সাহিত্যই রাশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে রূপ দিয়েছিল, যার ভেতর বেড়ে উঠেছেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। জারের আমলে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক রচনা প্রকাশ করা কঠিন ছিল। অসতর্ক নিবন্ধকারদের ‘সেরে’ ওঠা অবধি, অন্য কথায় তারা প্রকাশ্যে তাদের মত প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বিভিন্ন আশ্রমে আটকে রাখা হতো। এদিকে উপন্যাস ও কবিতাকে একটু বেশি শিথিলতার সঙ্গে দেখা হতো— যদিও সব ক্ষেত্রে নয়।

প্রধান সেন্সর ছিলেন অবশ্যই জার স্বয়ং। ‘জনতার পিতা’ পুশকিনের বেলায় প্রথম নিকোলাস ছাপাখানায় যাওয়ার আগে তাঁর বহু রচনা পড়ার ওপর জোর দিয়েছেন। পরিণামে কিছু নিষিদ্ধ হয়েছে, অন্যগুলোও বিলম্বিত হয়েছে এবং অতিরিক্ত ক্ষতিকরগুলো তাঁর বাড়িঘরে হামলা চালানো হতে পারে ভেবে স্বয়ং শঙ্কিত কবির হাতেই ধ্বংস হয়ে গেছে। ইউজিন ওনিজেন-এর পুড়িয়ে ফেলা পঙিক্তগুলোয় কী ছিল কোনোদিনই জানতে পারব না আমরা।

তা সত্ত্বেও, অন্যান্য উপায়ে এবং বৈচিত্র্যময় ভিন্ন ভিন্ন খতিয়ানে রাজনীতি রাশিয়ান ফিকশনে ছড়িয়ে আছে, অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশে যার তুলনা নেই। রাজনীতিকৃত সাহিত্য ও সাহিত্য সমালোচনা যত দূর সম্পর্কিত, পছন্দের ক্ষেত্রে রাশিয়ান বুদ্ধিজীবীসমাজ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। শক্তিশালী সমালোচক ভিসারিওন বেলিন্সকি এবং নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক নিকোলাই গোগলের মধ্যকার তিক্ত বিবাদ উপভোগ করেছেন তারা। ১৮৪২ সালে গোগোল রচিত প্রহসন ডেড সৌলস দেশকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল; নিরক্ষরদের সামনে সেটা জোরে পাঠ করা হতো।

অবশ্য, সাফল্যই গোগোলের পক্ষে পতনের কারণ প্রমাণিত হয়েছিল। পরবর্তী এক রচনায় পুঁতিগন্ধময় কৃষকদের নিয়ে লেখার এবং নিরক্ষতার পক্ষাবলম্বনের বিষয়টি প্রত্যাহার করে নেন তিনি। ডেড সৌলস-এর দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখেন: ‘এই বইটির বেশির ভাগ অংশই ভুলক্রমে লেখা, রাশিয়ার মাটিতে ঘটা প্রকৃত ঘটনাবলি নয়। প্রিয় পাঠক, আমি আপনাদের আমাকে শুধরে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাব। এই বিষয়টি অসন্তোষের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করবেন না। আমি আপনাকে কাজটা করতে বলছি।’

ক্ষিপ্ত বেলিন্সকি ১৮৪৭ সালে প্রকাশ্যে তার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন। বেলিন্সকির বহুল প্রচারিত ‘গোগোলের উদ্দেশে চিঠি’ গ্রাহককে একটা দীর্ঘ নিদ্রাহীন রাত জুগিয়েছিল:

 

রাশিয়ান জনগণকে খানিকটা জানি আমি। আপনার বইটি আমাকে সরকার ও সেন্সরশিপের ওপর, তবে জনগণের ওপর নয়, এর অশুভ প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনায় সজাগ করে দিয়েছে। সেন্ট পিটার্সবার্গে যখন সরকার কয়েক হাজার কপি অত্যন্ত কম দামে বিক্রির জন্য আপনার বই প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করার গুজব রটেছিল, [করেসপেন্ডন্স উইদ ফ্রেন্ডস], আমার বন্ধুরা আঘাত পেয়েছিল; কিন্তু আমি তাদের সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম যত যা-ই হোক, এই বইটা মোটেই সফল হবে না এবং শিগগিরই ভুলে যাওয়া হবে। সত্যি বলতে, এখন খোদ বইটির বদলে বরং এটা সম্পর্কে যেসব লেখা রচিত হয়েছিল, তার কারণেই একে মনে রাখা হচ্ছে। হ্যাঁ, অবিকশিত হলেও সত্যের প্রতি রাশিয়ানদের এখনো গভীর প্রবণতা রয়েছে।

&dquote;&dquote;

 

পরবর্তী বছরগুলোয় সমালোচকরা যেসব ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারের রচনা অপর্যাপ্তভাবে ক্ষমতায়নকারী বলে মনে হয়েছে, তাদের আঘাত হেনে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন।

তো এটাই ছিল লেনিনের বেড়ে ওঠার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ। তাঁর সুসংস্কৃত রক্ষণশীল বাবা এলাকার ইন্সপেক্টর অব স্কুল এবং শিক্ষানুরাগী হিসেবে সম্মানিত ছিলেন। বাড়িতে রোববার বিকালে অন্যদের পাশাপাশি শেক্সপিয়ার, গ্যোটে ও পুশকিন জোরে জোরে পাঠ করা হতো। উলিয়ানভ পরিবারের পক্ষে— জারপন্থী গোপন পুলিশের চোখকে ফাঁকি দেয়ার জন্য একটা ছদ্মনাম ছিল ‘লেনিন’— উঁচু স্তরের সংস্কৃতি থেকে পালিয়ে থাকার উপায় ছিল না।

হাইস্কুলে থাকতেই লাতিনের অনুরক্ত হয়ে পড়েন লেনিন। তাঁর প্রধান শিক্ষকের বড় আশা ছিল যে হয়তো তিনি একজন ভাষাবিদ এবং লাতিন ভাষার পণ্ডিতে পরিণত হবেন। ইতিহাসের ইচ্ছা ছিল ভিন্ন কিন্তু লাতিন ভাষার প্রতি লেনিনের আবেগ ও ক্লাসিক পড়ার স্বাদ কখনই তাঁকে ছেড়ে যায়নি। মূল রূপেই ভার্জিল, ওভিদ, হোরেন ও জুভেনাল পড়েছেন তিনি, সেই সঙ্গে রোমান উত্তেজনাকর বক্তৃতামালাও। নির্বাসনে থাকার দুটি বছর গোগ্রাসে গ্যোটে গিলেছেন।  ফাউস্ট পড়েছেন অসংখ্যবার।

১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় ক্লাসিক বিদ্যার সদ্ব্যবহার করেছেন লেনিন। ওই বছর এপ্রিলে রাশিয়ান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক অর্থোডক্সির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে কয়েকটি বিপ্লবী অভিসন্দর্ভে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ঘনিষ্ঠ কমরেডদের কয়েকজন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। এক তীক্ষ পাল্টা আক্রমণে গ্যোটের সেরা রচনা থেকে উদ্ধৃতি দেন লেনিন: ‘বন্ধুরা আমার, তত্ত্ব ধূসর, কিন্তু জীবনের চিরন্তন গাছটা সবুজ।’

অন্য যে কারও চেয়ে ভালো করে লেনিন জানতেন যে, ধ্রুপদী রাশিয়ান সাহিত্য রাজনীতিতে আসক্ত। এমনকি সবচেয়ে ‘অরাজনৈতিক’ লেখকরাও দেশের অবস্থা সম্পর্কে তাদের অসন্তোষ আড়াল করতে গিয়ে মুশকিলে পড়ে যেতেন। ইভান গনচারোভের উপন্যাস ওবলোমভ একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। এই রচনাটি লেনিন পছন্দ করতেন। ভূস্বামীদের জড়তা, শ্রমবিমুখতা এবং অন্তঃসারশূন্যতাকেই তুলে ধরেছে এটা। রাশিয়ান বুলিতে একটি নতুন শব্দের আবির্ভাবের ভেতর দিয়েই এই উপন্যাসটির সাফল্য উদযাপিত হয়েছে: ওবলোমভবাদ, দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরাচারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্যকারী শ্রেণীকে গালমন্দ করার বুলিতে পরিণত হয় এটা। পরে লেনিন মতপ্রকাশ করবেন যে, কেবল উচ্চশ্রেণীর ভেতরই এই রোগটা সীমিত ছিল না, বরং জারিয় আমলাতন্ত্রের একটা বিরাট অংশকে প্রভাবিত করে নিচের দিকে নেমে এসেছে। এমনকি বলশেভিক হর্তাকর্তারাও এ থেকে মুক্ত ছিলেন না। এটা গনচারোভের ধরে রাখা আয়নায় বৃহত্তর সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠার মতো একটি ব্যাপার। লেনিন তাঁর যুক্তিতে প্রায়ই প্রতিপক্ষকে বলতে গেলে সবসময়ই অপ্রীতিকর ও কখনো কখনো রাশিয়ান কাহিনীর ছোটখাটো চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করে আক্রমণ হানতেন।

দেশের লেখকরা ভিন্নমত পোষণ করে থাকলে (অবশ্যই এক্ষেত্রে একা ছিলেন না তারা) সেটা ছিল শাসকগোষ্ঠীকে উত্খাত করার কৌশলের ক্ষেত্রে। ১৮২৫ সালের প্রথম নিকোলাসের উত্তরাধিকারকে চ্যালেঞ্জ করা ডেসিম্বরিস্ট বিদ্রোহের পক্ষে ছিলেন পুশকিন। দ্রুত লুপ্ত হওয়ার আগে সামন্তবাদ নিয়ে প্রহসন করেছেন গোগল। জারবাদের সমালোচনামুখর ছিলেন তুর্গেনিভ, কিন্তু সন্ত্রাসের পক্ষে কথা বলা নিহিলিস্টদের প্রবলভাবে অপছন্দ করতেন। অ্যানার্কো-টেররিজমের সঙ্গে দস্তয়েভস্কির প্রণয় সেন্ট পিটার্সবার্গে এক ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের পর সংযত বিরোধিতায় পরিণত হয়। রাশিয়ান চরমবাদের বিরুদ্ধে তলস্তয়ের আক্রমণ লেনিনকে আনন্দিত করেছিল, কিন্তু কাউন্টের অতীন্দ্রিয়বাদী ক্রিশ্চানিটি ও শান্তিবাদ তাঁকে হতাশ করে। কীভাবে, প্রশ্ন করেছেন লেনিন, এমন একজন প্রতিভাবান লেখক একাধারে বিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারেন? আধডজন নিবন্ধের ভেতর দিয়ে লেনিন তলস্তয়ের রচনায় বর্তমান গভীর স্ববিরোধিতা তুলে ধরেছেন। লেনিনের তলস্তয় একটি সাবলীল রোগনির্ণয়ের ব্যবস্থা করতে সক্ষম— কৃষকসমাজের অর্থনৈতিক শোষণ ও সম্মিলিত ক্রোধ শনাক্ত ও প্রকাশ করেছে তাঁর উপন্যাসগুলো— কিন্তু নিরাময়ের কোনো সূত্র জোগায়নি। একটি সত্যিকারের বিপ্লবী ভবিষ্যৎ কল্পনার বদলে তলস্তয় একটি সহজতর, ক্রিশ্চান অতীতের ইউটোপীয় ইমেজে সান্ত্বনা খুঁজেছেন। ‘লিও তলস্তয় অ্যাজ দ্য মিরর অভ দ্য রাশিয়ান রেভ্যুলুশন’-এ লেনিন লিখেছেন, ‘তলস্তয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতবাদে স্ববিরোধিতা দুর্ঘটনাবশত নয়: এসব ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয়ার্ধে রাশিয়ান জীবনযাত্রার পরস্পরবিরোধী অবস্থা প্রকাশ করেছে।’ এভাবে তলস্তয়ের স্ববিরোধিতাগুলো লেনিনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উপকারী নির্দেশনার কাজ দিয়েছে।

এদিকে, দস্তয়েভস্কির ‘কষ্টের প্রথা’য় বিতৃষ্ণ হয়েছেন লেনিন, যদিও তাঁর লেখার ক্ষমতা ছিল অনস্বীকার্য। অবশ্য, সাহিত্য-সম্পর্কিত লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়নি। বিপ্লবের বছর খানেকের ভেতর, ২ আগস্ট, ১৯১৮, ইযভেস্তিয়া পত্রিকা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের লক্ষ্যে পাঠক মনোনীত ব্যক্তির একটি তালিকা প্রকাশ করে। তলস্তয়ের পর দ্বিতীয় ছিলেন দস্তয়েভস্কি। সে বছর নভেম্বরে প্রতীকীবাদী কবি ভিয়াচেসলভ ইভানভের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে মস্কো সোভিয়েতের প্রতিনিধি কর্তৃক মস্কোয় সৌধের উদ্বোধন করা হয়।

লেনিনের ওপর সত্যি বলতে র্যাডিকেল ও বিপ্লবীদের একটা গোটা প্রজন্মের ওপর সম্ভবত যে মানুষটির সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল, তিনি নিকোলাই চেরনিশেভস্কি। যাজকের ছেলে এবং সেই সঙ্গে বস্তুবাদী দার্শনিক ও সমাজতন্ত্রী ছিলেন চেরনিশেভস্কি। তাঁর ইউটোপীয় উপন্যাস হোয়াট ইজ টু বি ডান? সেন্ট পিটার্সবার্গের পিটার অ্যান্ড পল দুর্গে লেখা হয়েছিল, রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তাঁকে আটক রাখা হয়েছিল সেখানে। হোয়াট ইজ টু বি ডান? একটি নতুন প্রজন্মের বাইবেলে পরিণত হয়। কারাগার থেকে চালান হয়ে বাইরে আসার কারণে বাড়তি আভা পেয়েছিল এটি। মার্ক্সের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের বহু আগে (যার সঙ্গে চেরনিশেভস্কি চিঠিপত্র বিনিময় করেছিলেন) এই বইটিই লেনিনকে রেডিক্যালে পরিণত করে । প্রবীণ রেডিক্যাল পপুলিস্টের প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে লেনিন তাঁর ১৯০২ সালে রচিত ও প্রকাশিত প্রথম প্রধান রাজনৈতিক রচনার নাম রাখেন হোয়াট ইজ টুবি ডান?

চেরনিশেভস্কির উপন্যাসটির বিশাল সাফল্য প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিকদের, বিশেষ করে তুর্গেনিভকে, দারুণ কূপিত করে; বইটিকে ভীষণভাবে আক্রমণ করেন তিনি। রেডিক্যাল সমালোচক দব্রোলিউভব (ছাত্রদের কাছে ‘আমাদের দিদোরো’ হিসেবে শ্রদ্ধেয়) এবং পিসারেভের তরফ থেকে অগ্নিময় সমালোচনার কশাঘাতে পাল্টা জবাব দেয়া হয়। যারপরনাই ক্রুদ্ধ ছিলেন তুর্গেনিভ। একটি সরকারি অনুষ্ঠানে চেরনিশেভস্কির মোকাবেলা করে তিনি চিত্কার করে বলেছিলেন, ‘তুমি একটা সাপ আর দব্রোলিউভব একটা র্যাটল স্নেক।’

কি ছিল উপন্যাসের বিষয়বস্তু, যাকে নিয়ে এত বিতর্ক? ৫০ বছর ধরে সবগুলো পৃষ্ঠা পড়ার তিনবার প্রয়াস পেয়েছি আমি এবং সবগুলো প্রয়াসই ব্যর্থ হয়েছে। এটা কোনো ধ্রুপদী রাশিয়ান সাহিত্য নয়। এটা সেই সময়ের এবং রাশিয়ান বুদ্ধিজীবী সমাজের সন্ত্রাস-পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সন্দেহাতীতভাবে সবদিক থেকেই, বিশেষত লৈঙ্গিক সমতা এবং নারী ও পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে, কিন্তু সেই সঙ্গে কীভাবে সংগ্রাম করতে হবে, কীভাবে শত্রুকে চিহ্নিত করতে হবে এবং কীভাবে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে, সেসব ব্যাপারেও অত্যন্ত রেডিক্যাল এটা।

ভ্লাদিমির নবোকভ চেরনিশেভস্কিকে ঘৃণা করতেন, কিন্তু তাঁকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব আবিষ্কার করেছেন। তাঁর শেষ রাশিয়ান উপন্যাস দ্য গিফট-এ ৫০টি পৃষ্ঠা এই লেখক ও তার বলয়কে খাটো করার পেছনে খরচ করেছেন, কিন্তু স্বীকার করে নিয়েছেন যে সমসাময়িক সম্ভ্রান্ত ঘরে জন্ম নেয়া লেখকদের ভেতর প্রাকৃতজন চেরনিশেভস্কির প্রতি এক ধরনের শ্রেণী শ্লাঘা থাকার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই এবং একান্ত বৃত্তে ‘তলস্তয় এবং তুর্গেনিভ তাঁকে “ছারপোকার গন্ধঅলা ভদ্রলোক” বলতেন... এবং সব রকমেই পরিহাস করেছেন।’

তাদের পরিহাস অংশত ঈর্ষা থেকে জন্ম নিয়েছিল, কেননা তাদের অবজ্ঞার বিষয়বস্তু তরুণদের মাঝে যারপরনাই জনপ্রিয় ছিলেন এবং তুর্গেনিভের বেলায় ভূসম্পত্তি ধ্বংস করে কৃষকদের মাঝে জমিজিরাত বণ্টন করে দেয়ার লক্ষ্যে বিপ্লব প্রত্যাশী এক লেখকের প্রতি এক গভীর ও সহজাত রাজনৈতিক বৈরিতা থেকেও জন্ম নিয়েছিল।

১৯০৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত বিপ্লব মধ্যবর্তী সময়ে নির্বাসনে থাকতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসা তরুণ বলশেভিকরা চেরনিশেভস্কির বইটি অপাঠ্য বললে তাদের ওপর ক্ষেপে উঠতেন লেনিন। এই বইটির গভীরতা ও দর্শন বোঝার পক্ষে এখনো বড্ড ছোট তারা, পাল্টা জবাব দিতেন তিনি। ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাদের। তার পর বুঝতে পারবে যে চেরনিশেভস্কির দর্শন সাধারণ বাস্তবতাভিত্তিক: আদম এবং ইভ নয়, আমরা এসেছি এপ থেকে; জীবন স্বল্পায়ুর জৈবিক প্রক্রিয়া হওয়ায় প্রতিটি সত্তার জন্য সুখ বয়ে আনার দরকার রয়েছে। লোভ, ঘৃণা, যুদ্ধ, অহমবাদ এবং শ্রেণীবিভক্ত একটি বিশ্বে সেটি সম্ভবপর নয়। সে কারণেই সামাজিক বিপ্লব দরকার। বলশেভিক তরুণরা লেনিনের সঙ্গে সুইস পর্বতমালায় আরোহণ করার সময় নাগাদ অবশ্য ৪০ বছরের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল, বিপ্লব এরই মধ্যে সমাপ্ত হয়ে গেছে। লেনিনের চিন্তাধারার বিবর্তন গবেষণাকারী ইতিহাসবিদরা ব্যাপকভাবে চেরনিশেভস্কি পড়া শুরু করবেন। বিজ্ঞ দলীয় প্রগতিশীলরা সানন্দে মায়কোভস্কির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। লেনিন নন।

লেনিনের গভীরে প্রোথিত ধ্রুপদীবাদ বিপ্লবের আগে ও বিপ্লবকালে শিল্পকলা ও সাহিত্যের উত্তেজনাকর নতুন নতুন পরিবর্তনের কাছ থেকে রুদ্ধ করে রাখা বুরুজের ভূমিকা রেখেছে। রাশিয়া কিংবা অন্যত্র আধুনিকতাবাদকে স্থান করে দেয়া কঠিন আবিষ্কার করেছেন। শৈল্পিক আভান্ত-গার্দ কাজগুলো— মায়কোভস্কি ও নির্মাণবাদীরা— তাঁর রুচির বোধ মাফিক ছিলেন না।

কবি এবং শিল্পীরা তার কাছে পুশকিন ও লার্মোন্তোভকে ভালোবাসলেও বিপ্লবী, প্রাচীন শিল্প কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করে বেশি করে বলশেভিকবাদ ও বিপ্লবের সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নতুন কিছু তৈরি করার কথা বলতেন অযথাই। তিনি মোটেই টলেননি। যা ইচ্ছা লিখতে ও আঁকতে পারেন তারা, কিন্তু তাঁকে কেন সেসব তারিফ করতে জোর করা? লেনিনের বহু সহকর্মী নতুন আন্দোলনসমূহের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন। বুখারিন, লুনাচার্শস্কি, ক্রুপস্কায়া, কোলোন্তাই এবং একটা মাত্রা পর্যন্ত ট্রটস্কি বুঝতে পেরেছিলেন যে বিপ্লবী স্ফুলিঙ্গ কীভাবে নতুন নতুন দৃশ্যপট খুলে দিয়েছে। আভান্তে-গার্দের ভেতরই বিরোধ, সংশয় এবং স্ববিরোধিতা ছিল এবং সরকারের ভেতর তাদের সমর্থকরা ছিলেন পিপল’স কমিসারিয়াত ফর এডুকেশনের আনাতোলি লুনাচার্শস্কি, যেখানে লেনিনের স্ত্রী নাদিয়া ক্রুপসকায়াও কাজ করতেন। গৃহযুদ্ধের সময় কাগজের অভাব তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তারা প্রপাগান্ডা চিঠি প্রকাশ করবেন নাকি মায়কোভস্কির নতুন কবিতা? প্রথমটির দিকে জোর দিয়েছিলেন লেনিন। লুনাচার্শস্কি বিশ্বাস করতেন যে মায়কোভস্কির কবিতাই বেশি কার্যকর হবে এবং এখানে তিনিই জয়ী হয়েছিলেন।

লেনিন আবার ‘প্রলেতারিয়ান সাহিত্য ও শিল্পকলা’র যেকোনো ধারণার প্রতিই বৈরী ছিলেন, তিনি জোর দিয়েছিলেন যে সংস্কৃতির স্তর সবচেয়ে বিস্তৃত অর্থে অত্যন্ত নিচু এমন একটা দেশে বুর্জোয়া সংস্কৃতির (এবং এর আরো প্রাচীন পূর্বসূরিদের) চূড়া যান্ত্রিক ও মৃত সূত্রে বদলানো যাবে না। এখানে সংক্ষিপ্ত উপায় কোনোদিনই কাজ করবে না, লেনিনের মৃত্যুর পরবর্তী বাজে বছরগুলোয় সূচিত অশ্লীল ‘সামাজিক বাস্তববাদে’ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত একটা কিছু। সৃজনশীলতা ছিল অসার। এক লাফে প্রয়োজনের রাজ্য থেকে স্বাধীনতার রাজ্যে যাওয়া, যেখানে সবার জীবন যুক্তি দিয়ে আকার পাবে, সোভিয়েত ইউনিয়নে— কিংবা, সত্যি বলতে, অন্য কোথাও— কোনোদিনই তৈরি হয়নি।

 

রূপান্তর: শওকত হোসেন

[তারিক আলি’র দ্য ডাইলেমা অব লেনিন: টেরোরিজম, ওয়ার, এম্পায়ার, লাভ, রিবেলিয়ন থেকে]