দোপেঁয়াজা—নাম থেকে আন্দাজ করে নেয়া যায় রেসিপিটিতে পেঁয়াজের আধিক্য থাকবে। মূলত বেশি পেঁয়াজ রান্না করা মাংসের পদটিই দোপেঁয়াজা। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এ রান্না বেশ জনপ্রিয়। বিশেষভাবে নাম নিতে হবে ইরান, আফগানিস্তান ও ভারতের। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রেস্তোরাঁর মেনু কার্ডে দোপেঁয়াজা থাকবেই। দোপেঁয়াজার বাংলা করলে হয় দুটো পেঁয়াজ। দোপেঁয়াজায় পেঁয়াজের অধিক্য থাকে, তবে বিষয়টা শুধু বেশি পেঁয়াজ দেয়া নয়, সেটা একটু ভিন্নতর উপায়ে ব্যবহার করা হয়।

পারস্যের রান্নায় পেঁয়াজের আধিক্য দেখা যায়। ষোলো শতকে পারস্যের এ প্রভাব মোগলদের হাত ধরে প্রবেশ করে ভারতের রসুইঘরে। তবে রান্নায় পেঁয়াজের দ্বিতীয় স্তর যোগ করাটা নাকি শুরু হয়েছিল আকবরের আমলে। গল্পটা এমন যে ভুলবশত পাচক রান্নায় দুবার পেঁয়াজ দিয়ে ফেলে, আর আকবর সে রান্না বেশ উপভোগ করেছিলেন। ব্যস, সে থেকেই মোগল রান্নাঘরে যুক্ত হয়ে গেল দোপেঁয়াজা। এ দোপেঁয়াজায় পেঁয়াজের একটা অংশ থাকত পাতলা করে কাটা ও হালকা ভাজা। আরেকটা অংশ থাকত মিহি পেস্ট। অর্থাৎ পুরো স্বাদ পেঁয়াজের হলেও তাতে দুই ধরনের আমেজ থাকত। ভারতীয় রান্নাঘরে এ রেসিপিতে যুক্ত হয় গোলমরিচ, জিরা, ধনে, এলাচ ও লবঙ্গ। মূলত, খাসি বা ভেড়ার কিমা মাংস দোপেঁয়াজার জন্য ব্যবহার করা হতো। এটাও নিরামিষভোজী ভারতীয় সংস্কৃতিতে পারসিক সংযোজন। সেকালে যেহেতু ফ্রিজারের ব্যবস্থা ছিল না, তাই তাজা মাংসেরই দোপেঁয়াজা হতো। অন্যদিকে এখন পুরনো মাংস পছন্দমতো কেটে দোপেঁয়াজা করা যায়।

উনিশ শতকে ভারতবর্ষে বসবাসরত ব্রিটিশদের মধ্যে দোপেঁয়াজা কারি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর গত শতকে যুক্তরাজ্যের ভারতীয়দের রেস্তোরাঁয় জায়গা করে নিয়েছে দোপেঁয়াজা। হায়দরাবাদের রসনা বিলাসে দোপেঁয়াজা অন্যতম নাম। 

ইতিহাস থেকে যেটুকু পাওয়া যায় তাতে এটা নিশ্চিত যে দোপেঁয়াজার মূল পারস্যের রান্নাঘরে—পেঁয়াজ দিয়ে কিমা মাংস রান্না। এরপর বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে স্থানীয় রন্ধনশৈলী অনুসারে উপাদান সংযোজন হয়েছে।

দোপেঁয়াজার যে সাধারণ পদ্ধতিটি প্রচলিত সেটা এখানে উল্লেখ করা হলো—

প্রথমে মাংস বাদামি রঙ হওয়া পর্যন্ত তেলে হালকা করে ভাজতে হবে। এরপর মাংস সরিয়ে সে পাত্রেই দুই-তৃতীয়াংশ পেঁয়াজ হালকা ভাজা দিতে হবে। এরপর মসলা দিয়ে দিতে হবে। ঘ্রাণ বের হওয়া পর্যন্ত কয়েক মিনিট ভাজতে হবে। এরপর এসবের মধ্যে মাংস দিতে হবে, সঙ্গে আদা ও রসুন বাটা। টমেটোও দেয়া যায়। কয়েক মিনিট পর বাকি থাকা পেঁয়াজ দিয়ে দিতে হবে। এরপর আরো ৩-৪ মিনিট ভাজতে হবে। এবার পরিমাণমতো পানি দিয়ে রান্না করতে হবে।

ভারতবর্ষে দোপেঁয়াজার আগমনে আকবরের ভূমিকা নিয়ে এ লেখায় আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে ভিন্ন একটা গল্পও আছে। বলা হয় পদটি তৈরি করেছিলেন আকবরের সভাসদ মোল্লা দোপেঁয়াজা। তবে মানুষটির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে। মোল্লা দোপেঁয়াজা তার উপস্থিত বুদ্ধি আর রসবোধ দিয়ে আকবরকে আনন্দ দিতেন। তবে দোপেঁয়াজা নিয়ে গল্পগুলো পুরোটাই লোককথা বলে বিবেচনা করা হয়। তাই নামের মিলটি কাকতালীয় ঘটনাই বলা যায়। ব্রিটিশরা ভারত থেকে দোপেঁয়াজা আরো অনেক দেশে নিয়ে গেছে। তারা এতে যোগ করেছে সবজি। মধ্য এশিয়ায় ভেড়ার দোপেঁয়াজা জনপ্রিয়। ভারতবর্ষে এ রান্নার মাংসের তালিকায় যুক্ত হয়েছে খাসি, গরু, মুরগি এমনকি মাছও।

অমিত রহমান: লেখক