ঘোড়দৌড়ের আয়োজন করেছেন মোগল সম্রাট নুরউদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। বাছাই করা সব ঘোড়া এতে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু সবাইকে পেছনে ফেলে আরবীয় একটি বাচ্চা ঘোড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হলো। সম্রাট জাহাঙ্গীরকে এ ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন দাক্ষিণাত্যের তৎকালীন শাসক আদিল খান। ১৬০৮ সালে এ ঘোড়দৌড় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরিতে এ ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন সম্রাট জাহাঙ্গীর।
ভারতবর্ষে সামরিক ঐতিহ্য ও যুদ্ধকৌশল বদলে দিয়েছিল ঘোড়া। শক্তিশালী অশ্বারোহী বাহিনী মানেই যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত। এ যেন এক স্বতঃসিদ্ধ বিধিতে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে অশ্বারোহী বাহিনী ক্ষিপ্রগতিতে দাপিয়ে বেড়াত। পদাতিক বা হস্তীবাহিনীর পক্ষে এত দ্রুত নড়াচড়া করা সম্ভব ছিল না। তাই মোগল শাসকদের কাছে ঘোড়ার কদর ও আদর ছিল অনেক বেশি। মোগল সেনাবাহিনীতে অশ্বারোহী বাহিনীর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল। আরব, ইরান, তুরান, তুরস্ক, তুর্কিস্তান, বাদাখশান, শিরওয়ান, কিরগিজ, তিব্বত, কাশ্মীরসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে উৎকৃষ্ট মানের ঘোড়া আমদানি করা হতো। জল ও স্থল উভয় পথেই এসব ঘোড়া মোগল সাম্রাজ্যের সীমানায় প্রবেশ করত। ঘোড়ার ব্যবসা নির্বিঘ্ন ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোগল শাসকরা সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। অশ্বারোহী বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য ঘোড়ার ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখতেন না। রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ অশ্বারোহী বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হতো। আরবীয়, পারস্য ও তাজি ঘোড়াগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে সমুদ্র পথে আমদানি করা হতো। সে কারণে এসব ঘোড়াকে বলা হতো ‘বাহির’। আরবি বাহ্রুন শব্দের অর্থ সমুদ্র। সেখান থেকেই এমন নামকরণ। ঘোড়া আমদানির পাশাপাশি উপহারসামগ্রী হিসেবে এবং বিজিত দল থেকেও অনেক ঘোড়া পাওয়া যেত। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে নিয়মিত ঘোড়ার মেলার আয়োজন করা হতো। সেখান থেকে রাজকীয় বাহিনীকে ঘোড়া সরবরাহ করা হতো। আফগান, লোহানি, পোবিন্দা ইত্যাদি সম্প্রদায় ঘোড়া পালন ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে আঠারো শতকের দিকে ভাট, বানজারা, ভাট্টিসহ আরো কিছু সম্প্রদায় এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিদের কাছে যেন সর্বোৎকৃষ্ট ঘোড়াগুলো বিক্রি করা হয়, তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। এসব বাছাই করা ঘোড়ার মধ্যেও আবার অধিকতর ভালো ঘোড়াগুলোকে আলাদা করা হতো। সেগুলোকে বলা হতো খাস (বিশেষ)। খাস ঘোড়াগুলো রাখার জন্য ছয়টি রাজকীয় আস্তাবল নির্দিষ্ট ছিল। প্রতিটি আস্তাবলে ৪০টি করে ঘোড়া থাকত। খাস ঘোড়াগুলোর অধিকাংশই আরব ও পারস্য থেকে আসত। তবে এসব ঘোড়াকে কেনামাত্রই অশ্বারোহী বাহিনীতে সংযুক্ত করা হতো না। তার আগে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। প্রশিক্ষণস্থলের নাম ছিল ফরাসখানা। সেখানে ঘোড়াগুলোকে প্রথমে সামরিক কসরত শেখানো হতো। তারপর তাদের বিভিন্ন ধরনের গোপন সংকেত ও প্রতীকের সঙ্গে পরিচিত করানো হতো। এ বিশেষ কৌশলগুলোকে বলা হতো তিপুচাক। সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব ঘোড়া ও ঘোড়সওয়ারের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা সম্পর্ক তৈরি হতো। এসব কৌশলে প্রশিক্ষিত ঘোড়াগুলোকে বলা হতো ‘তিপুচাক’। হুমায়ুননামার ভাষ্যানুসারে, তিপুচাক ঘোড়াগুলোর ঘাড় ছিল লম্বা। গতি, সৌন্দর্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে ঘোড়াগুলো অতুলনীয় ছিল। আরোহীর নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার ব্যাপারে তারা সর্বদা সচেতন ও সচেষ্ট থাকত। একই সঙ্গে একজন অশ্বারোহীকেও তার ঘোড়ার নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হতো। যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ার প্রাণ রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হতো। মোগল সম্রাট বাবর যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ার মৃত্যুকে একজন সৈনিকের মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করেছেন। মোগল শাসকদের কাছে তিপুচাক ঘোড়া স্বর্ণ ও রুপার সমকক্ষ কিংবা ততোধিক মূল্যবান ছিল। তিপুচাক ঘোড়ার সংখ্যা দিয়ে একজন শাসকের সম্মান, মর্যাদা ও ক্ষমতা নির্ণয় করা হতো। সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ঘোড়াগুলোকে সৌজন্য ও শিষ্টাচার শিখানো হতো। শিষ্টাচারের শিক্ষার দিক দিয়ে আরবীয় ঘোড়াগুলো ছিল অতুলনীয়। তারা ছিল সতর্ক, সুন্দর ও যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচল। আরবীয় ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করা মানেই ছিল সম্মান, মর্যাদা ও আভিজাত্য বহুগুণে বেড়ে যাওয়া। তবে কেবল ঘোড়া থাকাটাই যথেষ্ট ছিল না, একজন প্রকৃত অভিজাত ব্যক্তির ঘোড়ার খুঁটিনাটি সম্পর্কেও জ্ঞান থাকতে হতো। তা না হলে ভালো ঘোড়া কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। কেনার পর ঘোড়ার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণও তারা করতে পারত না। ঘোড়ার বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করা ও প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান থাকাটাও একজন অশ্বারোহীর অপরিহার্য গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো।
মোগলদের আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী প্রকৃতি যুদ্ধবাজ ঘোড়াগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো। দ্রুতগতিসম্পন্ন ও অত্যাধুনিক অশ্বারোহী বাহিনীর কারণে মোগলরা বিশাল এলাকাজুড়ে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছিল। মোগল সেনাবাহিনীতে অশ্বারোহী বাহিনীর প্রাধান্য ছিল। মূলত মনসবদারদের নিয়ে অশ্বারোহী বাহিনী গঠিত হতো। মনসবদারদের অধীনে থাকা ঘোড়া ও অশ্বারোহীর সংখ্যা বিবেচনায় তাদের পদমর্যাদা নির্ধারিত হতো। তাছাড়া কয়েকজন বিশেষ অশ্বারোহী থাকতেন। তাদের ‘আহাদি’ বলা হতো। তারা সম্রাটের চারপাশে থাকতেন এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতেন। এসব আহাদিরা কারো কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন না। তারা কেবল সম্রাটের কাছেই জবাবদিহি করতেন।
মোগল শাসনামলে ঘোড়া ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। অমায়িক প্রাণী হিসেবে এর আলাদা পরিচিতি ছিল। উৎকৃষ্ট ঘোড়ার মালিকানা মোগল দরবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং আশরাফ পরিবারের অভিজাতদের সামাজিক মর্যাদাকে আরো বাড়িয়ে দিত। আভিজাত্যের পাশাপাশি পৌরুষের প্রতীকও ছিল ঘোড়া। এক হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে অন্য হাতে অস্ত্র পরিচালনা করতে পারাকে পৌরুষের সর্বোচ্চ প্রদর্শন হিসেবে গণ্য করা হতো।
মোগলদের কাছে ঘোড়া ছিল সবচেয়ে সেরা উপহার। একবার সম্রাট আকবর তার ভাই দানিয়ালকে নিয়ে আগ্রায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে আকবর দানিয়ালের মনোবাঞ্ছা জানতে চাইলেন। সুযোগ পেয়ে আকবরের অধীনে থাকা একটি ইরাকি ঘোড়া চেয়ে বসলেন দানিয়াল। সম্রাট আকবর তার বাসনা পূরণ করলেন। একবার সম্রাট জাহাঙ্গীর তার সংগ্রহে থাকা সেরা ঘোড়াটি রাজা মানসিংহকে উপহার দিয়েছিলেন। আরো কয়েকটি ঘোড়া ও কিছু উপহারসহ ঘোড়াটি রাজা মানসিংহের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন মিনু চিহির নামে একজন বিশ্বস্ত ভৃত্য। রাজা মানসিংহ সে উপহার পেয়ে রাজ্যলাভের চেয়েও বেশি উৎফুল্ল হয়েছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর রাজা কল্যাণকে একটি ইরাকি ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। ১৬১২ সালে তিনি মির্জা রুস্তমকে পাটনার প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। নিয়োগদানের সময় তিনি তাকে একটি সুসজ্জিত ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। ১৬১৫ সালে মহাবত খানকে দাক্ষিণাত্যের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। তাকেও অন্যান্য মহার্ঘ উপহারের সঙ্গে একটি চমৎকার ঘোড়া উপহার দেয়া হয়েছিল। একইভাবে ১৬১৬ সালে মুকাররাব খান যখন আহমেদাবাদের প্রশাসক হলেন, তখন তাকে সম্রাটের ব্যক্তিগত আস্তাবল থেকে দুটি ঘোড়া উপহার দেয়া হয়েছিল। ১৬২১ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর পুত্র শাহজাহানকে এক হাজারটি ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। শাহজাহানের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। এর নাম ছিল ‘রুম-রতন’ (তুরস্কের রত্ন)। ঘোড়াটি সম্রাট জাহাঙ্গীরকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন পারস্যের তৎকালীন শাসক। কূটনৈতিক উপহার হিসেবেও ঘোড়ার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে বাংলার তৎকালীন প্রশাসক তাকে ২৭টি ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। তুরস্কের রাষ্ট্রদূত ৫২টি আরবীয় ঘোড়া নিয়ে সম্রাট শাহজাহানের দরবারে এসেছিলেন। তুরানের রাষ্ট্রদূত তাকে ৮৭টি ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ২৭টি ঘোড়া ছিল তুর্কি বংশোদ্ভূত। সম্রাট শাহজাহান তাকে একটি ইরাকি ঘোড়া এবং কিছু স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিয়েছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবও ঘোড়া খুবই পছন্দ করতেন। তার শাসনামলে মোগল দরবারে পাঠানো উজবেক সুলতানদের প্রধান উপহার ছিল ঘোড়া। তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানেও ঘোড়া উপহার দেয়ার প্রচলন করেছিলেন। ১৬৭৯ সালে মুহাম্মদ আকবর যখন লাহোরের প্রশাসক নিযুক্ত হন, তখন তাকে দুটি ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব।
মোগল শাসনামলে আভিজাত্য, পৌরুষ ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ঘোড়ার অবস্থান ছিল অতুলনীয়। উপহার হিসেবেও তা ছিল অনন্য।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





