বাংলার ঘরে মেয়েরা একটু পড়াশোনা শিখলে বা আধুনিক বেশভূষা পরিধান করলে অনেকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে পরিহাস করে ওই মেয়েদের ‘মেমসাহেব’ বলে আড়ালে অগোচরে ডেকে থাকে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, এই মেমসাহেব কারা এবং বাংলা তথা ভারতে তাদের ইতিহাস কী বা বাংলার সমাজে তাদের অবদান কতটা! ঔপনিবেশিক বাংলার এই মেমসাহেবদের নিয়ে আলোচনার বিরাম নেই। কখনো কখনো তাদের আধুনিকা হিসেবে সম্ভ্রম করা হতো, অন্যদিকে তাদের নিয়ে বিভিন্ন বিতর্কিত গুঞ্জনও উঠত। খুব সহজে বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে তারা একাত্ম হতে পারেননি। অবশ্য ধীরে ধীরে ক্ষেত্রবিশেষে এ বিষয়ে পরিবর্তনও লক্ষ করা গেছে।

ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ব্রিটিশ প্রশাসনের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশী রমণীদেরও আসতে দেখা যায়। বহু ইংরেজ নারী তখন থেকে ভারতে পাড়ি দিতে থাকেন। আঠারো শতকে ব্রিটেন থেকে জাহাজে করে বহু বিদেশিনী বিলাতি রমণী ভারতে এসেছিলেন। ভারত সম্পর্কে বিদেশের মানুষের যে অস্বচ্ছ ধারণা ছিল সেগুলো জানার পরও বিদেশিনীদের এভাবে অজানা দেশে আগমন সত্যিই রোমাঞ্চকর ঘটনা। বিলাত থেকে ভারতে আসা ইংরেজ পুরুষদের সঙ্গে তাদের স্ত্রী বা আত্মীয়ারা যেমন আসতেন, তেমনি বহু ক্ষেত্রে একাকী ইউরোপীয় রমণীরাও ভারতে ভ্রমণ করতে এসেছেন। ভারতবর্ষের প্রাচুর্যের কারণে বহু বছর ধরে আরব, পর্তুগিজ, দিনেমার, ডাচ, ইংরেজ, ফরাসিদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। প্রায় ২০০ বছর শাসন করে ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করেছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। পরবর্তীকালে ভারতকে শোষণ ও শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল ব্রিটিশরাজ। মূলত এ ব্রিটিশ শাসনে থাকাকালে ভারতে ব্রিটিশ নারীদের প্রবেশ ঘটে। বহু ক্ষেত্রে অবশ্য দরিদ্র বিদেশী রমণীরা তাদের ভাগ্যান্বেষণে ভারতে আসতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় থেকেই ভারতের কলকাতা তথা সমগ্র বাংলায় ইংরেজদের ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন ঔপনিবেশিক বাংলায় এসেছিলেন তাদের স্বামীর সঙ্গে, কিছু রমণী এসেছিলেন এ দেশে বিয়ের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে আবার এদের মধ্যে অনেকেই বাংলা তথা ভারতের সামাজিক কাজে ব্রতী হতে। বিলাতি রমণীদের ভ্রমণবৃত্তান্ত ও চিঠিপত্র থেকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। ভারতীয়দের কাছে এসব রমণীর পরিচয় ছিল মেমসাহেব হিসেবে। ঔপনিবেশিক বাংলায় মেমসাহেবদের অবস্থা ছিল বিচিত্র। ভারতবর্ষের প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা। তাই ১৯১১ সাল নাগাদ কলকাতা ভারতের প্রাণকেন্দ্র হওয়ার পর থেকেই ইউরোপীয়রা এ শহরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। নীলচক্ষুর শ্বেতাঙ্গিনী বিদেশী নারীদের মেমসাহেব অভিহিত করা হতো। বাংলায় তাদের গতিবিধি, আচরণ, পরিবেশের সঙ্গে সমঝোতা করার প্রয়াস, এই বঙ্গের জনসাধারণের প্রতি মনোভাব—এগুলো মেমসাহেবদের ভ্রমণবৃত্তান্ত বা চিঠিগুলোয় প্রকাশ হতে দেখা গেছে।

আলোচ্য নিবন্ধ রচনায়নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গানের কলি উল্লেখ করা যেতে পারে;

‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী,

তুমি থাকো সিন্ধু পারে ওগো বিদেশিনী।’

সিন্ধু পারে এই বিদেশিনীরা না হলেও সুদূর টেমস নদীর পাড় থেকে আসা এই বিদেশিনীদের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। কিন্তু প্রথমেই মেমসাহেবদের এই বিশেষ আখ্যায় ভূষিত হওয়ার বিষয়টি জানা প্রয়োজন।

উনিশ শতকে কিছু গভর্নর তাদের স্ত্রীদেরও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। লর্ড হেস্টিংস ও তার স্ত্রী ফ্লোরা ভারতে কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। ১৮১৩-২৩ সাল পর্যন্ত তারা ভারতে ছিলেন। লেডি মেরি বেন্টিংক তার স্বামীর সঙ্গে ভারতে এসেছিলেন। এরপর ইডেন সহদরাও ভারতে আসেন। মেরি বেন্টিংক লন্ডনের জুওলজিক্যাল সোসাইটিতে হিমালয়ের বার্ডস্কিন দান করেছিলেন। কলকাতার তৎকালীন সময়ে পাগড়ির মধ্যে পালক ব্যবহার ফ্যাশান ছিল। ওই মেমসাহেবরা সেগুলো ব্যবহার করতেন। লেডি গভর্নর শব্দটা তখন খুব প্রচলিত ছিল। যেমন জর্জ ইডেনের দুই বোন তার সঙ্গে থাকতেন। বড় বোন এমিলিকে তাই লেডি গভর্নর হিসেবে তখন মানা হতো। তার ছোট বোন ফ্যানির মতে পুরুষতান্ত্রিক কলকাতার ক্লাবগুলোয় নারীদের সংখ্যা খুবই সামান্য, তাই তারা একাকিত্বেও থাকতেন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় শার্লট কারভেল্টলির পত্রগুলোয় কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। এ সময় ভায়োলেন্স মারাত্মক হয়েছিল। গুজব ছড়িয়েছিল বৃহত্তর অংশে ভারতীয়দের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তর করার প্রয়াস চলছে। স্যামুয়েল ক্যারিংটন নামে এক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সিপাহি বিদ্রোহের সময় কলকাতায় সেসব ভয়াবহতার ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। ভয়ে বহু ব্রিটিশ কর্মচারী রোজ পিস্তল বহন করতেন নিজের সঙ্গে। এসব বিদেশিনীর পত্রাবলি থেকে জানা যায়। এদিকে শার্লট তার স্বামীর সঙ্গে ভারতে আসেন। তিনি ১৯৬১-তে দার্জিলিং ভ্রমণে যান। তিনি ছবি এঁকে সেগুলো স্বদেশে পাঠাতেন। কিন্তু এই ভ্রমণকালে তার ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে, তাই তিনি পুনরায় কলকাতায় ফিরে যান। কলকাতাকে ভালোবেসে অনেক মেমসাহেব তার ভূষয়ী প্রশংসাও করেছেন। 

মেমসাহেব শব্দটির মধ্যে সম্ভ্রম ও কৌতুক উভয়ের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। মেম ও সাহেব—দুই শব্দের বন্ধনীতে বিদেশী রমণীদের মেমসাহেব বলে ডাকা হতো। অনেক সময় অবশ্য ইউরেশীয় নারীদেরও মেমসাহেব বলা হতো। কিন্তু তাদের চোখের রঙ কালো বর্ণের এবং গায়ের রঙ ব্রিটিশদের মতো উজ্জ্বল সাদা বর্ণের নয়। ঘটনাচক্রে একটি বিষয় উত্থাপন প্রয়োজন বোধ করি। আমার দিদিমা স্বর্গীয়া মৃণালিনী কাণ্ডার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজের গঙ্গা নদীর ধারে তার পিতৃসূত্রে বসবাস করতেন। নদীর নাব্যতা অনুসারে সেখান দিয়ে বহু বিদেশী জাহাজ যাতায়াত করত। আমার দিদিমার স্মৃতিচারণায় এসব মেমসাহেবের কথা উঠে আসতে দেখতাম। দিদিমা বলতেন, নদীতে বড় বড় জাহাজ যেত দিন-রাত। তখন ভারত স্বাধীন হয়নি। তিনি তার কৈশোর অবস্থায় দেখেছেন জাহাজ থেকে সাহেব ও মেমরা নামতেন বজবজে। সেই লম্বা, রোগা, শ্বেতাঙ্গ নারীদের নীল চোখ। তাদের পায়ে নিউকাট জুতো এবং প্রায় হাঁটু পর্যন্ত পোশাক পরতেন। স্বাভাবিকভাবেই বিদেশিনী এই নারীদের দেখে দিদিমা অবাক হতেন। সাধারণত গড়পড়তা বাঙালি বাড়ির মেয়েরা যেভাবে এক গণ্ডির মধ্যে থেকে অভ্যস্ত, সেখানে এসব আধুনিকা মেমসাহেব দিদিমার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। নব্য আধুনিকাদের এদিকটা দিদিমার পছন্দ হতো। এসব মেমসাহেব এ দেশের গরম সহ্য করতে পারতেন না। উনিশ শতকে কলকাতায় মেমসাহেবদের দেখে বাঙালি বাড়ির নারীদের আধুনিকীকরণ করার ঝোঁক দেখতে পাওয়া যেত।

অবশ্য শুধু স্বামীর সঙ্গেই যে মেমসাহেবরা বাংলায় আসতেন তা নয়, অনেক বিদেশিনী ছিলেন যারা বাংলা তথা ভারতবর্ষের সেবাকার্যেও মনোনিবেশ করে এসেছিলান। স্বামী বিবেকানন্দের ইচ্ছা অনুসারে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল তার আত্মীয়স্বজন, পরিবার সব লন্ডনে ফেলে রেখে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় এসে তার নব্য পরিচয় হয় ‘সিস্টার নিবেদিতা’ নামে। কলকাতায় বাংলা ভাষা শিখে স্বামীজির কর্মযজ্ঞে ও মানবতায় তিনি আত্মব্রতী হয়েছিলেন। বাঙালী নারীরা নিজেদের গৃহকর্মের মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রাখতেন, এ বিষয়টি মেমসাহেবদের ভাবাত। মেমসাহেবরা দেখতেন বাঙালি নারীরা দিন-রাত গৃহের মধ্যে পরিশ্রম করছে, কিন্তু তাদের এই শ্রমকে সেভাবে মর্যাদা দেয়া হচ্ছে না। ই. আগাস্টা কিং একজন বাঙালি নারীর বিষয়ে জানতে উৎসাহী হয়েছিলেন। এই জনৈকা বাঙালি নারী রোমান অক্ষর শিখতেন এবং ভবিষ্যতে ইংরেজি ভাষা শিখতেও আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ই. আগাস্টা কিং যখন তার বিবাহিত জীবন নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেন, তখন তিনি সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। আগাস্টা বিষয়টিকে দুই জাতির মধ্যে উপসাগরসম দূরত্ব বলে বর্ণনা করেছেন। বিদেশিনীরা এ দেশে এসে তাদের বাড়ির অন্দরসজ্জাকে ইউরোপীয় স্টাইলে সাজাতেই বেশি পছন্দ করতেন, তাই তারা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করতেন। বিশষ করে এমডি বাস্তর দোকান থেকে তারা মার্বেল টেবিল, আয়না ইত্যাদি কিনতেন। উষ্ণতার দিনে মেমসাহেবরা তাদের বাংলোকে শীতল রাখতে ‘খসখস’ ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে গরমকালে কলকাতার বন্দরকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোয় গরম হাওয়ার ‘লু’ বইত। সেই গরমের হলকা দেয়া উষ্ণ বাতাস থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে তারা খসখস ভিজিয়ে রাখতেন। কলকাতার এ উষ্ণতা থেকে রক্ষা পেতে সিমলায় শীতলতা উপভোগ করতে চলে যেতেন। এছাড়া অনেক মেমসাহেব ব্যারাকপুরের কাছে গঙ্গার ধার পছন্দ করতেন।

তদাপি বঙ্গদেশে আসা এ নিজভূমি বিচ্ছিন্ন ইউরোপীয়দের কথা মাথায় রেখে চারপাশকে সুন্দর মনোরমভাবে সাজানো হয়েছিল। মেমসাহেবদের জন্য গভর্নমেন্ট হাউজের পাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সুদৃশ্য বাগান তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া সেন্ট অ্যান্ড্রু চার্চও স্থাপন করা হয়েছিল তখন। চৌরঙ্গীর চারপাশে ফুলের বাগান সাজানো হয়েছিল। তবে বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন এমনই বহু মেমসাহেব। কিন্তু বঙ্গদেশে আসা এই মেমসাহেবদের সামনে যে বিষয়টি সর্বাপেক্ষা অপচ্ছন্দের ছিল তা হলো এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। ভারতের মধ্যে ঘন জঙ্গল, বন্য প্রাণী, ডাকাত থাকা সত্ত্বেও তারা যেভাবে বসবাস করত তা বিস্ময়কর। সর্বাপেক্ষা ভয়ানক ছিল মশার উৎপাত। চারপাশে ম্যালেরিয়া ছেয়ে গিয়েছিল। ১৮৩০ নাগাদ কলকাতার জনৈক সার্জেন্ট এফপি স্ট্রং লিখেছিলেন, বাংলার যেসব জায়গায় জঙ্গল পরিষ্কার হয়নি, সেসব জায়গায় ম্যালেরিয়া আরো ছড়িয়ে পড়েছিল। ন্যান্সি ভারনেড নামে সদ্য বিবাহিতা মেমসাহেবের যখন ম্যালেরিয়া হয় তখন তাদের কাছে মশা হয়ে উঠেছিল চরম শত্রু। বনাঞ্চল, জঙ্গল ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয় মশার আধিক্য ছিল বেশি। কলকাতায় প্রচুর জলাভূমি, পুকুর মশার বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। অ্যানা এইচ লিওনোওয়েন্স ১৮৮০-এর দশকের প্রথমার্ধে কলকাতা ভ্রমণকালে লিখেছিলেন, ভারতের সর্বাপেক্ষা অস্বাস্থ্যকর অঞ্চল ছিল এটি। অবশ্য কলকাতার উপকণ্ঠে কতকগুলো ঘন বনাঞ্চল থাকলেও রাস্তাগুলোয় যত্নসহকারে জল নিষ্কাশন করা হতো এবং কর্দমাক্ত জলাশয়গুলোকে বাগানে রূপান্তর করা হয়েছিল। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে মূলত কুইনাইন ট্যাবলেট ব্যবহার করা হতো। কলেরা রোগেরও প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে মেমসাহেবরা তাদের বিভিন্ন লেখনীতে ঔপনিবেশিক স্থানের বাসযোগ্যতা নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ক্যান্টনমেন্টগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়েও উষ্মা দেখিয়েছেন।

বিদেশ থেকে আসা মেমসাহেবদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থাও থাকত। ক্যান্টনমেন্টগুলোয় সেনাদের জন্য বিভিন্ন ক্রীড়া হতো, যেখানে নারীরাও উপস্থিত থাকতেন। নাচ, নাটকের মতো অনুষ্ঠানও হতো। থিয়েটার হলে দর্শকের বিশাল জমায়েতও হতো। সুদৃশ্যভাবে থিয়েটারের প্রেক্ষাগৃহ সাজানো থাকত। কলকাতায় থিয়েটারগুলোর বাইরে ভৃত্যরা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করত সাহেব ও মেমসাহেবদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। নৈশভোজন ও পার্টির ব্যবস্থাও সে সময় হতো। লেডি কার্জন প্রতি বছর কলকাতায় তিন মাস করে থাকতেন। সে সময় তিনি তার স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে নৈশভোজন ও পার্টির আয়োজন করতেন। মেমসাহেবরা ব্রিটিশ উপন্যাস পড়তে খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু স্বদেশ থেকে বইগুলো ভারতে আসতে যথেষ্ট দেরি হতো। বহু ক্ষেত্রে বিদেশী বইগুলো বিভিন্ন বাণিজ্য কেন্দ্রর মাধ্যমে কলকাতায় আসত। নিলামেও বইগুলো বিক্রি হতো। এ দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রেও মেমসাহেবদের অবদান আছে। হেনরি বেভারিজের স্ত্রী অ্যানেট আর্করয়েড একজন কলেজ শিক্ষিতা নারী, যিনি ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভারতে আসেন। তিনি বুঝতে পারলেন, ভারতীয় শিক্ষা সংস্কারগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কুসংস্কার থেকে গেছে, যার ফলে নারী শিক্ষার বিকাশে সেরূপ ব্যাপকতা দেখতে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই তিনি এ সমস্যা অনুধাবন করে নারীদের জন্য পৃথক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তিনি ভারতীয় সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও শিখতে শুরু করেন এবং মোগল সম্রাট বাবরের লেখা ‘বাবরনামা’র অনুবাদও করেন।

সুতরাং ঔপনিবেশিক যুগে মেমসাহেবরা শুধু স্বামীর সঙ্গে বাংলায় বসবাস করার জন্যই যে এসেছিল তা নয়, বরং অনেকেই এ বাংলার সেবাকার্যে আত্মনিয়োজিত করেছিলেন। তারা তাদের স্বামী-সন্তান নিয়ে এক অচেনা দেশে এসে যেমন নিজেদের গুছিয়ে নেয়া ও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন তেমনি এ দেশের মঙ্গলের কথাও অনেকে ভেবেছেন। এই বাংলার উষ্ণ আবহাওয়া বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং এখানকার মানুষের অনেক কিছুই তাদের পছন্দ হয়নি, কিন্তু এই বাংলা মায়ের স্নেহ থেকে মেমসাহেবরা বঞ্চিত হননি।

তথ্যসূত্র 

১. ঈপ্সিতা নাথ, ‘মেমসাহেবস’, হার্স্ট অ্যান্ড কোম্পানি, লন্ডন, ২০২২।

২. প্যাট বার, ‘দ্য মেমসাহেবস’, শেকার অ্যান্ড ওয়ারবার্গ, লন্ডন, ১৯৭৬।


উৎকলিকা সাহু: ইতিহাস গবেষক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়;

ইতিহাস শিক্ষিকা, নৈহাটী ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র মহিলা মহাবিদ্যালয়