বহুকাল ধরেই আংটি টিকে আছে। প্রাচীন গ্রিকরা ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে আংটি ব্যবহার করলেও বিয়ের আংটি হিসেবে তা করত না। রোমকরাও বিয়ের চেয়েও বরং ভালোবাসার প্রতীক হিসেবেই আংটি ব্যবহার করত। সাধারণত লোহার তৈরি (পরে সোনার) কিছু পাথরবিহীন রোমান আংটি বাগদানের সময় ব্যবহার করা হলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদ বা বিয়ের কথা বোঝায়নি। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের আংটিকে অ্যানালাস প্রোনোবাস বা আক্ষরিক অর্থে ‘বিয়ের জন্য আঙুলের আংটি’ বলা হতো। গোড়ার দিকের ক্রিশ্চান গির্জাই প্রথম বিয়ের অঙ্গীকার হিসেবে আংটিকে অনুমোদন দেয়। এখন একে বাতিলযোগ্য সেকুলার চুক্তির চেয়ে বেশি কিছু ভাবা হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে বিয়ের ক্ষেত্রে আংটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিল। ১৫৫৯ সালে বুক অব কমন প্রেয়ারে বিয়ে উপলক্ষে আংটি দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আংটির অর্থ
টিফানির একক বাক্যের বিজ্ঞাপন বলছে, ‘সব আংটিরই বলার মতো গল্প আছে।’ এলিজাবেথ টেলরের মন্তব্যের প্রতিধ্বনি মেলে এখানে। ২০০২ সালে স্মৃতিকথা মাই লাভ অ্যাফেয়ার উইথ জুয়েলারি প্রকাশ উপলক্ষে সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, তার অগুনতি অলঙ্কারের ‘প্রতিটিই আমাকে একটা কাহিনী বলে।’ আংটিসংক্রান্ত কাহিনীগুলো একটা সাধারণ গুচ্ছ অর্থের সাথে সম্পর্কিত। আদি জার্মান কিছু টেক্সটে, সম্ভবত নবম শতকের হবে, ব্রিনহিলদি তার ভাই আতিলা দ্য হানের কাছে এক ধরনের সংকেত হিসেবে নেকড়ের পশমে প্যাঁচানো একটা আংটি পাঠাচ্ছেন, কিন্তু সেটা ঠাহর করতে পারছেন না তিনি। কোনো কোনো আংটির বেলায় কেউ সংকেত ধরতে ব্যর্থ হলেও অন্যরা ঠিকই বুঝে নিয়েছে। আমরাও সে চেষ্টা করতে পারি।
প্রেম কাহিনীতে আংটির গোলাকার চেহারা দিয়ে সীমাহীন, চিরন্তন ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির কথা বোঝানো হয়েছে। ‘আমার ভালোবাসাকে অন্তহীন একটা আংটি দিয়েছি... আংটি কীভাবে সীমাহীন হয়?... আংটি গড়াতে শুরু করলে শেষ থাকে না’— জানাচ্ছে পুরনো ‘হেঁয়ালি সংগীত’। আবার এরই ভিন্ন ভাষ্যে যোগ করছে, ‘তোমাকে ভালোবাসার গল্প কোনোদিনই ফুরোবে না।’ ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর বিয়ের আইনের বিশেষজ্ঞ হেনরি সুইনবার্ন বলেছেন, ‘আজকের দিনের কোনো ধাতু দিয়ে বানানো তার ওপর আংটির শক্তি নির্ভর করে না, বরং বৃত্তাকার ও অন্তহীন ধরনই এগুলোর ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ার এবং অবিরাম বয়ে চলার কথা বোঝায়।’ উপাদান দিয়ে আংটির অন্যান্য অর্থ বোঝানো হয়েছে। আদিতে লোহা হলেও পরে তা সাধারণভাবে সোনায় পরিণত হয়েছে। ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দেয়া আংটি সোনার মতোই নিখাদ। এভাবে সুইনবার্ন ‘চুক্তির মেয়াদ ও চিরন্তন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা আংটির ধাতব কাঠিন্য ও স্থায়িত্বের তারিফ করেছেন। যদিও আমরা জানি, সোনা কিঞ্চিত কোমলই হয়। আংটির এমন অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্যই যেন অখণ্ডতা ও বিশ্বস্ততার পক্ষে সাক্ষী নির্বাচিত করেছে একে। বিয়ের পোশাক কিংবা বিয়ের সনদের চেয়ে অলঙ্কারপাতি বেশি টেকে। দুটি তাত্পর্যপূর্ণ দিক থেকে নেকলেস ও ব্রেসলেটের মতো অন্যান্য গোলাকার অলঙ্কারের চেয়ে আংটি ভিন্ন: আংটি পরতে কোনো কব্জা লাগে না; খুলতে হয় না, শোয়ার সময় প্রায়ই খুলে রাখা অন্য বেখাপ্পা অলঙ্কারের তুলনায় সারাক্ষণ হাতেই থাকে এটা। (প্রায়ই আংটির প্রতীকের অংশীদার হয়ে দাঁড়ানো এবং নারী, যৌনতা ও বিয়ের কাহিনীর সাধারণ বিষয় চুড়ির বেলায়ও এ কথা খাটে।)
১৮৯২ সালে কাশ্মীরে রচিত ‘মাছের পেটে আংটি’ কাহিনীর লোকগাথা ভাষ্যের আংটিটা নাকফুল ছিল। ব্রেসলেট বা নেকলেসের বদলে সব ধরনের আংটিই ভালোবাসার অখণ্ড স্থিরতাকে নিশ্চিত করে। শেকলের আংটার মতো গোলাকার যেকোনো অলঙ্কার গ্রহীতাকে বন্ধনে জড়িয়ে ফেলতে পারে। একটি ভিক্টোরিয়ান কবিতা ‘টু হার রিং’ আংটিকে মিনতি জানাচ্ছে, ‘ওর আঙুল যেভাবে বন্দি করেছ, সেভাবে ওর হূদয়ও বন্দি করো।’ শেক্সপিয়রের সিম্বেলিনে পোস্টহিউমাস ইমোজিনের বিশ্বস্ততা নিয়ে অমূলক সন্দেহ থেকে ‘ভালোবাসার শিকল’ হিসেবে দেয়া ব্রেসলেটের কথা বলছে। পলিন রেজের (অ্যান ডেসক্লস) উপন্যাস স্টোরি অব ওতে শিকল হিসেবে আংটির মর্ষকামী ও ধর্ষকামী রূপ দেখা গেছে। এখানে ‘ও’র প্রেমিক স্থায়ীভাবে তার দু’পায়ে ‘ও’ এবং স্যার স্টিফেনের নাম খোদাই করা দুটো আংটি জুড়ে দিয়ে চেস্টিটি বেল্টের কায়দায় তার যৌনতাকে রুদ্ধ করে একটা শিকলের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে। ওটা দিয়ে যে কেউ পশুর মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাকে।
সোনার বৃত্তের প্রতীক আংটি আরো বহু প্রতীকের মতো প্রায়ই যুগপত্ দুটো ভিন্ন অর্থ তুলে ধরায় দ্ব্যর্থবোধক হয়ে থাকে। অনেক সময় সাধারণ কোনো আংটিই একধারে হাজির ও গরহাজির, পেয়ে হারানোর পর ফের খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে দ্বৈত অর্থ তুলে ধরে। একই গল্পে দুজন ভিন্ন লোকের বেলায় একই আংটির দুই রকম অর্থ থাকতে পারে। কিংবা দ্বিতীয় একটি আংটি ফাঁস না করা পর্যন্ত ভান করে যেতে পারে। চলতি ফ্যাশনের কারণে অ্যামিবার মতো আংটি অন্ধকারে প্রতিরূপ তৈরি কিংবা বেড়ে উঠতে পারে। আংটি বদলের সময় আনায়েস নিনকে গুরু ফ্রয়েডের কাছ থেকে পাওয়া আংটি দিয়েছিলেন ওটো র্যাঙ্ক; আনায়েস দিয়েছেন বাবার আংটি। কিন্তু পৌরুষের প্রতীক আংটি দুটো অচিরেই তিনটি হয়ে গেছে। র্যাঙ্ককে দেয়া আংটির একটা নকল বানাতে স্বর্ণকার ভাড়া করেন আনায়েস। সেটি দেন দ্বিতীয় প্রেমিক হেনরি মিলারকে।
মিথ্যার আংটির ছায়ায় পড়েছে সত্যির আংটি। বিয়ের আংটি কাজে লাগার মতো মিথ্যাচারে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়তি ফুর্তির ধান্দায় ভিন্ন নারীর পিছু নিতে গিয়ে বিবাহিত পুরুষরা প্রায়ই বিয়ের আংটি খুলে রাখে। আবার ক্যাথলিক যাজকরা উর্দি গায়ে বেরোনোর সময় মেয়েদের নজর এড়াতে আংটি পরেন। বেশকিছু ইংরেজি শব্দ মারফত ভাষার দিক থেকেও আংটি সত্যি ও মিথ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব দার্শনিকভাবে সম্পর্কিত হওয়ার চেয়ে বরং কেবলই সমার্থক, তবে আংটির বিভিন্ন ইংরেজি গল্পে পরস্পরের অনুরণন তোলে।
আকার ও উপাদানের কল্যাণে কাপড় যেভাবে সুবাস বা কুকুরের পশম তুলে নেয়, সেভাবে আংটি ভিন্ন অর্থও গ্রহণ করে। ১৯১৭ সালে আংটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জর্জ ফ্রেডেরিক কুনজ চমত্কার বলেছেন: ‘সম্পর্ক বা স্মৃতির কারণে জোগানো বস্তুগত আংটিতে কোনো ধরনের জাদুকরী গুণ থাকার কল্পনাকে আমরা কুসংস্কার ধরে নিতে পারি হয়তো, কিন্তু মালিকের মগজ বা হূদয়ে সেটা বাস্তবই।’
সিগনেট আংটি
পরিচয় তুলে ধরার উপায় হিসেবে আংটি এক রকম বস্তুগত প্রতীক। আমরা বদলালেও এটা বদলায় না, ফলে সবসময়ই একে পরিচয়ের নিশ্চয়তা ধরে নেয়া হয়। সলোমনের কাছে সলোমনের আংটি থেকে থাকলে সে সবসময়ই সলোমন। অনেক সময় লক্ষণীয় কায়দায় আংটি খোদাই করা হয়, কিংবা পাথর বসানোয় অনন্য হয়ে ওঠে। অনেক কাহিনীতে আংটিই মালিকের নাম বা আদ্যক্ষর কিংবা ইনসিগনিয়া খোদাই করা সিগনেট রিং অথবা সিলমোহর। অসিরীয়রা চিঠি বা দলিলে সিলমোহর দিতে সিগনেট বা সিল ব্যবহার করত; মিনোয়ানরা অসিরীয়দের কাছ থেকে এ রীতি ধার করে। গোড়ার দিকে সিলমোহর খাড়া সিলিন্ডার আকৃতির ছিল। কিন্তু গ্রিকরা সেটাকে আংটিতে বসানো চ্যাপ্টা ডিমের চেহারা দিয়েছিল। গ্রিকরা সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের দিকে আলেক্সান্দারের বাহিনীর সঙ্গে সিগনেট রিং ভারতে নিয়ে আসে। আমরা দেখব, সিলের নানা ধরনের অর্থ ও প্রতীকের ইতিহাস রয়েছে এবং আংটির ইতিহাস ভিন্ন। এর মিশেলই সিগনেট রিং।
প্রথম দিকে সিগনেট রিং ছিল রাজাদের। সেগুলো ক্ষমতার আংটি ছিল; ‘কাউকে আংটি দেয়ার মানে ছিল ক্ষমতা দেয়া।’ হেইনরিখ জিমার মন্তব্য করেছেন, ‘কারো পক্ষে কথা বলার কর্তৃত্ব।’ প্রাচীন গল্পকথার অনেক পুরুষই প্রেমিকের পাশাপাশি রাজা ছিলেন। প্রায়ই নিরীহ নারীদের ফাঁদে ফেলতে আংটি ব্যবহার করেছেন তারা। এক কিংবদন্তি অনুযায়ী ইংল্যান্ডের রাজা জন ব্যারন ইউসটেস দে ভেসসির স্ত্রীকে পছন্দ করতেন; নকল তৈরির অজুহাতে দে ভেসসির সিল রিং ‘ধার’ করে সেটা ভেসসির স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে অবিলম্বে দেখা করার অনুরোধ জানান তিনি। আংটি দেখে মহিলা রওনা হয়ে যান, কিন্তু পথে স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়; ঠকানোর কথা টের পেয়ে দে ভেসসি ‘কোনো দুষ্ট মেয়েকে খুঁজে বের করে তাকে নিজের স্ত্রীর সাজে সাজাতে তার পোশাক পরাবেন স্থির করলেন।’ (বিছানার চালাকি এটা, এসব গল্পে প্রায়ই যার দেখা মিলবে; কেউ একজন যৌনসঙ্গীকে বোকা বানিয়ে কারো বদলে বিছানায় যাচ্ছে)।
সভাসদের স্ত্রীকে ভোগে ইচ্ছুক আরেক রাজা সফল হয়েছেন প্রমাণ করতে একটা সিগনেট রিং ব্যবহার করছেন; এ গল্পে আগ্রাওয়াল জাতি তাদের মন্দিরে পূজিত দেবী শিলা মাতার উত্স জানাচ্ছে।
আগ্রোহার শাহ তার একমাত্র মেয়ে শিলাকে শিয়ালকোটের মন্ত্রী মেহতা শাহর সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। শিয়ালকোটের রাজা মেয়ের রূপের কথা জেনে ভিন্ন রাজ্যে পাঠিয়ে দেন মেহতাকে, নিজে শিলার সঙ্গে দেখা করে ‘তার কৌমার্য হরণের’ চেষ্টা করেন। বাধা দেয়ায় হতোদ্যম রাজা শিলার আয়াকে তার আংটি শিলার বিছানায় লুকিয়ে রাখার নির্দেশ দেন। মেহতা ফেরার পর বিছানায় আংটি দেখে শিলা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন ধরে নেন। অমনি তাকে আগ্রোহায় বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার হুকুম দেন। কয়েক বছর পর সেই আয়া মেহতার কাছে বিছানায় আংটি রাখার কথা স্বীকার করে জানায়, শিলা সবসময় বিশ্বস্ত ছিলেন। স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে ঝটপট আগ্রোহার পথে রওনা হয়ে যান মেহতা, কিন্তু পথেই মারা যান তিনি। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তার সঙ্গে চিতায় ওঠেন তিনি। ওদের সেই চিতার জায়গায় একটা মন্দির নির্মিত হয়, সেটাই শিলা মাতা শক্তি মন্দির হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ত্রূদ্ধর রাজা প্রতিশোধ নিতে প্রত্যাখ্যানকারী নারীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে আংটি ব্যবহার করছেন। ঠিকই আঁচ করেছিলেন তিনি, তার স্বামী ধরে নেবেন, রাজা হয় আংটি খুইয়েছেন বা তাকে উপহার দিয়েছেন, মানে দুদিক থেকেই তার শয্যাসঙ্গী হয়েছেন তিনি।
রানীদেরও অনেক সময় সিগনেট আংটি থাকত। বহুল প্রচারিত ও অস্বীকৃত কিংবদন্তিমতে, রানী প্রথম এলিজাবেথ এসেক্সের দ্বিতীয় আর্ল রবার্ট ডেভেরার (১৫৬৫-১৬০১) সঙ্গে প্রণয়ের সময় তাকে একটা আংটি দিয়ে বিপদে পড়লে তার কাছে আংটিটা পাঠালেই সাহায্য করবেন বলেছিলেন। অথবা (অন্য ভাষ্যে) তার বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগই তোলা হোক, ক্ষমা করে দেবেন। তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে তাকে কারাবন্দি করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। রানীর কাছে আংটি পাঠান তিনি, কিন্তু লেডি নটিংহামের আংটিটা রানীর কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা থাকলেও তাকে বাধা দেয়া হয়। (বিভিন্ন ভাষ্যে বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে)। অনেক বছর বাদে লেডি নটিংহাম মৃত্যুশয্যা থেকে রানীর কাছে খবর পাঠান এবং তাকে ঘটনা খুলে বলেন। অনুতপ্ত রানী এর অল্প দিন পরই মারা যান। কিংবদন্তি এভাবেই বলছে। একমাত্র সমসাময়িক জন ম্যানিংহামের ডায়েরিতে এলিজাবেথের সঙ্গে এসেক্সের সম্পর্কের কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি স্রেফ বলেছেন, ‘মৃত্যু পর্যন্ত এসেক্সের দেয়া আংটি পরেছিলেন রানী।’
সিগনেট আংটি পরিচয়ের সিল। হিব্রু বাইবেলে (জেনেসিস) যে সিলের সাহায্যে তামর জুদাসকে চিনতে পারছেন, সেটা একটা সিগনেট, খুব সম্ভব সিগনেট রিং; রবার্ট অল্টারের মতে, রশি আর ছড়ির সঙ্গে মিলে ‘বাহকের বৈধ বিকল্প প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে ক্রেডিট কার্ডের মতো ছিল।’ এসব খোয়ানোর মানে ছিল (জুদাস যেমন হারিয়েছেন) পরিচয় চুরি যাওয়া। সুতরাং সিগনেট রিং ভালোবাসা ও বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে আমাদের ধারণার সঙ্গে প্রায়ই মিলে যাওয়া পরিচয় গোপন এবং প্রকাশের বহু কিংবদন্তিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে আংটিকে অবশ্যই ব্যক্তিবিশেষের কাছে বিশেষ ধরনের হতে হবে। অস্কার ওয়াইল্ডের দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে (১৮৯০) একজন লোকের বিকৃতকারী পাপ একটা ছবিতে চালান হওয়ার কাহিনী। নিজে সবসময় এক রকম থেকে গেছে সে। মৃত্যুর মুহূর্তে সহসা বদলে যাওয়া ছবির মতো ভীষণ চেহারা নিচ্ছে। তখনই আবার আগের মতো হয়ে উঠছে ছবিটা। গল্পটা শেষ হয়েছে এভাবে: ‘আংটি পরখ করার আগে ওরা তাকে ঠিকমতো চিনে উঠতে পারেনি।’ বাস্তব জীবনেও পচে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া কারো লাশ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আংটিই শেষ উপায়ে পরিণত হয়।
আংটি আবার অনেক সময় যৌনশক্তিও তুলে ধরে। ষোড়শ শতকের ইতালিতে পুরুষদের সিগনেট আংটিতে প্রায়ই পাথর বসানো থাকত। পাথরগুলোয় নগ্ন নারীদের যৌন উত্তেজক ছবি খোদাই করা থাকত। মনে করা হতো, তাতে নারীদের ওপর ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। ‘ভালোবাসার ভাব প্রকাশ করা পুরুষের মুখোমুখি’ বুকের ওপর নেমে আসা চুলের নগ্ন নারীর ছবিওয়ালা আংটি মালিককে নারীকে স্পর্শ করে তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা করিয়ে নেয়ার ক্ষমতা দিত। অবশ্য ওই পাথর নারীদের হাতে পড়লে আর কোনো ক্ষমতা থাকত না।
আর্থার কোনান ডয়েলের দ্য কেস অব লেডি স্যানক্স (১৮৯৩)-এ লর্ড স্যানক্স স্ত্রীকে শাস্তি দিতে ও ব্যভিচার থেকে দূরে রাখতে প্রেমিককে (জনৈক সার্জন) দিয়ে কৌশলে তার নিচের ঠোঁট কাটিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি বলেছেন, বিষ মাখানো ছুরির ঘায়ে মৃত্যু থেকে স্ত্রীকে বাঁচাতে ঠোঁট কাটা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু সার্জন কাজটা করার পর লর্ড স্যানক্স স্বীকার করেন: ‘আসলে ওই ক্ষতটা স্রেফ আমার সিগনেট রিংয়ের ছিল।’ স্ত্রীকে নিজের সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করতেই সিগনেট রিংটা ব্যবহার করেছেন। ঠিক যেভাবে ‘ও’র প্রেমিক নির্মমভাবে চেস্টিটি বেল্ট হিসেবে আংটি ব্যবহার করেছিল। এলভিস প্রিসলির বিখ্যাত একটা গান খোলামেলাভাবে আংটির অধিকারসুলভ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে:
দুনিয়াকে জানাতে চায় যে ও আমার, তাই আমার আংটি পরেছে
চিরকাল আমার থাকবে, দুনিয়াকে জানাতেই আংটি পরেছে
দুনিয়ার সবাইকে আমার ভালোবাসা দেখাব বলে
ভালোবেসে ওটা ওকে পরিয়েছি আমি
...
আর তাই আমি গাইছি, কারণ ও আংটি পরেছে।
আঙুলের আংটি
হাতের লেখা ও আঙুলের ছাপের পাশাপাশি সিগনেট রিং হাতেরই সম্প্রসারণ। অনেক সময় আংটি আপনার আঙুলেরই অংশে পরিণত হয়, অনেক বছর ধরে একই আংটি পরে থাকেন, কখনো খোলেন না, তারপর গিঁটগুলো মোটা হয়ে যায়, একসময় বুঝতে পারেন, আংটি এঁটো হয়ে বসে গেছে, তখন আর খোলার জো থাকে না। অনেক সময় আপনার হাতে ছাপ ফেলে যায়, পরিণত হয় ক্ষতচিহ্নে।
স্বাভাবিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের চিহ্ন হিসেবে আঙুল ও আংটি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। সিম্বেলিনে পোস্টহিউমাস যেমন বলছে: ‘আমার আংটিটার নিজের আঙুলের মতো যত্ন নিই আমি, এটা এরই একটা অংশ।’ আবার দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিসে গ্রাশিয়ানোকে তার স্ত্রীর দেয়া আংটি প্রসঙ্গে পোর্শিয়া বলছে, ‘তোমার স্ত্রীর প্রথম উপহার/ তোমার শপথ নিয়ে আঙুলের সঙ্গে সেঁটে থাকা জিনিস/ তোমার শরীরে বিশ্বাস নিয়ে সেঁটে দেয়া।’ এরপর পোর্শিয়ার দেয়া আংটি হারানো প্রসঙ্গে বাসানিও বলছে, ‘আরে, আমি বরং বাম হাত কেটে ফেলব/ বলব, ওটা বাঁচাতে গিয়েই খুইয়েছি হাতটা।’ সুতরাং আইনের দিক থেকে আংটি বলতে গেলে অঙ্গের মতোই অবিচ্ছেদ্য।
আংটিকে অনেক সময় স্রেফ আঙুল নয়, বরং হূদয়েরই অংশ মনে করা হয়। বিপুলভাবে গ্রিক, রোমান ও মিসরীয়দের নামে চালু এবং ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব স্কটল্যান্ডে প্রচলিত একটা গল্প বাম হাতের চার নম্বর আঙুলকে রিং ফিঙ্গার আখ্যা দিয়ে ওটা ভালোবাসার ধমনি ভেনা আমোরিস হয়ে সরাসরি হূদয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার কথা বলছে। পঞ্চম শতকে ম্যাক্রোবিয়াস মন্তব্য করেছেন, ‘এ স্নায়ুর কারণেই সদ্য বাগদত্ত স্বামী তার স্ত্রীর এ আঙুলে আংটি পরিয়ে দেয়, যেন এটা হূদয়েরই উপস্থাপন।’ ষোড়শ শতকের ডাচ চিকিত্সক লেভিনাস লেমিনাস বলেছেন, এ আঙুলকে মেডিকাস বলা হয়; প্রাচীন কালের চিকিত্সকরা এ আঙুলেই তাদের ওষুধের সরঞ্জাম ও আরক নাড়াচাড়া করতেন, ‘কারণ কোনো বিষই এর একেবারে বাইরের অংশের সঙ্গে সেঁটে থাকতে পারবে না, বরং মানুষকে বিচলিত করে নিজেই হূিপণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’ অনামিকা প্রায়ই লোকগাথা ও সাহিত্যে ভয়ঙ্কর ভূমিকা রেখেছে। এক নারীর আংটিওয়ালা আঙুল কর্তন ও বিকৃতির গা শিউরানো গল্প বলেছেন ওয়েলশ ম্যাবিনোগিওন (১৩০০-১৪২৫)। বেশ দীর্ঘ কাহিনী হওয়ায় এখানে কেবল মূল কথাগুলোই উল্লেখ করা হলো। এলফিন রাজার কাছে নিজের স্ত্রীর সতীত্ব নিয়ে বড়াই করেছিল। এলফিনকে কারারুদ্ধ করে যুবরাজ রুনকে এলফিনের স্ত্রীর সতীত্বের পরীক্ষা নিতে পাঠালেন রাজা। এলফিনের কবি জাদুকর তেলিয়েসিন অবশ্য আগেই সাবধান করে দিয়েছিল তাকে। তখন হেঁশেলের এক আয়াকে নিজের পোশাকে সাজিয়ে নিজের সেরা আংটিগুলো পরিয়ে দেয় সে। সেগুলোর ভেতর অল্প দিন আগে এলফিনের পাঠানো সিগনেট রিংটাও ছিল। রুন আয়াকে এমনভাবে নেশাগ্রস্ত করে যে, আংটিসুদ্ধ তার আঙুল কেটে নেয়ার কথা সে টেরই পায়নি। মেয়েটিকে নিয়ে যা করার করে, এলফিনের স্ত্রীর সতীত্ব হরণের পর বিদায়ের সময় আঙুল কেটে নেয়ার প্রমাণ হিসেবে আংটিসহই আঙুলটা রাজার কাছে নিয়ে যায় যুবরাজ। রাজা এলফিনকে তলব করে কাটা আঙুল দেখিয়ে বললেন, যে ওই আঙুল কেটেছে, তার স্ত্রীর সঙ্গে বিছানায়ও গেছে সে। এলফিনের জবাব ছিল: ‘বটে, নিজের আংটির কথা তো অস্বীকার করতে পারব না, কারণ অনেকেই চেনে ওটা। কিন্তু সত্যি বলতে, জোর গলায় বলছি, আংটিটা যে আঙুলে জড়িয়ে আছে, সেটা কোনোদিনই আমার স্ত্রীর হাতে ছিল না।’ আঙুলটা তার স্ত্রীর আঙুলের তুলনায় বেশ বড়, জানাল সে। মাসখানেক নখের পরিচর্যা করা হয়নি (অথচ তার স্ত্রী রোজই সেগুলোর যত্ন নেয়), তাছাড়া ওটায় রাইয়ের ময়ান লেগে আছে, তার স্ত্রী কোনোদিনই ও কাজ করেনি। তেলিয়েসিন মনিবকে কারাগার থেকে উদ্ধার করে তার স্ত্রীর সতীত্বের পক্ষে সাক্ষী দেয় এবং কবিদের মুখ বন্ধ করে, যাতে তাদের কেউই কথা বলার সাহস করেনি।
তেলিয়েসিন কীভাবে এলফিনের স্ত্রীর ‘সতীত্ব প্রমাণ’ করল, টেক্সট সে সম্পর্কে কিছু বলেনি আমাদের। তবে সম্ভবত স্রেফ তার আয়োজিত বিছানার কৌশলের প্রমাণই দিয়ে থাকবে। মহিলার কাটা আঙুল কীভাবে তার সতীত্ব হারানো প্রমাণ করে, তাও খোলাসা হয়নি এখানে। আংটির প্রমাণকে এখানে আঙুল থেকে আলাদা করা হয়েছে, তত্ত্বগতভাবে সিগনেট রিংয়ের যেটা হওয়ার কথা, এক্ষেত্রে আঙুল ব্যক্তির পরিচয় চিহ্ন নয়, বরং শ্রেণী পরিচয়: ওই আঙুলের মালিক কাজের লোক, ভদ্রমহিলা নয়। রাজা যেন আংটিকেই বিশ্বাস করেছেন, যদিও সেটা ভুয়া— টিন রুপার চেহারা নিতে পারে, এ অর্থে নয়, প্রমাণ মনে হলেও আসলে আংটিটা তা নয়, বরং আঙুলটাই প্রমাণ। এলফিনকে অসম্মান করতে রাজা প্রথমে আংটির প্রাচীন মিথ অনুযায়ী ‘প্রমাণ’ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। ওই প্রমাণের পক্ষে যৌক্তিক কারণ মেনে নিয়েছে এলফিন: বেশকিছু লোক ওটা চেনে। কিন্তু আঙুলের অকাট্য প্রমাণ শেষে গল্পের রেওয়াজকে ভঙ্গ করেছে।
টমাস মিডলটন ও উইলিয়াম রাওলিওর লেখা সপ্তদশ শতকের নাটক দ্য চ্যাঞ্জেলিংয়েও আংটিসহ কাটা আঙুল দেখা যায়। এবং ঊনবিংশ শতকে সংকলিত অভার্গনে গ্রাম থেকে সংগৃহীত একটা গল্পেও আছে এটা। নেকড়ের থাবায় আটকে থাকা একটা আংটি এক নারীর পরিচয় প্রকাশ করে। অন্যান্য গল্পে হাত/থাবার বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়েই বেড়ালের রূপ ধরা এক ডাইনি উন্মোচিত হয়।
[বিদেশী নিবন্ধ অবলম্বনে]






