জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

(পঞ্চবিংশ কিস্তি)

(তৃতীয় অধ্যায়)

‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় সাহিত্যসমূহের উদ্ভব’ (ষষ্ঠ পর্ব)

পক্ষ পরিবর্তন: আয়ারল্যান্ডের ঘটনা (প্রথমার্ধ)

১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা যুদ্ধের তুঙ্গ মুহূর্তে, Misneach (সাহস) নামের একটি সাময়িকপত্র আইরিশ লেখকদের আইরিশ ভাষায় বিশ্বসাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অনুবাদ করার আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি প্রকাশ করে। ১৯২২ সালে আইরিশ ফ্রি স্টেট স্থাপনের মধ্য দিয়ে উচ্চাভিলাষ বাস্তবে পরিণত হলো। ১৯২৮ সালে, শিক্ষা বিভাগের তৈরি একটি ‘প্রকাশনা কমিটি’, যা পরে An Gúm-এ পরিণত হয়, একটি অনুবাদ প্রতিযোগিতার ঘোষণা দেয়। আইরিশ ভাষায় অনুবাদের প্রয়োজনীয়তার জন্য প্রধান যে দুটো কারণ তুলে ধরা হয়েছিল, তা হলো অসাধারণ সব বিদেশী রচনার অনুকরণের বা সেসবের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টার মাধ্যমে আধুনিক আইরিশ সাহিত্যে গতি সঞ্চার করা।

স্বাধীনতার সময় আইরিশ ভাষা ও সাহিত্য একটি অবরুদ্ধ দশায় ছিল। ভাষাটির বিরুদ্ধে প্রথম যে আইন প্রণীত হয়েছিল— Statuets of Kilkenny— সেটা করেছিল অ্যাংলো-নরমান হানাদাররা, ১৩৬৬ খ্রিস্টাব্দে, এবং তাতে বলা হয়েছিল, যেসব ইংরেজ আইরিশ ভাষায় কথা বলবে, তাদের জায়গা-জমি বাজেয়াপ্ত করা হবে। অবশ্য আইনটির তেমন কোনো বাস্তবিক প্রভাব পড়েনি, কিন্তু ১৫৩৭ সালে রাজা অষ্টম হেনরি এ মর্মে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করেন, যার বলে আইরিশদের জন্যও মাতৃভাষায় কথা বলা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। আয়ারল্যান্ডের টিউডর ও ক্রমওয়েলীয় বিজয় ছিল সর্বাত্মক এবং বেশ কার্যকর। সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের অধিকতর দ্ব্যর্থহীন নীতি অনুযায়ী ভাষার পার্থক্যকে রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততার অগ্রহণযোগ্য বাহ্যিক অভিব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিনসেল (১৬০১) ও বয়েনের (১৬৯০) যুদ্ধে গেলিক অভিজাত সম্প্রদায়ের চূড়ান্ত পরাজয় সমাজ-রাজনীতিক কাঠামোগুলোকে ধসিয়ে দেয়, যা পুরনো গেলিক সম্প্রদায়ে একসময় পেশাদার লেখকদের (filí) পৃষ্ঠপোষকতার একটা ব্যবস্থার জোগান দিয়েছিল। সাহিত্য হয়ে পড়ে পৃষ্ঠপোষক ও পাঠকশূন্য, ভাষা তত্ত্বাবধায়কহীন। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ দেখা গেল মাত্র ১৫ শতাংশ জনগণ, বিভিন্ন কারণবশত, আইরিশভাষী। প্রথমত. যারা ১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭-এর মহাদুর্ভিক্ষের সময় মারা গিয়েছিল বা দেশান্তর হয়েছিল, তাদের অনেকেই আইরিশভাষী ছিল। তাছাড়া ১৮৩৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আইরিশ বাদ দেয়া হয়েছিল এবং ক্যাথলিক চার্চ আইরিশদের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি নির্লিপ্ত ছিল। বিশ শতকের গোড়ার দিকে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আইরিশ ভাষার পুনঃস্থাপন ও পুনর্জাগরণ। অনুবাদ ছিল এ পুনরুদ্ধার, এ মেরামতি বা সংস্কারকাজের হাতিয়ার।

An Gúm-এর অনুবাদ প্রকল্প ছিল পরস্পরবিরোধিতায় দীর্ণ এবং তার ফলে কয়েক শতাব্দীব্যাপী ভাষাতাত্ত্বিক বেদখলের প্রত্যুত্তর হিসেবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হয়েছিল। মূল দ্বন্দ্বটি ছিল পুনঃসৃজন হিসেবে অনুবাদ ও শিক্ষণ প্রণালি হিসেবে অনুবাদের মধ্যে, আর এ দ্বন্দ্বের নিরসন করা প্রকল্পটির পক্ষে কখনই সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। একদিকে লিয়াম ও রিন এবং সিয়ারভাল ও’ড্যালের মতো বুদ্ধিজীবী ভাষ্যকাররা অনুবাদকে আইরিশ ভাষায় এক নতুন সাহিত্যিক প্রকাশরীতি হিসেবে দেখলেন, যা ভাষাটিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করবে এবং ১২৫০ থেকে ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গোটা গেলিক জগতে ব্যবহূত ধ্রুপদী আইরিশের গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান সাংস্কৃতিক শব্দসম্ভার পুনঃপ্রচলন করবে। ১৯৩৩ সালে দি ইউনাইটেড আইরিশম্যান-এ লিয়াম ও রিন তাই দাবি করলেন: ‘ইউরোপে এমন কোনো দেশ নেই, যার দুই ধরনের ভাষা নেই, যার একটি কথাবার্তায় ও আলাপচারিতায় বা ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবহার হয়, অন্যটি সাহিত্যে দেখতে পাওয়া যায়।’ ও রিনের এ মন্তব্যের নেপথ্যে ছিল অনুবাদ সম্পর্কে আরো সাধারণ একটি ধারণা এবং সে ধারণার মূলে ছিল অষ্টাদশ শতকের শেষ ও উনিশ শতকের প্রথম ভাগের জর্মন অনুবাদতত্ত্ব; এবং সে তত্ত্ব অনুযায়ী, (বিশেষ করে গ্রিক ও লাতিন টেক্সটের) অনুবাদ একটি স্বাধীন জর্মন সাহিত্যকে চাঙ্গা করার কাজ করবে এবং জর্মন ভাষার অপরিমেয় ভাষাতাত্ত্বিক সংস্থানের প্রমাণ হাজির করবে। জার্মানিতে Strum und drang ও আদি রোমান্টিক আন্দোলনগুলোর যে আবেগগত ও রাজনৈতিক আমূল সংস্কারবাদ প্রত্যক্ষ করা হয়েছিল, তা আয়ারল্যান্ডের ১৭৯৮ ও ১৮০৩ সালের বিদ্রোহের প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। কুনো মেয়ার্সের মতো জর্মন পণ্ডিতরা কেল্টিক বিদ্যার ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকায় জর্মন প্রভাব বিশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। সে কারণে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন আইরিশ বুদ্ধিজীবীদের কাছে জাতীয় সাহিত্যের আবির্ভাবের ক্ষেত্রে অনুবাদের পুনঃসৃজনমূলক ও উৎপাদনশীল ভূমিকা একটি পরিচিত বিষয় বা থিম হয়ে উঠেছিল। কোনো দুর্বল হয়ে পড়া লক্ষ্য ভাষাকে শক্তিশালী করার ও সেটিকে আবার সাহিত্যিক মাধ্যম হিসেবে তৈরি করার একটি উপায় হিসেবে অনুবাদকে দেখা হয়েছিল।

অনুবাদের প্রতি এ মহিমান্বিত দৃষ্টিভঙ্গি যে সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়েছিল তা নয় এবং তা সবচেয়ে কম হয়েছিল সেসব রাজনীতিকের কাছে, যারা অনুবাদ প্রকল্প প্রচলন ও তার অর্থায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৯৩১ সালে ফ্রি স্টেটের অর্থমন্ত্রী এরনান ডি ব্লাগাদ বলেন, আয়ারল্যান্ডের মুখ্যত ইংরেজিভাষী অঞ্চলগুলোয় সব ধরনের পাঠকের রুচি অনুযায়ী প্রচুর পরিমাণ পাঠ্য উপাদান যাতে আইরিশ ভাষায় পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে এবং এজন্য যে পরিমাণ টেক্সট বা রচনা দরকার তা কেবল তার বিবেচনায়, অনুবাদের মাধ্যমেই সৃষ্টি করা যেতে পারে। যেসব বই অনুবাদের কথা হচ্ছিল, তার চমকপ্রদ সমন্বয়বাদের (একলেকটিসিজম) মধ্যেই অনুবাদকের শিক্ষণ প্রণালিগত ব্রত পরস্ফুিটিত হয়ে উঠেছিল। আমরা দেখি, ১৯২৮ সালের একটি তালিকায় ছিল: Lorna Doone, The Last of the Mohicans, Hajji Baba of Ispahan, Irish Nationality, The Path to Rome, The Wallet of Kai Lung, আবার, Daddy Longlegs, Mrs. Wiggs of the Cabbage Patch, এবং The Undying Monster। তালিকায় জনপ্রিয় ফিকশন ও শিশু সাহিত্যের আধিক্যের মানে হচ্ছে আইরিশ, যারা প্রায় জানেই না, তারা সে ভাষায় পাঠযোগ্য উপাদানের সহজ উপায় হাতের কাছে পেয়ে যাবে। এ লক্ষ্যটি আর সেই সঙ্গে সব ধরনের রুচির পাঠকদের জন্য পাঠযোগ্য উপাদান সরবরাহ করার ধারণাটি প্রশংসনীয় হলেও উচ্চসংস্কৃতির অনুবাদের প্রবক্তাদের উদ্বুদ্ধ করা পুনঃসৃজনমূলক প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তা তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বললেই চলে।

অনুবাদকে যদি ভাষাই শেখাতে হয়, তাহলে সেটার প্রাথমিক কাজ হবে আয়ারল্যান্ডের Gaeltachtaí (আইরিশভাষী অঞ্চলগুলো)-এর সমৃদ্ধ দেশী ভাষা শেখানো। অনুবাদ প্রকল্পে প্রায় নিরঙ্কুশভাবে আইরিশ ভাষায় কথা বলা দেশীয় লোকজনদের নিয়োগ করা হয়েছিল: Seán Ó Ruadháin, Séamus Ó Grianna, Nicolás Tóibín এবং Aindrias Ó Baoighill। এ অনুবাদকরা, লরেন্স ভেনুটির ভাষায় বললে, একটি ‘ফ্লুয়েন্ট বা স্বচ্ছন্দ কৌশল’ অবলম্বন করেছিলেন। আর সেটা হলো, টেক্সটিকে এমনভাবে অনুবাদ করা, যেন সেটা পড়লে মনে হয় আদতে সেটা লক্ষ্য ভাষা ও সংস্কৃতি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে এবং যেখানে মূল টেক্সটের ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কোনো ধরনের চিহ্ন নেই। মুনস্টার, আলস্টার ও কনাক্ট প্রভৃতি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেছে নেয়া অনুবাদকরা তাদের অনূদিত রচনায় উপভাষাগত পার্থক্যগুলো বজায় রাখলেন। তার ফলটা বিগ্রহচূর্ণকারী না হয়ে দাঁড়াল রক্ষণশীল, যা ছিল আক্ষরিকভাবে বললে যা হয় ‘জনসাধারণের ভাষা, সেই caint na ndaoine-এর মতো আরো একটি সাধারণ দায়বদ্ধতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ অবস্থানের পক্ষে সবচেয়ে জোরগলায় যিনি বক্তব্য রেখেছিলেন, তিনি হলেন আধুনিক আইরিশ সাহিত্যের আদি ক্ল্যাসিকগুলোর একটি Séadna-এর (১৯০৪) রচয়িতা ও একজন প্রসিদ্ধ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী Fr. Peadar Ó Laoghaire। তিনি দাবি করলেন যে, Gaeltachtaí অঞ্চলগুলো বসবাসকারী জনসাধারণের স্বাভাবিক, দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তার ভেতরেই আইরিশ জনসাধারণের সত্যিকারের চৈতন্য ও ভাষাটির সারাৎসার পাওয়া যাবে। অবশ্যই এ কথায় ভাষাতাত্ত্বিক যে সাপেক্ষবাদ (relativism) অন্তর্নিহিত রয়েছে, তা উনিশ শতকে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের একটি সাধারণ যোগসূত্র।

(ক্রমশ)