সৃষ্টির সময়টাতে ১৮৪০-এর দশকে ডাকবাংলোর রুম ভাড়া কত ছিল বের করা যায়নি। তবে বেশ কয়েক দশক পর ১৯২০-এর দশকে যে ৮ আনার বেশি ছিল না, এটা নিশ্চিত। স্ত্রী নিয়ে থাকারও সুযোগ ছিল, এজন্য বাড়তি ৪ আনা গুনতে হতো। সেক্ষেত্রে বাড়তি বালিশ সরবরাহ করা হতো। আরো ছয় দশক পর ১৯৮০-এর দশকে রুম ভাড়া বেড়ে ৮ টাকা হয়। খাট দুজনের জন্য অপ্রশস্ত হয়ে ওঠে, ফলে স্ত্রীকে নিয়ে থাকলেও ৮ টাকার বেশি কাউকে দিতে দেখিনি।

ডাকবাংলোর উত্তরসূরি সার্কিট হাউস এলেও কর্তৃত্ব বিভাজিত হয়ে ডাকবাংলো রয়ে গেছে জেলা পরিষদের হাতে আর সার্কিট হাউস ডেপুটি কমিশনার ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে গণপূর্ত বিভাগের রক্ষণাবেক্ষণে দেয়া হয়েছে।

ডাকবাংলোর প্রতিষ্ঠা ডাক ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে অবশ্যই সম্পৃক্ত। কিন্তু ইম্পেরিয়াল মেইল সার্ভিসের বাইরেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্ব সুসংহত করতে প্রধান সড়কে পনেরো মাইল অন্তর কোম্পানির কর্মচারীদের সংক্ষিপ্ত অবস্থান ও বিশ্রামের জন্য এক বা দুই কক্ষের বাংলো প্রতিষ্ঠা করা হয়। দূর থেকে হলুদ বরণ এ ভবনটিতে ‘খড়ের স্তূপ’ মনে হতো আর কক্ষের পরিসর ‘এর চেয়ে আর ছোট করা সম্ভব ছিল না’—এমনই বর্ণনা দিয়েছেন লকউড কিপলিং (রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর বাবা)।

যখন সার্কিট হাউস তৈরি করা হয় তখন উদ্দেশ্য ছিল সার্কিট ডিউটিতে আসা ইংরেজ কর্মচারীদের সাময়িক আবাসন প্রদান। ২৭ জুলাই ১৮৭৭ বাংলা সরকারের জারি করা একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মূলত কমিশনার ও সার্কিট জজদের দায়িত্ব পালনের সুবিধার জন্য সার্কিট হাউস তৈরি করা হয়েছে। এটি কারো দীর্ঘকালীন আবাসন নয়। সুতরাং এর অপব্যবহার রোধ করতে হবে। কেবল সরকারি কাজে এখানে অবস্থান করার জন্য যাদের ভাড়া দিতে হবে না তারা হচ্ছেন: পূর্ত বিভাগের সচিব ও সহকারী সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, ছোট নাগপুরের জুডিশিয়াল কমিশনার, জেলায় দায়িত্বরত জজ, অতিরিক্ত জজ, বাংলা সরকারের চিফ ইঞ্জিনিয়ার, সহকারী ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল, গণপূর্ত অডিটর, স্যালিটারি কমিশনার, কনজারভেটর অব ফরেস্ট, পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডিআইজি, ডিপিআই, পোস্টমাস্টার জেনারেল, সার্জন জেনারেল এবং আরো কজন। বিনা ভাড়ায় থাকলেও অবস্থানকালে চৌকিদারের কাছ থেকে ভিজিট বই নিয়ে তাতে স্বাক্ষর করতে হবে, চৌকিদার এই বই নিয়মিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখাবেন।

সে আমলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো কক্ষ থাকার সুযোগ ছিল না। এ কালে আছে, ভাড়ারও তারতম্য আছে।

ডাকবাংলোগুলোর ভাড়াও একসময় সার্কিট হাউসের অনুরূপই ছিল। তবে সুযোগ-সুবিধা সার্কিট হাউসে বেশি। এখন জেলা পরিষদই নিজস্ব মালিকানাধীন ডাকবাংলোর ভাড়া নির্ধারণ করে, উপজেলা পরিষদের মালিকানাধীন হলে উপজেলা পরিষদ একটি সাধারণ গাইডলাইন অনুসরণ করে ভাড়া নির্ধারণ করে।

আমরা গল্প-উপন্যাসে যে সব ডাকবাংলোর কথা পড়ি তার একাংশ মাত্র গণপূর্ত বা জেলা পরিষদের; বৃহদাংশই হচ্ছে বিভিন্ন দপ্তরের। এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীনও আছে।

বাংলার ডাকবাংলোগুলোর সঙ্গে টুকরো টুকরো জাতীয় ইতিহাস ও ব্যক্তি স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ডাকবাংলোর সঙ্গে ইংরেজ পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন রুডিয়ার্ড কিপলিং। পরিচয় এতটাই নিবিড় হয়েছে বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে গঠিত শব্দযুগলকে ইংরেজরা অনেকটাই নিজেদের করে নিয়েছে। গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক রোডের ডাকবাংলো নিয়ে কিপলিং লিখেছেন ‘মাই ওন ট্রু ঘোস্ট স্টোরি’।

রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখকদের অনেকেই তাদের রচনায় পুরনো দিনের ডাকবাংলোগুলোকে তুলে এনেছেন।

‘অলৌকিক’-এ লাল টালির ডাকবাংলো:

অলৌকিক, এইভাবে ঘটে

হঠাৎ একদিন ফাঁক হয়ে যায় সাদাসিধে ঝিনুক

ভিতর থেকে ঠিকরে বেরোয় সাদা জ্যোত্স্না।

 

সেদিন মুক্তোর মতো গড়িয়ে এলে আমার হাতে

অমনি বদলে গেল দৃশ্য।

আমার ডান দিকে ছিল মেঘলা দিন

হয়ে গেল ডালিম-ফাটানো রোদ

আর বাঁ দিকে ছিল ইটের পাঁজা

হয়ে গেল লাল ইটের ডাকবাংলো।

       অলৌকিক এভাবেই ঘটে।

(পূর্ণেন্দু পত্রী)

রবীন্দ্রনাথের গল্পের অধ্যাপক অনিলকুমার সরকার—‘গত জেনারেশনের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির পিএইচডি দলের একজন, মাস কয়েক আগে একটি উপনাগরিক কলেজের অধ্যক্ষতা ত্যাগ করে এখানকার স্টেটের একটি পরিত্যক্ত ডাকবাংলা ভাড়া নিয়ে সেটা বাসযোগ্য করে তুলেছেন।

হঠাৎ চমকে দেয়া ষোল বছর বয়সী আশালতা সিংহ প্রেমের উপন্যাস লিখে রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছেন; রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন কীর্তি নিয়ে আগ্রহী এই তরুণীকে পুরীর সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে ১৯৩৯ সালে চিঠি লিখেন।

হুমায়ূন আহমেদের কয়েকটি উপন্যাসে ডাকবাংলোর দেখা পাওয়া যায়। ‘আমার আছে জল’ উপন্যাসের নীলগঞ্জের ডাকবাংলো অন্যতম। বিখ্যাত হিন্দি ঔপন্যাসিক কমলেশ্বর ‘ডাকবাংলা’ নামে একটি উপন্যাসই লিখেছেন; শিবু কুমার রাই লিখেছেন ‘ডাকবাংলা’। মনোজ বসুর নাটকের নাম ডাকবাংলা। বাংলোবন্দী জীবনে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে মনোজ বসুর কাহিনীতে। বুদ্ধদেব গুহর আরণ্যক সিরিজে ঋজুদা কাহিনীর গল্পগুলো বন বিভাগের ডাকবাংলোতে সৃষ্টি। ঋজুদার সব কাহিনীতেই ডাকবাংলো পাওয়া যাবে—অরণ্যে রাত্রিবাস করতে হলে একটি নিরাপদ শোয়ার জায়গা তো লাগবেই। আসামের গল্পকার হরেকৃষ্ণ ডেকা ডাকবাংলোতে স্বল্পকালের অবস্থানেই কেয়ারটেকারের স্ত্রীর প্রেমে পড়ে যান। খুশবন্ত সিং-এর গল্পে বিলেতি সাহেব তার স্ত্রী ও কন্যা অনেকদিনের প্রায় জনমানবহীন ডাকবাংলোতে উঠবেন এবং একটি ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার প্রতীক্ষায় থাকবেন। বনের ও ডাকবাংলোর গল্পের আর একটি প্যাটার্ন হচ্ছে গভীর অরণ্যের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তায় গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। তারপর ডাকবাংলো খুঁজে বের করা এবং ভৌতিক অভিজ্ঞতা লাভ করা। সঙ্গে আতঙ্কিত একজন নারী থাকলে ভালো, না থাকলেও সমস্যা নেই। হন্টেড ডাকবাংলোতে হয়তো একজন নারীই প্রতীক্ষায় আছে কখন আসবে নতুন আগন্তুক।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনীতে ডাকবাংলো থাকতেই হবে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্ধকারের আগন্তুক উপন্যাসে দ্বিতীয় লোকটি সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বেশ রহস্যমণ্ডিত হাসি হাসল; কাছাকাছি কোথাও ডাকবাংলো আছে বলতে পারেন?

সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা দীর্ঘক্ষণ হেঁটে ক্লান্ত হয়ে বলেন, ‘এবার সার্কিট হাউজে যেতে হয়।’ সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান-এ তিন সড়কের মোড়েই ডাকবাংলা। শরত্চন্দ্রও ডাকবাংলোকে এড়িয়ে যাননি। চন্দ্রনাথ উপন্যাসে ডাকবাংলার দেখা মেলে:

হরি আর মধু এসেছে। তারা ডাকবাংলায় আছে।

এখানে আনতে বুঝি সাহস হলো না?

চন্দ্রনাথ এ কথায় উত্তর দিল না।

চন্দ্রনাথ আহারে বসিয়া সুমুখে এক থালা লুচি দেখিয়া কিছু বিস্মিত হইল।

 

শক্তি চট্টোপাধ্যায় অবিনাশকে জিজ্ঞেস করছেন ফলকোবাদের সেই বাংলোটির কথা:

টিলার উপরে সেই বাড়িটির কথা মনে পড়ে?

সামনে ঘোড়ানিম গাছ পিছনে  ইঁদারা

একপাশে নাবাল মাঠ, অন্য পাশে টেবিল পাহাড়

তাতে বাগিচার ফুল ছোটখাটো ওঁরাও-পল্লীর ঠাস-চাপা ছবি

ভেঙে সূর্য ডুবে যায় লাল রবারের বল হারানোর মতো।...

 

তোমরা দুজনে মিলে ভোররাতে ভাঙো হ্যারিকেন

যত কিছু কাচ পাত্র ভঙ্গুর, ঠুনকো গ্লাসবাটি—

কোন শিখা থেকে লাগে মাদুরে আগুন মনে নেই?

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার নামই ‘ডাকবাংলোতে’।

চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দা থেকে নেমে

টগর গাছের পাশে দাঁড়িয়ে

আমি হাত বাড়িয়েছি

হাত থেমে রইল শূন্যে

পৃথিবী কাঁপে না, তবুও কখনো কখনো মানুষের

ভূমিকম্পন হয়

এত বাতাস তবু দীর্ঘশ্বাস নিতে ইচ্ছে হয় না

ভুবনময় এই মোহিনী আলোর মধ্যে দুলে ওঠে বিষণ্নতা।

রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় অমিত রায় চেরাপুঞ্জির ডাকবাংলায় কটা দিন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। দুদিন না যেতেই বুঝল জনতা না থাকলে নির্জনতার স্বাদ মরে যায়। অথচ সকলকে বলে গিয়েছে শিলং যাচ্ছে নির্জনতা ভোগের জন্য। ‘কিছুদিন ওর কাটল পাহাড়ের ঢালুতে দেওদার গাছের ছায়ায় বই পড়ে। গল্পের বই ছুঁলে না, কেননা ছুটিতে গল্পের বই পড়া সাধারণের দস্তুর। ও পড়তে লাগল সুনীতি চাটুজ্জের ‘বাংলা ভাষায় শব্দতত্ত্ব’। লেখকের সাথে মতান্তর ঘটবে এই আশা মনে নিয়ে।

জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথের ডাকবাংলায় বাসের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। গোরা উপন্যাসে ‘হারানবাবু ডাকবাংলায় ফিরিয়া আসিয়া ম্যাজিস্ট্রেটের সহিত তাহার আলাপের বিবরণ বিস্তারিত করিয়া বলিলেন। কিন্তু গোরার সহিত তাহার সাক্ষাতের কোনো উল্লেখমাত্র করিলেন না।

সার্কিট হাউস কিংবা ডাকবাংলোর খাবারে বৈচিত্র্য কোনোকালেই ছিল না। একটি ভাজি ডাল আর মুরগি কিংবা মাছ, খাবারের দাম আলাদাভাবে বাবুর্চির হাতে হস্তান্তর করতে হয়। নির্দিষ্ট খাবারের বাইরে কিছু খেতে হলে কেনাকাটার জন্য বাবুর্চির হাতে আগেই টাকা দিতে হয়। অধিকাংশ ডাকবাংলোতে আলাদা করে কোনো বাবুর্চি নেই। কেয়ারটেকার নিজেই বাবুর্চি, অনেক জায়গায় তার স্ত্রী অবৈতনিক বাবুর্চি। যেটুকু খাবার বাঁচানো গেল, যেটুকু মসলা রয়ে গেল এটাই শ্রমের মজুরি। খাবারের বৈচিত্র্য না থাকলেও ডাকবাংলো নাম যুক্ত হয়ে দুটো রেসিপি রান্নাবান্নার বইয়ে উঠে এসেছে। একটি মাটন ডাকবাংলো, আরেকটি চিকেন ডাকবাংলো। তাই বলে পোলাও-কোর্মা-কালিয়ার মতো কালিয়া ডাকবাংলো বললে এটাকে খাবার মনে না করাই উত্তম। কালিয়া নড়াইল জেলার একটি উপজেলা। কালিয়া ডাকবাংলো কিংবদন্তির দুই শিল্পীর কাছে ভিটেবাড়ি—একজন নৃত্যগুরু উদয় শঙ্কর অন্যজন সেতারখ্যাত পণ্ডিত রবিশঙ্কর।

হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলায় তেলিয়াপাড়া ডাকবাংলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। মেজর খালেদ মোশাররফ এখানেই সশস্ত্র লড়াইয়ের কর্মসূচি প্রণয়ন করেন এবং সহযোদ্ধাদের নির্দেশনা দেন।

রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন হয়ে বিরাজ করছে সবচেয়ে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের ডাকবাংলো। এটি একসময় মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকারে ছিল কিন্তু পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা এটি অধিকার করে নেয় এবং এটিকে তাদের নির্যাতন ক্যাম্পে পরিণত করে।

একাত্তরের নির্মমতা ও নির্যাতনের সাক্ষ্য দেয় সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা ডাকবাংলা। একাত্তরে জেলা শহরের সার্কিট হাউস এবং থানা পর্যায়ের ডাকবাংলোগুলোয় প্রায় সবই পাকিস্তানি সৈন্যদের দখলে ছিল। প্রায় সব জায়গায় পুরনো ভবন ভেঙে নতুন স্থাপনা গড়া হয়েছে, দুএকটি এখনো জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।

সে আমলের ডাকবাংলোতে বিদ্যুৎ, রানিং ওয়াটার কিছুই ছিল না। একবার গিয়ে ডাকবাংলোতে উঠতে পারলে বাকি ব্যবস্থার জন্য কেয়ারটেকারই ভরসা। সিপাহি বিদ্রোহের সময় সাদা সাহেবরা যখন শহর থেকে পালাল তাদের অনেকে দূরের ডাকবাংলোগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক