কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ও সুর করা ‘চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা, চাঁদের চেয়েও জ্যোতি’ গানটি হয়তো অনেকেই শুনেছেন। কিন্তু গানটি যে মধ্যযুগের দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসের অন্যতম লড়াকু নারী চাঁদ বিবি বা চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে রচিত, তা কজনই বা জানেন? বিজাপুর-আহমেদনগরের সুলতানি সাম্রাজ্যের রাজপ্রতিনিধি হিসেবে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা চাঁদ সুলতানার (১৫৫০-১৫৯৯), বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত অবশ্য গানটির ভেতরেই লিপিবদ্ধ করেছিলেন নজরুল: ‘তুমি গোলকুণ্ডার কোহিনূর হীরাসম/আজো ইতিহাসে জ্বলিতেছে নিরুপম/রণরঙ্গিণী ফিরে এসো...’।

চাঁদ সুলতানার উত্তরাধিকার এ যুগে আর ফেরত আসবে কিনা জানা নেই। তবে এ উপমহাদেশের লেখকদের কলমে তো বটেই, এমনকি কখনো কখনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর একাধিক লেখকের কলমে চাঁদ সুলতানার কথা উঠে এসেছে ঠিকই। মজার ব্যাপার, চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে প্রথম উপন্যাস লেখেন ভারতে ভাগ্যান্বেষণে আসা এক ইংরেজই। আবার তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড় কর্তা। তিনি ‘কনফেশনস অব আ থাগ’খ্যাত ফিলিপ মেডোস টেইলর। চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে লেখা তার  ‘আ নোবেল কুইন: আ রোম্যান্স অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি’ শিরোনামের উপন্যাসটি দীর্ঘকায়, প্রথম আলাদা আলাদা মোট তিন খণ্ডে প্রকাশ পায়। এর অখণ্ড সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫১২। উল্লেখ্য, উপন্যাসটি বই আকারে বের হয় টেইলরের মৃত্যুর দুই বছর পর, ১৮৭৮ সালে। এর আগে ধারাবাহিকভাবে তা ইংল্যান্ডের ‘ওভারল্যান্ড মেইল’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

যে মেডোস টেইলর সাধারণত নিজের দেখা ও তার সমকালের ভারত প্রসঙ্গেই মুখ্যত লিখেছেন—সেই  লেখক হঠাৎ কেন উনিশ শতক ছেড়ে সুদূর মধ্যযুগের চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে উপন্যাস রচনা করতে বসলেন? এমন প্রশ্ন কোনো কোনো সমালোচক করেছেন। এর জবাব অবশ্য টেইলর তার উপন্যাসের মধ্যেই দিয়ে গেছেন। তার মতে, ইতিহাসে লিপিবদ্ধ বিজাপুর-আহমেদনগরের সুলতানি সাম্রাজ্যের শক্তি ও সমৃদ্ধিই তাকে চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে প্ররোচিত করেছিল। চাঁদ সুলতানার মতো যোদ্ধা যখন বিজাপুর-আহমেদনগর প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তখন সেখানকার জনগণ সুশাসন ও উন্নয়নের দেখা পেয়েছিল। তাই সেই সাম্রাজ্য ও সময়ের উজ্জ্বলতম ব্যতিক্রমী প্রতিনিধি হিসেবে তার মনে চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে লেখার আকাঙ্ক্ষা জন্মে।

উপন্যাসে চাঁদ সুলতানার চরিত্র চিত্রায়ণের বেলায় টেইলর মুখ্যত নজর দিয়েছেন রাজ্যশাসনে তার প্রশাসনিক দক্ষতা ও যুদ্ধের ময়দানে অর্জিত সাফল্য এই দুই দিকেই। তার কলমে উঠে আসা চাঁদ সুলতানা মধ্যযুগের ভারতের এমন এক সংগ্রামী রাজমহিষী—যিনি কিনা একই সঙ্গে নিষ্ঠাবান ধার্মিক, শিল্পকলা-স্থাপত্যের সমঝদার, নারী মুক্তির আহ্বানে মুখর এবং সর্বোপরি প্রজ্ঞাবান শাসক ও বীরযোদ্ধা। টেইলরের কলমে উঠে আসে চাঁদ সুলতানার এমন প্রতিচ্ছবি, যেখানে তার রূঢ়তাও কার্যত মমতার নামান্তর। চাঁদ সুলতানার দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞের একটি খণ্ডাংশ টেইলরের কলমে উঠে এসেছে এভাবে: ‘প্রতি রাতে ঘুমোবার আগে রাজমহিষী প্রত্যেকের কাছে তার নির্দেশনাসমূহ পাঠিয়ে দেন। আর নিজের কাছে আসা জরুরি দলিলপত্র ও সমনে সই এবং রাজকীয় সিলমোহর বসান।’


চাঁদ সুলতানার কথা লিখতে গিয়ে তার মধ্যে মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা কাজ করত, তা নানাভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা টেইলর করেছেন। প্রথাগত অর্থে নারীবাদী না হয়েও চাঁদ সুলতানা যে মধ্যযুগের পুরুষাধিপত্যময় দক্ষিণ ভারতীয় সমাজে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন—এ নিয়ে প্রশংসা করতে টেইলর কার্পণ্য করেননি। আবার বিজাপুর-আহমেদনগরে নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে সদ্ভাব বজায় রাখতেও চাঁদ সুলতানা সচেষ্ট ছিলেন, এমন বর্ণনাও টেইলর দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করে তাদের সঙ্গে চাঁদ সুলতানার যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।

বস্তুত, টেইলরকে চাঁদ সুলতানার জীবন-আখ্যান এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে তাকে নিজের দেশের রানী এলিজাবেথের সমতূল্য বলে স্বীকৃতি দিতেও তিনি পিছপা হননি। ‘আ নোবেল কুইন’-এর একটি অংশে তিনি লিখেছেন: ‘ইংল্যান্ডের খুব সামান্য লোকই জানে যে আমাদের রানী এলিজাবেথের সমসাময়িক  এক নারী ছিলেন দাক্ষিণাত্যে, যিনি কিনা তার সমান ক্ষমতার অধিকারী, সমান রাজনৈতিক প্রতিভার অধিকারী, এমনকি ভিন্ন প্রেক্ষিতে সমান শিক্ষাদীক্ষারও অধিকারী। যিনি এক বৃহৎ সাম্রাজ্য ও জনসমষ্টিকে শাসন করতেন...সমস্ত প্রলোভন ও চরম ক্ষমতার প্রদর্শনের বাইরে গিয়ে যিনি একই সঙ্গে ছিলেন সহজিয়া, উদার, অকপট ও করুণাময়ী। আবার মার্জিত, পুণ্যময়ী, ধার্মিক ও দানশীলাও বটেন। ভারতের সব নারীর মধ্যে তিনি যেন এক নিখুঁত অমূল্য রত্ন হিসেবে স্থান পেয়েছেন।’

‘আ নোবেল কুইন’ বেরোনোার প্রায় ৩০ বছর পর ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ বাংলায় চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে নাটক লেখেন। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত সেই নাটকের শিরোনাম ‘চাঁদ বিবি’। ক্ষীরোদপ্রসাদের অন্য সব নাটকের মতোই ‘চাঁদ বিবি’ও তথাকথিত ‘নাটুকে’ উপাদান ও তার সমকালের রঙ্গমঞ্চের স্বভাবসিদ্ধ আতিশয্যে ভরপুর। তা সত্ত্বেও চাঁদ সুলতানার বীরত্ব ও বিশিষ্টতার পরিচয় এ নাটক থেকেও খানিক লঘুভঙ্গিতে উদ্ধার করা যায়। বিশেষ করে চাঁদ সুলতানার স্বামী আলী আদিল শাহর অপঘাতজনিত মৃত্যুর পর তার নয় বছরের বালক ভাগ্নে ইব্রাহিম আদিল শাহকে (আলী আদিল শাহ ও চাঁদ সুলতানা নিঃসন্তান ছিলেন) রাজসিংহাসনে বসানো হয়—তখন এলোপাথাড়ি মুগল আক্রমণের প্রেক্ষিতে সুলতানি সাম্রাজ্যের টালমাটাল অবস্থায় চাঁদ সুলতানার মনের যে ক্ষিপ্ত অবস্থার বর্ণনা ক্ষীরোদপ্রসাদ দিয়েছেন, তা থেকে (অল্পবিস্তর কল্পনার জাল আর অনেকখানি আবেগের খাদ মেশানো যদিও) ওই সময়ের উত্তাপটুকু অন্তত অনুভব করা যায়: ‘আমার স্বামীর অতি যত্নের প্রতিষ্ঠিত রাজ্য—আমি একটা অল্পবুদ্ধি যুবকের খেয়ালে এ রাজ্য ধ্বংস হতে দিতে তো পারব না। আমার স্বামী শক্তিমান আদিলসা যে সময় ঘাতকের হাতে প্রাণ


বিসর্জন দেন, তখন আমি বালিকা। আমি তত্পূর্বে তারই পদপ্রান্তে বসে, রাজনীতির গূঢ় রহস্য অল্প অল্প শিক্ষা করেছিলুম। মৃগয়াতেও অশ্বারোহনে আমি তার সঙ্গিনী—সিংহের হূদয় বিদ্ধ করতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যখন তিনি আমার কাছে পরাস্ত হতেন, তখন পুলকাশ্রু বিসর্জন করতে করতে ঊর্ধ্বে চেয়ে করজোড়ে বলতেন, ‘ঈশ্বর! চাঁদকে আমার চেয়ে রাজনীতিতে শক্তিশালিনী কর!’...” ক্ষীরোদপ্রসাদ অবশ্য অতি আবেগের তোড়ে ঐতিহাসিক তথ্যের কিঞ্চিৎ রদবদল ঘটিয়ে ফেলেছেন। আলী আদিল শাহ যখন আততায়ীর হাতে নিহত হন, তখন চাঁদ সুলতানার বয়স কম করে হলেও আটাশ-ঊনত্রিশ বছর—‘বালিকা’ আর নন। যা হোক, এমন কিছু খাদ সত্ত্বেও প্রায় দুশো পাতার এই নাটকটি এখনো ফের পড়া যেতে পারে। অন্তত উনিশ-বিশ শতকের সন্ধিক্ষণের একজন বাঙালি ‘জনপ্রিয়’ নাট্যকার কীভাবে চাঁদ সুলতানা-চরিত পুনর্নির্মাণ করেছেন, তা বোঝার জন্য হলেও।

চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে এরপর নানা ভাষায় নেহাত কম লেখা হয়নি। ১৩৪২ বাংলা সনে কলকাতার ‘আবুল ফয়েজ অ্যান্ড কোং’ থেকে প্রকাশিত মোহাম্মদ সানাউল্লাহর ঐতিহাসিক আখ্যানের বই ‘দিল্লীশ্বরী’-র বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে চাঁদ সুলতানার কথা। মুঘলদের সঙ্গে লড়াইয়ের পর প্রজ্ঞাময়ী চাঁদ সুলতানা তাদের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করতে গিয়ে যে নিজের প্রাণ হারিয়েছেন কতিপয় অস্থির কুচক্রীর হাতে, তা লেখক তার বইয়ের উক্ত অধ্যায়ের উপসংহারে ভারি হূদয়গ্রাহী আকারে তুলে ধরেছেন: ‘কিন্তু সোলতানার এত চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে গেল। তার এই সন্ধির প্রস্তাব কতকগুলো দুষ্টবুদ্ধি লোকের মনে দারুণ সন্দেহের সঞ্চার করল। ...একদিন সুযোগ বুঝে তারা সোলতানার বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করে নিঃসহায় অবস্থায় তাকে অতি নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল।...দক্ষিণী মুসলমানের বিজয়-গৌরব, ভারত নারীর জীবন্ত আদর্শ চিরকালের জন্য এভাবে অতল সাগরে মিলিয়ে গেল।...’

এছাড়া চাঁদ সুলতানাকে নিয়ে উনিশ শতক থেকে বিগত শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কবিতা-নাটক বা উপন্যাসও কিছু কিছু লেখা হয়েছে। অদ্ভুতভাবে যেসব ব্যক্তি প্রচণ্ড গোঁড়া আচরণের মারফত (বিশেষত বাঙালি মুসলমান সমাজে) নারীশিক্ষা বা নারী জাগরণের বিরোধিতা করেছেন, তেমন কেউ কেউও ‘মুসলিম গৌরবের’ বয়ান দিতে গিয়ে চাঁদ সুলতানার বন্দনা গেয়েছেন। আবার পাকিস্তান-পর্বে নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী ‘চাঁদ সুলতানা’ নামে একটি নৃত্যনাট্য প্রযোজনা করেন, যা কিনা নানা দেশে ‘পাকিস্তানি কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের’ পরিচয় তুলে ধরার জন্য সদলবলে তিনি পরিবেশনও করেছিলেন। কিন্তু চাঁদ সুলতানার বীরত্ব গাঁথার কেন্দ্রভূমি যে একান্তই দক্ষিণ ভারতে এবং তার ব্যক্তিত্বের বিস্তারও ঘটেছে ওই অঞ্চলে—তা কি তিনি জানতেন না? সত্যিই বড় বিচিত্র এই দেশ।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক