দাক্ষিণাত্যের হায়দরাবাদের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক সাইয়িদ আহমাদুল্লাহ কাদরি উর্দু ভাষায় চাঁদ বিবির জীবনবৃত্তান্ত রচনা করেন। মুহাম্মদ লুত্ফর উদ-দীন খান বাহাদুর (লতাফত জঙ্গ) স্মারক গ্রন্থমালার এটি দ্বিতীয় বই। উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে ১৯৩৯ সালে বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের সপ্তম, ষোড়শ ও সপ্তদশ অধ্যায়ের নির্বাচিত অংশ মিলিয়ে ‘চাঁদ বিবির মৃত্যু’ প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলায় সংক্ষিপ্ত অনুস্মৃতি উপস্থাপন করা হচ্ছে:

আলী আদিল শাহের বিজাপুর শাসনামলের প্রধান অবলম্বন চাঁদ বিবির জীবন ও জীবনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ইতিহাস নীরব। ইব্রাহিম আদিল শাহ-এর শাসনের সাথে যখন তিনি যুক্ত হলেন, তখনই সর্বপ্রথম তার নাম জানা গেল—এর আগে যেন তার অস্তিত্বই ছিল না। ইব্রাহিম আদিল শাহের বয়স তখন মাত্র নয় বছর। প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাকে এবং তার রাজত্বকে লালন করেছেন।

আলী আদিল শাহের মৃত্যু এবং ইব্রাহিমের সিংহাসনে আরোহণ করার সময় রাজ্যের অভিজাতরা বিজাপুর তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। তখন কী ঘটছিল তার বর্ণনা লিখে গেছেন তাজকিরাত-উল-মুলক গ্রন্থের লেখক:

যখন কামিলউদ্দিন খান দেক্কানিকে ভাইসরয় নিয়োগ করা হয় রাজা বুধবার ও শুক্রবার দরবার করতেন এবং রাজ্যের বিশিষ্টজনদের দেওয়া উপহারও গ্রহণ করতেন। অন্যান্য দিন ভাইসয়ের কাছ থেকে ফরমান জারি হতো। বিজাপুর দুর্গের কমান্ডারসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে ভাইসরয় নিজের লোকদের বসান। রাজ্যের ওপর নিশ্চিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবার পর তিনি রাজকোষও নিজের হাতে আনতে চাইলেন। তিনি আদেশ জারি করলেন, রাজ্যের সকল কর্মচারীদের বেতন তার মাধ্যমে হবে।

চাঁদ বিবি কামিল খান দেক্কানির বাড়াবাড়িতে ভীষণ অসন্তুষ্ট হলে এবং আশংকা করলেন ভাইসরয়ের মাধ্যমে বিজাপুরের অভিজাত সম্প্রদায় হয়তো ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করছে। তিনি তাদের দাত ভেঙ্গে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ভাইসরয়কে ফরমান জারি করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন রাজা বয়স ্প্রাপ্ত হলে নিজেই তা করবেন। কামিল খান তাকে অমান্য করে আরও দ্রুত কয়েকটি ফরমান জারি করলেন। ক্ষুব্ধ চাঁদ বিবি এর একটি সুরাহা করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত রইলেন। তিনি অভিজাতদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর কিশোয়ার খানকে আস্থায় নিয়ে কামিল খানের সব দূরভিসন্ধিমূলক কাজ তার সামনে তুলে ধরলেন। এতে কিশোয়ার খান এতোটাই ক্ষুব্ধ হলেন যে পরবর্তী প্রথম সুযোগেই কামিল খানকে হত্যা করলেন।

কামিল খানের বিদায়ের পর আফজাল খান সিরাজিকে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব দিলেন। রাজক্ষমতা প্রদানের এই সন্ধিক্ষণে বিজাপুর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পোলকুন্ডা, আহমদনগর এ বিজাপুরে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তাদের মোকাবেলা করার দায়িত্ব দিলেন আফজাল খানকে আর কিশোয়ারকে তার মন্ত্রী নিয়োগ করলেন। অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও ষড়যন্ত্রের এক পর্যায়ে মুস্তফা খানের সহায়তায় চাঁদ বিবি কিশোয়ার খানকেও উৎপাটন করতে চাইলেন। কিন্তু গোপন এজেন্টের মাধ্যমে খবর পেয়ে কিশোয়ার খানের বাহিনী তা কাজে লাগিয়ে মুস্তফা খানকে যুদ্ধে প্ররোচিত করলেন। দুর্বল সেনাবাহিনী নিয়ে মুস্তফা খান সুবিধে করতে পারলেন না, তিনিও নিহত হলেন এবং চাঁদ বিবিকে সাতারা দুর্গেই বন্দি করে রাখা হলো। নিপীড়ণকারী হিসেবে কিশোয়ার খান কুখ্যাত হয়ে উঠার পর হাবসি সেনানায়ক ইকলাস খান তার বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী পাঠান, তিনি গোলকুন্তায় পালিয়ে যান এবং তারই হাতে নিহত মুস্তফা খানের এক আত্মীয় তাকে হত্যা করেন। চাঁদ বিবি আহমেদনগরে ফিরে আসেন এবং রাজক্ষমতা প্রয়োগ করতে শুরু করেন।

দিল্লির সম্রাট আকবর যখন দাক্ষিণাত্যের রাজন্যদের আনুগত্য দাবি করলেন সকলেই তা প্রত্যাখ্যান করলেন। অন্যদিকে অপরিণত রাজ্যের দ্বিতীয় ইব্রাহিম আদিল শাহের প্রতিপক্ষ নিজেকে দ্বাদশ বর্ষীয় দ্বিতীয় আহমদ নিজেকে রাজা ঘোষণা করলে অভিজাতদের প্রতিনিধি মিয়া এবং তার অবস্থান সংহত করতে আকবর পুত্র মুরাদ মির্জাকে আহমেদনগর অবরোধ ও শাসনের আমন্ত্রণ জানালেন।

মরিয়া হয়ে উঠা চাঁদ বিবি যুদ্ধের সব আয়োজন সম্পন্ন করলেন। ৩০ হাজার সৈন্যের মুঘল বাহিনী আহমেদনগর দুর্গ আক্রমণ করে। প্রথমে তেমন সুবিধা করতে পারেনি, প্রবলভাবে প্রতিহত হয়। ক্ষয়ক্ষতিও হয় যথেষ্ট। দুর্গ প্রাকার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য হবে মনে করে খাজা আবুল হোসাইন তিরমিজির তত্ত্বাবধানে দেয়াল ঘেঁষে মাইন পোতা হলো। বিস্ফোরণে দেয়াল উড়ে গেলে মুঘল সৈন্যরা ভেতরে প্রবেশ করে সুলতান বাহাদুর নিজাম শাহকে গ্রেফতার করে বুরহানপুরে সম্রাট আকবরের কাছে পাঠিয়ে দিল।

চাঁদ বিবির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। মুঘলরা দুর্গ অধিকার করে নিয়েছে। জানার পর তিনি পূর্বে খনন করা কূপে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন বিসর্জন দেন। বার মাস চারদিনের অবরোধের পর ১০০৯ হিজরির মহররমের প্রথম দিন দুর্গ মুঘল বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।

ঐতিহাসিক রফিউদ্দিন সিরাজী ও ফিরিশতা লিখেছেন, অবরুদ্ধ হবার পর চাঁদ বিবি যখন বুঝতে পারলেন তার বিজয়ের সম্ভাবনা নেই, তিনি এর আগে মুঘলদের বেরার অঞ্চল তুলে দেবার মতো এবারও কোনো কিছু দেবার বিনিময়ে আত্মসমর্পণ করার কথা ভেবেছিলেন। এতে হাবসি অভিজাতদের সায় ছিল না। তাদের লোকজন বলপূর্বক দুর্গের অভ্যন্তরে তার প্রাসাদে প্রবেশ করে এবং তাকে হত্যা করে। ঐতিহাসিক ফিরিশতার (মুহম্মদ কাশিম হিন্দু শাহ) লেখায় এবং রফিউদ্দিন সিরাজীর তাজকিরাত উল মুলক গ্রন্থে বলা হয় হাবসি চিতা খান চাঁদ বিবিকে হত্যা করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিশ্লেষকরা বলেন, হাবসি চিতা খান যাকে হত্যা করে তার নাম চাঁদ বিবি হলেও তিনি ক্ষমতাধর চাঁদ সুলতানা নন।

হিস্ট্রি অব আহমদনগর গ্রন্থে সাইয়িদ জাফর বলেছেন, চাঁদ বিবি ও তার কজন সঙ্গী মাছলি বাওলি কূপে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেন। বাহাদুর নিজাম শাহুর অনুরোধে মৃতদেহগুলো তোলা হয়। চাঁদ বিবির মরদেহ সেখানে ছিল। তাদের সবাইকে রওয়াজা বাগে সমাহিত করা হয়; চাঁদ বিবির কবর ইট ও চুনাপাথরে বাঁধাই করে রাখা হয়।

ঐতিহাসিক কাফি খান লিখেছেন, চাঁদ বিবি কুপে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তারপর তার আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বহুল শ্রুত এই বর্ণহাটি মুহাম্মদ কাশিম ফিরিশতার বিবরণীতে মেলে না। তার মৃত্যুর ঘটনা বিজাপুর ও আহমদনগরের ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেছেন কিন্তু ঘটনাস্থলের সাথে বাস্তব পরিচিতি না থাকায় বিজাপুরের ঐতিহাসিকদের বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয় বলে মনে করা যেতে পারে।

জামিউল উলম গ্রন্থের বর্ণনাটি লক্ষণীয়। চাঁদ বিবি দিল্লির সৈনিকদের আচরণ ও অভ্যাস সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তার আশঙ্কা গ্রেফতার হবার পর তার শরীরের উপর দিয়ে সেনাদের কামনার ঝড় বয়ে যাবে এবং তাকে লণ্ডভণ্ড করে ফেলবে। তিনি তার সতীত্ব রক্ষা করার জন্য বড় জালা বা ভাটিতে এসিড পূর্ণ করে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মুহূর্তের মধ্যে তার শরীর এসিডে দ্রবীভূত হয়ে গেল। এমনকি মৃত্যুর পরও কোনো আগন্তুক তাকে দেখার তার সুযোগ পায়নি।

তারিখ-ই-ফিরিশিতাতে মুহাম্মদ কাশিম ফিরিশতা লিখেছেন। চাঁদ বিবি খোজা চিতা খানকে বললেন, আহাঙ্গ খান এবং অন্য অভিজাতরা এমনই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে যে আমাদের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে সম্রাট আকবর নিজে আক্রমণ উদ্যোগী হয়েছেন। এটা নিশ্চিত দু-একদিনের মধ্যেই আমাদের দুর্গের পতন ঘটবে।

চিতা খান বললেন, যা হবার হয়ে গেছে, আমাকে কী করতে হবে নির্দেশ করুন।

চাঁদ সুলতানা বললেন, আমার মনে হয় মুঘলদের কাছে আমাদের দুর্গ সমর্পণ করে জীবন ও সম্মান বাঁচাতে জুনাইর এর দিকে চলে যাওয়া ভালো হবে এবং যখন আমরা শক্তি অর্জন করতে পারব নতুন করে আক্রমণ করব।

চিতা খান দুর্গের ভেতরে সমবেত লোকদের বললেন, চাঁদ বিবি মুঘলদের সাথে ষড়যন্ত্র করে এই দুর্গ সমর্পণ করতে চাচ্ছেন।

এতে জনতা ক্ষিপ্ত ও উন্মুক্ত হয়ে হারেমে প্রবেশ করল এবং চাঁদ বিবিকে ভয়ঙ্কর নির্মমভাবে হত্যা করল।

 

ইবনে মোতালিব: লেখক