পানিপথে যুদ্ধ চলছে। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল। ইবরাহীম লোদির বিশাল সেনাবহরের সামনে জহির-উদ-দ্বীন বাবর। কিন্তু অধিক সেনার পেশিশক্তি দিয়েই যে যুদ্ধ জয় করা যায় না এর প্রমাণ রেখেছিলেন বাবর। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইবরাহীম লোদি পরাজিত হয়েছিলেন বাবরের বিরুদ্ধে। এ যুদ্ধে বাবরের জয়ের মধ্য দিয়ে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা হয় দিল্লিতে তা সবারই জানা। কিন্তু যুদ্ধ জয় কেমন করে হলো সেদিকে নজর করলে দুটো বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, বাবরের কৌশল। তিনি পণ্যবাহী গাড়ি একত্রে বেঁধে সৈন্যদের রেখেছিলেন এর পেছনে। কিন্তু তাহলে আক্রমণ হলো কেমন করে? এখানেই দ্বিতীয় বিষয়। মোগল সেনারা আক্রমণ করেছিল ম্যাচলক ধাঁচের গাদা বন্দুক দিয়ে। এ যুদ্ধের সময় থেকেই ভারতে বন্দুকের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। এরপর ৩০০ বছরের বেশি সময় ব্যাপ্ত মোগল শাসন সামনে এনেছিল বিচিত্র ধরনের অস্ত্রশস্ত্র। 

উপমহাদেশে ৩০০ বছরের মোগল শাসনের পুরোটাই ছিল যুদ্ধবিগ্রহে ভরা। আর যুদ্ধ মানেই অস্ত্র। মধ্যযুগে যুদ্ধ মানে ছিল সম্মুখসমর। সেখানে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করা হতো। ছুড়ে মারার মতো অস্ত্র বলতে ছিল তীর। বর্শাও এর মধ্যে যুক্ত হতে পারে। এর বাইরে মূল ছিল তলোয়ার। পদাতিকরা তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করত। তলোয়ারেরও বহু ধরন ছিল। ঘোড়সওয়াররা দীর্ঘ বর্শা ও বল্লম ব্যবহার করত। মোগল আমলে এ ধরনের অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয় বন্দুক। মোগলরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র-তীর-ধনুক, কুঠার, বর্ম, ঢাল নিয়ে এসেছিল। আসার পথে যুক্ত হয় মাস্কেট, বোমা, কামান, রকেট। আরো সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতীয় অস্ত্র।

মোগল শাসকদের মধ্যে সবাই ছিলেন উদ্ভাবনের সমর্থক। নতুন যেকোনো বিষয় তারা স্বাগত জানাতেন। যুদ্ধ ও অস্ত্রের ক্ষেত্রে বাবর নানা ধরনের উদ্ভাবনের সূচনা করেছিলেন। আকবরের শাসনামলে তা আরো বাড়ে। কিন্তু তাদেরও আগে বিজ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন তৈমুর লংয়ের নাতি উলুঘ বেগ। রাজ্য স্থাপনের পাশাপাশি রাজ্য বিস্তারেও তাদের আগ্রহ ছিল। মোগল শাসনামলে রাজ্য বিস্তারের একমাত্র উপায় ছিল যুদ্ধ। এছাড়া নানা সময়ে শত্রুর আক্রমণ ও নানা বিদ্রোহ লেগে ছিল। সে কারণেও যুদ্ধ হতো। বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের স্বার্থেই উদ্ভাবনে, বিশেষত অস্ত্রের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হয়েছিল মোগলদের। কখনো তারা খুঁজে নিয়েছে নতুন অস্ত্র। আর এর মধ্যে বন্দুক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

বাবর তার ভারত অভিযানের সময় ম্যাচলক বন্দুক সঙ্গে এনেছিলেন। এ অস্ত্র তাকে দিল্লি জয় করতে সহযোগিতা করেছিল। এ জাতের বন্দুকে বারুদ ঠেসে গুলি করা হতো। বলা হয়, বারুদের ব্যবহার ভারতে বাবরের হাত ধরেই হয়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আছে। ভারতে এর আগেও আগ্নেয়াস্ত্র ও বারুদ ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু সেসব ছিল বড় আকারের আগ্নেয়াস্ত্র, কামান ঘরানার। মোগলরাও কামান ব্যবহার করেছে, এমকি বহু বিখ্যাত কামান তাদের ছিল, কিন্তু মোগল শাসনামলে তৈরি হয়েছিল বহনযোগ্য আগ্নেয়াস্ত্র। এক্ষেত্রে বাদশাহ আকবর ও তার পুত্র জাহাঙ্গীর ছিলেন অগ্রণী। দুজনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল অসংখ্য ছোট, বহনযোগ্য অস্ত্র। কেবল সংগ্রহই নয়, এগুলো নিয়মিত পরিবর্তন, পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে যেত। 

বন্দুকের প্রতি আকবরের আলাদা আকর্ষণ ছিল। এ সম্পর্কে আবুল ফজল লিখেছেন, ‘‌হারেমে একশ একটি বন্দুক রাখা হতো। সৌরবছরের প্রথম দিন হারেমের পরিচারকদের হাতে ১১টি বন্দুক দেয়া হতো। প্রতিটি বন্দুক মাস, সপ্তাহ ও দিন হিসেবে নির্ধারিত থাকত।...বাদশাহ এ বন্দুক দিয়ে অনুশীলন করতেন। সবগুলো একবার করে ব্যবহার করা হয়ে গেলে আবার নতুন করে শুরু করতেন।’ এসব বন্দুকের কোনো কোনোটি নিয়ে বাদশাহ শিকারে যেতেন এবং কোন বন্দুকে কতগুলো শিকার করলেন তা লিখে রাখার দায়িত্ব ছিল ওয়াকিয়ানবিশদের। আবুল ফজল জানাচ্ছেন ‘‌সংগ্রাম’ নামের একটি বন্দুক দিয়ে ১ হাজার ১৯টি প্রাণী শিকার করা হয়েছে।

বন্দুকের এমন ব্যবহারের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, কেবল যুদ্ধ নয়, এর বাইরেও ব্যবহার হতো বন্দুক এবং কেবল পুরুষরাই নন, নারীরাও বন্দুক ব্যবহার করে শিকার করতেন। আকবরের পুত্র সেলিমও (পরবর্তী সময়ে বাদশাহ জাহাঙ্গীর) একজন দারুণ বন্দুকবাজ ছিলেন। তার স্ত্রী নূর জাহান শিকারে বন্দুক ব্যবহার করেছেন। এসব বিশেষ বন্দুক বিশেষভাবেই তৈরি হতো। বন্দুকের ওপর থাকত নানা রকম কারুকাজ। ছুরি ও তলোয়ারের পাশাপাশি বন্দুকেও কোফতগারির (এক ধরনের কারুকাজ) কাজ করা হতো।

মোগলদের আগে এমনকি মোগল শাসনে প্রাথমিক পর্যায়েও পদাতিকরা শস্ত্র (যা হাতে ধরে যুদ্ধ করতে হয়। যা ছোড়া যায় তা অস্ত্র) নিয়ে যুদ্ধ করত। দিনে দিনে অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই তীর বহুল ব্যবহৃত। মোগল আমল থেকে সেই জায়গা নিতে শুরু করে মাস্কেট। বলা হয়, মাস্কেট মূলত ‌ক্রসবোর (আড়ধনুক) নীতি অবলম্বনে তৈরি। এটি তুলনামূলক কম শ্রমে চালানো যেত। বন্দুকবাজ তার এক হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে সহজে গুলি ছুড়তে পারতেন। শুরুতে ক্রসবোর তুলনায় এর কার্যকারিতা (লক্ষ্যবিদ্ধ করা) ছিল কম। কিন্তু এটি সৈন্যরা আড়াল থেকে ব্যবহার করতে পারত। আরো মজার ব্যাপার, ক্রসবোর তুলনায় এর উৎপাদন খরচ ছিল কম। অন্যদিকে কম দূরত্বে মাস্কেটের গুলি তীরের চেয়ে বেশি গতিতে লক্ষ্যকে বিদ্ধ করত। তীরের তুলনায় তাই মোটের ওপর লাভজনক হয়ে ওঠে মাস্কেট।

বাবরের সময় ব্যবহার করা মাস্কেটগুলো তৈরি হয়েছিল ব্রাস (কপার ও জিংকের মিশ্রণে তৈরি) দিয়ে। পরবর্তী সময়ে এ জায়গা নেয় স্টিল। ‘‌তুফাং’ নামের প্রথম দিকের এ ম্যাচলক দ্রুতই নষ্ট হতো। এরপর আকবর এ বন্দুকের সংস্কার করান। তৈরি হয় ‘‌তোরাদর’। একই ধারার, তবে তুলনামূলক বেশি টেকসই। স্টিলের পাত মুড়ে তৈরি হতো এসব বন্দুকের নল। আকবরের সময়কার এসব বন্দুকের নলের দৈর্ঘ্য ছিল ৬৬ ও ৪১ ইঞ্চি। নলের পেছনের অংশ ব্রাস, সিলভার এমনকি স্বর্ণের তৈরিও হতো। গুলিগুলো হতো মূলত সিসার তৈরি। মোগলরা তাদের বন্দুকবাজদের হাতির পিঠে চড়িয়ে দিত, যেন গুলি ছুড়ে লক্ষ্যভেদ সহজ হয়। এ ম্যাচলকের আবার কিছু প্রকার ছিল। এর মধ্যে তিন প্রকার ম্যাচলক ব্যবহার হতো বেশি:

ক্যালেটক: এ বন্দুকগুলো তুলনামূলক দীর্ঘ। বগলের নিচে নিয়ে ঘুরতে হতো।

জিজায়েল: এটি মোগল আমলের জনপ্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। জিজায়েল এক প্রকারের ‘‌সুইভেল গান’। তবে ম্যাচলকের সঙ্গে এর আলোচনা না করে হালকা আগ্নেয়াস্ত্রের আলোচনায় একে রাখা ভালো।

ঘোর-দাহান: জিজায়েলের মতোই হালকা আগ্নেয়াস্ত্র।

মোগল আর্টিলারি তথা কামান বা কামানজাতীয় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও এর কার্যকরিতা বহুল আলোচিত। কামান ও বারুদ মূলত অটোমান সুলতান মেহমেদের হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতন থেকেই বিখ্যাত। মোগল বাদশারাও কামানে বিনিয়োগ করতেন। মোগলরা তৈরি করেছিল আলাদা গোলন্দাজ বাহিনী। চিতোর, দাক্ষিণাত্য জয়ে ভূমিকা রেখেছিল কামান ও গোলন্দাজ বাহিনী। তবে সেদিকে যাওয়ার আগে আরো হালকা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কিছু আলাপ প্রয়োজন। কেননা মোগল আমলে পিস্তলেরও ব্যবহার ছিল।

২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া বলিউড সিনেমা ‘‌বুলেট রাজা’ সিনেমার একটি গানের শিরোনাম ‘‌তামাঞ্চে পে ডিস্কো’। সাইফ আলী খান অভিনীত এ সিনেমার যে ‘‌তামাঞ্চা’র কথা বলা হয়েছে তার সূতিকাগার মোগল আমল। তামাঞ্চাকে বলা যায় পিস্তলের আদি রূপ। মাস্কেটকে ছোট করে তামাঞ্চায় পরিণত করা হয়। এর ব্যবহার অষ্টাদশ শতাব্দীতে দেখা গেছে। তবে এ পিস্তল সহজে বহনযোগ্যতার কারণে উচ্চপদাধিকারীদেরই কেবল দেয়া হতো। এছাড়া ‘শেরবাচাহ’ নামে এক ধরনের মাস্কেটুন (ছোট মাস্কেট) ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়। এটির গঠনে মাস্কেটের ছাপ স্পষ্টই দেখা যায়। ধারণা করা হয়, নাদির শাহ কিংবা আহমদ শাহ আবদালির হাত ধরে এ অস্ত্র ভারতে এসেছিল। কেননা অষ্টাদশ শতাব্দীতে ‘শের বাচাহ’ নামে একটি পারস্য সেনাদলের উল্লেখ পাওয়া যায়।

মোগল আমলে আগ্নেয়াস্ত্রের ছিল প্রধান দুটি ভাগ—ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ও হালকা আগ্নেয়াস্ত্র। এমনিতে বন্দুক হালকা আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যেই পড়ে, তবে বন্দুক আলাদা করেই রাখা ভালো। পঞ্চদশ শতাব্দীতে কামানের ব্যবহার বাড়তে থাকে এবং কামানই ছিল শত্রুদের ধ্বংস করার বড় অস্ত্র। কিন্তু কামান তৈরি থেকে বহন, সবই ছিল কঠিন। সে কারণে মোগল আমলে কামানের ছোট সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করা হয় আর সেখানে সফলও হয়েছিলেন মোগল আমলের অস্ত্র নির্মাতারা। আজ আমরা কাঁধে বহনযোগ্য যে রকেট লঞ্চার দেখি তার পূর্বসূরি তৈরি হয়েছিল মোগল আমলে। এগুলো অবশ্য মোগল আমলে কাঁধে বহন করা যেত না। তবে উটের পিঠে বসিয়ে ছোড়ার মতো ছোট কামান তৈরি করা হয়েছিল।

‘‌লাইট আর্টিলারি’র মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হতো ‘‌জাম্বুরাক’। এটি এক প্রকার সুইভেল গান (একটি চিকন বা হালকা ভিতের ওপর বসানো ছোট কামান), যা নানা আকার ও ধরনের হতো। জাম্বুরাক সাধারণত উটের পিঠে করে নিয়ে যাওয়া হতো এবং উটের পিঠ থেকেই এগুলো ছোড়া হতো। হাতির পিঠে বসানো হতো দুটো। এ কারণে সুইভেল গানের নাম এ সময় জনপ্রিয় ধারায় ‘‌ক্যামেল গান’ বলা হতো। এগুলো বহনযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি গতিশীল তথা পশুগুলো চলমান অবস্থায় গোলা ছোড়ার সুবিধা ছিল। এছাড়া কিছু হালকা আর্টিলারি ছোট গাড়িতে চাপানো হতো। এতে অস্ত্র বহনে সুবিধা হতো।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষপাদ থেকে যুদ্ধে কামান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। এর সূচনা ও বিকাশের বড় অংশ মধ্য এশিয়ায়। কামানের বিকাশের কৃতিত্ব অনেকে অটোমান সাম্রাজ্যকে দেয়। ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলেও দেখা যায়, সাফাভি সাম্রাজ্যে কামানের ব্যবহার বেশি ছিল। বাবর তার অভিযানের সময় অটোমান সাম্রাজ্য থেকে আর্টিলারি চালানোর প্রযুক্তি শেখার ব্যবস্থা করেন। মোগল সেনাবাহিনীতে কামানের বিশেষ স্থান ছিল। বাবরের সময়ে ব্যবহৃত একেকটি কামান ১০০-১৫০ কেজি ওজনের গোলা ছুড়তে পারত। সময় গড়ানোর সঙ্গে কামানের আকার ছোট করায় মনোযোগ দেয়া হয়। এর পেছনে কারণ ছিল। শুরুর দিকে সাধারণত অবরোধ করে দুর্গ দখলই ছিল যুদ্ধের অন্যতম মূল কাজ। পরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্য বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে দ্রুত কোনো স্থানে গিয়ে যুদ্ধ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলে হালকা অস্ত্র জরুরি হয়ে পড়ে।

কনৌজের যুদ্ধ এর একটি প্রমাণ। দিল্লি-আগ্রা থেকে দূরে যুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়েছিল আর সেক্ষেত্রে কামানের গোলার ওজন কমানোয় গুরুত্ব দেন হুমায়ুন। তবে এ সময়ও ৩০ কেজি ওজনের গোলা ছোড়ার মতো কামান তিনি ব্যবহার করেছেন। হুমায়ুনের এ কামান থেকে এক ‘‌ফরশক’ (আধুনিক হিসাবে তিন থেকে সোয়া তিন মাইল) দূরত্বে গোলা পৌঁছানো যেত। এসব কামানের আবার ছিল গালভরা কিছু নাম। যেমন শের দাহান (বাঘের মুখ), গাজী খাঁ, ফতেহ লস্কর ইত্যাদি। উইলিয়াম আরভিন জানাচ্ছেন, মোগল আমলে ১৪ ফুট লম্বা একটি কামান তৈরি হয়েছিল। তার মতে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কামান।

আগেই বলা হয়েছে, আকবরের সময় থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের আকার ছোট হতে শুরু করে। হুমায়ুন কামান ছোট করেছিলেন, কিন্তু আকবর তাকে হাতে বহনযোগ্য করায় মনোযোগ দেন। সেখান থেকেই তৈরি হয় জাম্বুরাক জারব-জানের মতো হালকা কামানের। বন্দুক তো আছেই। আকবরের সময়ে ব্যবহৃত জাম্বুরাক দুই মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতো। এতে ৩ দশমিক ৯ ইঞ্চি থেকে ৪ দশমিক ৭ ইঞ্চি ব্যাসের গোলা ব্যবহার করা হতো। আকবর তার অভিযানগুলোর সময় প্রচুর বন্দুক সঙ্গে নিতেন। পরবর্তী সময়ে এসব অস্ত্র আরো বিশেষায়িত হয়। ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে চিতোরগড় দখলের সময় আকবরের মাস্কেটের গুলিতে মারা যান জয়মল ও পাট্টা। এ থেকেই বোঝা যায়, মাস্কেট ততদিনে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ‘‌রকেট’, যা অগ্নি সংযোগ করে হাত দিয়ে ছোড়া হতো। বলা যায়, এখনকার গ্রেনেডের পূর্বসূরি ছিল এগুলো। বহু আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রেরই সূচনা মোগল অস্ত্রাগারে।

কামান ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র জনপ্রিয় হওয়া শুরু করলেও সনাতন অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। মোগল আমলে সম্মুখসমরে ব্যবহৃত হতো তলোয়ার, ছোরা, বর্শা, কুড়াল ইত্যাদি। এর প্রতিটির আবার ছিল একাধিক ধরন। যুদ্ধের সঙ্গে আরো যুক্ত ছিল বর্ম, ঢাল, শিরস্ত্রাণ। মোগল আমলের অস্ত্র নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে এগুলো বাদ দেয়া চলে না।

সনাতন ধারার অস্ত্র (মূলত শস্ত্র) ব্যবহার করতেন পদাতিক সেনারা। তাদের হাতে থাকত তলোয়ার, ঢাল, কুঠার ও কুড়াল, বর্শা ও লম্বা ছোরা। এসব তলোয়ারের ছিল নানা ধরন। তলোয়ারকে উর্দুতে তেগ ও ফারসিতে শমসির নামে ডাকা হতো। মোগল আমলে কয়েক ধরনের তলোয়ার ব্যবহার করা হতো। আররি ধারার বাঁকানো তলোয়ারের পাশাপাশি লম্বা, সোজা তলোয়ারও হাতে হাতে ঘুরত। তলোয়ারের মধ্যে জুলফিকারের নাম সর্বাধিক শোনা যায়। বাঁকানো এ তলোয়ারের ওপরের দিকের অনেকটা অংশ খাঁজকাটা এবং মাঝ বরাবর চেরা। জুলফিকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও উপযোগিতা ছিল। এর মাঝখানে বিপক্ষের সেনার তলোয়ার ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে ভেঙে ফেলা যেত। আওরঙ্গজেবের সময় থেকে জুলফিকারের ব্যবহার বেশি হয়। এছাড়া ছিল সিরোহি, খান্দা, ধুপ নামের নানা ধরনের তলোয়ার। ছোরা সবসময়ই থাকত মোগল সেনা এমনকি বাদশাহ ও শাহজাদাদের কোমরে, পায়ের জুতোর ভেতরে। ছোরা ও তলোয়ারের বাঁট ও খাপে থাকত নানা রকম কারুকাজ। বাদশা ও শাহজাদাদের অস্ত্রে বসানো হতো মণিমুক্তা। তাদের পাশাপাশি অমাত্য ও বড় সেনাপতিদের তলোয়ারে নানা কারুকাজের পাশাপাশি কোরআনের আয়াতও লেখা থাকত। কারুকাজের মধ্যে কোফতাগারি ধরনটি ছিল জনপ্রিয়।

গদার কথা বলতেই মহাভারতের ভীম ও দুর্যোধনের কথা মনে পড়ে, কিন্তু গদা পুরনো হাতিয়ার হলেও মোগল আমলে এর ব্যবহার ছিল। মোটামুটি দুই ফুট লম্বা হাতলের গদা ব্যবহার করা হতো। কুঠারেরও ছিল নানা নকশা ও ধরন। কোনোটি একধারি কোনেটি দুইধারী। এছাড়া নেজা, বল্লম, সাইনথি প্রভৃতি বল্লম ব্যবহার করা হতো। একেকটির দৈর্ঘ্য হতো আড়াই থেকে সাত ফুটেরও বেশি।

হুমায়ুন তার শাসনামলে গুজরাট আক্রমণ করে জয়ী হওয়ার পর তার বহু সেনাকে মণিমুক্তা দিয়েছিলেন, যা তারা ঢালে করে নিয়েছিল। মোগল আমলে বেশির ভাগই গোলাকার ঢাল ব্যবহৃত হতো, যার কোনো কোনোটি তৈরি হতো সম্বর, নীলগাই, হাতি বা গন্ডারের চামড়া দিয়ে। মোগলদের ঢাল ও শিরস্ত্রাণ ছিল যুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার অন্যতম অনুষঙ্গ। শিরস্ত্রাণ তৈরি হতো ধাতু দিয়ে এবং শিরস্ত্রাণের নিচ থেকে ঘাড়ের কাছে বসানো হতো তারজালি, যেন ঘাড়ে তলোয়ারের কোপ এলে তা সামলে নেয়া যায়। বর্ম তারা পরতেন পুরো শরীরজুড়ে। তবে শিরস্ত্রাণ, ঢাল কেবল আঘাত রক্ষা করতেই নয়, বরং নানা সময় আরো নানা কাজে ব্যবহার হয়েছে। ঢালের একটি ব্যবহার তো বলাই হলো। শিরস্ত্রাণের এক ভিন্ন ব্যবহার বলে এ লেখা শেষ করা যায়।

হুমায়ুন তখন শের শাহর কাছে দুটো যুদ্ধে পরাজিত। ভাইরা তখন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। দেশীয় কোনো রাজ্যও তাকে ঠাঁই দেয়া তো দূর, সাহায্য করতেও রাজি না। হুমায়ুন চলছিলেন পারস্যের দিকে। তার ইচ্ছা ছিল পারস্যের মধ্য দিয়ে মক্কায় যাবেন এবং সেখানেই ধর্ম পালন করতে করতে জীবন শেষ করবেন। চলতি পথে তার বহু অমাত্য তাকে ছেড়ে চলে যায়। রসদেরও করুণ অবস্থা। সে সময় একদিন বহরের একটি ঘোড়া জবাই করা হয়েছিল। কিন্তু ঘোড়ার মাংস রান্না ও খাওয়ার কোনো পাত্র ছিল না। তাই বিচিত্র সে অবস্থায় খাওয়ার পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল শিরস্ত্রাণ।

মাহমুদুর রহমান: লেখক