প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চ প্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ

(১০ম কিস্তি)

দ্বিতীয় অধ্যায়

‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় ভাষাসমূহের বিকাশ’

(ষষ্ঠাংশ)

ফরাসি ভাষার বন্ধনমুক্তি

(আইবেরীয়, লিগুরীয় এবং গঅলিশ) গঅল-এ মানুষ যেসব ভাষায় গোড়ার দিকে কথা বলত, সেগুলোর কোনোটাই পরবর্তীকালে যা ফরাসি ভাষা হয়ে উঠেছিল, সেখানে তাদের কোনো চিহ্ন রেখে যায়নি বললেই চলে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শতকে যেসব ফ্র্যাংকিশ ও ভিসিগথ হানাদার এসে পৌঁছেছিল, তারা শিগগিরই রোমাকায়িত হয়ে পড়ে। ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যে সংযোগের দিক থেকে বললে বলতে হয়, যুগান্তকারী প্রভাবটি ছিল রোমক বিজয়, আর সেটা ঘটেছিল ৫৮ থেকে ৫১ খ্রিস্টীয় যুগের মধ্যে। অনুবাদের মধ্য দিয়েই রোম গ্রিসের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছিল এবং লিখিত বা লেখ্য লাতিন মধ্যযুগীয় ইউরোপের লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা বা স্বদেশী ভাষা হয়ে দাঁড়ায় (অর্থাৎ কিনা, গির্জা, আইন আর বিদ্যাবত্তার ভাষা)

{লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা কথাটা ইতালীয় ভাষা থেকে নেয়া, আদিতে বোঝাত ফ্র্যাংকিশ ভাষা, সেসব ইউরোপীয় বণিকের ভাষা, যারা পুব ভূমধ্যসাগরে অভিযান চালিয়েছিল, সেই ফ্র্যাংকদের নয় যারা পঞ্চম শতকে গঅলে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। ওটা ছিল মূলত রোমান্স ভাষাগুলোর একটা সংকর, যেটা ক্রুসেডের সময় থেকে ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত ব্যবহূত হয়েছিল। আজ কথাটা দিয়ে যেকোনো সাধারণ ভাষা বুঝিয়ে থাকে, তা সেটা কোনো প্রকৃত জাতীয় ভাষা বা কোনো সংকর ভাষা, যা-ই হোক না কেন। ভারতে মোঙ্গোল বিজেতারা সৈন্যদলের মধ্যে এবং তাদের সাম্রাজ্যে প্রশাসনিক যোগাযোগের একটা ভাষা হিসেবে উর্দু ভাষার জন্ম দিয়েছিল (তুর্কি ভাষায় উর্দু মানে ‘সেনাদল’)। সোয়াহিলি ছিল মূলত আফ্রিকার পুব উপকূলের আরব বণিকদের ভাষা, এবং উল্লেখ্য, সোয়াহিলি কথাটা এসেছে আরবি ‘সাহেল’ থেকে, যার মানে ‘উপকূল’।}

অন্যদিকে, ‘লিঙ্গুয়া রোমানা রাস্টিকা’ই (দখলদার সৈন্য, প্রশাসক, এবং বণিকদের ভাষা), ফরাসিসহ বিভিন্ন রোমান্স ভাষার জন্ম দিয়েছে। সেই নবম শতাব্দীতেই ধ্রুপদী লাতিন আর জনগণের লাতিন বা সেই তথাকথিত ‘ভালগার’ লাতিনের মধ্যে এতটাই দূরত্ব তৈরি হয় যে, গির্জা ও রাজশক্তি দুটোই তার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এবং এখানেই অনুবাদ তার ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে আসে। ‘কাউন্সিল অব ট্যুরস’ (৮১৩ খ্রি.) যাজকদেরকে স্বদেশী ভাষায় ধর্মোপদেশ অনুবাদ করার অনুমোদন দান করে। ‘স্ট্রাসবুর্গের শপথ’ (৮৪২ খ্রি.) যদিও এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনূদিত হয়নি, কিন্তু একটা দ্বিভাষিক টেক্সট হিসেবে (রোমান্স ও টিউটনিক) সেটার প্রতিলিপি তৈরি করা হয়েছিল।

{এই তথাকথিত ‘স্ট্রাসবুর্গের শপথ’ ছিল শার্লামেনের দুই নাতি টেকো চার্লস ও জার্মান লুইস বা লুইসের মধ্যে সম্পাদিত একটি মৈত্রী চুক্তি, যখন তাঁরা সাম্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছিলেন। স্ট্রাসবুর্গে ৮৪২ খ্রিস্টাব্দে দেয়া সেই ঘোষণায় চার্লস এবং লুইস তাঁদের ভাই লোথায়েরের বিরুদ্ধে একে অপরকে রক্ষা ও সাহায্য করবেন বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন। পুরোপুরি লাতিনে রচিত শপথটির প্রতিলিপি তৈরি করা হয়েছিল চার্লসের রোমান্স এবং লুইসের টিউটনিক (ওল্ড হাই জার্মান) ভাষায় এবং নিথার্ড রচিত ইতিহাসে (নবম শতক) তা হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে।} 

তো, এটাই প্রথম কোনো লিখিত নথি বা দলিল,  যা langue d’oïl-এ লেখা হয়েছে। লয়র নদীর উত্তরের মানুষ এই উপভাষাটি ব্যবহার করত। আর langue d’oc ব্যবহূত হতো নদীটির দক্ষিণে। তো, langue d’oïl  উপভাষাটি আরো বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন বেশকিছু উপভাষার জন্ম দেয়, যার মধ্যে সেরা দুটি হচ্ছে নরমান ও ফ্রাঁসিয়েন। বিজেতা উইলিয়ামের কারণে নরমান উপভাষাটি একটি দুর্দান্ত কিন্তু সংক্ষিপ্ত ভবিষ্যতের জন্য নিয়তি নির্দিষ্টই ছিল। অন্যদিকে, একটি কেন্দ্রীয় উপভাষা ফ্রাঁসিয়েন হয়ে উঠেছিল চতুর্দশ শতকীয় ফরাসি ভাষা।

{ফ্রাঁসিয়েন  শব্দটি ভাষাতত্ত্ববিদ গাস্তঁ পারির তৈরি; কথাটা তিনি dialecte de l’Île France-এই অভিব্যক্তিটির বদলে সৃষ্টি করেছিলেন। রাজদরবারের ভাষা হিসেবে ফ্রাঁসিয়েন রাজপ্রভাব বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং একসময় জাতীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করে langue d’oïl প্রদেশের শিক্ষিত মানুষের লিখিত ভাষাগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারিয়ে দিয়ে। ফ্রাঁসিয়েনের ব্যাপারটা বিতর্কিত: কেউ কেউ এ কথা বলেন যে, ফরাসি ভাষা লাতিন ভাষার প্রত্যক্ষ ও খাঁটি বংশজাত এই ধারণার সমর্থন জোগাতে এবং এর ফলে ফ্রান্সের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব হ্রাস করার জন্য এটির অস্তিত্ব ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত এগিয়ে আনা হয়। পরবর্তীকালে, রেনেসাঁও ফরাসি ভাষার বিকাশে তার অবদান রেখেছে। সপ্তদশ শতকে ভাষাটিকে বিধিবদ্ধ এবং প্রমিতকরণ করা হয়। আমরা একটু পরে দেখব, ভাষাটির পরিপূর্ণতা অর্জনের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াতে অনুবাদকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।}

মধ্যযুগের অনুবাদকরা তাঁদের রোমক পূর্বসূরিদের মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন: তাঁরা একটি সম্পন্ন সংস্কৃতি ও প্রাগ্রসর ভাষা থেকে এমন একটি ভাষায় অনুবাদ করছিলেন, যেটি তখনো উদ্ভূত হচ্ছে। সেই সঙ্গে তাঁরা এমন একটি পাঠকগোষ্ঠীর জন্য অনুবাদ করছিলেন, যারা এই অনুবাদকদের কাজের মধ্যে দিয়েই প্রাচীন যুগকে আবিষ্কার করছিল। কাজেই আদর্শের জন্য তাঁরা রোমকদের দিকে তাকালেন: অনুবাদের পদ্ধতির  সন্ধানে তো বটেই, সেই সঙ্গে তাঁদের ভাষার অপূর্ণতাগুলো দূর করার জন্যও বটে। শিগগিরই এই অগ্রদূতদের অনুবাদ শিল্পের বা বিদ্যার অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হলো, সেসব সমস্যার যেগুলো আরো দুরূহ, তার কারণ তাঁরা যে কাজ করছিলেন, সেটা আগে কেউ করেননি।

গোড়াতে এই অনুবাদগুলো বিভিন্ন মঠেই সম্পাদিত হয়েছিল, প্রধানত ধর্মীয় উদ্দেশ্যে, কিন্তু ধীরে ধীরে দশম শতকের দিকে অন্যান্য জ্ঞানকাণ্ডেরও অনুবাদ হতে থাকে। শিগগিরই স্বল্পায়তন আখ্যানমূলক কাব্যের বিশেষত মধ্যযুগীয় সাহিত্যরীতি ফ্যাব্লিউ অথবা, প্রাচীন নমুনার ওপর ভিত্তি ক’রে রচিত কমেডি বা রোমান্স প্রণীত হতে থাকে। প্রথমদিকের মহান কবিরা, যেমন খ্রিতিয়াঁ দি তোয়া, মারি দে ফ্রঁস, খুতব্যফ ও জঁ দে মাং ছিলেন মুখ্যত অনুবাদক। এবং তাঁরা এমন সময়ে লিখছিলেন যখন অনুবাদ, অনুকরণ এবং সৃজন সব অঙ্গাঙ্গিভাবে বিজড়িত হয়ে গিয়েছিল। চতুর্দশ শতকে প্রথম দিকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অনুবাদ মঠের গণ্ডি পার হতে এবং রাজ-সুরক্ষায় ক্ষণিকভাবে নিজের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে পারেনি। রাজা দ্বিতীয় জন বা প্রিয় জন তাঁর এক সচিব পিয়ার বেস্যুইয়াকে (আনুমানিক ১২৯০-১৩৬২, Pierre Bersuire), যিনি একজন বেনেডিক্টীয় সন্ন্যাসী ছিলেন, লিভির ‘রোমের ইতিহাস’ (১৩৫৫-৫৬, Ab urbe condita) অনুবাদ করার দায়িত্ব দেন। বেস্যুইয়া খেয়াল করলেন যে, সে সময়ে ধ্রুপদী লাতিন বোঝার মতো মানুষ খুব কম, আর তাই তিনি অনুবাদের ভূমিকায় তাঁর নিজের তৈরি করা সত্তরটি নতুন শব্দের একটা শব্দকোষ যুক্ত করলেন: augure, auspices, cirque, expier, sénat, triomphe ইত্যাদি। প্রায় একই সময়ে, লাতিন থেকে লরেইন-এর একটি উপভাষায় (Lorraine dialect) কিছু স্তোত্রের অনুবাদের একটি সংকলন Metz Psalter দেখিয়ে দিল কী করে ফরাসি প্রতিশব্দের অভাবের ক্ষতিপূরণ করা যেতে পারে: ১. ধারকর্জ, (যেমন, iniquitas হয়েছে iniquiteit, আর redemptio হয়েছে redemption) এবং ২. অন্বয় বা সহজ করে অন্যভাবে বলা (paraphrase), যেটা এজন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল যে, কিছু কিছু লাতিন শব্দের সমতুল্য বা সমার্থক কথা কেবল ‘ঘুরিয়ে বা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয়ার’ মাধ্যমেই সম্ভব ছিল। এখানে একটা মজার ব্যাপার লক্ষণীয় যে, অনেক আগেই সিসেরো এই দুটো পদ্ধতিরই ব্যবহার ও সুপারিশ করে গিয়েছিলেন।

{উল্লেখ্য, সিসেরোর পুরো নাম মার্কাস তুলিয়াস সিসেরো (১০৬-৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত রোমক রাষ্ট্রনায়ক, দার্শনিক, বাগ্মী ও অনুবাদক। রোমকদেরকে তিনিই গ্রিক দর্শনের সঙ্গে পরিচিত করান এবং সেই দর্শন বোধগম্য করা জন্য প্রয়োজনীয় লাতিন দার্শনিক শব্দভাণ্ডার নির্মাণ করেন। De orator (৫৫ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ, ‘বাগ্মী প্রসঙ্গে’) এবং De finibus bonorum et malorum (৪৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ, ‘ভালো ও মন্দের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে’), এই দুটি রচনায় তিনি অনুবাদ-সংক্রান্ত পূর্বোক্ত ধারণাগুলো ব্যক্ত করে গেছেন।}

ক্রমশ...