৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১, বুধবার
— স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আলভী ভাইদের টাকায় ইয়াহিয়া খান পেশোয়ার ক্যান্টনমেন্টে একটি আলিশান বাড়ি বানিয়েছেন। সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে এ বাড়িতে গৃহপ্রবেশ ঘটল, তার আগে বেশ ক’দিন ধরে চলেছে যতসব তুলকালাম কাণ্ড, মদ্যপান এবং নারীসঙ্গসুধা গ্রহণ। ৩০০ নিরাপত্তা প্রহরীবেষ্টিত বাড়ির লনে একদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলেছে নারী ও পুরুষের উদ্দাম নৃত্য। সেখানে ইয়াহিয়ার কোলে বসা ছিল দুই নারী আর জেনারেল হামিদের কোলে একজন। এই দৃশ্য দেখে এক পুলিশ সদস্য এতই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যে, সে তাদের গুলি করতে চেয়েছে।
— যুদ্ধ নিয়ে খুব কথাবার্তা হচ্ছে। নির্বুদ্ধি কিছু সামরিক কর্তা আগেই আক্রমণের পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। এটিই হবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং নির্বুদ্ধিতার কাজ। এতে পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারটিও বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১, শনিবার
— ইরানের শাহানশাহের সঙ্গে তেহরানে মোলাকাত করতে ইয়াহিয়া করাচি হয়ে রওনা হয়েছেন। এ সাক্ষাতের উদ্দেশ্য কী হতে পারে আমার জানা নেই— সম্ভবত মুজিবুর রহমান ও পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ কিংবা ভারতীয় যুদ্ধ হুমকি। উভয় ক্ষেত্রেই তো আমেরিকান উদ্যোগ বহাল আছে।
১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১, মঙ্গলবার
— দুদিনের জন্য ইরানের শাহের সঙ্গে মোলাকাত শেষ করে ইয়াহিয়া ফিরে এসেছেন। তেহরান এয়ারপোর্টে শাহের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের সময় তাকে খুব বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। এটি খুব সম্ভব তিনি সম্ভাব্য ভারতীয় আক্রমণের প্রেক্ষাপটে শাহের কাছে সামরিক সরঞ্জাম ধার চাইতে পারেন কিংবা শাহ আমেরিকার পক্ষে সাংবিধানিক ব্যবস্থাগুলো জানাতেও ইয়াহিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকতে পারেন।
এখন এটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, কী কারণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশে পাঞ্জাবিদের ব্যাপারে এমন বিদ্বেষ। কারণ সুযোগ পেলে যেকোনো বিভাগে পাঞ্জাবিরা সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও করাচি সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে, আবার সমর শিল্পে অনেক অগ্রসর হয়েছে, পাঞ্জাবিরা কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে আরো বেশি এগিয়ে গেছে।
ইয়াহিয়া এখন স্থবির হয়ে আছেন, ভবিষ্যতে কী ঘটবে এ সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা নেই, আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত।
পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে ভারত।
বহু সংখ্যক গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর গোলাগুলির আড়ালে পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে মূলত নাশকতামূলক কাজ এবং আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য। (পাকিস্তানের প্রতি) অনুগত লোকদের সন্ত্রস্ত করে তুলতে এবং ধ্বংসাত্মক কাজ চালাতে আরো বহু সংখ্যক মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য, আইন-শৃঙ্খলাবিহীন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, অর্থনীতি পঙ্গু করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়া, খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত করা। কেউ কেউ মনে করেন দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি সমাগত। কেউ একজন আমাকে বলেছেন পাকিস্তান যে ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ইয়াহিয়ার মধ্যে কোনো উদ্বেগই দেখা যাচ্ছে না, তাকে পূর্ণ আত্মপ্রত্যয়ী মনে হচ্ছে। এটি ভালো, কিন্তু আমি ভাবি এর কতটা যুক্তিসঙ্গত।
২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১, সোমবার
— আমার মনে হচ্ছে, লে. জেনারেল হামিদ ইয়াহিয়ার ওপর অসন্তুষ্ট, কারণ ইয়াহিয়া দুটি পদ ধরে রেখেছেন। তিনি মনে করছেন তার সঙ্গে ছলচাতুরী করা হয়েছে। তবে লে. জেনারেল হামিদ নীরব ও ধৈর্যশীল মানুষ। আমার মনে হয় না, এ নিয়ে তিনি কোনো শোরগোল করবেন।
— পাকিস্তানের খুব ভালো বন্ধু স্যার ফ্রেডরিক বেনেট এমপি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গতকাল আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। পাকিস্তানে এখন যা ঘটছে, তা নিয়ে তিনি বাস্তবিকই অসন্তুষ্ট। তিনি বললেন, নভেম্বর থেকে মার্চ পাকিস্তানের জন্য খুব কঠিন সময়। ভারত পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে, আর এটি তিনি এ কারণে বললেন যে, হিমালয় গিরিপথ বন্ধ হয়ে গেলে চীনও সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে পারবে না।
ভারত যদি কাউকে ভয় পায়, তাহলে তা চীনকেই।
২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১, বুধবার
— আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ভারতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত রয়েছে। আমার মনে হয়, তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানে এবং প্রস্তুতিও নিচ্ছে। এখন যুদ্ধ পাকিস্তানের দরজায়, এত কাছাকাছি আগে কখনো আসেনি। অনুমান করা যায়, ভারত পূর্ব পাকিস্তানের কিছু অংশ দখল করে নিয়ে সেখানে শরণার্থীদের বন্দোবস্ত করবে। এটি আসলে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে পূর্ব পাকিস্তান দখলের অজুহাত। ভারতের মনে যা-ই থাকুক, পূর্ব পাকিস্তান দখলের চেষ্টা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে যুদ্ধে লিপ্ত করবে। একজন নারীর নেতৃত্বে ভারতে একটি দুর্বল সরকার দেশ চালাচ্ছে। এই নারী যদি সুযোগ পান, তাহলে তিনি অবশ্যই দেখিয়ে ছাড়বেন যে, তিনি পুরুষের চেয়ে কম নন। মস্কোয় ইন্দিরা গান্ধীর সৌজন্যে দেয়া মধ্যাহ্নভোজে কোসিগিন পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকবেন। আবার একই সঙ্গে তিনি এ কথাও বলেছেন যে, কোনো পরিস্থিতিতেই উপমহাদেশে যুদ্ধ লাগতে দেয়া যাবে না।
টিকা:
আইয়ুব খান: ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান (১৪ মে, ১৯০৭-১৯ এপ্রিল, ১৯৭৪) ১৯৫১ থেকে পাকিস্তানের কমান্ডার-ইন-চিফ। ২৮ অক্টোবর, ১৯৫৮ থেকে ২৫ মার্চ, ১৯৬৯ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট।
‘ডায়েরিজ অব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৬৬-১৯৭২’ ২০০৭ সালে প্রকাশিত। সম্পাদনা করেছেন ক্রেইগ ব্যাক্সটার।
ইয়াহিয়া খান: জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান (১৯১৭-১০ আগস্ট, ১৯৮০) পাকিস্তানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট। তিনিও সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতাসীন হন। ২৬ মার্চ, ১৯৬৯ থেকে ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার অ্যালকোহল ও নারী আসক্তির কট্টর সমালোচক তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান।
লে. জেনারেল হামিদ: লে. জেনারেল আব্দুল হামিদ খান ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। ডেপুটি মার্শাল ’ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে একসময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
শাহানশাহ: মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি (২৬ অক্টোবর, ১৯১৯-২৭ জুলাই, ১৯৮০) ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১ থেকে তাকে উচ্ছেদ করার দিন ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ পর্যন্ত ইরানের শাহ ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শাহের ঘনিষ্ঠতা ছিল।
ইন্দিরা গান্ধী: ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী (১৯ নভেম্বর, ১৯১৭-৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪) ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ এবং ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭১-এ উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ঘাতকের হাতে নিহত হন।





