গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ভাষায় ‘বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি’ এবং নিঃসন্দেহে বিশ শতকের সবচেয়ে বেশি পঠিত ও শ্রুত কবি পাবলো নেরুদা। ১৯৭১-এর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী পাবলো নেরুদার জন্ম চিলি অঞ্চলে, ১২ জুলাই ১৯০৪; চিলির জাতীয় জীবনের কঠিন এক দুঃসময়ে ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩ সালে নেরুদা মৃত্যুবরণ করেন। এটি মৃত্যু না হত্যা— সে প্রশ্ন এখনো উত্থাপিত হয়নি।

নেরুদার কয়েকটি সাক্ষাত্কারের অংশবিশেষ ভাষান্তর করে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।

ইসলা নেগ্রাতে নিজ ভিলায় ১৯৭০ সালে রিটা গিবার্টকে দেয়া সাক্ষাত্কারের আংশিক উদ্ধৃতি—

প্রশ্ন: পাবলো নেরুদা তাঁর সমালোচকদের সম্পর্কে কী বলবেন?

নেরুদা: ওহ্, আমার সমালোচকরা! আমাকে ছিঁড়ে প্রায় টুকরো টুকরো করেছে। তারা আমাকে বিশ্লেষণ করেছে এবং দারুণ ভালোবাসা ও ঘৃণা নিয়ে ছোট ছোট করে কেটেছে। কাজের বেলায় যেমন ঘটে, জীবনের বেলাতে একজন সম্ভবত সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারে না— দুটোতেই একই কথা। চুম্বন ও ঘুষি, আলিঙ্গন ও লাথি— দুই-ই জোটে কবির জীবনে।

প্রশ্ন: আপনার কোনো একটি কাজকে যদি আগুন থেকে রক্ষা করতে হয়, আপনি কোনটি বেছে নেবেন?

নেরুদা: সম্ভবত আমার একটিকেও না। এসব দিয়ে আমার কাজটা কী? বরং আমি আগুন থেকে একটি মেয়েকে বাঁচাব... অথবা ভালো গোয়েন্দা গল্পের একটি সংকলন— যা আমার কবিতার চেয়ে অনেক বেশি বিনোদন জোগাবে।

প্রশ্ন: কোন ভাষায় শ্রেষ্ঠ অনূদিত কাজগুলো পাওয়া যাবে?

নেরুদা: আমি বলব ইতালিয়ান। কারণ এটি দুটি ভাষা— ইংলিশ ও ফ্রেঞ্চের মূল্যবোধের কাছাকাছি। আমার জানামতে, ইতালিয়ান ছাড়া আর কোনো ভাষার সঙ্গে স্প্যানিশকে মেলানো যায় না— কণ্ঠস্বরেও না, প্রতিস্থাপনেও না, বর্ণেও না, শব্দের ভারেও না। এটি অনুবাদযোগ্যতায় সমকক্ষ কিনা, সে প্রশ্ন নয়— ভাবধারায় হয়তো ঠিক থাকবে, কিন্তু শব্দের অর্থ ও অনুবাদের যথার্থতাই হয়তো কবিতাটিকে ধ্বংস করে ফেলবে। শব্দের মূল্য ঠিক রাখতে এবং ধ্বনিভাবকে প্রতিফলিত করতে সে কারণেই আমি বলি, ইতালিয়ানই সবচেয়ে কাছাকাছি। ফ্রেঞ্চ অনুবাদে মনে হয় আমার কবিতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

‘একজন কবির জীবন স্বাভাবিকভাবেই তার কবিতায় প্রতিফলিত হবে। এটাই তার ব্যবসার বিধান এবং জীবনের একটি বিধান।’— পাবলো নেরুদা

‘আমি নির্দিষ্ট কিছু শব্দ মজুদ করি... শব্দগুলো যখন আমাকে ডিঙিয়ে যেতে চায়, আমি তাদের মাঝপথে ধরে ফেলি, আমি তাদের ফাঁদে ফেলি, পরিষ্কার করি, খোসা ছাড়াই। আমি নিজেকে ভোজের সামনে বসাই, আমার কাছে তাদের স্ফটিকীকৃত অবয়ব রয়েছে, প্রাণবন্ত, সবজিস্বাদ, তৈলাক্ত ফলের মতো, শৈবালের মতো, জলপাইয়ের মতো— আমি নেড়েচেড়ে দিই, আমি ঝাঁকি দিই, তারপর আমি পান করি, এক ঢোকে গিলে ফেলি, আমি তাদের পিষে ভর্তা বানাই, আবার নতুন করে সাজাই... আমি তাদের আমার কবিতার মতো ছেড়ে যাই, পালিশ কাঠের অভ্রের মতো, কয়লার মতো, ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ থেকে তুলে আনার মতো, ঢেউয়ের ঝাপটায় উঠে আসা উপহারের মতো... শব্দের ভেতর সবকিছুই আছে।’— পাবলো নেরুদা

 

(দুই)

 

১৯৭১-এর শরতে রেডিও কানাডাতে এরিখ বকস্টেলের নেয়া পাবলো নেরুদার সাক্ষাত্কার:

এরিখ: যারা আপনার কবিতা পড়ে, তারা তাত্ক্ষণিকভাবেই শ্রমের পৃথিবীর উপস্থিতি অনুভব করে এবং তারা আপনাকে রাজনৈতিক কবি বিবেচনা করে।

নেরুদা: আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমি রাজনৈতিক কবি নই। আমি কবিতার এই শ্রেণীকরণকে অরুচিকর মনে করি, যা আমাকে কোনো ভাবাদর্শে নিবেদিত কবিতার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। লেখক হিসেবে আমার যে লক্ষ্য, যদি কোনো লক্ষ্য থেকে থাকে, তা হচ্ছে— আমি যা কিছু দেখি, স্পর্শ করি, আমি জানি, ভালোবাসি কিংবা ঘৃণা করি— সবকিছু নিয়ে লিখতে চাই। কিন্তু আমার দিকে কেবল শ্রমিকদের পৃথিবীটার অঙ্গুলি নির্দেশ করে আপনি অবচেতন ও সদয় পথে আমাকে সংঘটিত শ্রমিক সমাজের কিংবা যন্ত্রণাদগ্ধ জনতার মুখপাত্র বানিয়ে দেন। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। আমার কবিতার কেবল কোনো অংশে সমকালীন পৃথিবীর যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি করে থাকি— আর তা লাতিন আমেরিকান বিশ্বের। রাজনৈতিক কবি হিসেবে চিহ্নিত হতে আমি অস্বীকার করি।

যে কবিরা মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন না কিংবা কখনো করেননি, যারা ক্রমাগত নিস্পৃহই থেকে গেছেন, যারা জরুরি বাস্তবতা থেকে সরে গিয়ে কবিতার প্রসারের কথা বলেছেন, কবিতা নিয়ে নসিহত করেছেন, তাদেরই আমাদের যুগের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কবি হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। কারণ সভ্যতার স্বাভাবিক আন্দোলন এবং পৃথিবীর অগ্রগামিতা থেকে তাদের অনুপস্থিতির মাধ্যমে সে উন্নয়নকে আটকে দিতে অবদান রেখেছেন। তার মানে সত্যি সত্যিই যারা রাজনৈতিক কবি— তারা প্রতিক্রিয়াশীল কবি ও লেখক।

আমার বেলায় শ্রমিক ও জনতাকে নিয়ে লেখা আমার আবেগেরই ফল। এটা কারো নির্দেশিত কোনো রচনা নয়— ভাবাদর্শে নিবেদিত সাহিত্যের সঙ্গে আমার কবিতার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি লাতিন আমেরিকার সামাজিক বিন্যাস এবং পৃথিবীর অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হই— কারণ আমি সাগর, ফুল ও জীবন সম্পর্কে অবহিত। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই যেহেতু আমার দেখার বিস্তার সঞ্চরণশীল, অনেক উন্নত এবং বিশাল— যা সমস্ত মানবতাকে ধারণ করে— তা-ই আমার কবিতার প্রতিশ্রুত একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে, আমার কাজের রাজনৈতিক অংশকে যদি আলাদা করেন, তাহলে আমার সেই রাজনৈতিক বা সামাজিক কাজের পরিমাণ, তা সে কাজের এক-চতুর্থাংশ বা এক-পঞ্চমাংশও হবে না। সে কারণে আমি শ্রেণীবিন্যস্ত হতে অস্বীকার করি। তারা আমাকে শ্রেণীবিভাজনে ফেলে বিরোধী একটি শ্রেণীতে চিহ্নিত করতে চায়। একটি তৈরি শ্রেণীকরণ। আমি চাঁদের কবি, আমি ফুলের কবি, আমি ভালোবাসার কবি। তার মানে কবিতা সম্পর্কে কবিতার প্রাচীন ধারণা আমি বহন করি। আমি যা লিখেছি এবং যা লিখছি এবং যেসব কবিতা সমাজের উন্নয়ন, প্রগতি ও শান্তির ক্ষমতার প্রতি নিবেদিত, তার সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই।

প্রশ্ন: এইমাত্র বলেছেন আপনি নক্ষত্র, পুষ্প ও ভালোবাসার কবি। এর সঙ্গে কেউ কেউ যোগ করতে পারে এই নতুন মহাদেশের পাথর, বৃক্ষ, নদী ও পর্বত। আমি প্রায়ই প্রথম ইউরোপিয়ান, যিনি পৃথিবীর বর্ণনা দিতে চেয়েছেন, তার কথা ভাবি। হার্নান্দো কর্তেজ মেক্সিকো থেকে পঞ্চম চার্লসকে লিখছেন: শব্দ জানা নেই বলে তিনি যা দেখছেন, তার বর্ণনা করা কষ্টকর। ‘নতুন’ — এই পৃথিবীকে একটি নাম দেয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা?

নেরুদা: আমাকে বলতে দিন, এটা কোনো সমস্যা ছিল না, এটা ছিল আমাদের দায়িত্ব। লাতিন আমেরিকান কবির দায়িত্ব নামায়ন, তার অর্থ পৃথিবী সৃষ্টিকে সম্পূর্ণ করা। যেহেতু নাম, একটি শব্দ কোনো জ্ঞান বা মৌলিক কোনো কিছুর নাম ছাড়াই বিরাজ করছিল— আমাদের হাতে যা পেয়েছি, তা কুয়াশাচ্ছন্ন এবং রহস্যময়। আমাদের নিজ মহাদেশের এই জ্ঞান বিশেষ করে সে দুর্গের শেষ দিকে এসে কুড়ির দশকে যখন আমি তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, তরুণ কবি, যখন আমি লিখতে শুরু করি— স্বয়ং দায়িত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়।

সে সময় বিশাল চৌম্বকীয় আকর্ষণ ছিল ইউরোপীয় সংস্কৃতি, বিশেষ করে ফরাসি সংস্কৃতি। আমাদের মধ্যে লেখক ছিলেন, অত্যন্ত মেধাবী লেখক, যারা ফ্রেঞ্চ ছাড়া অন্য ভাষায় লেখেননি। একয়াডোরিয়ানরা— যারা নিজেদের অজ্ঞাতে নিজেদের মহাদেশকে তাচ্ছিল্য করেছে, তারা শুধু যে দিকই বদলে দিয়েছে তা নয়; ভাষাও বদলে দিয়েছে। তাদের নন্দনতাত্ত্বিক অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায়, যে অবস্থানটি অধিকন্তু শ্রেণীগত অবস্থান— লাতিন আমেরিকার অলিগার্ক বা গোষ্ঠীশাসন বরাবরই নিজেদের উন্নত সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছে এবং নিজেদের সর্বশেষ ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও সেখানকার আধুনিকতম মানুষের মাঝে ঝুঁকে পড়ে নিজেদের শনাক্ত করতে চেষ্টা করেছে।

একটি সময়ে লাতিন আমেরিকায় শিল্পের জন্য শিল্পের আধিপত্য ছিল। আমাদের নিজেদের যে দেশের সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে— সে প্রত্যয়ের প্রণোদনা আমি আবিষ্কার করিনি কিংবা যারা আমার সঙ্গে একই সময়ে লিখতে শুরু করেছে, তারাও নয়। আমরা এ তত্ত্বের আবিষ্কারক নই। এটা শুরু থেকেই বিরাজমান ছিল, এমনকি ‘কনকুইস্তাদোর’ বিজয়ীদের মধ্যে প্রথম কবির আবির্ভাবের সময়ও ছিল: আমাদের কাছে কবি এরসিলার উদাহরণ রয়েছেন। আমার দেশে কবিতার উদ্ভাবক একজন স্পেনিয়ার্ড, পঞ্চম চার্লসের একটি পৃষ্ঠা— যা বিজয়ীদের ঢেউয়ের সঙ্গে এখানে এসে পৌঁছেছে। আর তিনিই চিলি সম্পর্কে সবচেয়ে নাটকীয় সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক কথা লিখেছেন আদিবাসী ভারতীয়দের সম্পর্কে, যারা তিনশ বছর ধরে তাদের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। তিনি এরসিলা, যার মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের বীজ লুকোনো ছিল।

কিন্তু ১৯ শতকে আমাদের গোষ্ঠী শাসকের সমৃদ্ধি ঘটছে, ধনবাদ আমাদের মহাদেশকে শোষণ করেছে। আর এই ভয়াবহ শোষণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে একটি সম্ভ্রান্ত শ্রেণী, যাদের কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে ইউরোপের ফ্যাশনদুরস্ত শৈলী।

এর প্রভাবে যা ঘটেছে, যে প্রভাব চেতনে-অবচেতনে আমাদের সময়েও বিরাজ করত, তাতে অনেক কবি চেয়েছেন কেবল মহাবৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে এবং ইউরোপীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেকে বিশ্বসংস্কৃতিতে বিলীন করতে। কিন্তু আমরা আমাদের মহান উত্তরাধিকারীদের উদাহরণ অনুসরণ করেছি। আমরা আমাদের নিজস্ব জীবনদৃষ্টিকে মানুষের ভোগান্তির ছাঁচে গড়ে তুলেছি। আর সে জীবনদৃষ্টি গড়ে উঠেছে বিশাল ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল পরিসরে, আমাদের আমেরিকার মহান ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ এবং মহান প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর। এটা নতুন কিছু নয়। তবে আমরা এমন একটি নতুন প্রজন্মের সন্তান, যেখানে শ্রেণীদ্বন্দ্ব ক্রমাগত বর্ধিত হারে মূর্ত হচ্ছিল, আমাদের শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সংগ্রামেও বিচ্ছিন্ন কিংবা যূথবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। আর তা করতে গিয়ে গোষ্ঠী শাসনের সঙ্গে যে আবরণ আমাদের বেঁধে রেখেছিল, তা ছিঁড়ে ফেলতে হয় এবং তা অবশ্যই ইউরোপিয়ানিস্ট ধারার সঙ্গে— যে ধারাটি মৃত নয়, বরং একে রক্ষা করাও জরুরি— কারণ একই ঝুড়িতে একই পরিস্থিতির ভালো ও মন্দ ঠাঁই দেয়া সমীচীন নয়।

তার মানে আমাদের ইউরোপীয় সংস্কৃতিরও একটি মহান উত্তরাধিকার রয়েছে— আমরা তা বুঝি এবং তার প্রশংসা করি— এই উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে আমরা লেখক হিসেবে, চিন্তাবিদ হিসেবে টিকে থাকতে পারব না। ইউরোপীয় সংস্কৃতির কাছে আমাদের অনেক ঋণ। আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি তৈরি করে নিতে হবে। আমাদের মহাদেশ এবং আমাদের নিজেদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তা করতে হবে। আর এটি জটিল পথ। এটিই অধিকতর মৌলিক পথ— এ পথ কখনো অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায়। আমরা অশ্লীলতা কিংবা বাস্তবতা কোনোটা নিয়েই আতঙ্কিত নই— আমরা পৃথিবীর সব দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার সম্ভাবনাকে ধারণ করি— সেক্ষেত্রে অনস্বীকার্য যে ইউরোপীয় সংস্কৃতির কিছু আমাদের জন্য অনিবার্য।

প্রশ্ন: সেটাই কি ছিল ‘ক্যান্টো জেনারেল’-এর লক্ষ্য?

(ক্যান্টো জেনারেল পাবলো নেরুদার ১০ম কাব্যগ্রন্থ, ১৯৫০ সালে মেক্সিকোতে প্রকাশিত, তবে কবিতাগুলো ১৯৩৮ সাল থেকে লিখতে শুরু করেছিলেন। একটি হিস্পানিক আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রায় ১৫ হাজার পঙিক্তর ২৩১টি কবিতায় সমগ্র পশ্চিম গোলার্ধ— নতুন পৃথিবীর ইতিহাসের বিশ্বকোষ এ কাব্যগ্রন্থ।)

নেরুদা: ক্যান্টো জেনারেলের কোনো তত্ত্ব নেই। আমি যখন কাজ শুরু করি, দেখি বিষয়গুলো সেখানে রয়েছেই। সাধারণভাবে আমি তত্ত্ববিরোধী। ক্যান্টো জেনারেল একটি জৈবিক কাজ, তা এমন আকার ধারণ করল, যা আমি কবিতার ধ্রুপদ কাঠামোতে ফেলতে চাইলাম না। তার পরও শেষ পর্যন্ত এর একটি কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে— যদিও এটি কেবল আকস্মিক অবহিতির কোনো বিষয় নয়। বরং এটি আমার প্রতিদিনের জৈবিক জীবন— যখন আমার অবহিতি বিস্তৃত হলো, আমি একই নিষ্ঠায়, আমেরিকান মহাদেশের সব অঞ্চল ও দেশের জন্য একই রকম ভালোবাসায় একটি বই লিখতে সমর্থ হলাম। আমি বলেছি এটি বিচ্ছিন্ন কোনো পরীক্ষা বা বিশ্লেষণের কোনো ফসল নয়, যা আমাকে দিয়ে কাজটি করিয়েছে, বরং এর শুরু আমার জন্ম দিয়ে, আমি যে একজন লেখক, এর আকস্মিক অবহিতি দিয়ে। ক্যান্টো জেনারেল শেষ পর্যন্ত নিজেকে সম্প্রসারণ করে সবকিছুতে নিয়ে যায়— আমেরিকান মহাদেশের সকল প্রপঞ্চে। এতে উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের অংশও আছে। কিন্তু সাধারণভাবে বলতে পারি, এটি একজন লাতিন আমেরিকান কবির ব্যক্তিত্বের বিকাশ— যে তার মহাদেশকে চেনে এবং সেখানে পৌঁছতে চায়, যা তার অচেনা। এটি একটি অসমাপ্ত কবিতা এবং আর সব কবিও এই রচনা অব্যাহত রাখতে পারেন। এটি কোনো আবদ্ধ কাজ নয়— এটি খোলা সৃষ্টি, যেখানে সকল স্রোতধারা, সকল সৃষ্টি এবং মহাদেশের সকল সংকট পরিবাহিত হতে পারে।