তৃষ্ণাপর্ব

সারাক্ষণ চোখের তারার

ভোরবর্ণ দেশে ভ্রমণ করে কারা?

 

দেখাগুলি চলিষ্ণু মেঘদল,

স্বপ্নময়, নাকি বজ্রপোড়া, ওজন কত হবে?

 

করো যাপনের খতিয়ান,

কোন দলিল-অক্ষরে জায়মান?

 

দুগ্ধধবল সত্যের বিধান,

ফসলযত্নে মাপযন্ত্রে তোলো।

 

মনিটরে অজস্র দৃশ্যের সংখ্যাঢেউ। শতরূপ।

বলো অংকবিদ, দেখাগুলির ওজন কত হলো?

 

শস্য হাতে শিশু,

পদ্মায় শ্রাবণ-রাত্রিতে ইলিশের নৌকা,

৭ই মার্চে আকাশছোঁয়া হাত,

রাত্রির বোরকা পরা ঘুমন্ত গ্রাম, বুটের উল্লাস,

দেশহারা মানুষ, সৈকতে মৃত শিশু,

মার গোরখোদকের কোদালে

বসত হারানো ভীত দুটি কেঁচো,

গীতবিতানের প্রেম পর্বে একটি বহুবর্ণ পালক

হাঁটছে, একাকী বসে আছে, তীরের মেজাজে দৌড়াচ্ছে,

মুখে হাসি, কথা বলছে জাগ্রত, ঘুমন্ত স্বরে, কখনো বিষণ্ন।

দৃশ্যেরা ঘুরে ঘুরে চেনা-অচেনা কথা আর বারতায়

ছুঁয়ে যাচ্ছে এবং যাচ্ছে না তাদের বন্ধু-শত্রু-হাত।

 

‘আর কী কী রেখেছ চোখের পৃথিবীতে?’

বসে থাকি বোবা।

সব উত্তরে সবাই দেখে না সূর্যোদয়।

 

গোয়েন্দা বাহিনী আর নিউজ এজেন্সি

আমার চোখের পাঠশালায়

তাদের ‘কী  কী’ খুঁজতে লেগে গেল।

 

অক্ষিগোলকের ভেতর থেকে

এক গোয়েন্দা টাকমাথা বের করতেই

ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন

লাল আলো জ্বেলে

‘কী দেখলেন? গোপন কিছু আছে?’

‘তালিকা করছি, শেষ হলে বলব’,

‘কবে শেষ হবে?’

বিষণ্ন হেসে, ‘ক্ষুধার্ত আমি।’

‘একটা কিছু বলুন?’

‘আতঙ্কের এই শতাব্দী লেগে যেতে পারে।

দেখেছি এক ঝলক,

ডালদানার মতো, অশ্রুবিন্দুর মতো

লাল নীল কালো চিহ্নবীথি ধাবমান।’

 

পৃথিবীর সব টিভিতে ব্রেকিং নিউজ।

যেন ট্রাম্পের বক্তৃতা শুনে

স্ট্যাচু অব লিবার্টি আত্মহত্যা করবে বলে

ইস্ট রিভারে নেমে গেছে।

‘দেখাগুলির তালিকা হচ্ছে,

শেষ হতে একশ বছর লাগতে পারে।’

ক’জন জিরাফ টক শোতে

ঠোঁটের তরঙ্গ-কল্লোলে ব্যস্ত সারা দিন।

সোস্যাল মিডিয়ায় কথার সমুদ্রঢেউ:

‘মানুষটাকে একটু শান্তি দাও।’

‘শালার পায়ুপথে বরফ ঢুকাও

সব সঞ্চিত-দেখা

না দেখার কথা বলে দেবে।’

 

মানুষেরা আয়নার জাদুঘরে যায়।

ডুবোচর। বহুবর্ণ বাঁচা। অশ্রুরেখা।

আনন্দ-ডানা। বিষণ্ন-সিঁড়িতে ছায়া।

কী ভেবে ব্যক্তিগত চোখ বন্ধ করে।

ঐ যে শৈশব। ঐ যে প্রেম। যৌবনঝঞ্ঝায় চাঁদ।

ঐ যে না-ফেরা ভেসে আসে, ভেসে যায়।

 

দেখার তৃষ্ণা ডাকে, ‘চলো, কে চায় স্থবিরতার প্রতিধ্বনি?’

 

সীমাহীন ভার টানতে টানতে আমি মুখ থুবড়ে পড়ে যাই।

ধুলো মুছে কষ্টের আড়ত নিয়ে আবার দাঁড়াই।

 

সূর্যের অমিয় মাতৃসেবা দেখি।

যা চাই অন্বেষণে, যদি পেয়ে যাই।

 

রৌদ্রময়, কুয়াশাগৃহী সব দৃশ্যই আমার জল।

 

বিকালের স্বরে আয়ু ফুরাবার দিনগুলি বলে,

‘কবে অন্ধ হবে? দেখার সঞ্চয়ে গণবিলুপ্তি নেই?’

 

কখনো আমার চোখ

ফলহীন গাছের ঋতুস্বরে বলে:

‘শীতের নক্ষত্র রেখে চলে গেছে প্রেম।

নারীকেও বহুবিধ অধুনায় দেখেছ অনেক।

খড়কুটোও আমাকে নিয়ে ধুলোঠোঁটে হাসে।

রক্ত, অন্ধকার থেকে এসে আমার উঠোনে পড়ে।

শিশুর হাতের উপর দিনের শেষ সূর্য রেখে,

যেন সমুদ্রে ডুবতে দেবে না, তুলেছ তার ছবি।

আর কিসের আশায় কতদূর টানবে আমাকে?’

 

যেন চোখ বন্ধু সিসিফাসের কালো পাথর,

নিরন্তর ঠেলি, উঠছি পাহাড়ে।

ওই শীর্ষে শান্তি থাকে একা।

নিজেই অবাক, এক সন্ধ্যায় চূড়ায় উঠে গেছি।

কী গর্বিত শ্রমিকতা!

কাঁদে চোখ,

আমাদের সীমাহীন যোগ্যতায়

সুন্দরকেও করেছি দেউলিয়া।

 

বলো, আর কত টানবে আমাকে?

মনে নেই, যযাতির ঘুমহীন ক্ষরণ?

আর কী দেখাতে চাও?

কী দেখলে বলবে, ‘চোখ এবার চির বিশ্রামে যাও।’

একটি প্রসন্ন মুখ। একটি গীতশ্রী দিন।

তৃষিত মানুষ, বহন করো, টানো, আজন্ম ঠেলে যাও।