আধুনিক কালে রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠা, শাসন আবর্তিত হয়েছে কেবল একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে, এখনো তার ব্যত্যয় হয়নি। তারা সৌদ বংশ, যারা বিশ্বজুড়ে আল সৌদ বা হাউজ অব সৌদ নামে আলোচিত, অনেক বিষয়ে সমালোচিতও। এ বংশের যে প্রাচীনতম পূর্বসূরির খোঁজ পাওয়া যায় তিনি মানি ইবনে রাবিয়াহ আল-মুরায়দি। তিনি তার গোত্রকে সঙ্গে নিয়ে দিরিয়াতে বসবাস করতে শুরু করেন ১৪৪৬-৪৭ সালে। আর এ বংশের বর্তমান নামটি আসে শেখ সৌদ বিন মুহাম্মদ আল মাকরিনের নাম থেকে। তিনি ১৭২৫ সালে মারা যান।

প্রথম সৌদি স্টেট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭২৭ সালে। এটি আমিরাত অব দিরিয়া নামেও পরিচিত। এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ বিন সৌদ আল মাকরিন (১৭২৭-১৭৬৫)। ১৭৪৪ সালে দিরিয়ার আমির মোহাম্মদ বিন সৌদ ও ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাব ঐক্য গড়ে তোলেন। এ ঐক্যের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার এবং এর ভিত্তিতে আরব উপদ্বীপের রাজ্যগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা।

সৌদি রাষ্ট্র এ পর্বে ভূখণ্ড জয় ও ধর্মীয় উদ্দীপনা দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ রাষ্ট্রের তার চূড়ান্ত বিকাশের কালে আধুনিক সৌদি আরবের বেশির ভাগ এলাকা তার দখলে নিয়ে আসে। আল সৌদ এবং তার মিত্রদের আধিপত্য ইয়েমেন, ওমান, সিরিয়া ও ইরাকে পৌঁছে যায়। এ সময়ে এ সৌদি রাষ্ট্রের কাঠামো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাব ও তার বংশধররা। এ সময় সৌদি রাষ্ট্রের বাসিন্দারা নিজেদের নতুন ও বিশেষ একটি পরিচয়ে অন্যদের চেয়ে আলাদ করে তোলে। তারা নিজেদের বলতেন মুওয়াহিদুন বা আহল আল তাওহীদ। পরবর্তী সময়ে তারা ওয়াহাবি পরিচয়ে চিহ্নিত হন। সবারই জানা এই ওয়াহাবি দর্শন, চিন্তা আজকের দুনিয়ায়ও মুসলিম জাহানে অত্যন্ত প্রভাবশালী।

সৌদ বংশ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এ রাষ্ট্রে শাসনক্ষমতা বংশানুক্রমে হাতবদলের রীতি চালু হয়ে যায় শুরু থেকেই। প্রথম শাসক মোহাম্মদ বিন সৌদের মৃত্যুর পর ১৭৬৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তার পুত্র আবদুলআজিজ। ১৮০২ সালে আবদুলআজিজ প্রায় ১০ হাজার সেনা নিয়ে শিয়াদের পবিত্র শহর কারাবালায় হামলা করেন। এ হামলার ঘটনা অটোমান ও মিসরীয় শাসকদের অস্থিরতায় ফেলে দেয়। তারা নতুন শক্তির উত্থান ও শঙ্কা দেখতে পান। মরুর বুকে রাজনীতি ও সামরিক লড়াই নতুন রূপ নেয়। পরবর্তী আঘাতটি সইতে হয় সৌদ বংশকে। আবদুলআজিজ ১৮০৩ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন। হাতেনাতে প্রমাণ না থাকলেও এটা ধরে নেয়া হয় বা যায় যে কারবালা আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে কোনো শিয়া এ ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন। এরপর ক্ষমতায় বসেন তার পুত্র সৌদ বিন আবদুলআজিজ আল সৌদ (১৭৪৮-১৮১৪)। এ সময় সৌদি রাষ্ট্র সর্বোচ্চ ভৌগোলিক বিস্তৃতিতে পৌঁছায়। ১৮১৪ সালে তার মৃত্যুর পর পুত্র আবদুল্লাহ ইবন সৌদ ক্ষমতায় বসেন। তাকে অটোমান ও মিসরীয়দের মিলিত আক্রমণ মোকাবেলা করতে হয়। অবশেষে সৌদি রাজধানী দিরিয়ার পতন হয় ১৮১৮ সালে। অটোমানরা আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করে এবং কনস্ট্যান্টিনোপলে তার শিরশ্ছেদ করা হয়। এভাবে সমাপ্ত হয় প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের অভিযান। মিসরীয়রা সৌদ বংশের অনেক সদস্যকে গ্রেফতার করে এবং রাজধানী দিরিয়াকে ধ্বংস করে দেয়।

দিরিয়ার পতনের কয়েক বছর পর সৌদিরা পুনরায় নিজেদের সংগঠিত করেন। এবার তারা নজদে তাদের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং নজদ আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাসে এ পর্ব দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্র নামে পরিচিত, রাজধানী হয় রিয়াদ। এ পর্বে ভৌগোলিক বিস্তার আর প্রথম পর্বের মতো হয়নি। ধর্মীয় সংস্কারের বিষয়টিও ঝিমিয়ে পড়েছিল। এ সময় সৌদ পরিবারে ভ্রাতৃঘাতী ও উপদলীয় সংঘাত শুরু হয়। বেশির ভাগ সময়ই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়নি। ১৮৯১ সালে সৌদি রাষ্ট্রের এ দ্বিতীয় পর্বের ইতি ঘটে।

১৯০২ সালে সৌদ বংশের সন্তান আবদুলআজিজ রিয়াদে সৌদি শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা করেন। অল্প কিছু অনুসারী ও ভাইদের নিয়ে তিনি রিয়াদের মাসমাক দুর্গ দখল করেন এবং স্থানীয় গভর্নরকে হত্যা করা হয়। আবদুলআজিজের বয়স তখন সবে ২০ ছুঁয়েছে। তিনি রিয়াদের শাসক ঘোষিত হলেন। আধুনিক সময়ে যে সৌদি আরব রাষ্ট্র তা এ তরুণ সৌদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হলো। পশ্চিমা দুনিয়ায় তার পরিচিতি ইবনে সৌদ নামে আর আরব দুনিয়ায় তিনি এখনো আবদুলআজিজ। পরবর্তী তিন দশকে তিনি আরবের বুকে সৌদ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আল রশিদ গোষ্ঠী ও অটোমানরা। অটোমান ও আল রশিদদের মোকাবেলা করতে আবদুলআজিজ ব্রিটিশদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এ সময় ব্রিটিশরা তার শাসনাধীন অঞ্চলের অখণ্ডতা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিল। অবশেষে ১৯২১ সালে আল রশিদিদের পরাজয় নিশ্চিত হয়। ১৯৩২ নাগাদ সব শত্রুদের হটিয়ে দিয়ে আরব উপদ্বীপের বেশির ভাগ অঞ্চলে সৌদ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বছরই তিনি তার রাজ্যগুলোকে কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়ার পতাকাতলে সমবেত করেন। আবদুলআজিজ মারা যান ১৯৫৩ সালে। ততদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সৌদি আরবের মিত্রতা তৈরি হয়েছে। তাকেই আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা দেয়া হয়।

তৃতীয় সৌদি রাষ্ট্রই আধুনিক কিংডম অব সৌদি আরব। সৌদ বংশের হাতেই এর শাসনভার। জ্বালানি তেল নামের এক জাদুকরী অস্ত্র আছে তাদের হাতে। এর জোরে ও অর্থে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বরাজনীতিতে সৌদি পরিবারের তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, ইসলামের মূলে ফিরে যাওয়ার আন্দোলনে তাদের পূর্বসূরিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল, যা ভারতীয় উপমহাদেশের উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের অনেক কিংবদন্তি মুসলিম ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু আধুনিক কালে তাদের কর্মকাণ্ড, শাসনপদ্ধতি নিয়ে নানা রকম সমালোচনা আছে খোদ ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যেই। আছে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের দাগ।

সৌদি আরবের ইতিহাস যেন সৌদ পরিবারের ইতিহাস হয়ে ওঠে সেজন্য এক পরিকল্পিত কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে অনেক বছর ধরেই। ২০১০ সালের শেষদিকে মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদের প্রান্তসীমায় থাকা একটি অটোমান স্থাপত্য বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। আপাত উদ্দেশ্য মসজিদের সম্প্রসারণ। ভাঙা স্থাপনাটির স্থান পরিষ্কারের সময় শ্রমিকরা বিভিন্ন দলিলপত্রসহ ১২টি ধাতব বাক্স উদ্ধার করে। এ শ্রমিকরা পুরনো মূল্যবান কিছু মনে করে এ দলিলাদি নিজেরা সরিয়ে ফেলে এবং কয়েকদিন পর সেগুলোর স্থান হয় জেদ্দার পুরনো জিনিসের বাজারে। স্থানীয় এক সংগ্রাহক আবার সেগুলো কিনে নেন। আর কিছু চলে যায় কায়রোর এক বণিকের হাতে। তিনি কিছুদিন পর তার সংগ্রহের দলিলপত্র সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত আর্কাইভে বিক্রির জন্য রিয়াদে আসেন। সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে বেশির ভাগ দলিল কিনে নেয় কিং আবদুলআজিজ ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড আর্কাইভ। প্রতিষ্ঠানটি দারাহ নামে সুপরিচিত। এছাড়া কিং ফয়সল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজও অনেক ডকুমেন্ট কিনে নেয়। কিছু দলিলের ঠিকানা হয় কিং ফাহাদ ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। বেশির ভাগ দলিল ছিল মিসর থেকে মক্কায় হজযাত্রীদের সংক্রান্ত। তবে এর মধ্যে কিছু দলিল ছিল রীতিমতো বিস্ফোরক, অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান। সেগুলো ছিল মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবসংক্রান্ত। তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতকে ইসলামী দুনিয়ায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। অষ্টাদশ শতকে যখন সৌদ বংশের হাতে প্রথম সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তাদের সঙ্গে আবদুল ওয়াহাবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং সে সময় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিসরে আবদুল ওয়াহাব অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। সৌদি রাষ্ট্র গঠনে ওয়াহাবি মতাদর্শের ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য। আধুনিক সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ঘোষণা, পাঠ্যক্রম ও রাষ্ট্র অনুমোদিত ইতিহাসে এ স্বীকৃতি দেয়া আছে। কিন্তু তার পরও এবার এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। আবদুল ওয়াহাবকে নিয়ে পাওয়া নতুন এসব দলিলপত্রকে অনেকটা নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো। দারাহ একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে রেয়ার ম্যানুস্ক্রিপ্ট এক্সিবিশন অন সৌদি অ্যারাবিয়া শিরোনামে। কিউরেটররা নতুন জোগাড় করা দলিল থেকে অনেক কিছু প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলেন কিন্তু কোনো এক আশ্চর্য কারণে আবদুল ওয়াহাব সম্পর্কিত সব দলিল প্রদর্শনীর তালিকায় রাখা হলো না। বিষয়টি নিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে বললেন, এ তো নতুন কিছু নয়, সৌদি সরকারের পুরনো কৌশল। আঠারো শতকে সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আবদুল ওয়াহাবের ভূমিকাকে আড়াল করতে এবং শুধু সৌদ বংশকেই একক কৃতিত্ব দিতে এ-সংক্রান্ত সব দলিলাদিকে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয় না। বলা হয়, শাসক সৌদ পরিবারের পক্ষে ইতিহাস লিখতেই দারাহ এমন ভূমিকা পালন করে। ওয়াহাবের অনুসারীরা বেশ হাঙ্গামা বাধানোর চেষ্টা করেছিলেন প্রদর্শনীতে। এরপর নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে তা থামানো হয়।

বিভিন্ন সময়ে সৌদি আরবে প্রাচীন বাজার, কফি হাউজ, অটোমান আমলের দুর্গ, শিয়া ও সুফি দরগা, বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার একটি রাজনীতি আছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এর মাধ্যমে সৌদি আরবের অতীত চিহ্নগুলো মুছে ফেলা হয়েছে, যার মাধ্যমে ইতিহাস শুধু সৌদ পরিবারের ফ্যামিলি ট্রির বিবরণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

 

এস এম রশিদ: লেখক