মহাশ্বেতা দেবী ছিলেন একরোখা ও ছেলেমানুষের মতো; মনিষ ঘটকের আদরের মেয়ে, ঋত্বিক ঘটকের প্রিয় ভাতিজি, মৈত্রেয় ঘটকের প্রিয় বোন; তবে অমরও।

শমিক বন্দ্যোপাধ্যায় (সমালোচক) ১৯৭৯ সালে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাণবন্ত, সুন্দর, জাঁদরেল এবং নানা পরামর্শে ভরপুর ছিলেন তিনি। কাগজপত্র আর নানা ফাইলে ঢাকা একটা সেক্রেটারিয়েল টেবিলের পেছনে উঁচু চেয়ারে আরামে বসেছিলেন। বই আর পত্রিকায় ঠাসা মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু বইয়ের তাকগুলো দেয়াল ঢেকে রেখেছে। মাঝামাঝি একটা জায়গা ছিল যেখানে রান্নাবান্না হতো, তার পর বোধহয় একটা শোবার ঘর। সেটার ওধারে একটা কামরা, যেখানে তাঁর পক্ষাঘাতে চেয়ারবন্দি জীবনসঙ্গীর দেখা পেত কেউ। সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে ফ্ল্যাটে যেতে হবে আপনাকে। বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছেই ছিল সেটা। পরে জানতে পেরেছি যে, ভিন্ন একটা কামরায় খোলা অন্য সিঁড়ি বেয়েও ফ্ল্যাটে ঢোকা সম্ভব এবং আমার বিশ্বাস সর্পিল সিঁড়িঘরের ক্ষুদে ল্যান্ডিং থেকেও এ কামরায় ওঠানামা করতে পারত কেউ।

এ ফ্ল্যাটের বিস্তারিত বর্ণনা দিলাম, কেননা এটাই মহাশ্বেতা দেবীকে আমার সামনে তুলে ধরে। তাঁর আরো প্রাচুর্যময় গল্ফ সবুজ ফ্ল্যাটগুলোয় অনেকবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কিন্তু তত দিনে আমাদের সম্পর্ক বদলে গেছে।

তিনি ছিলেন মোহময়, এমিলি পোস্ট যাকে জনতার বলয়ের নারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন (পোস্টের কথা নয়, আমি একটা আক্রা গেস্টহাউজে আছি): শক্তি আর কমনীয়তার মিশেলে। প্রায়ই গান গেয়ে উঠতেন তিনি, ঘন ঘন এবং সৃজনশীলভাবে অশোভন, কিন্তু প্রায়ই ‘ইন্ডিয়ান পিপলস’ থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিটিএ) বিষয়বস্তু। তার জন্য দেবী কালির গান, হিন্দি ফিল্মের গান গাইতাম আমি। আমার কাছে বামপন্থী বাঙালি বুদ্ধিজীবীর আদর্শ ছিলেন তিনি। তাঁর কাজ সম্পর্কে আমার লেখা পছন্দ করেননি এবং একাধিকবার প্রকাশ্যে উদার ও সংযত মন্তব্য করেছেন: ‘নিজের মত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার আছে ওর।’

এ বছর কবি সমর সেনের জন্মশতবার্ষিকী। শিগগিরই তাঁকে নিয়ে লিখতে যাচ্ছি। খুবই ব্যতিক্রমী মানুষ। ১৯৮৩ সালে মহাশ্বেতার সঙ্গে পরিচয়ের চার বছর পরে মেধাবী ইতিহাসবিদ রণজিত্ গুহের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি, তাঁর ব্যক্তিত্বে তাঁর (মহাশ্বেতা) প্রফুল্লতার কিছু ছাপ ছিল। তিনিই আমাকে দিয়ে তাঁর রচনা অনুবাদ শুরু করিয়েছিলেন, প্রথমে দ্রৌপদী, তার পর স্তন্যদায়িনী। আমার করা স্তন্যদায়িনীর অনুবাদ পছন্দ করেছিলেন তিনি, আমার ইংরেজি পড়ার সময় তাঁর নিজের বাংলা পড়ছেন মনে হচ্ছিল বলে মন্তব্য করেছেন। আমার তরজমা সম্পর্কে এটাই ছিল তার একমাত্র মন্তব্য, তবে সেটা এত বড় প্রশংসা যে চিরকাল মনে ধরে রাখব।

আমার মনে হয়, টেরোডাক্টাইল তাঁর সেরা রচনা এবং মেরি ওরাওন সেরা চরিত্র সৃষ্টি (বাস্তব জীবনে তাঁর মতো একজনকে চেনার কথা আমাকে বলেছিলেন তিনি)। তা না হলে উনিশ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকের বাঙালি ঔপন্যাসিকদের ব্যাপক প্রভাবে তাঁর গোত্রীয় চরিত্রগুলো বড্ড বেশি মহান, বর্বর। চোট্টি মুণ্ডার বেলায় কেবল হাওয়ার্ড ফাস্টের প্রভাবের কথাই আমাকে বলেছিলেন। এটা হয়তো টেরোডাক্টাইলকে খাটো করতে পারত, কিন্তু অলৌকিক স্টাইলাইজেশেইন ওই উপন্যাসিকার শক্তি এবং শঙ্কর ও বিক্ষ এর আওতার ভেতরই রয়েছে। স্থানীয় স্বশাসিত সরকারের লোকজন, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের আদর্শবাদী ছিটমহলের চরিত্রায়ণ ঋদ্ধ ও বোধযোগ্য।

টেরোডাক্টাইল লেখার আনুমানিক দুই বছর আগে টেরোডাক্টাইল সম্পর্কে কিছু জানি কিনা, আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি। অবশ্যই জানতাম না এবং অচিরেই কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম। টেক্সট আমাকে বাস্তব আঘাতের মতো ঘা দিয়েছিল এবং এর সূক্ষ্মতা পুরোপুরি বুঝতে বেশ কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল, হয়তো এখনো পুরোপুরি পারিনি। কাহিনীর পটভূমি ছত্তিশগড়, কিন্তু অবুঝমার নামটা ধরতে না পারলে আপনি জানতে পারবেন না। আত্মধ্বংসী মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব সূচিত সহিংসতা, যাকে উপরিগত বামপন্থীরা ‘মাওবাদ’ বলে, তারই গভীর সমালোচনা। এবং পড়তে জানেন এমন পাঠকের জন্যই লেখা হয়েছে।

আমার মনে হয় আমাকে প্রথম যে কাজটি করতে বলেছিলেন তিনি, সেটা হলো— আদিম জাতি ঐক্য পরিষদের পরিকল্পনায় সেক্রেটারিয়েল সহযোগিতার কথা। আমাকে নীরব নিরাপস সাঁওতাল অ্যাক্টিভিস্ট বার্নার্ড ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় কারাগারে বিবেকবান হয়ে ওঠা রাজনওয়াগড়ের গোপীবল্লভ দেওর সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেন তিনি। স্থানীয় খেরিয় সবর সম্প্রদায়ের আইনি কল্যাণের লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি। পুলিশ বিভাগের সমর্থন আদায়ের জন্য কাজ করেছেন মহাশ্বেতা এবং অবিরাম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুবাদে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।

গোপীদা ইউএনডিপির সঙ্গে কাজ করেছেন এবং মহাশ্বেতা ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের উপজাতীয় কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে। গোপীদা এই আধা যাযাবর সম্প্রদায়ের ভেতর চাষাবাদের অভ্যাস গড়ে তোলার ও তাদের চকিত সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন। মহাশ্বেতা আগ্রহী লোকজনের ব্যবস্থা করেছিলেন এই প্রয়াসে সহযোগিতা দানের জন্য। ষাটের দশকে একদল উদ্বিগ্ন গ্রাম্য ভদ্রলোক পশ্চিমবঙ্গ খেরিয় সবর কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সামনের উঠানের একটা বিশাল গাছের নিচে প্রতিদিন দিওয়ান-ই-আমের আয়োজন করতেন গোপীদা। আমার সেখানে অবস্থানের সময় তার সহকারী প্রশান্ত রক্ষিতের বাড়ি হিসেবে চারতলা দালান আর ছোট একটা অফিস বিল্ডিং এবং আরো কিছু ভবন নির্মাণ করেছিলেন তিনি।

ভবিষ্যতের জন্য একটা ঋণ তহবিল দাঁড় করাতে খেরিয়রা প্রতি মাসে সমিতিতে ১০ টাকা করে চাঁদা দিত। ওরা যেন কুটির শিল্পের পণ্য তৈরি করে কলকাতার বাজারে বিক্রি করতে পারে, শহরে দুর্গাপূজার সাজ্জসজ্জা করতে পারে— সেটা নিশ্চিত করেছিলেন মহাশ্বেতা। এক বছর অন্তর অন্তর বড় আকারের তিনদিনের সবর মেলার আয়োজন করতেন তিনি, যেখানে স্থানীয়রা তাদের ঐতিহ্যবাহী ও সমসাময়িক সৃজনশীল প্রতিভার প্রকাশ ঘটাত। সমৃদ্ধ উদ্যোগ ছিল এটা এবং দুই দশকের মতো এ প্রয়াসের অংশ হতে পারাটা আমার জন্য সৌভাগ্যজনক ছিল।

১৯৮৬ সালে প্রশান্তের অনুরোধে চারটি সবর বসতিতে চারটা প্রাথমিক স্কুল খুলেছিলাম আমি। আমার জন্য একটা ছোট শোবার ঘরসহ চারটা সাধারণ স্কুলরুম নির্মাণের জন্য পিয়ারলেস, শেল, মিঠুন চক্রবর্তী এবং আরো অনেকের কাছ থেকে টাকা তুলেছিলেন মহাশ্বেতা। ওখানে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের মন পাল্টানোর শিক্ষার অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু এটা আমার কাহিনী নয়।

মহাশ্বেতা অনেক সময় গ্রাম দেখতে আসতেন। কিন্তু কখনো ওই স্কুলগুলোকে চলমান অবস্থায় দেখেননি। গোপীদার ইউএনডিপি স্কুলগুলো কখনো চালুই হয়নি। আমার স্কুলের ছাত্ররা তৈরি হয়ে গেলে গোপীদা তাদের মহল্লায় তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলে নিয়ে যেতেন। ছেলেরা স্কুলের হোস্টেলে থাকত। দালানের উপরের দুটি তলা মেয়েদের হোস্টেলে পরিণত হয়। ছেলেমেয়েদের ইংরেজি ও অঙ্ক শেখানোর জন্য নামকরা শিক্ষকদের ব্যবস্থা করেছিলাম আমি। আবার মহাশ্বেতা এর অংশ ছিলেন না। মনপ্রাণ দিয়ে প্রাপ্তবয়স্কের দিকে খেয়াল রাখতেন তিনি। সুতরাং ওখানে আমার দেখা সর্বসেরা ছাত্রী শ্যামলী সবরকে চিনতেন না তিনি বা হাইস্কুলের প্রথম বছরেই তার মারা যাওয়ার কথাও জানা ছিল না তার। সেরা ছাত্র মেঘনাথ সবরকেও চিনতেন না তিনি। গোপীদার হাইস্কুলে শিক্ষার বদলে তাকে তথ্য দিয়ে ঠেসে দেয়া হচ্ছে বলে আমার কাছে অভিযোগ করেছিল সে (পাওলো ফ্রেইরি’জ ডিস্টিংকশন), কারণ শিক্ষকরা একটা রেকর্ড গড়তে চাইছিলেন: একটা নিয়মিত হিন্দু-মুসলিম স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হতে চলেছে এক উপজাতি ছেলে। অসুখী ছিল সে, উপজাতি ছাত্রদের স্কুলে যেতে চেয়েছিল। এলাকার এ ধরনের একটা স্কুলে গিয়েছিলাম আমি। গোপীদা ব্যাপারটাকে রাজনৈতিকভাবে নিয়েছিলেন এবং আমি এলাকা থেকে চলে আসার পরদিনই সব স্কুল বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মহাশ্বেতা তাঁর পুরনো মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে পারেননি।

ছাড়াছাড়ির আগে আমাকে বারোদায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি— সেখানে তেজগড়ে গণেশ দেবীর প্রকল্পে কাজ করতেন এবং ১৮৭১ সালে ব্রিটিশদের ‘অপরাধী’ হিসেবে ঘোষণা করা গোত্রীয় ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন। ছরাসদের সঙ্গে পরিচয় করাতে আমাকে আহমেদাবাদে নিয়ে গেছেন। সবসময়ই উত্তর-দক্ষিণের আদিবাসীদের একসঙ্গে করার জন্য নিবেদিত ছিলেন তিনি।

বহু বছর ধরে এমন এক বিরল সত্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত থাকার ব্যাপারটাকে আমি মূল্যবান মনে করি। তাঁর আন্তরিকতা ও প্রাণশক্তি অতুলনীয় ছিল। শেষ পর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ায় আমি দুঃখিত। মে মাসের শেষের দিকে তাকে দেখেছিলাম— যেন আবার পরস্পরকে ভালোবেসেছি আমরা। এ স্মৃতি আমি বয়ে বেড়াব। নবীন কিশোর তার মৃত্যুসংবাদ দিলেন যখন, তখন হড়বড়িয়ে বলে উঠেছিলাম আমি: ‘ওকে তো অমর মনে হয়েছিল!’ হ্যাঁ, একরোখা ও ছেলেমানুষের মতো; মনিষ ঘটকের আদরের মেয়ে, ঋতিক ঘটকের প্রিয় ভাতিজি, মৈত্রেয় ঘটকের প্রিয় বোন; তবে অমরও।

            রূপান্তর: শওকত হোসেন