মধ্যযুগে তলোয়ারই ছিল শাসন ক্ষমতার নিয়ামক। মোগলরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। মোগলদের ভাগ্য নির্ধারণ হতো তাদের সেনাবাহিনীর গুণগত মানের ওপরই। ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা বাবর পানিপথে বিশাল আফগান বাহিনীকে হারিয়েছিলেন নিজের খুবই ছোট এক সেনাবাহিনী দিয়ে। ছোট হলেও তার সেনাবাহিনী ছিল অসীম সাহসী আর সমর বিদ্যায় কুশলী। মোগল সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর সেনাবাহিনীর আকারও বাড়তে থাকে। আওরঙ্গজেবের আমল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর এ আকার বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত অগ্রসরে অক্ষম এক ভারবাহী ঢাউস জনবলে পরিণত হয়। এটা মোগল সেনাবাহিনীর কর্মক্ষমতা হ্রাস করেছিল।
বাবরের পুত্র হুমায়ুন কনৌজে নিজের অপেক্ষাকৃত বড় সেনাবাহিনী নিয়ে হেরেছিলেন ছোট আফগান বাহিনীর কাছে। কিন্তু এ হুমায়ুনই যখন আবার সে আফগানদের হারান তখন তার সেনাবাহিনী ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট। অর্থাৎ সুশৃঙ্খল ছোট ও সাহসী সেনাবাহিনী প্রতিপক্ষ বিশাল সেনাবাহিনীকে হারাতে ও নির্মূল করতে সক্ষম।
বাদশা বাবর তার সেনাবাহিনী নিজে সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে পরিচালনা করতে পারতেন। কিন্তু আকবর বা তার পরবর্তী শাসকদের কারো পক্ষেই সেটা সম্ভব হয়নি। এর কারণ ছিল সেনাবাহিনীর বিশালতা। আকবর নিজে সেনাবাহিনীর অনেক সংস্কার করলেও সেনাবাহিনীতে ক্রমানুযায়ী পদ ও ক্ষমতার বিন্যাস তিনি করেননি। এর পরিবর্তে তিনি সেনাবাহিনীকে ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত রাখতেন। মনসবদারদের দায়িত্ব ছিল এসব ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন নিয়োগ করা। যুদ্ধের সময় এ ইউনিটগুলোকে এক জায়গায় আনা হতো। তবে কখনই এদের একটি ঐক্যবদ্ধ সেনাবাহিনীতে পরিণত করা হয়নি।
মোগল সেনাবাহিনীর কোনো সাধারণ পোশাক ছিল না। সাধারণ অনুশীলন বা যুদ্ধ কৌশলেরও কোনো বালাই ছিল না। প্রত্যেক জাতি তাদের ইউনিট নিয়ে নিজেদের মতো করে লড়াই করত। যেমন আফগানরা আফগান নেতার অধীন, রাজপুতরা তাদের নিজস্ব নেতার অধীন। প্রত্যেকেই তাদের ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুসারে যুদ্ধ করত এবং তাদের নিজস্ব অস্ত্র ব্যবহার করত। ফলে মোগলদের কোনো একটি একক সেনাবাহিনী ছিল—এমনটা বলা যায় না, বরং তাদের ছিল বিভিন্ন সেনাদলের একটি পুঞ্জীভূত ভার।
মোগল সেনাবাহিনীর আরেকটি দুর্বলতা ছিল, তাদের অনেক সেনা অধিনায়কই সার্বক্ষণিক কর্মরত থাকতেন না। অনেক ক্ষেত্রে এমনকি তারা যোদ্ধাও ছিলেন না। যুদ্ধের সময় কবি, ডাক্তার বা অন্যান্য পেশার মানুষকেও যুদ্ধে নামতে হতো। সেনা ইউনিটের নেতৃত্ব নিয়ে আমিরদের মধ্যে রেষারেষি ছিল। যুদ্ধের সময় ছোট ছোট সেনাদলকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো সেনা অধিনায়কেরও অভাব ছিল। ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন অধিনায়কের অধীন থাকত পাঁচ হাজার সৈন্য। ফলে তার পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে এ বিপুল সেনাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো না। আবার যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা অধিনায়কের মৃত্যু হলে পরবর্তী নেতা নির্দিষ্ট থাকত না। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে সে দল ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত।
মোগল সেনাবাহিনীর বিভাগ ছিল চারটি—রিসালা, পদাতিক, গোলন্দাজ ও হস্তী বাহিনী। এদের মধ্যে রিসালা, পদাতিক ও হস্তী বাহিনী মনসবদারদের মধ্যে ইচ্ছেমতো ভাগ করে দেয়া হতো। কিন্তু গোলন্দাজ বাহিনীর জন্য থাকত নির্দিষ্ট বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা অধিনায়ক। গোলন্দাজ ইউনিটের প্রধানের পদ ছিল ‘মীর অতিশ’। সেনাবাহিনীর একটি কেন্দ্রীয় অংশ থাকত, যা সম্রাট সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরবর্তী পর্যায়ের বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন মনসবদার ও রাজারা। আর স্থানীয় মিলিশিয়া পরিচালনা করতেন জমিদাররা।
মোগল সেনাবাহিনীর মূল শক্তি ছিল কেন্দ্রীয় রিসালা বা অশ্বারোহী ইউনিট। সম্রাট আকবরের সময় এ ইউনিটে ছিল প্রায় ২৫ হাজার সৈন্য। এ ইউনিটে থাকত আবার আরেকটি কেন্দ্র, যারা ছিলেন সম্রাটের বিশ্বস্ত ও সমর কুশল সৈন্যদের নিয়ে গঠিত। তারা সবসময় সামরিক প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে যেকোনো সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতেন। এ সেনাদের বলা হতো ‘আহাদিস’।
কেন্দ্রীয় ইউনিটের সৈন্য ও অধিনায়কদের সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা হতো। তাদের চারিত্রিক সাধুতার জন্য অবশ্যই কোনো জামিন হাজির করতে হতো। এ বাহিনীর রিসালাদের নিজস্ব তুর্কি ঘোড়া থাকতে হতো। কারণ ভারতের ঘোড়া ছিল ভীরু ও অশান্ত প্রকৃতির। আকবরের সময় ঘোড়াদের সাতটি ভাগে ভাগ করা হতো—আরব, পারসি, মুজান্না, তুর্কি, ইয়াবু, তাজিস ও জংলী ঘোড়া। আরব ঘোড়া ছিল সেরা।
মনসবদারদের প্রতিও নির্দেশ ছিল তারা যাতে সতর্কতার সঙ্গে সেনা নিয়োগ দেন। কিন্তু অনেক সময়ই তারা চাকরদের সৈন্য সাজিয়ে আনতেন বা অন্যের ঘোড়া ধার নিয়ে আসতেন। এ চতুরতা বন্ধ করতে সম্রাট আকবর ঘোড়ার গায়ে চিহ্ন দেয়ার বিধান চালু করেন, যা তার উত্তরসূরিরাও অনুসরণ করেছেন। আকবর তার রাজত্বের অষ্টাদশ এ চিহ্ন দেয়ার বিধান চালু করেন। রিসালা বাহিনী ছিল মোগলদের এলিট ফোর্স। তাই এ বাহিনীর সৈন্য ও ঘোড়ার জন্য বিশেষ দৃষ্টি রাখা হতো। প্রতি বছর কাবুল, বুখারা ও বল্খ থেকে প্রায় এক লাখ ঘোড়া আমদানি করা হতো।
পদাতিক সেনাদের মর্যাদা ছিল কম। পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করাটা সে সময় খুব একটা সম্মানজনক বলে বিবেচিত হতো না। কেউই পদাতিক বাহিনীতে কাজ করতে আগ্রহী হতেন না। তাই মুটে, পানিবাহক, ডাক বহনকারী—এমন পেশার মানুষ দিয়ে তৈরি হতো পদাতিক বাহিনী।
মোগল-ভারতের সাধারণ অস্ত্র ছিল তলোয়ার, বর্শা ও তীর-ধনুক। শূল বা বর্শা ছিল রাজপুতদের প্রিয় অস্ত্র। বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করা সৈন্যদের কোনো সম্মান ছিল না মোগল ভারতে। ভারতে যুদ্ধ হতো তলোয়ার আর বর্শা দিয়ে। আর মিসাইল বলতে ছিল তীর। তবে ধীরে ধীরে মাসকেট গান ও কামানের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু তা কখনই তলোয়ার, বর্শার মর্যাদা নিতে পারেনি। কামান ও মাসকেট গান বাবরই প্রথমবারের মতো ভারতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন। বাবরের বর্ণনায় জানা যায়, ভারতের অনেক এলাকার মানুষ তখনো বন্দুক দেখেনি। বন্দুককে তারা অত্যন্ত ভয় পেত। বন্দুক নিয়ে সম্রাট আকবরের বেশ আগ্রহ ছিল। তার পৃষ্ঠপোষকতায় হাকিম ফাতহুল্লাহ শিরাজি দুই নলের কামান আবিষ্কার করেছিলেন। আকবর এমন এক ধরনের বন্দুক তৈরি করিয়েছিলেন, যা কয়েক টুকরোয় ভাগ করা যায় এবং দরকার মতো জুড়ে নেয়া যায়। নিঃসন্দেহে এটা ছিল সে আমলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গোলন্দাজ অভিযানের একটি পরিচালনা করেছিলেন শাহজাদা দারা শিকো। কান্দাহার অভিযানে তার সঙ্গে ছিল ৩০ হাজার কামানের গোলা, ১ লাখ ৮৭ হাজার কিলোগ্রাম বারুদ, ৯৩ হাজার কিলোগ্রাম লেড ও ১ হাজার ৪০০ রকেট। কিন্তু এ বিপুল গোলাবারুদ নিয়েও দারা কান্দাহার দখলে নিতে পারেননি। কারণ তখনো এ অঞ্চলে যুদ্ধের নির্ণায়ক ছিল রিসালা বাহিনী। কিন্তু তার পরও গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে আগ্রহ ছিল মোগল সম্রাটদের। এ বাহিনী সরাসরি সম্রাটের নিয়ন্ত্রণে থাকত। গোলন্দাজ বাহিনীর সদস্যদের বেতনও ছিল ভালো। মানুচ্চি শাহজাহানের গোলন্দাজ বাহিনীতে মাসে বেতন পেতেন ৮০ রুপি। দারা তার বেতন বাড়িয়ে করেন ১৫০ রুপি। আওরঙ্গজেব ইউরোপীয় গোলন্দাজদের বেতন নির্ধারণ করেন দিনে ৪ রুপি। যুদ্ধে গোলাবারুদের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে কমতে থাকে ভারতের যুদ্ধের ট্যাঙ্ক বলে খ্যাত হাতির ব্যবহার। কারণ হাতি বন্দুক বা কামানের শব্দে ভয় পায়। আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী ভারতে এসে প্রথমবারের মতো হাতি দেখেছিল। সে হাতি দর্শন তাদের জন্য মোটেও সুখকর হয়নি। তাদের ঘোড়া সে বিরাট প্রাণীটিকে দেখে ভীত হয়ে পড়েছিল। মোগলরাও ভারতে এসে হাতির ব্যবহার দেখে। আকবরের হাতি সংগ্রহের নেশা ছিল। আকবরের সংগ্রহে ছিল পাঁচ হাজার হাতি। যার মধ্যে তার নিজের সংগ্রহশালায় ছিল ১০০ হাতি, যাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম ছিল। আকবরের হাতির পাল চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল। এক. ভাদ্দার, যাকে হিন্দিতে বলা হতো গজ মানিক, দুই. মান্দ, যা ছিল বন্য প্রকৃতির, তিন. মির্গ ও চার. মির।
স্থলযুদ্ধ নিয়ে মোগলরা অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। স্থলে সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার ব্যাপারে তারা কোনো সুযোগ ছাড়তেন না। মোগলরা এ দেশে এসেছিলেন মধ্য এশিয়া থেকে। সাগর ছিল তাদের কাছে অচেনা। ফলে ভারতে এসেও নৌবাহিনী নিয়ে তাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। মোগল যুগে এশিয়ায় একমাত্র চীনেরই উল্লেখ করার মতো নৌবাহিনী ছিল। তবে মোগল আমলে বড় বড় জাহাজ নির্মিত হতো। এসব জাহাজ চলত মূলত আরব সাগরে। ভারত থেকে মক্কায় হজযাত্রীদের নিয়ে যাওয়ার জন্যই এ জাহাজগুলো ব্যবহৃত হতো। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুরাট থেকে এসব জাহাজ মক্কায় যেত। এ জাহাজের বর্ণনায় পর্যটক নিকোলো কন্টি বলেছেন, জাহাজগুলো আকারে বড় হলেও খুব মজবুত ছিল না। এমন একটি জাহাজে তিনি ১ হাজার ৭০০ লোক পরিবহন করতে দেখেছেন। মোগল দের শক্তিশালী নৌবাহিনী না থাকায় সাগরে তাদের যাত্রী ও বাণিজ্য-জাহাজের নিরাপত্তার জন্য ইউরোপীয়দের সহায়তা চাইতে হতো। জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে বাণিজ্য জাহাজকে রক্ষা করতে ঢাকায় মোগলদের একটি বড় নৌবহর ছিল। ১৫৮২ সালে আকবরের অর্থমন্ত্রী টোডরমলের বাংলার রাজস্ব নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। জলদস্যুদের মোকাবেলা করতে আওরঙ্গজেব শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা খুব বেশিদূর এগোয়নি। পুরো ষোল ও সতেরো শতকের কয়েক দশক ভারতের স্থলভাগসংলগ্ন সাগরে আধিপত্য বজায় রেখেছিল পর্তুগিজরা। পর্তুগিজরা এ সাগর তাদের রাজার অধীন বলে দাবি করত। কিন্তু এ নিয়ে মোগলরা তেমন কোনো জবাব দিতে চেষ্টা করেননি। কারণ মূলত সাগরে পর্তুগিজদের এ আধিপত্য স্থলের মোগলদের জন্য কোনো হুমকি ছিল না। মোগলদের চিন্তা ছিল কেবল স্থলকে দখলে রাখা।
মোগলরা স্থলে নিজেদের অজেয় বলে বিবেচনা করতেন। সম্রাট আকবরের সময় ব্যাপারটা তেমনই ছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেবের সময় এসে পরাক্রমশালী মোগল সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেতন বৈষম্য, নৈতিক মানের অবক্ষয়সহ বিভিন্ন সমস্যা পর্যুদস্ত করে মোগল সেনাবাহিনীকে। সম্রাট শাহজাহানের শাসনের শেষদিকে ও আওরঙ্গজেবের শাসনামলে সৈন্যদের লুটপাট করার নজির আছে। মোগল সেনাবাহিনীর সংকট বেড়েছে তার আকারের সমানুপাতে। শাহজাহানের মৃত্যুর মাধ্যমে মোগল সেনাবাহিনীর সমর নেশা লোপ পায়। জাহাঙ্গীরের আমল থেকেই সেনাবাহিনীর গুণগত মান কমতে থাকে। তাভেরনিয়ার ভারতে এসেছিলেন সম্রাট শাহজাহানের সময়ে। তিনি বলেছেন, ১০০ ইউরোপীয় এক হাজার ভারতীয় সেনাকে পরাজিত করতে পারে। ভারতে আসা ইংরেজদের মধ্যে একটা প্রচলিত ঠাট্টা ছিল এমন যে একজন পর্তুগিজ তিনজন ভারতীয়কে পরাজিত করতে পারে আর একজন ইংরেজ তিনজন পর্তুগিজকে পরাজিত করতে পারে। মানুচ্চি বলেছিলেন, ৩০ হাজার ইউরোপীয় সেনা মোগল সাম্রাজ্য দখল করে নিতে পারে।
মধ্যযুগের যুদ্ধে সেনাদের সমর উদ্যম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের বিলাসিতা ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর ধার কমিয়ে দেয়। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে মানরিক উল্লেখ করেন, ‘মোগলরা ভীরু ও বিলাসপ্রিয়। তারা যোদ্ধা নন।’
মোগলদের পক্ষে অনেক রাজপুত সেনা কাজ করতেন। যুদ্ধে যাওয়ার আগে তারা আফিম সেবন করতেন। রাজপুতরা অসম সাহসী হলেও যুদ্ধের আগে এ আফিম নিয়ে নিজেদের উদ্দীপ্ত করে নিতেন। এমনকি মুসলিম সেনাদের অনেকেও যুদ্ধে যাওয়ার আগে আফিম সেবন করতেন। যুদ্ধের উদ্যমই শুধু যুদ্ধ জেতার জন্য যথেষ্ট নয়। দরকার নিয়মানুবর্তিতা, সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী। মোগল সাম্রাজ্যের প্রথমভাগে এ বিষয় কঠোরভাবে পালন করা হতো। মনসরেট বলেছেন, রাজপুতদের নিয়ে মোগলদের ধারণা ছিল—তারা জানে কীভাবে যুদ্ধে প্রাণ দিতে হয়, কিন্তু কীভাবে লড়তে হয় সেটা তারা জানে না। বাদশা বাবর লিখেছেন, ‘যে সৈন্য তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবে তার নাক কেটে সৈন্যদলের মধ্যে ঘোরানো হবে।’ একই রকমভাবে শাসন করেছেন সম্রাট আকবর। মনসরেট জানাচ্ছেন, ‘আকবর কঠোরভাবে সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন এবং এক্ষেত্রে তিনি কোনো হেরফের হতে দিতেন না।’
মোগল তথা ভারতীয় সেনাবাহিনী বিরাট আকারের হলেও ভাগ্যনির্ধারণী যুদ্ধগুলোও দিন ফুরাতে না ফুরাতেই শেষ হয়ে যেত। যুদ্ধ নির্ভর করত অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম আক্রমণের ওপর। ৪০ হাজারের পদাতিক বাহিনীও দুইহাজার অশ্বারোহীর সামনে টিকতে পারত না। আর সেনারা মোটেও দেশ বা রাজার পক্ষে যুদ্ধ করতেন না, তারা স্রেফ বেতনের বিনিময়ে যুদ্ধ করতেন। ফলে যুদ্ধের ময়দানে কমান্ডার মারা গেলে তার অধীনের সেনারা রণে ভঙ্গ দিতেন।
যুদ্ধে বিশ্বাস মধ্যযুগে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। পানিপথে জয় সম্পর্কে বাদশা বাবর বলেন, ‘এ সাফল্যকে আমি নিজের শক্তির ফল বলব না, এটা আমার প্রচেষ্টা থেকে তৈরি হওয়া সৌভাগ্যও নয়। এটা আল্লাহর করুণা ও কৃপার নিদর্শন।’ যুদ্ধে যাওয়ার আগে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের সেনারাই ধর্মীয় আচার পালন করতেন। জওহর জানিয়েছেন, কামরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার আগে সম্রাট হুমায়ুন, শাহজাদা আকবর ও সেনাপতি আবুল মওলি গোসল করে জুমার নামাজ আদায় করেন এবং মাথায় সুগন্ধি লাগিয়ে নিজেদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করে নেন। হিন্দুস্তানে আক্রমণের আগে হুমায়ুন শাহজাদা আকবরকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার জামাকাপড় পরান এবং আকবরের সামনে বসে কোরআন পড়ে তার গায়ে ফুঁ দিয়ে দেন। মোগলদের সব যুদ্ধই শুরু হতো সাফল্য কামনা করে প্রার্থনার মাধ্যমে। সৃষ্টিকর্তার আনুকূল্য ব্যতীত যুদ্ধ জয় করা যায় না। মোগলরা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সুরের সঙ্গে নিজেদের ঐকতান বজায় রাখতে চাইতেন। তাই তারা যুদ্ধের দিন ঠিক করতেন নক্ষত্রের অবস্থান দেখে। প্রতিটি যুদ্ধের আগে তারা তাদের ভাগ্য গণনার আশ্রয় নিতেন। সাধারণ সেনা ও কর্মকর্তারাও ভালো পোশাক পরে যুদ্ধে যেতেন। কারণ তারা এ যুদ্ধকে নিজের শেষ যুদ্ধ বলে বিবেচনা করতেন।
যুদ্ধযাত্রায় সৈন্যদলের সঙ্গে বিরাট এক জনগোষ্ঠী তাদের সঙ্গে চলত। বিশেষত সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং তাদের পরিবারও যেত এ যাত্রায়। হাজার হাজার মানুষের একটি দল ভ্রাম্যমাণ যাত্রায় শামিল হতো। নরিসের বর্ণনামতে, এ দলে থাকত ‘স্ত্রী, গণিকা, শিশু, খোজা, বণিক, মহাজন, ব্যবসায়ী।’ তবে রাজপুত নারীরা এ ভ্রাম্যমাণ যাত্রায় যেতেন না। মারাঠিদের ক্ষেত্রে শিবাজি নারীদের এ রকম যাত্রায় গমন নিষিদ্ধ করেন।
যুদ্ধযাত্রায় সেনারা কোনো আলাদা একক বাহিনী হিসেবে চলতেন না। দেখা যেত প্রত্যেক সৈন্য তার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটছেন। সঙ্গে তার অস্ত্র, পারিবারিক মালপত্র। সৈন্যদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থাও থাকত না। সে ভ্রাম্যমাণ যাত্রায় থাকা ব্যবসায়ীরা তাদের মালপত্র নিয়ে চলতেন। যাত্রা চলাকালীন তারা বাজার বসাতেন এবং সেনাদের সেখান থেকেই তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করতে হতো। সম্রাট শুধু এ ব্যবসায়ীদের থাকা নিশ্চিত করতেন, যাতে সেনারা দরকারি জিনিস কিনতে পারেন। এ ব্যবস্থা ভালোই কাজ করত। যুদ্ধে যাওয়ার আগে সেনাদের কয়েক মাসের বেতন দিয়ে দেয়া হতো যাতে তারা দরকারি জিনিস ঠিকভাবে কিনতে পারেন।
সেনাবাহিনী চলার সময় বিভিন্ন দিকে অগ্রবর্তী বাহিনী যেত যাতে অ্যামবুশ এড়ানো যায়। মনসারেট আকবরের কাবুল অভিযানে ছিলেন। তিনি জানান, সাম্রাজ্যের বাইরের কোনো এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় আগে দূত গিয়ে সেখানকার স্থানীয় শাসকদের আশ্বস্ত করে আসতেন, যাতে তারা ভয় না পান। মোগল সেনাবাহিনীর যুদ্ধযাত্রার গতি ছিল দিনে ১০-১২ মাইল।
যুদ্ধে সেনাবাহিনীর জন্য দুই ধরনের সংকেত থাকত। একটি নিজের গোত্রের মধ্যে ব্যবহারের জন্য এবং অন্যটি পুরো সেনাবাহিনীর জন্য। এটা করা হতো যুদ্ধ-ময়দানে একে অপরকে চেনার জন্য। একজন বলতেন সংকেতের প্রথম অংশ অন্যজন বলতেন শেষ অংশ। অনেক সময় শত্রুদের ভিড় থেকে নিজেদের পৃথক করতে সেনারা বিভিন্ন স্লোগান দিতেন। যেমন মুসলমানরা বলতেন আল্লাহু আকবর! বা ইয়া মুইন!, রাজপুতরা বলতেন রাম! রাম!, মারাঠিরা বলতেন হর-হর মহাদেব! কিন্তু অনেক সময়েই এটা কাজ করত না। কারণ অনেক সময় দুইপক্ষেই একই ধর্মের বা জাতির সেনারা থাকতেন।
মোগল সম্রাটদের মধ্যে আওরঙ্গজেবের সময়ই মোগল সেনাবাহিনী সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পতিত হয়। সেনাবাহিনীর আকার বিস্তৃত হলেও সেনাদের নৈতিক মানের অবক্ষয় ঘটে। মানুষ তো বটেই, পশুদের সঙ্গেও অমানবিক ব্যবহার করা হতো তখন।
মোগল বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৈমুর লং। তৈমুর থেকে ভারতের প্রথম যুগের মোগল শাসকরা সবাই ছিলেন সমর কুশল। তাদের উন্নত পরিকল্পনা বহু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের জয় এনে দিয়েছে। তৈমুর লং ভারতে এসে প্রথম হাতির মুখোমুখি হন। কিন্তু দ্রুতই তিনি হাতিকে মোকাবেলা করার উপায় বের করে ফেলেন। কাঁটা বিছিয়ে তিনি হাতিকে দিশেহারা করে ফেলেন। খড়ে আগুন দিয়েও হাতিকে কাবু করেন তিনি।
মোগল ও রাজপুতরা চোরাগোপ্তা হামলার নীতিকে নিন্দা করতেন। তাদের মতে, এটা হলো কাপুরুষতার নিদর্শন। তবে এক্ষেত্রে মারাঠিদের কোনো আপত্তি ছিল না। মারাঠীদের সেনাবাহিনীর গঠন ছিল মোগলদের চেয়ে উন্নতমানের। তাদের সেনাবাহিনীতে ছিল সুনির্দিষ্ট পদবিন্যাস। মারাঠাদের কাছে জয়ই ছিল প্রধান বিষয়। আর রাজপুতদের কাছে গৌরব ছিল প্রধান। রাজপুতরা পরাজয়ের চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করতেন, কিন্তু মারাঠিরা পালিয়ে গিয়ে আরেকটি সুযোগ খুঁজত। মারাঠিরা মোটেই স্বপ্নবিলাসী ছিল না, যেমনটা ছিলেন মোগল রা। বালক বয়সেই বাবর তার পিতার হারানো রাজত্ব পুনর্দখল করার প্রতিজ্ঞা করেন। তাই ইতিহাসে মোগল সাম্রাজ্য গড়ে উঠলেও কোনো মারাঠা সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেনি।
তথ্যসূত্র
আবুল ফজল, আইন-ই আকবরী, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা, ২০১০।
আব্রাহাম এরালি, দ্য মোগল ওয়ার্ল্ড; লাইফ ইন ইন্ডিয়া’স লাস্ট গোল্ডেন এজ, পেঙ্গুইন বুকস, নয়াদিল্লি, ২০০৭
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক





