বান্ডিল তাসকেও সে রেখেছিল টেবিলের ওপর। সে বড়লোক না গরিব, তা আমাদের জানা ছিল না। সে রিটায়ার্ড না বেকার, তাও জানতাম না। কেবল জানতাম দাদ, হাজা, চুলকানির মতো সে ঘৃণা করত শৈত্যপ্রবাহকে।

শীতের বিকালগুলো ছিল প্রবল ক্লান্তিকর। ছোট দিন আর বড় রাতের এ অদ্ভুত সম্মেলনকে পছন্দ করত না মোটেও। যেমন সাধু অপছন্দ করে বেশ্যাকে। পাখিগুলো তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যেত। রাস্তায় ম্যাড়মেড়ে হলুদ আলোগুলো জ্বলে উঠত দ্রুত। চায়ের দোকানগুলো ফাঁকা হয়ে যেত সাত তাড়াতাড়ি। কুয়াশা নামত জোর। এর থেকে অনেক সহজ ছিল রাষ্ট্রপতি হওয়া। এই আইডিয়াটা মাথায় কিক করার পরই সে নেচে উঠত ধিনাক ধিনাক। কীভাবে সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস নিয়োগ হয়, কীভাবেই বা সাধিত হয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি, সে জেনে নেয়ার চেষ্টা করত দ্রুত। রাধাকৃষ্ণণ বা রোনাল্ড রিগ্যানের বই পড়ার চেষ্টা করত। সে জানত, রাষ্ট্রপতি হতে তার প্রয়োজন অনেক প্রথম পছন্দের ভোট। তাই পাঁচটি করে তাস (আসলে টাকা) সে রেখেছিল হাঁড়ি, কলসি, ডেকচি, সসপ্যানের সামনে। কারণ ওই হাঁড়ি, কলসি, ডেকচিই ছিল প্রথম পছন্দের ভোটার। আর দ্বিতীয় পছন্দের হাতা, খুন্তি, ছাঁকনির সামনে রেখেছিল একটা করে তাস মানে টাকা। কড়াইয়ের সঙ্গে তার হয়েছিল প্রভূত দরকষাকষি। শেষমেশ আটটি তাসের বিনিময়ে রাজি হয়েছিল কড়াই।

সে এইট পাস ছিল, না অর্থনীতিতে ডক্টরেট আমরা জানতাম না। ঘুমোলে মুখ দিয়ে লালা পড়ে, না নাক ডেকে ঘুমোন এ বিষয়েও আমাদের জানা ছিল না। কেবল জানতাম সে ঘৃণা করত শৈত্যপ্রবাহকে। যেমনটা মানুষ করে থাকে নিজের পায়খানা পেচ্ছাপকেও।

শীতের সন্ধ্যগুলো ছিল খুব ক্লান্তিকর। গরম চা ঠাণ্ডা হয়ে যেত খুব সহজেই। ভেতরে পরতে হতো কুটকুটে উলিকটের গেঞ্জি। হাতে গ্লাভস, গায়ে সোয়েটার, মাথায় মাংকিটুপি। এর থেকে অনেক সহজ ছিল রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়া। এই আইডিয়াটা মাথায় আসার পরই তার দৃষ্টি হতো নরম ও চকচকে। হাঁড়ি, কলসি, ডেকচি, হাতা, খুন্তি, টেবিলে রাখার পর টেবিলের নিচে রেখেছিল বালতি। আর তাতে ছিল গরম জল, পাশে সাবান। কারণ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাকে হাত ধুয়ে নিতে হবে। মেয়েদের জন্য কি কল্যাণ করা যায়, কীভাবে ধর্ষণ রোধ করা যায় বা কোন দেশকে সুবিধামতো শান্তিসেনা নামিয়ে টাইট দেয়া যায়, তাকে বুঝে নিতে হতো দ্রুত। আব্রাহাম লিংকন বা নীলম সঞ্জীব রেড্ডির জীবন ও দর্শন তাকে পড়তেই হতো। আলমারির কালোমতো হ্যান্ডেল আর চাবিমুখটা আসলে ছিল নির্বাচন কমিশনের। টেবিলেই রাখা ছিল একটা রুটি বেলার বেলনচি। ওটা মাইক্রোফোন। বের করে রাখা ছিল তার জীবনের সবেধন নীলমণি স্যুট আর টাই। নির্বাচিত হওয়ার পর পরতে হবে তো।

হোয়াইট হাউজ বা রাইসিনা হিলসের ছবি দেখতে দেখতে তার বয়স যেত কমে। তার বাড়ি, চেয়ার, টেবিল সব নিজের, না ভাড়া করা আমরা জানতাম না। কেবল জানতাম সে শৈত্যপ্রবাহকে ঘৃণা করে। যেমন সেনাবাহিনীকে ঘৃণা করে স্থানীয় মানুষ।

শীতের রাতগুলো ছিল ক্লান্তিকর। ঘড়ি বেজেই চলত টিক টিক টিক। শীতের র?্যাপার, তেল চিটচিটে বালিশ আর কুকুরের চিত্কার ভেসে আসার পরও সে বিরক্ত হলো না। কারণ আইডিয়া নয়, এখন সে পুরোদস্তুর রাষ্ট্রপতি। একটা ছোট টুলের ওপর দাঁড়িয়ে, স্যুট-টাই পরে সমবেত হাঁড়ি, কলসি, ডেকচি এবং কড়াই ও হাতা খুন্তি সামনে রেখে সে বলতে শুরু করল— মাই ডিয়ার কান্ট্রিমেন, আমি আপনাদের প্রতি দায়বদ্ধ। দায়বদ্ধ দেশের সংবিধানের প্রতি। আর তাই বলব, শৈত্যপ্রবাহকে ঘৃণা করতে শিখুন। নইলে কোথাও কখনো বিপ্লব আসবে না, উষ্ণতাও না। কেবল একটা গোটা জাতি কি কমলালেবু আর পশমের বল নিয়ে লোফালুফি খেলবে?

বলে রাখা ভালো, বক্তব্য রাখার আগে তিনি জ্যোতিষীর কথামতো নারকেল ফাটিয়ে ছিলেন, আর বক্তব্যের শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছিলেন বালতির জলে।

আর তিনি বলে চলেছিলেন— মাই ডিয়ার কান্ট্রিম্যান— তার গলা ঠাণ্ডায় বুজে আসছিল, ঘড়ি টিক টিক টিক, বাইরে কুকুরের চিত্কার—

লোকটা অতিমানব, ঈশ্বর না শয়তান অথবা শুধুই মানুষ, সে কথা বলতে পারব না। কেবল বলতে পারি, একটা প্রবল জাঁকানো শৈত্যপ্রবাহে জবুথবু হয়ে ছিল একটা গোটা উপমহাদেশ।
অথচ বিশ্বাস করুন, বেঁচে থাকতে উষ্ণতার প্রয়োজন।