পাঁচ শতকের পুরনো চিত্রকর্ম ‘সালভাতোর মুন্ডি’। ডান হাত উঁচু করে রাখা যিশুখ্রিস্টের প্রতিকৃতি। ১৫০৫ সালের দিকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা। দীর্ঘদিন রহস্যে আবৃত থাকার পর হঠাৎ প্রকাশ্যে আসে ২০০৫ সালে। আর সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে যায় পৃথিবীময়। ২০১৭ সালে নিলাম থেকে ৪৫ কোটি ডলারে চিত্রকর্মটিকে কিনে নেন সৌদি যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমান। দামটাকে বেশ চড়াই বলতে হবে। এ ঘটনার ঠিক এক বছর আগের কথা। ২০১৬ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সে গিয়ে যুবরাজ মুগ্ধ হয়েছিলেন ৪৩০ ফুট দীর্ঘ এক ইয়ট দেখে। দুটি হেলিপ্যাড ও বিলাসবহুল সব উপকরণে সজ্জিত ইয়টের নাম ‘সিরিন’। যা ঘটার তাই ঘটল, রুশ মালিকের কাছ থেকে ৫০ কোটি ডলারে সিরিনকে কিনে নিলেন যুবরাজ। আরো এক বছর পেছনে তাকানো যাক। ২০১৫ সালে ফ্রান্সে অবস্থিত চতুর্দশ লুই শ্যাতো নামে প্রাসাদটি খুব মনে ধরে যায় যুবরাজের। ফরচুন ম্যাগাজিনে যাকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রাসাদের তকমা দেয়া হয়েছে। যা হোক কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই যুবরাজ প্রাসাদটি কিনে নিলেন ৩০ কোটি ডলারে। সৌদ রাজবংশের প্রাচুর্য আর বিলাসী জীবনযাপন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেয়া যেতে পারে ওপরের তিনটি ঘটনায়। তবু মুহম্মদ বিন সালমান বলে শুধু না, সৌদি রাজবংশের সদস্যদের আভিজাত্য আর বিলাসিতা প্রবাদপ্রতীম।
১৯৩৮ সালে দাহরানে তেল আবিষ্কারের ঘটনা বদলে দেয় পুরো উপদ্বীপের নিয়তি। প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যারাবিয়ান-আমেরিকান অয়েল কোম্পানি বা আরামকো। কোম্পানিটি পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনে চলে আসে। আর রাষ্ট্র মানেই যেহেতু সৌদ রাজপরিবার, ফলে সৌদ পরিবারের অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির বিস্তার ঘটতে থাকে দেশের ভেতরে ও বাইরে। সেই প্রভাব এতটাই যে হাল সময়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম ক্লাব নিউ ক্যাসল ইউনাইটেডে করা বিনিয়োগই ৮ কোটি ডলার। পরিসংখ্যান বলছে, সৌদ রাজপরিবারের হাতে থাকা সম্পত্তির মোট পরিমাণ ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। যা ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছে থাকা সম্পদের ১৬ গুণ। অবশ্য সৌদ পরিবারে সদস্যের সংখ্যা ১৫ হাজার হলেও সম্পত্তির অধিকাংশ রয়েছে ২ হাজারের হাতে।
সাধারণত রাজপরিবারের সদস্যদের জীবন গোপনীয় রাখা হয়। সৌদ পরিবারও তার ব্যতিক্রম না। অবশ্য বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সদস্যদের বিলাসবহুল প্রাসাদ কেনার খবর গোপন থাকেনি। প্যারিসের আবাসন ব্যবসার প্রতিনিধি দানিয়া সিনো সম্প্রতি সৌদি রাজকন্যার কাছে তিন কোটি ডলারে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির কথা প্রকাশ করেছেন। বাদশাহ সালমানের সম্পত্তি কেবল লন্ডনেই কোটি ডলারের। রয়েছে ব্যক্তিগত ইয়ট। রাজপরিবারের সদস্যদের ভ্রমণের অন্যতম প্রধান গন্তব্য স্পেন ও প্যারিস। যাওয়া হয় মালদ্বীপের ব্যয়বহুল রিসোর্টগুলোতেও। একসঙ্গে তিনটি রিসোর্ট নিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে উদযাপনের খরচই প্রায় ৩ কোটির ডলার। রাজকীয় আলোচনায় প্রাসাদের প্রসঙ্গ না আনাটা অন্যায়। সৌদি আরবের প্রধান নগরী রিয়াদেই নির্মাণ করা হয়েছে ইয়ামামা প্রাসাদ। আরব নকশায় সজ্জিত প্রাসাদের ভেতরের ভাগে মহামূল্যবান কার্পেট বিছানো। ইতালিয়ান মার্ভেলে তৈরি মেঝে এবং স্বর্ণখচিত আসবাবপত্রে পূর্ণ কক্ষগুলো। অন্যদিকে আল-আওজা প্রাসাদ রিয়াদে অবস্থিত হলেও গঠনগতভাবে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। স্থানীয় আরব সংস্কৃতি ও নির্মাণশিল্প প্রাধান্য পেয়েছে এখানে। এরগা রিয়াদে অবস্থিত তৃতীয় প্রাসাদ। আভিজাত্যের দিক দিয়ে ইমামা প্রাসাদের সঙ্গেই শুধু তুলনা করা যেতে পারে এরগা প্রাসাদের। ২০১৬ সালে এই প্রাসাদেই আমেরিকার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। বাদশাহ সালমানের ছোট ছেলে খালিদ বিন সালমান। ১ কোটি ২০ লাখ ডলার দিয়ে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় ‘লা শ্যাতো দি লুমিয়েরে’ বা ‘আলোর প্রাসাদ’ ক্রয় করেন। তার আগেও অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রাসাদ কেনা হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে প্রিন্স সৌদ বিন ফয়সলের কেনা হস্টনের প্রাসাদকে আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। বর্তমান বাজারে তার মূল্য আনুমানিক ১ কোটি ৬ লাখ ডলার। রিয়াদে অবস্থিত মুরাব্বা প্রাসাদের ঐতিহাসিক তাত্পর্য অন্য মাত্রার। নজদি সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয় প্রাসাদটিকে। জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেক আন্তর্জাতিক নেতা সেখানে আপ্যায়িত হয়েছেন।
২০১৫ সালে ক্ষমতায় আসার সঙ্গে পিতা বাদশাহ সালমান ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেন। আরামকোর দায়িত্ব দেয়া হয় পুত্র মুহম্মদ বিন সালমানকে। ক্রাউন প্রিন্স মুহম্মদ বিন সালমান আরামকোর পাশাপাশি দেখাশোনা করেন দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন খাত। ২০১৭ সালে আসীন হন উপপ্রধানমন্ত্রীর পদে। পুরো সময়ে দেশে ও বিদেশে বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করার প্রতি ছিল তার মনোযোগ। তার বিলাসবহুল জীবনযাপন কয়েক বছর ধরেই বিশ্বমিডিয়ার শিরোনাম। নতুন ভবিষ্যতের ধারণা নিয়ে তিনিই উদ্যোগ নিয়েছেন তাবুক প্রদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর শহরের নিয়ম তৈরি করার। নেয়া হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে সৌদি আরবকে তেলনির্ভরতা কাটিয়ে পর্যটন ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশে পরিণত করার প্রকল্প। যুবরাজ ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন জেরেড কুশনারের নতুন কোম্পানিতে। সামরিক শক্তিতেও অন্য এক সৌদি আরব দেখতে চান। কেবল ২০১৮ সালেই সৌদি আরবের অস্ত্র আমদানির পরিমাণ ৬৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ব্যক্তিগত জেট বিমান, ইয়ট, প্রাসাদ, স্বর্ণনির্মিত আসবাবপত্র কিংবা বিখ্যাত সব শিল্পকর্ম—কী নেই তার অধিকারে!
সৌদি রাজপরিবারের প্রসঙ্গ আসলে আল-ওয়ালিদ বিন তালাল প্রসঙ্গ আসা অনিবার্য। তাকে বলা হয় আরবের ওয়ারেন বাফেট। ২০১৭ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে বিশ্বের সম্পদশালী ব্যক্তির তালিকায় সপ্তম অবস্থানে ছিলেন তিনি। তার পিতা ছিলেন ব্যবসায়ী, তিনিও উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবেই যাত্রা শুরু করেন। ২০০৭-০৮ সালের দিকে সিটি ব্যাংকের অর্ধেক শেয়ারের মালিকানা ছিল তার। বিনিয়োগ করেন বিভিন্ন নিউজ করপোরেশনে। প্রতিষ্ঠা করেন আরব বিশ্বের বৃহত্তম বিনোদন কোম্পানি রোটানা গ্রুপ। অবশ্য তার উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ। বিশ্ববিখ্যাত ফোর সিজনস হোটেল এবং মন্টে কার্লো গ্র্যান্ড হোটেলে রয়েছে শেয়ারের বড় অংশ। বিনিয়োগ করেছেন ইউরো ডিজনিতেও। যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘কলোনি ক্যাপিটাল’-এর সঙ্গে মিলে আল-ওয়ালিদ ইবনে তালালের কোম্পানি প্রায় ৩৯০ কোটি ডলারের হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসা শুরু করে। ইলোন মাস্ক টুইটার অধিগ্রহণের সময়ে সেখানেও তার বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৮০ কোটি ডলার। তার জীবনযাপন তার পকেটের মতোই চাকচিক্যময়। ইতালির তুরিনে অবস্থিত গথিক ধাঁচে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ ‘ক্যাসল অব কাস্তানেতো পো’ ক্রয় করেন ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দামে। রিয়াদে রয়েছে ৪২০ কক্ষবিশিষ্ট বিলাসবহুল প্রাসাদ। বিভিন্ন সময়ে শিকার করা প্রাণীও এই প্রাসাদে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। আকৃতির দিক থেকে বিশ্বের ৬৫তম ইয়ট তার মালিকানায়। শুধু ইয়ট না, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি বোয়িং ৭৪৭, একটি এয়ারবাস ৩২১ এবং একটি মাঝারি আকারের বাণিজ্যিক জেট রেখেছেন।
এর বাইরে সৌদ পরিবারের অন্য সদস্যদের যাপিত জীবনও মনোযোগের দাবি রাখে। ২০১৬ সালে প্রিন্সেস রিম আল-ফয়সাল ক্যালিফোর্নিয়ায় ৩৫ লাখ ডলারে প্রাসাদ কেনেন। এক সময়ের সৌদি আরবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তুর্কি বিন নাসের আস-সৌদ এবং প্রিন্সেস রিমা বিনতে বন্দর আস-সৌদের প্রাসাদও বিলাসবহুল। সৌদি আরবের সিংহভাগ অর্থনীতি তাদের দখলে। দেশটির গণমাধ্যমের ওপরও রয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণ। সৌদি রিসার্চ অ্যান্ড মিডিয়া গ্রুপের (এসআরএমজি) সঙ্গে সৌদ পরিবারের সম্পর্ক গভীর। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও ম্যাগাজিন মিলিয়ে অন্তত ৩০টি পত্রিকা রয়েছে এর অধীনে। তারা নানাভাবে সৌদ পরিবারের প্রভাব বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। বেশুমার প্রভাব আর সম্পত্তি রাজপরিবারের জীবনযাত্রাকেও বেহিসেবি করেছে। সেটাই উঠে আসে আমেরিকান টিভি প্রোগ্রামে যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমানের বক্তব্যে। বিলাসবহুল জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি স্পষ্ট স্বরেই বলেন, ‘আমি গরিব না, সম্পদশালী। আমি গান্ধী কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলাও না। আমি এমন পরিবারের সন্তান, যারা সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার আগেও কয়েকশ বছর ধরে শাসন করেছে।’
আহমেদ দীন রুমি: লেখক





