ঔপনিবেশিক আমলের কোনো এক সময় কলকাতায় পা রেখেছিলেন মিস পার্সি। সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে পড়েছিল এ ইংরেজ মেমসাহেবের দেহ-মনে। অপার উচ্ছ্বাসে তিনি বলেছিলেন, ‘What a charming place this must be to live in! How spacious! How Imposing!’ ফার্ডিনান্ড ডে উইলটন ওয়ার্ড রচিত ‘লাইফ ইন ক্যালকাটা, ইংলিশ অ্যাট ক্যালকাটা’ বইয়ের প্রথম ভলিউমে এ তথ্য উল্লেখ আছে।
স্বনামে খ্যাত মেমসাহেব ছিলেন ফ্যানি পার্কস। কলকাতা ত্যাগ করে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার সময় তার হূদয় ভীষণভাবে মুচড়ে উঠেছিল। গভীর বেদনায় ডুবে গিয়েছিলেন তিনি। কেটাকি কুশারি ডাইসন রচিত ‘আ ভ্যারিয়াস ইউনিভার্স’ বইয়ে ফ্যানি পার্কসকে উদ্ধৃত করে সে অনুভূতির বয়ান তুলে ধরা হয়েছে। কলকাতা ছাড়ার কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ফ্যানি পার্কস লেখেন, ‘আসার আগে একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি আমার ঘর ছেড়ে যেতে চাইনি। যখন বলা হলো সবকিছু প্রস্তুত, আমি সিঁড়ি ভেঙে একবার ওপরতলায় উঠে আবার নিচে এলাম ঘোড়ার গাড়ির কাছে। তারপর আবার একটা অজুহাতে ফিরে গেলাম বাড়ির ভেতরে। প্রত্যেকটা ঘরে একবার করে উঁকি মারলাম, যেন অনেক বন্ধুকে ছেড়ে বিদায় নিচ্ছি। আর কখনো দেখা হবে না তাদের সঙ্গে।’
মেমসাহেবরা নানা কারণে কলকাতাকে আপন করে নিয়েছিলেন। কলকাতা ত্যাগের বেদনাও তাই তাদের ক্ষেত্রে প্রকট আকার ধারণ করেছিল। নিখিল সুর তার ‘সায়েবমেম সমাচার: কোম্পানির আমলে কলকাতা’ বইয়ে এ ব্যাপারে বেশ হূদয়গ্রাহী একটি মন্তব্য করেছেন। বইটির ‘মেমসায়েবদের মতিগতি’ নামক একটি প্রবন্ধের শেষে তিনি লেখেন, ‘সম্ভবত ফ্যানি পার্কসের মতো আরো অনেক মেমসায়েবের হূদয় ভেঙে গিয়েছিল শেষবারের মতো কলকাতার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে। ইতিহাসে তাদের কথা লেখা নেই। কিন্তু অনুমান করতে অসুবিধা হয় না।’
ভারতবর্ষ তথা কলকাতায় মেমসাহেবদের আগমনের শুরুটা কেমন ছিল? এখানে তাদের জীবনযাপনের পদ্ধতিটাই বা ছিল কেমন? তাদের মনোজগতে কোন কোন বিষয় আলোড়ন তুলত? এ রকম নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন নিখিল সুর। তার পূর্বোল্লিখিত বইটিই আমাদের বর্তমান রচনার মূল ভিত্তি।
ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম দিকে কলকাতায় মেমসাহেবের সংখ্যা ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। কারণ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। ইংরেজ কুমারীরা ভারতে আসার জন্য কোম্পানির পরিচালক সমিতির অনুমতি পেত না। বেপরোয়া কেউ যদিও কোনোভাবে চলে আসত, তাদের তত্ক্ষণাত্ বিলেতে পাঠিয়ে দেয়া হতো। এক্ষেত্রে কোম্পানি সবসময় হুঁশিয়ার থাকত। নিখিল সুর লেখেন, ‘বিলেতে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই চাইত না, এ দেশে শ্বেতাঙ্গিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাক। প্রতি বছর কলকাতার সায়েবদের তালিকা পাঠানো হতো বিলেতে। খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হতো সে তালিকা। কোনো অবিবাহিতা ইংরেজ মহিলার নাম তালিকায় থাকলে হুকুম হতো তাকে বিলেতে ফেরত পাঠানোর জন্য।’ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও লুকিয়ে ভারতে আসার চেষ্টা করা বেপরোয়া ইংরেজ তরুণীদের একজন ছিলেন মিস ক্যাম্পবেল। ‘হার্ডউইক’ নামক একটি জাহাজের ক্যাপ্টেন স্যামসনের সহায়তায় তিনি সে জাহাজে চড়ে ভারতে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন। ১৭৫৫ সালের ৩১ জানুয়ারি পরিচালক সমিতি কলকাতার কাউন্সিলকে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে জানানো হয়, পরিচালক সমিতি আশঙ্কা করছে ক্যাম্পবেল জাহাজে চড়ে বাংলায় যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাকে ‘হার্ডউইক’ জাহাজের মালিকের খরচে বিলেতগামী প্রথম জাহাজেই বিলেতে ফেরত পাঠানোর কড়া নির্দেশ দেয়া হয়। এ ঘটনার ঠিক এক বছর আগে মিস ক্রিশ্চিয়ানা রস নামক এক মেমসাহেবকে একটি ফরাসি জাহাজে করে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। সুরেশ চন্দ্র ঘোষ রচিত ‘দ্য সোশ্যাল কন্ডিশন অব ব্রিটিশ কমিউনিটি ইন বেঙ্গল’ এবং পি জে মার্শাল রচিত ‘দ্য হোয়াইট টাউন অব ক্যালকাটা আন্ডার দ্য রুল অব দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ বই দুটির বরাতে নিখিল সুর লেখেন, ‘সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে যখন কলকাতা আক্রমণ করেন, সারা বাংলায় সায়েবের সংখ্যা ছিল ৬৭১, মেমের সংখ্যা মাত্র ৮০। ৫৪ বছর পরে ১৮১০ সালে তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে চার হাজার ও ২৫০। কোম্পানির আমলে সবসময়ই কলকাতার শ্বেতাঙ্গ সমাজে সায়েবরাই সংখ্যার বিচারে প্রভুত্ব করত।’ অন্যদিকে, ‘বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’-এর দশম ভলিউমের সূত্রে নিখিল সুর জানান, ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত কলকাতায় মেমসাহেবদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে সাহেবদের সমাজে বিয়ের ঘটনাও ছিল বিরল। নিখিল সুর লেখেন, ‘১৭১৩-৫৪, ৪১ বছরে কলকাতায় সায়েব-মেমের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল ৪১৭টা, অর্থাত্ বছরে গড়ে মাত্র ১০টার মতো। মেমদের মধ্যে ৮১ জন ছিল বিধবা অথবা বিবাহবিচ্ছিন্না। ১০৭ জন কলকাতার শ্বেতাঙ্গিনী।’
কালের পরিক্রমায় কুমারী মেমসাহেবদের ভারতে আসার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে থাকে। তথাপি তাদের সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি। সে কারণে নিঃসঙ্গ সাহেবরা এক নিদারুণ হতাশায় ভুগতেন। ইংল্যান্ড থেকে কলকাতার বন্দরে কোনো জাহাজ ভিড়লে তাদের সে মানসিক পরিস্থিতির চিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠত। তারা হন্যে হয়ে যাত্রী তালিকায় কোনো কুমারীর নাম আছে কিনা খুঁজতেন। জাহাজ ভেড়ার দিন বন্দরে কেবল তরুণ ও অবিবাহিত সাহেবরাই ভিড় জমাতেন না, বয়স্ক ও ধনী বিপত্নীকরাও উল্লেখযোগ্য হারে ভিড় জমাতেন। জাহাজে চড়ে আসা কুমারী মেমসাহেবদের হূদয় জয় করতে নানাভাবে প্রচেষ্টা চালাতেন সাহেবরা। বিষয়টি ছিল লটারিতে পুরস্কার পাওয়ার মতো। কারণ পাণিগ্রহণের আশায় মৌমাছির মতো ভিড় জমানো এসব সাহেবের তুলনায় কুমারী মেমসাহেবদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগণ্য। তাছাড়া প্রতি রোববার মেমসাহেবদের দৃষ্টি আকর্ষণের আশায় সাহেবরা গির্জায় যেতেন। এ প্রসঙ্গে ‘হার্টলি হাউজ’ নামক একটি বইয়ের সূত্রে নিখিল সুর লেখেন, ‘গির্জায় মেয়েরা পৌঁছলেই পুরনো প্রথানুযায়ী পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সব অফিসার হাত বাড়িয়ে দিত তাদের আসন গ্রহণে সাহায্য করতে। জাহাজ এসে পৌঁছলেই তারা ঠিক করে নিত, গির্জায় কে কোন সুন্দরীর সেবা করবে। দেখা যেত এর পরই কোনো রকম আনুষ্ঠানিক পরিচয় বিনিময় ছাড়াই তাদের দুই হাত এক হয়েছে।’ তৎকালীন কলকাতায় কুমারী মেমসাহেবদের চাহিদা এতটাই বেশি ছিল যে অবিবাহিত সাহেবরা তাদের বাড়ি পর্যন্ত চলে যেতেন। কলকাতায় আসার পর এসব মেমসাহেবদের বাড়ির দরজা পাণিপ্রত্যাশী সাহেবদের জন্য তিনদিন খোলা থাকত। এক্ষেত্রে তারা রীতিমতো দরবার বসাতেন। নিখিল সুর লেখেন, ‘এক এক করে প্রত্যেক পাণিপ্রার্থীকে সুযোগ দেয়া হতো কুমারীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করার। দরবার শেষ হওয়ার আগেই অসংখ্য প্রস্তাব জমা পড়ত কুমারীর কাছে।’ কুমারী মেমসাহেবের স্বল্পতার কারণে বিধবা মেমসাহেবদের চাহিদাও ছিল ব্যাপক। তাই কোনো মেমসাহেব বিধবা হলে নতুন জীবনসঙ্গী পেতে তার কোনো অসুবিধা হতো না। এমনকি মৃত স্বামীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার আগেই তার কাছে অসংখ্য বিয়ের প্রস্তাব এসে জমা হতো। তাছাড়া বিধবা মেমসাহেবদের বিয়ে করার ব্যাপারে সাহেবদের আগ্রহের আরেকটি বড় কারণ ছিল। সে সময় কোনো মেমসাহের বিধবা হলে তিনি তার স্বামীর বেতনের সমপরিমাণ পেনশন পেতেন। তাই বিধবা মেমসাহেবদের বিয়ে করে সাহেবরা দুভাবে লাভবান হতেন। পত্নী ও অর্থ—একত্রে দুটোই তারা পেতেন। তবে কোম্পানির সেনাবাহিনীতে যেসব সাহেব ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে কাজ করতেন, তাদের স্ত্রীরা কিন্তু নিয়মিত সৈনিকের মতো পেনশন পেতেন না। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর তারা চরম আর্থিক সংকটে পতিত হতেন। অনেকে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হতেন। নিখিল সুরের লেখা থেকে এমন তিনজন মেমসাহেবের নাম জানা যায়। অ্যাবি ম্যাকটাগেট, রেবেকা ডোভ ও ব্রিগেট গোগিনস। তারা লালবাজারে বাস করতেন। সেখানকার সম্ভ্রান্ত সাহেব পরিবারগুলো আপত্তি তুললে কলকাতার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
উনিশ শতকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। কলকাতায় কুমারী মেমসাহেবদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর প্রধান কারণ ছিল আর্থিক। ইংল্যান্ডে তখন চরম দারিদ্র্য। তাই এসব কুমারী মেমসাহেব কোনো বিত্তশালী সাহেবকে বিয়ে করে আর্থিক নিশ্চয়তা লাভের প্রত্যাশায় ভারতে পাড়ি জমাতে শুরু করেন। নিখিল সুর লেখেন, ‘১৭৮০-এর দশকের কোনো একটা সময় থেকে বিলেতের মেয়েরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, দীর্ঘ সমুদ্রপথে ভ্রমণের ধকল স্বীকার করে ভারতের উদ্দেশে পাড়ি দিতে শুরু করে প্রতি বছর। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল কোনো অর্থশালী ইংরেজ বা ইউরোপীয়কে বর হিসেবে বড়শিতে গেঁথে তোলা।’ এক্ষেত্রে তাদের প্রধান আকর্ষণ ছিল বল নাচের আসর। তারা নিজেদের সবটুকু পুঁজির বিনিময়ে ঝলমলে পোশাক কিনত। তারপর সে পোশাকে সজ্জিত হয়ে বল নাচের আসরে যেত। অনেক সময় মেমসাহেবরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে বল নাচের আসর বসাতেন। আর্থিক সংকট ছাড়াও উনিশ শতকে কলকাতায় মেমসাহেবদের সংখ্যা বাড়ার পেছনে আরেকটি কারণ ছিল। সাহেবরা তাদের স্ত্রীদের এ সময় ইংল্যান্ড থেকে কলকাতায় নিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন।
যে উদ্দেশ্যেই মেমসাহেবরা কলকাতায় আসুক না কেন, তাদের অনেকেই কলকাতাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। বাংলায় সেবামূলক ও জনহিতৈষী কাজের জন্য তাদের অনেকেই বিখ্যাত হয়েছেন। ভারতবর্ষ তথা কলকাতায় মেমসাহেবদের আগমন ও জীবনযাপনের সামান্য ইঙ্গিত পাঠকরা এ লেখা থেকে পাবেন, এমন প্রত্যাশায় এখানেই ইতি।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





