সময়টা ছিল ১৯৪০-এর আশপাশে, যখন আলজেরিয়ার বন্দরনগরী ওরাঁও ছিল ফরাসি উপনিবেশ। গাছপালা-পাখি তথা সৌন্দর্যবিহীন এ নগরীর জনজীবন কাটে যান্ত্রিক ব্যস্ততায়। একদিন হঠাৎ এ গতানুগতিক জনজীবনে হানা দেয় ভয়াবহ প্লেগ।
এভাবেই
শুরু হয় নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক ও দার্শনিক আলবেয়ার কামুর উপন্যাস দ্য
প্লেগ। যদিও কামু প্রথমে এ উপন্যাসের নাম দ্য
প্লেগ না রেখে রাখতে চেয়েছিলেন দ্য প্রিজনারস। পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন করলেও কেনই বা দ্য
প্রিজনারস তার কাছে অধিকতর প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছিল, সে আলোচনায় আমরা পরে আসব।
ফ্রেঞ্চ
ক্রিটিক প্রাইজ পাওয়া দ্য প্লেগ প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে, জর্জ ওরওয়েলের ‘১৯৮৪’ প্রকাশিত হওয়ার কয়েক মাস আগে। যদিও কামু বইটি লেখা শুরু করেন ১৯৪০-এর দিকে, যখন কামু ছিলেন ওরাঁও শহরে। তখন থেকেই গল্পের উপকরণ সংগ্রহ করতে থাকেন তিনি। মাঝে বিশ্বযুদ্ধ, ফরাসিদের ডানকার্ক যুদ্ধে হেরে যাওয়া, নািস বাহিনী দ্বারা ফ্রান্স দখল এবং এর ফলে ১৯৪০-এর দিকে ফরাসি প্রতিরোধ ইত্যাদি ঘটনায় তিনি উপন্যাসের কাজ বন্ধ রাখেন। ফ্রান্স মুক্ত হলে তিনি পুনরায় উপন্যাসের কাজে হাত দেন। মাঝের এ সময়টিতে কামু অস্তিত্ববাদ সম্পর্কিত তার বিখ্যাত প্রবন্ধ The
Myth of Sisyphus লেখা শুরু করেন এবং বিপুল সাড়া পেতে থাকেন। তিনি ফ্রান্সের তরুণদের কাছে নতুন চিন্তা ও দর্শনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গণ্য হতে থাকেন।
১৯৪৭-এ প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্য প্লেগ বিপুল সাড়া ফেলে এবং সেই বছরই বইটি ২০ হাজার কপির ওপর বিক্রি হয়। এক বছরের মাথায় উপন্যাসটি নয়টি ভাষায় অনূদিত হয়। ফলে বইটির মাধ্যমে কামু লেখক হিসেবে বিপুল পাঠকের কাছে পরিচিতি পান। তবে বইটির এ সাফল্যের পেছনে আরেকজন বিখ্যাত দার্শনিকের অবদানও অনস্বীকার্য, তিনি জ্যাঁ পল সার্ত্রে। সার্ত্রে দ্য প্লেগ সম্পর্কে একটি রিভিউ লেখেন এর অস্তিত্ববাদী দর্শনকে বর্ণনা করে।
কামুর যেকোনো লেখায়ই তার ব্যক্তিগত জীবনের আভাস পাওয়া যায়। দ্য প্লেগের ক্ষেত্রে তার ব্যাত্যয় হয়নি। ফরাসি-আলজেরীয় দার্শনিক ও লেখক কামুর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা আলজেরিয়ায়। তাই তার অনেক গল্পেই বিভিন্ন আঙ্গিকে আলজেরিয়ার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কামু তাই ফরাসি হয়েও ফ্রান্সে ছিলেন একজন ‘আউটসাইডার’ হয়ে। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তিনি জ্যাঁ পল সার্ত্রে ও ফরাসি বুদ্ধিজীবী পরিমণ্ডলের সান্নিধ্য পান, যার ছাপ পরবর্তী সময়ে কামুর দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। কামুর মিথ অব সিসিফাস তথা অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রভাব আমরা দ্য প্লেগে দেখতে পাই। যদিও কামু অস্তিত্ববাদী দার্শনিক হিসেবে পরিচিত হতে চাননি এবং তিনি এ দর্শনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এ বিরুদ্ধাচরণ শেষ অবধি তার সঙ্গে সার্ত্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়।
প্লেগকে
বলা হয় কমেন্ট্রি অব হিউম্যান নেচার। যেহেতু বইটি ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর প্রকাশিত হয়, তাই ফ্রান্স তথা পুরো ইউরোপ খুব সহজেই কামুর এ এলিগোরিক্যাল কথনের মমার্থ বুঝতে পারে। সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে সমসাময়িক সব পত্রিকা ও বুদ্ধিজীবী মহল একে জার্মান নািস বাহিনীর ফ্রান্স দখলের রূপক গল্প হিসেবে গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই আসে রঁল্যা বার্থের কথা। বিখ্যাত রিপ্রেজেন্টেশনিস্ট ও দার্শনিক বার্থ দ্য প্লেগকে একটি এলিগোরি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং একই সঙ্গে এর সমালোচনাও করেন। তার মতে, কামু এখানে নািস বাহিনীকে একটি অসুখ বা প্লেগ হিসেবে এবং ওরাঁওবাসীর প্লেগের বিরুদ্ধে লড়াই দেখাতে গিয়ে আসলে নৈতিক প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে সিমোন দ্য বোভোয়ার সমালোচনাও উল্লেখযোগ্য। বোভোয়া মনে করেন, কামুর এ প্লেগের এলিগোরি রাজনৈতিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ কামুর এ প্লেগ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা এবং এর দ্বারা মানুষ খুব সহজেই তার রাজনৈতিক দায় থেকে মুক্তি পাচ্ছে। ফ্যাসিজমকে প্লেগ হিসেবে দেখালে আসলে ফ্যাসিজম মানুষের হাতে নয়, এমনটাই দেখানো হয়। তাই এ রূপককে তিনি নন-আইডিওলজিক্যাল মনে করেন।
এসব
সমালোচনার উত্তরে কামু বলেন, ‘টেররের
অনেক রকম পর্ব আছে’ এবং তিনি আরো বলেন, ‘দ্য
প্লেগে আমি চেয়েছিলাম বইটির নানা স্তরিক পাঠ চলুক।’
প্রথম
বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্স জার্মান বাহিনীকে পরাজিত করে। সেই একই ফ্রান্স যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরনো শত্রুর কাছে হেরে যায়, তখন তা ফ্রান্সবাসীর কাছে হয় বিস্ময়কর ঘটনা। তারা যেন তা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। শুধু অবহেলাতেই যেন এ পরাজয় ঘটল। একই ঘটনা আমরা দ্য
প্লেগ উপন্যাসেও দেখতে পাই। হাজার বছর আগের প্লেগ যে আবারো জনজীবনে এমনভাবে হানা দেবে, তা যেন ওরাঁওবাসী কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না। বাস্তবিক ফ্রান্সের অনেক বুদ্ধিজীবীই মনে করেন, এমনটাই হওয়ার কথা, যে ধারণা আমরা গল্পের ফাদার পানেলুর বক্তব্যের মাধ্যমে পাই। গল্পের আরেক স্তরে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে ওরাঁও শহর লকডাউন হয়ে যাওয়ার পর মানুষ দ্বিধায় পড়ে যায়। তারা ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে লড়বে, নাকি কমিউনিটির কথা চিন্তা করবে? শহর লকডাউন হয়ে গেলে তারা যেন নিজ গৃহেই হয়ে যায় কারাবন্দি, যেমনটি আমরা বাস্তবেও দেখি। ফ্রান্সবাসী যেমন নিজ ভূমেই জিম্মি ছিল নািসদের কাছে। ফলে আমাদের বুঝতে আর অসুবিধা হয় না, কেন কামু এ বইয়ের নাম প্রথমে দ্য
প্রিজনারস রাখতে চেয়েছিলেন।
সাহিত্যের
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয় হচ্ছে ইন্টেনশনালিজম। এ থিওরির মতে, তিনিই ভালো পাঠক, যিনি গল্পে বর্ণিত লেখকের উদ্দেশ্য ধরতে পারেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লিটারেরি মুভমেন্ট যেমন—নিওক্রিটিক অ্যাপ্রোচ, রিডার্স রেসপন্স অ্যাপ্রোচ, স্ট্রাকচারালিজম, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম এসে এ ইনটেনশনালিজমকে ইনটেনশনাল ফ্যালাসি হিসেবে আখ্যায়িত করে। সুজান সন্ট্যাগ তার বিখ্যাত বই ‘অ্যাগেইনস্ট ইন্টারপ্রিটেশন’-এ বলেন যে পাঠক তার ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতার আলোকে একই লেখার বিভিন্ন রকম অর্থ দাঁড় করাতে সক্ষম। সন্ট্যাগের এ ব্যাখ্যা থেকে আমাদের বর্তমান মহামারী পরিস্থিতিতে নতুনভাবে দ্য প্লেগ পঠন এবং এর অর্থ অনুধাবনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। গল্পের প্লেগ এখন আর আমাদের কাছে ফ্যাসিবাদের রূপক নয়, বরং বাস্তবতা হিসেবে ধরা দিচ্ছে।
বর্তমান সময়ে এ উপন্যাসকে ব্যাখ্যা করতে গেলে চলে আসে কামুর ফিলোসফিক্যাল প্রবন্ধ দ্য মিথ অব সিসিফাসের প্রসঙ্গ। এতে কামু আমাদের জীবনকে তুলনা করেছেন সিসিফাসের শাস্তির সঙ্গে, যাকে অনন্তকাল ধরে পাথর বয়ে তুলতে হয় পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত। কিন্তু কামু বলেছেন, সিসিফাসের এমন শাস্তির পরও আমরা সিসিফাসকে হাসতে দেখি। কামু জানাচ্ছেন, জীবন অর্থহীন। শেষ পর্যন্ত অর্থহীন জানলেও আমরা নিজেরাই নিজেদের জীবনের অর্থ দাঁড় করাতে পারি।
কামুর
উপন্যাসের এক জায়গায় রিওকে তারিউ জানাচ্ছে, ‘এই
প্লেগের কাছে তার এ বীরত্ব টিকবে তো?’
রিওর
উত্তর, ‘সেটা
জরুরি না। জ্ররুরি হচ্ছে এ ক্রমাগত সংগ্রাম করে যাওয়াটা।’
গল্পের
চরিত্রগুলোর মধ্যে আমরা কামুর দর্শনের প্রভাব দেখতে পাই। উপন্যাসে ওরাঁওবাসী মহামারীর কারণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পুরো শহর কোয়ারেন্টিন করে রাখা হয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, তারা কি আদৌ কখনো মুক্ত ছিল? বরং তারা সর্বদাই ব্যক্তিগত স্বার্থ, উদ্দেশ্য, লালসার দাস হয়ে ছিল। ফলে নাগরিকদের টনক ঠিক তখনই নড়ল, যখন তাদের আপনজনের সঙ্গে তাদের বিচ্ছেদ ঘটল। প্রথমবারের মতো তারা অনুভব করল যে নিজ গৃহেই যেন তারা কারাবন্দি হয়ে আছে।
অস্তিত্ববাদ
ও মানবতাবাদ—এ দুইয়ের মিশ্রণে কামুর দর্শন। কামু বিশ্বাস করতেন, মরণশীল এ জীবনকে অর্থ প্রদান করা একান্তই মানুষের হাতে। তার মতে, মানুষের সব দুর্দশা ও মৃত্যুর বিপক্ষে লড়াইয়ের মাধ্যমেই আসতে পারে জীবনের অর্থ। তার দর্শনের এ দিকটি দেখতে পাওয়া যায় গল্পের অন্যতম কথক তারিউ চরিত্রটির মধ্য দিয়ে।
মহামারীর
শুরুতে নগরবাসীকে ব্যক্তিগত ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। শুরুর দিকে তারা নিজেদের দুর্দশাকে একান্তই নিজস্ব বলে গণ্য করে। দুর্দশা চরমে উঠলে তাদের বোধোদয় হয় এবং প্লেগকে তারা সমষ্টিগত সমস্যা ভাবতে শুরু করে। এভাবে তারা বিচ্ছিন্নতা বোধ থেকে বেরিয়ে এসে সম্মিলিত শক্তি দিয়ে মহামারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং এর মাধ্যমে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করে। এ চেষ্টার অংশীদার হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় গল্পের সাংবাদিক রাঁবেয়ার চরিত্রটিকে।
মৃত্যু
যখন অনিবার্য, তখন এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটাকে কৌতুকপ্রদ মনে হতে পারে, মনে হতে পারে নির্বুদ্ধিতা। কিন্তু কামু মনে করেন, এমন অবস্থায় এ নিরর্থক লড়াই বা এ অবিরাম প্রচেষ্টাই এনে দিতে পারে জীবনের অর্থ। এ একই বিষয় আমরা লক্ষ করি কেন্দ্রীয় চরিত্র ডাক্তার রিওর মধ্যে, যিনি অবিশ্রান্তভাবে মানুষের জীবন রক্ষায় কাজ করে যান। কামুর চরিত্ররা জানে যে এ লড়াই করতে গিয়েও তারা প্লেগ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, মারা পড়তে পারে। প্রাণ যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এও অনুধাবন করে যে এ প্রতিরোধ না গড়ে তুললেও প্রাণ যাবে। তাই যখন মৃত্যু ছাড়া আর বিকল্প কোনো পথ নেই, তখন তারা বেছে নেয় মৃত্যুর বিরুদ্ধে সংগ্রামকে; যে সংগ্রাম একার নয়, সবার অস্তিত্বের সংগ্রাম। দ্য
প্লেগ আদতে শত আশাহীনতার মাঝে কামুর এ আশাবাদের ঘোষণা দেয়।
তাসনিম রহমান নিরা:
নন-ফিকশন লেখক





