একটু পেছন থেকে শুরু করতে চাই।

২০১৮ সালের মাঝামাঝি, বাবাকে নিয়ে বের হয়েছি রাস্তায়, ডাক্তারের কাছে যাব। পথে একটা অবরুদ্ধ ভাব। যারা গাড়িঘোড়া নিয়ন্ত্রণ করে তারা বদলে গেছে। শক্তসমর্থ ট্রাফিক পুলিশদের পরিবর্তে কোমল মুখের ঘেমে ওঠা ছেলেমেয়েরা রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করছে। ওরা রাস্তা পরিচালনায় দক্ষ নয়। তাই গাড়ি রিকশায় মানুষের বিচিত্র জট বেঁধে যাচ্ছে। তবু তারা নাছোড়। চোখেমুখে এক ধরনের জেদমাখানো প্রতিজ্ঞা। কারো কারো চোখে একটা কান্নামাখা ক্রোধ। পথচারী সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া রহস্যময়। তবে গাড়িচালকদের বেশির ভাগ যারপরনাই বিরক্ত। আমি বাবাকে নিয়ে একপাশে দাঁড়ালাম। গাড়ি পাচ্ছি না। কী করি? বাবার শরীর বেশ দুর্বল হয়ে আছে। তাকে দ্রুত একটা কোনো গাড়িতে উঠিয়ে বসাতে পারলে শান্তি। এর ভেতর একটা মেয়ে এগিয়ে এল। মেয়েটা রাস্তা নিয়ন্ত্রণকারী কিশোর-কিশোরীদের একজন।

‘কোথায় যাবেন? কোনো সাহায্য করতে পারি?’

মেয়েটার কণ্ঠে সহমর্মী কোমলতা তেমন একটা ছিল না। তবু সে এক ধরনের দায়িত্ব থেকে যেন এগিয়ে এল। আমার মনে হলো তার চলাফেরায় একটা তেজ তখনো সে বজায় রেখেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এতটাই লড়াই করছে যে যুদ্ধংদেহী ভাবটা না চাইতেও প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে কথায়। ওটাই কোমলতাটুকু কেড়ে নিয়েছে। কিসের সঙ্গে লড়াই চলছে? দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা যখন দৃঢ় থেকে শিথিল হয়ে যাচ্ছে, চোখের আলো যখন ক্ষণে ক্ষণে বাড়ছে কমছে, তখন প্রতিপক্ষ হিসেবে ক্ষুধা-তৃষ্ণার উপস্থিতি আঁচ করা যায়। কিন্তু আমি রাস্তায় নেমেই আরো বড় প্রতিপক্ষের আঁচ পেয়েছি, ক্ষুধা-তৃষ্ণা যার কাছে তুচ্ছ। তা হলো, মানুষের অসহযোগিতা, তীর্যক মন্তব্য, তাচ্ছিল্য। প্রথমে মানুষ সয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ক্রমেই পারছিল না। কাকে দোষ দেব। এই যে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যাব বলে বের হয়েছি, সেই আমিও কি তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়িনি সে মুহূর্তে?

আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল। ওরা রাস্তার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে চেয়েছে অভিমানবশত, আর সরকারও চাইছে যেন ঘরের ছেলে বাইরে মার খেয়ে পথে তার অসহয়তার সীমা বুঝে নিজেই ঘরে ফিরে আসুক। টের পাচ্ছিলাম, জনজীবন যাপনে বাধা পেয়ে অমর্যাদার শিকার মানুষের মনের বিষের ঘনকুটিল নদ গতিপথ বদলে ধীরে ধীরে ঘুরে যাচ্ছে ওদের দিকে।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বন্ধুদের সারি আর দীর্ঘ করতে চায়নি ওরা। যারা মারা গেছে ওরা যেন কেবল ওদেরই স্বজন। রমিজউদ্দিন স্কুলের রাজীব ও দিয়া যেন আর কারো কেউ ছিল না। রাজপথে বন্ধুদের দলিত করে হত্যার অহিংস প্রতিকার ঘটাতে নেমে ছেলেমেয়েগুলো যেন অপরাধ করেছে। ওদের চিত্কারের বিপরীতে দরকারি সাড়া নেই। ওদের নিঃসঙ্গ করে দেয়া হচ্ছিল। ক্রমেই করে তোলা হচ্ছিল সাধারণের চোখে মস্ত আপদ। সেই এক নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আমি বড় কিছু হীরকখণ্ড ক্রমেই কালো হয়ে উঠতে দেখছিলাম।

মেয়েটা আমাদের রাস্তা পার করে দিয়ে একসার রিকশার দিকে এগোতে সাহায্য করল। ও নিজেও কোনো কিনারা পাচ্ছিল না। আমি কোনোক্রমে শান্ত ছিলাম। আমার দুটি সত্তা দুদিকে ফিরে কাঁদছিল। আমার কাছে কোনো প্রতিকার ছিল না। বাবার ডাক্তার ছিলেন পান্থপথ। মিরপুর ১০ থেকে পান্থপথ রিকশার দূরত্ব নয়। তবু কোনো রিকশাওয়ালা অবাক হচ্ছিল না। শেষে একজনকে নিয়ে আমরা পথ পাড়ি দিয়েছিলাম। বাবার পাশে থেকে বুঝেছিলাম প্রথম দিকে তিনি মেয়েটির প্রতি খানিক বিরূপ ছিলেন। পরে করুণা আর কৃতার্থতা মেশানো চোখে তাকিয়ে ছিলেন। বাবা ২০১৯-এর শুরুতে দেহান্তরিত হন।

এ বছরের শেষ দিকেও কাছাকাছি ঘটনার সামনে পড়ি। তখন পার্লিয়াকে নিয়ে ওর একটা অ্যাসাইনমেন্ট সমাধা করার জন্যে যাব শাহবাগ। মধ্যপথে পড়লাম ভয়াবহ অবরোধের মুখে। নভেম্বরের শেষ কয়েক দিনে তো বেশকিছু সড়ক-হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। শিক্ষার্থী নাঈম, মাইনুদ্দিন ছাড়াও আরো মানুষ আছে শিকারের তালিকায়। এল ছাত্রদের প্রতিবাদ। মাঝখানে জ্বালানির মূল্য বাড়ায় বাস ভাড়া বেড়ে হয়ে উঠল অসহনীয়। নিরুপায় ছাত্ররা স্বাভাবিকভাবেই সমাধান চাইল। গাড়িচাপায় রাস্তায় রক্ত গড়াল যখন; একটা স্লোগান ভুলব না, ‘আর কত লিটার রক্ত লাগবে সড়ক আইন লিখতে?’ ওর সঙ্গে জ্বালানির মূল্য বাড়ায় যুক্ত হলো দ্বিতীয় ছাত্ররোষ। এও কিছু রক্তক্ষত তৈরি করল। আগুন জ্বলল, আমি দেখলাম, আবারো কিছু হীরকখণ্ড কালো হয়ে উঠছে।

দেশ বাঁচে নাগরিকে। দেশ যখন বংশানুক্রমে গর্বিত নাগরিক তৈরি করতে থাকে, তার টিকে থাকা নয় শুধু, তার বাঁচার মতো বাঁচা নিয়ে, প্রগতি নিয়ে আর চিন্তা থাকে না। দেশ যখন বংশানুক্রমে হতাশ নাগরিক তৈরি করতে থাকে, সে বাঁচে না। এ কথা শুধু দেশ নয়, জাতি, সম্প্রদায়, শিল্পকর্ম সবকিছুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। চাই গর্বিত অনুসারী। আমরা কি গর্বিত অনুসারী তৈরি করতে পারছি?

মানুষ জন্মের নিয়মে স্মৃতিকাতর। আমার একদিন পথ চলতে গিয়ে মনে হলো মানুষ ততদূর পর্যন্ত ভক্তি বিস্তার করতে পারে, যতদূর সে স্মরণ করতে পারে। আরো অনেক কিছুর সঙ্গে স্মৃতির সীমা তার ভক্তির সীমা নির্ধারণ করে। মানুষ যেখানে বেড়ে ওঠে, মানুষে যে পরিবেশ ভালোবাসে, যা ভালোবাসে; বা শুধু ভালোবাসা নয়, যা কিছু অপছন্দ করে, এড়িয়ে যেতে চায়; তার সেসব বোধই কেবল একা তাকে তৈরি করে না। যে মাত্রায় সে অনুভব করে, সেই মাত্রা পরবর্তী প্রজন্মের বোধের পথও তৈরি করে রাখে। স্মৃতি তাই বিবর্তনে এত জরুরি, টিকে থাকার সংগ্রামে এত প্রভাববিস্তারি। টিকে থাকারই নিঃশব্দ শর্ত হিসেবে মানুষ আত্মপ্রেমী। আর দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, সম্প্রদায়প্রেম এমনকি শিল্পপ্রেমও আত্মপ্রেমের অংশ। মানুষ আত্মপ্রেমী বলে এক ধরনের দেশাত্মবোধ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এ বোধ জীনের তন্তুতে সংরক্ষিত। সাধারণ সময়ে হয়তো সে টেরও পাবে না, কিন্তু বিশেষ সময় এলে তার গলা আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসতে চাইবে। এ অবধারিত। সেই বিশেষ সময় মানুষভেদে ভিন্ন হতে পারে। গর্বিত হওয়ার উপকরণগুলো সেই বোধের শেকড়ে পুষ্টি দেয়। যে কারণে মানুষ যখন ভালোবাসার মানুষ পরিবৃত্ত হয়ে থাকে, তখন সে মানুষ থাকে। অন্যথা ক্রমেই তাকে পিশাচ করে দেয়। আমাদের নতুন সময়ের মানুষেরা পৃথিবীর আর সব সময়ের মতো দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধ নিয়েই জন্মেছে। এ কোনো ফুঁকে দেয়ার বিষয় নয়। কিন্তু আমরা কি প্রেমবোধের শেকড়ে পুষ্টির উপকরণগুলো পারছি তাদের দিতে? আমি তো কেবল হীরকখণ্ড কালো হতে দেখছি। এ বছর তাই দেখলাম। গত বছরগুলোর মতো। গত দশকগুলোর মতো।

একটা মৌলিক প্রশ্নে আসতে চাই। রাজা কে। রাজা কারা।

জাপানি মাঙ্গা থেকে পরে এনিমেশনে রূপ দেয়া একটা বিশ্বনন্দিত সিরিজের নাম করছি, নারুতো। নারুতোর একটা পর্বে একজন শিক্ষক, আসুমা সেনসেই, বিশেষ এক প্রশ্নের সম্মুখীন হন। রাজা কে। যখন তিনি তরুণ, তখন এ প্রশ্নের জবাবটা সহজ ছিল। যিনি সিংহাসনে বসে আছেন, তিনিই রাজা। অথবা মানুষ যাকে শাসনের জন্যে নির্বাচন করেছে, নেতা বলে মেনে নিয়েছে, সেই তো। এ উত্তর শুনে বাবা সারুতোবি হাসলেন। বললেন, ভেবে বের করো। আমি বলব না।

রাজাকে রক্ষা করতে হবে, রাজার জন্যে প্রাণ দিতে হবে, এসব প্রচল কথার অর্থ কী, এ কী কেবল স্থূল সিংহাসনে বসে থাকা ব্যক্তিটির স্বার্থেই কথ্য। সারুতোবি সেনসেই বহু ত্যাগে, অপেক্ষায়, ধ্যানে একদিন উত্তরটা পেলেন। না, যাদের তিনি রাজা ভাবতেন, রাজা তারা নয়। রাজা বদলায়, রাজার জন্যে প্রাণ ধন্য ও দানযোগ্য, সবই ঠিক আছে, শুধু সিংহাসনটা চিনতে তিনি ভুল করেছেন।

দরবারের অমূল্য আসনে, সভার পতি হয়ে রাজা বসেই নেই। রাজা দুলছেন দোলনায়। প্রতিটি জাতির রাজা তার দোলনায় দুলছেন, পায়ে পায়ে হাঁটছেন, ক্রমেই বেড়ে উঠছেন। প্রতিটি শিশু, প্রতিটি কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণী দেশের রাজা-রানী। রাজা হলো উত্তর প্রজন্ম। এ রাজার জন্যে যে জাতি নিবেদিত, সে জাতিকে কে নিশ্চিহ্ন করবে? সে জাতির প্রগতির পথ কে রুদ্ধ করবে। সে তো হবে গর্বিত সত্য রাজার গরবিনী দেশ।

আমরা কেমন রেখেছি আমাদের রাজাদের? দুটো বাক্য আমাকে বড় তাড়াচ্ছে। বছরজোড়া দুটো বাক্য। দুটোই আমাদের রাজা ইস্যুতে উচ্চারিত। একটি বাক্য, আর কত লিটার রক্ত হলে সড়ক আইন লেখা হবে। আরেকটি বাক্য; যে বাক্য নিয়ে আমি কোনো বিশ্লেষণে যাব না, ময়নাতদন্তেও নয়। শুধু তা উচ্চারণ করব। ‘হাড় নেই, চাপ দেবেন না’। এর উচ্চারণেই সব ব্যথার ব্যাখ্যা রয়েছে, ভয়াতুর মনে কল্পিত, দেশের ভবিষ্যৎ রয়েছে।

হীরকখণ্ডগুলো কি ক্রমেই শুধু কালো হয়ে উঠছে না?

 

হামিম কামাল: কথাসাহিত্যিক